
এই লেখায় নারীবাদী চিন্তার ইতিহাসকে চারটি ‘তরঙ্গ’ বা পর্যায়ের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রাগৈতিহাসিক সমাজে নারীর ভূমিকা ও গুরুত্ব থেকে শুরু করে পিতৃতন্ত্রের উত্থান, ভোটাধিকার আন্দোলন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আলোচিত হয়েছে ধারাবাহিকভাবে। একই সঙ্গে সিমোন দ্য বুভোয়ার, জুডিথ বাটলার কিংবা লরা মালভির মতো গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদদের তত্ত্বের আলোকে দেখানো হয়েছে, কীভাবে পরিবার, সমাজ ও মিডিয়া জেন্ডার পরিচয় নির্মাণ ও পুনরুৎপাদনে ভূমিকা রাখে।
আমরা যখন নারীবাদ নিয়ে আলাপ করি বা এর ইতিহাস পড়ি, সাধারণত কয়েকটি পর্যায় ধরে আলোচনা করি। এই পর্যায়গুলোকে ‘ওয়েভ’ বা তরঙ্গ হিসেবে শনাক্ত করে মোট চারটি পর্যায়ে নারীবাদের এই যাত্রাকে ধরা যেতে পারে। নারীবাদীদের মতে, নারীর ঐতিহাসিক পরাজয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের এই সভ্যতা, টিকে আছে নারীকে অবমূল্যায়ন করে, অধীনস্থ করে, প্রান্তিকীকরণের মধ্য দিয়ে। কিন্তু দুনিয়ায় এমন তীব্র বৈষম্যের মধ্য দিয়ে নারীর শুরুটা ছিল না। বরং নারী সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম হওয়ায় তখন তার গুরুত্ব ছিল অসীম। প্রকৃতির শ্বাপদসংকুল পরিবেশে তখন টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন ছিল আরও বেশি লোকবলের, তাই নারী ছিল শক্তি ও একতার উৎস। আমরা অনেকেই মনে করি যে যূথবদ্ধ সমাজে নারীরা সন্তান লালনপালন করত আর পুরুষেরা গিয়ে শিকার করে আনত। নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হিসাবটা এতটা সরলরৈখিক না। শিকারের মাধ্যমে পাওয়া আমিষ বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও শিকার সব সময় নিশ্চিত নয়। অনেক সময় ফিরতে হতো খালি হাতেও, কিংবা শুধু আমিষ রাতের খাবারের জন্য পর্যাপ্ত নয়। সেই সময় নারীরা যে কেবল সন্তান লালনপালন করত তা নয়, তারা ফলমূল, শাকসবজি সংগ্রহ করত। ধীরে ধীরে শিখে নিয়েছিল সংরক্ষণের বিষয়টিও, মনে করা হয় এভাবেই তাদের হাত ধরে গড়ে উঠেছিল কৃষির পত্তন। গৃহ নির্মাণ এবং ব্যবস্থাপনায় ব্যাপৃত ছিল নারী। পোশাক বুনন এমনকি শিকড়বাকড় দিয়ে চিকিৎসা বা রোগ নিরাময় মনে করা হয়, এখানেও নারীর অবদান সব থেকে বেশি।
কিন্তু নারীর ঐতিহাসিক পরাজয় ঘটে লাঙল আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। এত দিন পর্যন্ত নারী বুদ্ধি দিয়ে প্রজ্ঞা দিয়ে যা কিছু অর্জন করেছিল, এই আবিষ্কার তা ছিনিয়ে নেয়। কৃষি এবং তার পরম্পরায় লাঙলের আবিষ্কার থেকে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় ব্যক্তিগত সম্পদ বা পুঁজির ধারণা। আর এই সম্পদের মালিক হন মূলত পুরুষ, যে পুরুষ বলপ্রয়োগ করতে পারে, সে হয়ে ওঠে ধনী জোতদার, দুর্বল পুরুষেরা হয় তার অধীন। অর্জিত সম্পদ সে সবার মাঝে বিতরণ করতে চায় না বরং কুক্ষিগত করতে চায়। মৃত্যুর পর সম্পদ হস্তান্তর করতে চায় নিজের পুত্রকে। কিন্তু হায়, সে নারীর মতো সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম নয়, কীভাবে উত্তরাধিকার করে সব সম্পদের মালিকানা হস্তান্তর করবে সে। শুরু করল বিবাহ প্রথা, যেখানে নারী একজন পুরুষের অধীন হলেও নিজের জন্য উন্মুক্ত রাখল বহুবিবাহ প্রথা। তার কারণ মূলত সন্তানের পরিচয় নির্ধারণের মধ্য দিয়ে উত্তরাধিকার তৈরি। আর এভাবে পুরুষ নারীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় সন্তান জন্ম দেওয়ার ‘গ্লোরি’, যা এত দিন নারী শরীরের শক্তিময়তার এক প্রতীক ছিল, তাই দিয়ে নারীকে পুরুষের অধীনস্থ করে রাখার কৌশল তৈরি হলো, শুরু হলো পিতৃত্বতন্ত্রের। পুরুষের জন্য তৈরি হলো অনেক পেশা, আর নারীর জন্য বরাদ্দ রইল ঘর, বাচ্চা জন্মদান আর লালন-পালনের দায়িত্ব। কিন্তু ঘরটি তার নিজের নয় স্বামীর, তার নিজের সন্তানও তার নিজের নয়, তার স্বামীর। নারী এভাবে হয়ে উঠল একেবারেই পুরুষের ব্যক্তিগত সম্পদ। রাষ্ট্র তাকে কোনো স্বীকৃতি দেয় না, তার কোনো ভোটাধিকার নেই।
নারীবাদীদের মতে, নারীর ঐতিহাসিক পরাজয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের এই সভ্যতা, টিকে আছে নারীকে অবমূল্যায়ন করে, অধীনস্থ করে, প্রান্তিকীকরণের মধ্য দিয়ে। কিন্তু দুনিয়ায় এমন তীব্র বৈষম্যের মধ্য দিয়ে নারীর শুরুটা ছিল না। বরং নারী সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম হওয়ায় তখন তার গুরুত্ব ছিল অসীম।
ঠিক এই পর্যায় থেকেই নারীবাদী আন্দোলনের যাত্রা শুরু। প্রথম ওয়েভ বা পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাই ভোটাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অধিকার নিয়ে আন্দোলন। ১৯ শতকের শেষ কিংবা বিংশ শতকের গোড়ার দিকে নারীবাদীদের কাছে সবার আগে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নারীর আইনি অধিকার বা বলা যেতে পারে আইন বা রাষ্ট্রের চোখে নারী যেন সমান সুযোগ পায়, সেই বিষয়টি। এই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ছিলেন মেরি ওলস্টোনক্রাফট (১৭৫৯-১৭৯৯)। তিনি শিক্ষাকে নারীমুক্তির অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে দেখতেন এবং মনে করতেন যথার্থ শিক্ষার মধ্য দিয়ে নারীমুক্তি সম্ভব। বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে মোড অব প্রোডাকশনে যে বড় পরিবর্তন আসে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে জেন্ডারভিত্তিক কর্ম বণ্টনে। পুরুষ মানুষ টাকা কামানোর জন্য বাইরে চলে যায় আর নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে বুর্জোয়া নারীরা স্বামী যেটুকু মর্যাদা, আনন্দ বা ক্ষমতা দেয়, তাই দিয়ে জীবন পার করে দেয়। নারী বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা থেকে সরে গিয়ে নিজেকে অন্যের মুখাপেক্ষী করে তোলে। মেরি ওলস্টোনক্রাফট মনে করতেন, এটা নারীর স্বভাববিরুদ্ধ। কারণ, আদিম যুগ থেকে নারীকে নিজের এবং তার সমাজের টিকে থাকার প্রশ্নে লড়াই করতে হয়েছে, সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, আবিষ্কার করতে হয়েছে। ফলে এই জীবনটাকে তিনি খাঁচা বন্দী পাখি হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রথম তরঙ্গের আরেক নেতা এলিজাবেথ ক্যাডি স্যান্টন (১৮১৫-১৯০২) মনে করতেন নারী ও পুরুষ উভয়েই সমানভাবে সৃষ্টি হয়েছে এবং তাদের সমান অধিকার থাকা উচিত। স্যান্টন মনে করতেন, নারীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার সাহস এবং নিজের অধিকার দাবি করার ক্ষমতা।
দ্বিতীয় তরঙ্গ চলমান ছিল ১৯৬০ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত। এ সময়ের নারীবাদীরা শুধু আইনি অধিকার নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এই সময় ‘দ্য পার্সোনাল ইজ পলিটিক্যাল’ ধারণাটি জনপ্রিয় হয়, যার অর্থ ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা আমাদের চারপাশের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। এই তরঙ্গে কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ ও মজুরির দাবি তোলা হয়। জন্মনিয়ন্ত্রণ এবং প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়ে কথা বলা শুরু হয়। প্রয়োজনে নারী গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, এমন বিষয়গুলো সামনে চলে আসে। গার্হস্থ্য সহিংসতা ও যৌন হয়রানি নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পায় এই সময়ে এসে। এই সময়কার প্রভাবশালী চিন্তাবিদদের মধ্যে সব থেকে প্রভাব রাখতে পেরেছেন দার্শনিক সিমোন দ্য বুভোয়ার (১৯০৮-১৯৮৬)। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য সেকেন্ড সেক্সকে নারীবাদী তত্ত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত মনে করা হয়। তিনি যুক্তি দেন যে নারী হওয়া কোনো জন্মগত বিষয় নয়, বরং সমাজ তার পরিচয় গঠন করে দেয়। এ ছাড়া তিনি ব্যাখ্যা করেন যে সমাজ পুরুষকে মূল সত্তা বা ‘সেলফ’ হিসেবে দেখে আর নারীকে ‘আদার’ বা গৌণ অবস্থানে রাখে হয়। মানে পুরুষ হলো মানদণ্ড বা স্ট্যান্ডার্ড আর নারী হলো সেখান থেকে বিচ্যুতি। এভাবে সেলফ আর আদার মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসে এবং একে অপরকে দোষারোপ করতে থাকে। এখান থেকে নারী–পুরুষের মধ্যে একধরনের হায়ারার্কি তৈরি হয়: পুরুষ সেখানে সব সময়ই নাম্বার ওয়ান আর নারী দ্বিতীয়। সেলফ এখানে স্বাধীন এবং সক্রিয় আর নারীর নিষ্ক্রিয়। তার পরিচয় সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দেয় পুরুষ, পুরুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের ভিত্তিতে তার পরিচয় তৈরি হয়, মা বোন কিংবা স্ত্রী!
বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে মোড অব প্রোডাকশনে যে বড় পরিবর্তন আসে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে জেন্ডারভিত্তিক কর্ম বণ্টনে। পুরুষ মানুষ টাকা কামানোর জন্য বাইরে চলে যায় আর নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে বুর্জোয়া নারীরা স্বামী যেটুকু মর্যাদা, আনন্দ বা ক্ষমতা দেয়, তাই দিয়ে জীবন পার করে দেয়।
তৃতীয় তরঙ্গে এসে নারীবাদ বৈচিত্র্য এবং পরিচয়ের বহুমাত্রিকতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। এখানে দেখানো হয় যে বিভিন্ন সামাজিক পরিচয় যেমন লিঙ্গ, জাতি ও শ্রেণি এই জিনিসগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মানুষের অভিজ্ঞতা ও বৈষম্যের ধরন নির্ধারণ করে দেয়। একই সঙ্গে জেন্ডার ও যৌন পরিচয়কে স্থির বা দ্বৈত নয়, বরং পরিবর্তনশীল ও বহুমাত্রিক হিসেবে দেখা শুরু হয়। সংস্কৃতি কারখানাগুলোতে উৎপাদিত গান, চলচ্চিত্র, ধারাবাহিক কিংবা বিজ্ঞাপনে উপস্থাপিত নারীর প্রতিনিধিত্ব নিয়েও নতুনভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। এই সময়ের তাত্ত্বিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেন জুডিথ বাটলার। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ জেন্ডার ট্রাবল জেন্ডারকে একটি সামাজিকভাবে নির্মিত ধারণা হিসেবে ব্যাখ্যা করে এবং নারীবাদী ও জেন্ডার তত্ত্বে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করে। এখানে তিনি জেন্ডার পারফরমিটি সম্পর্কে নতুন একটি ধারণা দেন। জেন্ডার পারফরমিটি ব্যাখ্যা করে যে জেন্ডার আদতে কোনো স্থির বা স্ট্যাটিক কোনো বিষয় নয়; বরং এটা খানিকটা তরল এবং ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে জেন্ডার পারফরম্যান্স ভিন্ন হতে পারে।
জেন্ডার কোনো স্থির বা জন্মগত পরিচয় নয়; বরং মানুষের কাজ বা আচরণই জেন্ডার আইডেন্টিটি গঠন করে। অর্থাৎ জেন্ডার মানুষের ভেতরকার ইউনিক কোনো গুণাবলি নয়; বরং এমন কিছু, যা মানুষ প্রতিদিনের আচরণের মাধ্যমে ‘করে’ থাকে। সমাজে নরমভাবে কথা বলা, নির্দিষ্ট ধরনের পোশাক পরা বা কোমল আচরণ করা প্রত্যাশিত নারী গুণ, আর শক্ত, দৃঢ় বা কর্তৃত্বপূর্ণ আচরণকে পৌরুষত্ব মনে করা হয়। একজন নারী প্রত্যাশিত নারীর গুণগুলো এবং একজন পুরুষ তার কাছে প্রত্যাশিত পৌরষত্বকে আত্মস্থ করবে, এমনটা খুব স্বাভাবিক মনে করা হয়। সে অনুযায়ী পরিবার, বিদ্যালয় এমনকি কর্মক্ষেত্রে এ ধরনের আচরণগুলো বারবার চর্চা ও পুনরাবৃত্তি করতে হয়। বাটলার স্বাভাবিকীকরণের এই প্রক্রিয়াকেই জেন্ডার পারফরমেটিভিটি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
তিনি বলেন, মূলত এই ধারাবাহিক পুনরাবৃত্তির কারণেই জেন্ডার পরিচয় স্থায়ী ও স্বাভাবিক বলে মনে হয়। বাটলার মনে করেন, এই আচরণগুলোকে ভেঙে দেওয়াও সম্ভব। ড্র্যাগ পারফরম্যান্স, পুরুষের নারীসুলভ পোশাক পরা বা নারীর তথাকথিত পুরুষালি আচরণ করা—এসব উদাহরণ দেখায় যে জেন্ডার আসলে স্থির বা প্রাকৃতিক নয়, বরং পরিবর্তনশীল ও নির্মিত। মানুষ সচেতনভাবে প্রতিদিন অভিনয় করে জেন্ডার তৈরি করে না; বরং সমাজের নিয়ম, প্রত্যাশা ও সামাজিক চাপের কারণে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই নির্দিষ্ট ধরনের আচরণ অনুসরণ করে, যা ধীরে ধীরে তার জেন্ডার পরিচয়কে স্বাভাবিক করে তোলে।
বাটলার দেখান যে জেন্ডার ধারণা ভাষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোর মাধ্যমে নির্মিত হয়। এই সামাজিক ভাষ্য বা ডিসকোর্স নির্ধারণ করে কে নারী, কে পুরুষ আর কোন আচরণকে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য বলা হবে। ফলে জেন্ডার কোনো প্রাকৃতিক সত্য নয়। এটি মূলত সমাজ ও সংস্কৃতি নির্মিত নিয়ত পরিবর্তনশীল ধারণা।
এ ছাড়া বাটলার দেখান যে জেন্ডার ধারণা ভাষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোর মাধ্যমে নির্মিত হয়। এই সামাজিক ভাষ্য বা ডিসকোর্স নির্ধারণ করে কে নারী, কে পুরুষ আর কোন আচরণকে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য বলা হবে। ফলে জেন্ডার কোনো প্রাকৃতিক সত্য নয়। এটি মূলত সমাজ ও সংস্কৃতি নির্মিত নিয়ত পরিবর্তনশীল ধারণা। বাটলার একদিকে যেমন বলতে চান যে জেন্ডার প্রাকৃতিক নয়, আবার অন্যদিকে তিনি এটাও বলতে চান যে জেন্ডার ব্যক্তি নিজে নির্ধারণ করেন না। জেন্ডার পরিচয় আসলে নির্ধারণ করে দেয় মানুষ কোন শ্রেণি, ভাষা, সাংস্কৃতিক বা সামাজিক ক্ষমতা কাঠামোতে আছে। তাই সামাজিক বা সাংস্কৃতিক ক্ষমতা কাঠামোতে বদল ঘটলে জেন্ডার সম্পর্কিত ধারণাতে বদল আসতে পারে।
সমাজে যে ধরনের আচরণকে নারী বা পুরুষের জন্য উপযুক্ত মনে করে, মানুষ ধীরে ধীরে সেই আচরণগুলো অনুসরণ করতে করতে একটি নির্দিষ্ট জেন্ডার পরিচয় গড়ে তোলে। এই প্রক্রিয়ায় পরিবার এবং ভিজ্যুয়াল মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পরিবার হলো শিশুর প্রথম সামাজিক শিক্ষার জায়গা। ছোটবেলা থেকেই পরিবারে ছেলেমেয়েদের আলাদা আচরণ শেখানো হয়। যেমন—মেয়েদের শান্ত, ভদ্র ও ঘরকেন্দ্রিক হতে বলা হয়, আর ছেলেদের সাহসী, শক্তিশালী এবং বাইরে কাজ করার জন্য উৎসাহিত করা হয়। অনেক সময় মেয়েদের খেলনা হিসেবে পুতুল দেওয়া হয় এবং ছেলেদের খেলনা হিসেবে গাড়ি বা বন্দুক দেওয়া হয়। এই ধরনের অভ্যাস ও আচরণ প্রতিদিন চর্চা হতে হতে শিশুদের মনে একটি ধারণা তৈরি হয় যে এগুলোই স্বাভাবিক নারী বা পুরুষের আচরণ। ফলে পরিবার জেন্ডার পরিচয়ের পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে।
আর ভিজ্যুয়াল মিডিয়া—যেমন সিনেমা, টেলিভিশন, বিজ্ঞাপন এবং সামাজিক মাধ্যম—এই ধারণাগুলোকে আরও শক্তিশালী করে। যেমন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নারী বারবার বিপদে পড়ে অনেক সময় ভিলেন তার প্রতি নৃশংসতা প্রকাশ করে, এ সময় নায়ক এসে তাকে উদ্ধার করে। পুরুষ চরিত্রকে শক্তিশালী, সক্রিয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে দেখানো আর নারী চরিত্রকে সুন্দর, কোমল এবং আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে বিপুলসংখ্যক দর্শকের মনে ধীরে ধীরে এসব ধারণার ভিত গাঢ় হয়।
লরা মালভি (১৯৪১– ) তাঁর ‘মেল গেজ’ তত্ত্বে দেখান, মূলধারার সিনেমায় ক্যামেরা ও গল্প কীভাবে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে নির্মিত হয়। এতে নারীকে অনেক সময় কেবল দেখার বস্তু বা আকর্ষণের কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এর ফলে দর্শকেরা নারীকে একটি দৃশ্যমান বস্তুর মতো দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
এইভাবে পরিবার স্কুল কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে মিডিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো জেন্ডার আচরণের পুনরাবৃত্তি তৈরি করে। পরিবার দৈনন্দিন আচরণের মাধ্যমে জেন্ডার শেখায়, আর মিডিয়া সেই ধারণাগুলোকে দৃশ্য ও গল্পের মাধ্যমে আরও প্রতিষ্ঠিত করে। তাই বাটলারের জেন্ডার পারফরমেটিভিটি এবং মালভির মেল গেজ—দুটি তত্ত্বই বুঝিয়ে দেয় যে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে নারীর জন্য একটি নিষ্ক্রিয়, পরাধীন এবং নাজুক জেন্ডার পরিচয়কে নির্দিষ্ট করে দেয় এবং সেটা কৃত্রিম হলেও মানুষ সেটাকে স্বাভাবিক জ্ঞান করতে থাকে।