মুর্তজা বশীরের আঁকা নজরুলের প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
মুর্তজা বশীরের আঁকা নজরুলের প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

নিবন্ধ

কাজী নজরুল ইসলাম: বিদ্রোহ, মানবতা ও সৃষ্টিশক্তির দ্বৈতসত্তা

১.

কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালি সাংস্কৃতিক চেতনায় এমন এক নাম, যা একই সঙ্গে আবেগ, ইতিহাস, বিদ্রোহ এবং জনমানসের গভীর আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। দুই বাংলাতেই তাঁর নাম উচ্চারিত হয় প্রবল ভালোবাসা ও উচ্ছ্বাসে। তবে এই জনপ্রিয়তার ভিত যে সম্পূর্ণ সাহিত্যবিচার-নির্ভর নয়, বরং বহুলাংশে সময়সঞ্জাত আবেগ, রাজনৈতিক আলোড়ন ও জাতীয় আকাঙ্ক্ষার ফল, তা অনস্বীকার্য। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে বাঙালি সমাজ যখন ঔপনিবেশিক শাসনের দমননীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার মধ্যে পথ খুঁজছিল, তখন নজরুলের আবির্ভাব ঘটে এক বিস্ফোরণধর্মী শক্তি নিয়ে। তাঁর কণ্ঠে মানুষ শুনেছিল প্রতিবাদ, দ্রোহ, মুক্তি ও সাম্যের আহ্বান; ফলে অনুরাগমুগ্ধ পাঠকসমাজ তাঁকে ‘বিদ্রোহী কবি’, ‘গণমানুষের কবি’, ‘যৌবনের কবি’, ‘সাম্যের কবি’, ‘মানবতার কবি’ ইত্যাদি নানা অভিধায় ভূষিত করে নিজেদের আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেয়েছিল।

নজরুলের আবির্ভাব ছিল এক অর্থে সময়ের দাবি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইউরোপীয় বিপর্যয়, রুশবিপ্লবের অভিঘাত, অসহযোগ আন্দোলন, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড, বঙ্গীয় রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সাইমন কমিশন-বিরোধী আন্দোলন, শ্রমিক অসন্তোষ ও সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ—এই উত্তেজনাপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তাঁর কাব্যচর্চার সূচনা ও বিকাশ। সমাজের নানা মত ও পথের মানুষ নিজেদের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি খুঁজে পেয়েছিল তাঁর রচনায়। এর কারণ, নজরুল কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের কঠোর অনুসারী ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন আবেগপ্রবণ মানবতাবাদী, যিনি গণমানুষের তাৎক্ষণিক অনুভূতি ও আকাঙ্ক্ষাকে ভাষা দিয়েছিলেন। তাঁর পূর্বসূরি হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত কিংবা যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের কাব্যে সমাজচেতনার উপস্থিতি থাকলেও সেগুলো ছিল অধিকতর দার্শনিক ও তাত্ত্বিক। নজরুলের শক্তি ছিল তাঁর প্রত্যক্ষতা, তীব্রতা ও নাটকীয় ভঙ্গিতে। তিনি মানুষের অন্তর্লীন ক্ষোভকে মুহূর্তেই উচ্চারণযোগ্য করে তুলেছিলেন। ফলে তিনি কেবল কবি নন, জনতার আবেগের মুখপাত্রে পরিণত হন।

এখানেই তাঁর প্রথম বড় সাফল্য—তিনি বাঙালিকে চমকে দিয়েছিলেন। যে দেশে রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘকাল তীব্র সমালোচনা, অবজ্ঞা ও রুচিগত দূরত্বের মুখোমুখি হয়েছেন, সেই দেশে নজরুল প্রথম আবির্ভাবেই গণসম্মান ও উচ্ছ্বসিত গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেন। তাঁর কবিতা পাঠককে তাত্ত্বিক চিন্তার গভীরে না নিয়ে, সরাসরি আবেগে আঘাত করত। তাঁর ভাষা ছিল দ্রুত, উত্তেজনাময়, সুরেলা ও মঞ্চোপযোগী। ফলে তাঁর কবিতা পাঠের চেয়ে আবৃত্তি ও গানের মাধ্যমে বেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। ‘বিদ্রোহী’, ‘ভাঙার গান’, ‘সাম্যবাদী’, ‘কুলি-মজুর’, ‘দারিদ্র্য’ কিংবা ‘চাষার গান’-এর মতো রচনায় সাধারণ মানুষ নিজেদের ক্ষোভ, অপমান ও স্বপ্নের অভিব্যক্তি খুঁজে পেয়েছিল।

নজরুলের দ্বিতীয় বড় সাফল্য আসে তাঁর গণসংযোগক্ষমতা থেকে। তিনি ছিলেন চারণকবির মতো জনমানুষের কণ্ঠস্বর। তাঁর কবিতায় যুক্তির চেয়ে উদ্দীপনা, দার্শনিক গভীরতার চেয়ে তাৎক্ষণিক আবেগ, বিশ্লেষণের চেয়ে আহ্বান ছিল প্রবল। ঔপনিবেশিক দাসত্বে ক্লান্ত এক জাতি তখন এমনই ভাষা খুঁজছিল, যা তাদের রক্ত গরম করবে, ভীরুতা ভাঙবে এবং সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করবে। নজরুল সেই ভাষাই দিয়েছিলেন। তাঁর কবিতায় তরবারির ঝনঝনানি, শঙ্খধ্বনি, রণভেরী ও দ্রোহের উত্তাপ এক নতুন জাতীয় আবেগ সৃষ্টি করে। ফলে তিনি হয়ে ওঠেন তারুণ্যের প্রতীক, প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর ও স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা।

তাঁর তৃতীয় এবং সম্ভবত সবচেয়ে ব্যাপক সাফল্য আসে সংগীতস্রষ্টা হিসেবে। নজরুলগীতি বাংলা সংগীতকে এক নতুন মাত্রা দেয়। ইসলামি সংগীত, শ্যামাসংগীত, কীর্তনধর্মী গান, দেশাত্মবোধক গান, প্রেমের গান কিংবা রাগাশ্রিত সংগীত—প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি অভিনব সুর, শব্দ ও আবেগের সমন্বয় ঘটান। এই সংগীত পৌঁছে যায় শহর থেকে গ্রামে, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত থেকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে। রবীন্দ্রসংগীত যেখানে উচ্চতর রুচি, প্রশিক্ষণ ও নান্দনিক প্রস্তুতির দাবি রাখে, সেখানে নজরুলগীতি দ্রুত ও সহজে মানুষের কানে ও কণ্ঠে স্থান করে নেয়। তাই একসময় জনপ্রিয়তার দিক থেকে নজরুল রবীন্দ্রনাথকেও ছাপিয়ে যান। তবে এ দুই স্রষ্টার আবেদন প্রকৃতিগতভাবে ভিন্ন। নজরুলের আহ্বান ছিল তাৎক্ষণিক ও উত্তেজনাময়; রবীন্দ্রনাথের আহ্বান ছিল বিবেক, আত্মশক্তি ও মানবিক দায়িত্ববোধের প্রতি। নজরুল মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ মানুষকে অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছেন।

ঐতিহাসিক বিচারে নজরুল নিঃসন্দেহে যুগের সন্তান এবং যুগের কণ্ঠস্বর। তিনি তাঁর সময়ের চাহিদাকে শিল্পে রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর কবিতায় যে আবেগ, তা এক বিশেষ রাজনৈতিক ও সামাজিক মুহূর্তের ফসল। তাই তাঁর সাফল্যও অনেকাংশে কালিক ও প্রাসঙ্গিক। উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে মানুষ যুক্তির চেয়ে উদ্দীপনা খোঁজে; দর্শনের চেয়ে চায় সংগ্রামের ডাক। নজরুল সেই প্রয়োজন পূরণ করেছিলেন বলেই তিনি গণনায়কে পরিণত হন। তাঁর নিজের ভাষাতেই—‘বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই নবী’—এই আত্মস্বীকৃতির মধ্যে তাঁর সাহিত্যিক অবস্থানের একটি গভীর সত্য নিহিত রয়েছে। তিনি ভবিষ্যৎ দর্শনের স্থপতি নন; বরং বর্তমানের বিক্ষুব্ধ আত্মার কবি।

তবে সাহিত্যিক মূল্যায়নের নিরিখ ভিন্ন। ইতিহাস কোনো সাহিত্যিককে অমরত্ব দিতে পারে না; চিরস্থায়িত্ব নির্ভর করে শিল্পরূপ, ভাবগভীরতা, ভাষার অভিনবত্ব ও মানবজিজ্ঞাসার গভীরতার ওপর। এই বিচারক্ষেত্রে নজরুলের কাব্য নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। তাঁর প্রথম পর্বের রচনায় কোরআন-হাদিস, গীতা-পুরাণ ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের বিপুল ব্যবহার লক্ষ করা যায়। ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘ভাঙার গান’-এ তিনি ধর্মীয় প্রতীক ও পৌরাণিক উপমার মাধ্যমে বিদ্রোহ ও ন্যায়বোধকে জাগিয়ে তুলেছেন। কিন্তু তাঁর মানবতাবাদ ছিল মূলত নৈতিক ও ধর্মীয় চেতনানির্ভর; অর্থনৈতিক কাঠামোগত পরিবর্তনের ধারণা সেখানে সুস্পষ্ট নয়। তিনি শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু শোষণব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ দেননি।

দ্বিতীয় পর্বে এসে ‘সাম্যবাদী’, ‘সর্বহারা’, ‘জিঞ্জির’, ‘ফণিমনসা’ প্রভৃতি কাব্যে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার প্রভাব স্পষ্ট হয়। কিন্তু এখানেও তিনি ‘প্রকৃত’ মার্ক্সবাদী নন। তাঁর সাম্যচেতনা মূলত ধর্মীয় মানবতাবাদ ও নৈতিক ন্যায়বোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ‘গাহি সাম্যের গান/ মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই’—এই উচ্চারণে শ্রেণিসংগ্রামের মার্ক্সীয় দর্শনের চেয়ে বেশি প্রকাশ পায় মানুষের আধ্যাত্মিক মর্যাদার স্বীকৃতি। তিনি ধনবৈষম্যের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হলেও ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার মৌলিক রূপান্তরের কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা দেননি। ফলে তাঁর সমাজচেতনা প্রায়ই দ্বিধাবিভক্ত ও আপসহীনতার বদলে সমন্বয়কামী হয়ে উঠেছে।

মুর্তজা বশীরের আঁকা নজরুলের প্রতিকৃতি
হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রশ্নেও নজরুলের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সীমাবদ্ধ। তিনি সাম্প্রদায়িক বিভেদকে অস্বীকার করে দুই সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সমন্বয় ঘটাতে চেয়েছিলেন। তাঁর কবিতায় ইসলামি ঐতিহ্য ও হিন্দু পুরাণ পাশাপাশি স্থান পেয়েছে। এর ফলে তিনি উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেন। কিন্তু তিনি মূলত সহাবস্থানের কথা বলেছেন, অভিন্ন জাতিসত্তার নির্মাণ নিয়ে গভীর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করেননি। তাঁর ঐক্যচিন্তা ছিল নৈতিক ও আবেগপ্রসূত; সমাজ-অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বিশ্লেষণ সেখানে তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত।

নজরুল মূলত ছিলেন ধার্মিক মানবতাবাদী। তিনি মানুষকে ধর্মীয় নৈতিকতার মাধ্যমে সংযত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাছে মুক্তি মানে ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার; কিন্তু সেই ন্যায়বিচারের ভিত্তি ছিল নৈতিক বিবেক, বৈপ্লবিক শ্রেণিসংগ্রাম নয়। তাই তিনি জমিদার, মহাজন বা শোষককে নিন্দা করেছেন, কিন্তু উৎপাদনব্যবস্থার মৌলিক রূপান্তরের কোনো রাজনৈতিক দর্শন নির্মাণ করেননি। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল হৃদয়নির্ভর, বৈজ্ঞানিক নয়; আবেগনির্ভর, দার্শনিকভাবে সুসংহত নয়।

হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রশ্নেও নজরুলের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সীমাবদ্ধ। তিনি সাম্প্রদায়িক বিভেদকে অস্বীকার করে দুই সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সমন্বয় ঘটাতে চেয়েছিলেন। তাঁর কবিতায় ইসলামি ঐতিহ্য ও হিন্দু পুরাণ পাশাপাশি স্থান পেয়েছে। এর ফলে তিনি উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেন। কিন্তু তিনি মূলত সহাবস্থানের কথা বলেছেন, অভিন্ন জাতিসত্তার নির্মাণ নিয়ে গভীর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করেননি। তাঁর ঐক্যচিন্তা ছিল নৈতিক ও আবেগপ্রসূত; সমাজ-অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বিশ্লেষণ সেখানে তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত।

এ কারণেই বলা যায়, নজরুলের সাহিত্যিক শক্তি তাঁর আবেগ, ছন্দ, উচ্চারণ ও সংগীতময়তায়; তাঁর সীমাবদ্ধতা চিন্তার গভীরতা ও দার্শনিক সংহতিতে। তিনি যুগকে আলোড়িত করেছেন, মানুষকে জাগিয়েছেন, পরাধীন জাতির মধ্যে আত্মমর্যাদার বোধ সৃষ্টি করেছেন—এ তাঁর ঐতিহাসিক কৃতিত্ব। কিন্তু শিল্পের কঠোর বিচারে তাঁর রচনা সর্বদা সমান গভীরতা অর্জন করেনি। তাঁর কবিতায় যে উদ্দীপনা আছে, তা অনেক সময় স্থায়ী নন্দনচেতনার বদলে ক্ষণস্থায়ী আবেগের জন্ম দেয়।

তবু কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এক অনিবার্য নাম। তিনি ছিলেন বিদ্রোহের আগুন, তারুণ্যের উন্মেষ, সাম্যের আকাঙ্ক্ষা এবং ঔপনিবেশিক দাসত্বের বিরুদ্ধে বাঙালির উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ। তাঁর সীমাবদ্ধতা যেমন আছে, তেমনি তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্বও অসীম। তিনি হয়তো পূর্ণাঙ্গ দার্শনিক কবি নন; কিন্তু তিনি এমন এক কবি, যিনি নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠে ভাষা দিয়েছেন, পরাধীন জাতিকে আত্মমর্যাদার স্বপ্ন দেখিয়েছেন এবং বাংলা কাব্যভাষায় এক অভূতপূর্ব শক্তি ও সুরের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। তাঁর কাব্যের স্থায়ী মূল্য তাই কেবল মতাদর্শে নয়, বরং সেই অগ্নিস্পর্শী প্রাণশক্তিতে, যা এখনো বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনায় স্পন্দিত।

২.

কোনো প্রতিভাবান মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস কিংবা আদর্শ কখনোই একরৈখিক থাকে না। জীবন, সমাজ ও ইতিহাসের পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতা মানুষকে যেমন নতুন উপলব্ধির দিকে ঠেলে দেয়, তেমনি তার পূর্ববিশ্বাসকেও সংশোধিত বা পরিত্যক্ত হতে বাধ্য করে। এ পরিবর্তন অনেক সময় স্ববিরোধ, দ্বিধা ও মতদ্বন্দ্বের জন্ম দেয় বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে তা সৃজনশীল মননের গতিশীলতারও পরিচয় বহন করে। কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্যেও এই অন্তর্দ্বন্দ্ব অত্যন্ত প্রকটভাবে দৃশ্যমান। তাঁর মধ্যে একই সঙ্গে দেখা যায় বিপ্লবী চেতনা ও ধর্মবিশ্বাস, সাম্যবাদী আকাঙ্ক্ষা ও আধ্যাত্মিক অনুরাগ, গণ–অভ্যুত্থানের আহ্বান ও ব্যক্তিগত প্রেমবেদনার আত্মনিবেদন। ফলে তাঁর সাহিত্যিক সত্তা কখনো একক আদর্শে স্থিত হয়নি; বরং বহুস্বর, বহুমুখিতা ও আবেগজাত তাড়নার মধ্য দিয়েই তার প্রকাশ ঘটেছে।

নজরুল একদিকে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সশস্ত্র বিপ্লব ও গণ–আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন, অন্যদিকে গান্ধীবাদী অসহযোগ, চরকা ও স্বদেশচেতনার প্রতিও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন। কখনো তিনি কামাল আতাতুর্কের আধুনিকতাবাদী রাষ্ট্রগঠনের প্রশংসা করেছেন, কখনো আবার ইসলামি ঐতিহ্য ও নবীপ্রেমে গভীরভাবে নিমগ্ন থেকেছেন। একই মানুষ ‘সাম্যবাদী’ কবিতা লিখেছেন, আবার ‘নাতে রাসূল’ রচনা করেছেন; ‘বিদ্রোহী’র অগ্নিগর্ভ উচ্চারণের পাশে লিখেছেন শ্যামাসংগীত, ভক্তিমূলক গান ও সুফিবাদী মরমি সংগীত। এই বহুমাত্রিকতা একদিকে তাঁর সৃষ্টিকে করেছে বৈচিত্র্যময়, অন্যদিকে তাঁর দার্শনিক অবস্থানকে করেছে দ্বিধাগ্রস্ত ও অনির্দিষ্ট।

মূলত কোনো একক মতাদর্শ তাঁকে সম্পূর্ণভাবে অধিকার করতে পারেনি। তিনি ছিলেন প্রবল আবেগপ্রবণ এবং তাৎক্ষণিক প্রেরণায় চালিত। ফলে যে ভাব, যে বক্তব্য বা যে আন্দোলন তাঁর কল্পনাকে উদ্দীপ্ত করেছে, তাকেই তিনি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন। মতাদর্শগত সামঞ্জস্য বা ঐতিহাসিক কার্যকারণ বিশ্লেষণের চেয়ে তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল মানবিক আবেগ ও মুহূর্তের উদ্দীপনা। এ কারণেই তিনি কখনো বিপ্লবী, কখনো ধর্মপ্রচারক, কখনো প্রেমিক, কখনো সমাজসংস্কারক—এই বহুসত্তায় বিচরণ করেছেন। তিনি নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু শোষণব্যবস্থার গভীর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ করেননি; ধনীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, কিন্তু পুঁজিবাদী কাঠামোর বিকল্প কোনো সুসংহত সমাজদর্শন নির্মাণ করেননি।

তাঁর মানবতাবাদ মূলত অভিজ্ঞতাজাত সহানুভূতির ফসল। দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তার জীবন তিনি নিজে ভোগ করেছিলেন বলেই কুলি-মজুর-চাষার দুঃখ তাঁকে ব্যথিত করেছিল। কিন্তু এই সহানুভূতি ছিল আবেগকেন্দ্রিক, দার্শনিকভাবে সুসংহত নয়। তিনি ক্ষুধার্ত মানুষের অন্ন, বস্ত্র ও আশ্রয় চেয়েছেন; কিন্তু শ্রেণিহীন সমাজ নির্মাণের কোনো বৈপ্লবিক রূপরেখা দেননি। তাঁর ‘সাম্য’ ধারণা ছিল নৈতিক ন্যায়বোধ ও ধর্মীয় মানবতার ওপর প্রতিষ্ঠিত; মার্ক্সীয় অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের ওপর নয়। ফলে তিনি অনেক সময় ধনিককে ব্যক্তিগতভাবে অপরাধী ভেবে ক্ষুব্ধ হয়েছেন; কিন্তু ধনতান্ত্রিক উৎপাদনব্যবস্থার জটিলতাকে বিশ্লেষণ করেননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ; কিন্তু সেই মুক্তির পথ নিয়ে তিনি দ্বিধান্বিত ও অস্পষ্ট।

এখানেই তাঁর চিন্তার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়। সংবেদনশীল মানবতাবাদ যেখানে ব্যক্তিস্বার্থ অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবকল্যাণের আদর্শ নির্মাণ করে, নজরুলের মানবতাবাদ অনেকাংশেই ব্যক্তিগত বেদনা, ক্ষোভ ও জৈবিক উত্তেজনার দ্বারা চালিত। তাঁর প্রতিবাদে আগুন আছে, কিন্তু দূরদৃষ্টি কম; আছে আহ্বান, কিন্তু স্থায়ী সমাধানের পরিকল্পনা নেই। তিনি যেন চোখের সামনে দেখা অন্যায়ের বিরুদ্ধে তৎক্ষণাৎ গর্জে উঠেছেন; কিন্তু তার অন্তর্নিহিত সামাজিক ও ঐতিহাসিক কারণ নিয়ে দীর্ঘ মননশীলতা গড়ে তোলেননি। রবীন্দ্রনাথ যেমন মানুষের অন্তর্জগতের মুক্তিকে প্রধান মনে করেছেন, নজরুল তেমনি বহির্জগতের অবিচারের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

এই সীমাবদ্ধতার একটি কারণ তাঁর শিক্ষাগত পরিসর। নজরুল মূলত ফারসি সাহিত্য ও ভারতীয় পুরাণ-ঐতিহ্যে গভীরভাবে শিক্ষিত ছিলেন। মধ্যযুগীয় ফারসি কাব্যের রোমান্টিকতা, সুফিবাদী চেতনা এবং হিন্দু পুরাণের রূপক-উপমা তাঁর কল্পনাকে বিপুলভাবে সমৃদ্ধ করেছিল। কিন্তু আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শন, বিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্বের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ পরিচয় ছিল সীমিত। অথচ উনিশ ও বিশ শতকের আধুনিক চিন্তার জগৎ ডারউইন, মার্ক্স ও ফ্রয়েডের তত্ত্বে আমূল পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। মানুষের উৎপত্তি, সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো এবং অবচেতন মনের বিশ্লেষণ—এ তিনটি ক্ষেত্র আধুনিক জীবনবোধের ভিত্তি নির্মাণ করেছিল। নজরুল এই আধুনিক জিজ্ঞাসার গভীরে প্রবেশ করেননি। ফলে তাঁর কাব্যে আবেগের তীব্রতা থাকলেও চিন্তার বিবর্তন খুব বেশি দেখা যায় না।

নজরুলের সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর আবেগ। হৃদয়বৃত্তিই ছিল তাঁর প্রধান সম্বল। তিনি যুক্তির চেয়ে অনুভূতিকে, বিশ্লেষণের চেয়ে উচ্ছ্বাসকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে তাঁর কবিতা ও গান পাঠককে মুহূর্তে আলোড়িত করে; কিন্তু তাঁর গল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই উচ্চতা অর্জন করতে পারেনি। কারণ, কাহিনিনির্ভর সাহিত্যে কেবল আবেগ নয়, প্রয়োজন সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, চরিত্র নির্মাণের দক্ষতা এবং জটিল মানবসম্পর্কের অন্তর্দৃষ্টি।

তাঁর সাহিত্যিক জীবনও ছিল অদ্ভুত দ্রুততার এক বিস্ফোরণ। ১৯২২ থেকে ১৯৩২—এই এক দশকের মধ্যেই তাঁর সৃষ্টিশক্তির অভাবনীয় বিকাশ ঘটে। ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘ভাঙার গান’, ‘সাম্যবাদী’, ‘সর্বহারা’, ‘ফণিমনসা’, ‘জিঞ্জির’, ‘দোলনচাঁপা’, ‘ছায়ানট’, ‘বুলবুল’—অসংখ্য কাব্য ও গান একের পর এক রচিত হয়। তাঁর সৃষ্টির প্রবাহ ছিল যেন আকস্মিক বর্ষণমুখর নদীর মতো—প্রবল, উচ্ছ্বসিত; কিন্তু অনেক সময় অস্থির। পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্যিক শক্তি ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসে। যে বিস্ময়কর উত্থান তাঁকে বাংলা সাহিত্যের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল, তার দীর্ঘস্থায়ী পরিণতি তিনি নির্মাণ করতে পারেননি। এ কারণেই অনেক সমালোচক তাঁর প্রতিভাকে বিশাল বৃক্ষের পরিবর্তে দ্রুত বর্ধনশীল গুল্মজাতীয় শক্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন—সহজে বিকশিত; কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে গভীর বিস্তার ঘটাতে অসমর্থ।

নজরুলের সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর আবেগ। হৃদয়বৃত্তিই ছিল তাঁর প্রধান সম্বল। তিনি যুক্তির চেয়ে অনুভূতিকে, বিশ্লেষণের চেয়ে উচ্ছ্বাসকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে তাঁর কবিতা ও গান পাঠককে মুহূর্তে আলোড়িত করে; কিন্তু তাঁর গল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই উচ্চতা অর্জন করতে পারেনি। কারণ, কাহিনিনির্ভর সাহিত্যে কেবল আবেগ নয়, প্রয়োজন সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, চরিত্র নির্মাণের দক্ষতা এবং জটিল মানবসম্পর্কের অন্তর্দৃষ্টি। নজরুলের মধ্যে এই বৌদ্ধিক সংযম ও স্থাপত্যবোধ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। ফলে তাঁর কাহিনির বিন্যাস প্রায়ই শিথিল, চরিত্রগুলো একমাত্রিক এবং সংলাপ অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও তাঁর গদ্য প্রলাপধর্মী মনে হয়। তবে ভাষার সজীবতা, হৃদয়গ্রাহী বাক্যবন্ধ ও মুহূর্তসৃষ্টির ক্ষমতা তাঁর গদ্যকেও আংশিকভাবে আকর্ষণীয় করে রেখেছে।

অন্যদিকে ছন্দ ও শব্দপ্রয়োগে নজরুল ছিলেন অসাধারণ দক্ষ। বাংলা কাব্যে আরবি-ফারসি শব্দভান্ডারের সার্থক ও ব্যাপক প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি ভাষাকে নতুন সুর ও বৈচিত্র্য দিয়েছেন। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ও মোহিতলাল মজুমদারের প্রভাব থাকলেও তিনি এ উপাদানকে নিজস্ব শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। বাংলা ছন্দে আরবি-ফারসি ধ্বনি ও গীতলতার সংযোজন তাঁর কাব্যকে এক নতুন গতি দিয়েছে। একই সঙ্গে হিন্দু পুরাণ ও ইসলামি ঐতিহ্যের সমন্বিত ব্যবহার তাঁর কবিতাকে দুই সম্প্রদায়ের কাছেই গ্রহণযোগ্য ও হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছিল। তাঁর কবিতায় কৃষ্ণ, আলী, কালী, কারবালা, মহাদেব, ইমাম হোসেন, রাধা, ফেরেশতা—সবাই একই কাব্যভুবনে এসে মিলিত হয়েছে। এই সাংস্কৃতিক সমন্বয় তাঁর সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্যের অন্যতম প্রধান উৎস।

তবে এই বিপুল অলংকারময়তা ও পৌরাণিক উপমার ব্যবহার অনেক সময় তাঁর কাব্যের অন্তর্গত দুর্বলতাকেও আড়াল করেছে। আবেগের অতিরঞ্জন, বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি, ভাবগত অসংলগ্নতা কিংবা অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘতা প্রায়ই তাঁর কবিতায় দেখা যায়। কখনো কখনো মনে হয়, প্রিয় শব্দ ও উপমা ব্যবহারের আকর্ষণে তিনি কবিতাকে অযথা বিস্তৃত করেছেন। ‘বিদ্রোহী’, ‘দারিদ্র্য’, ‘পূজারিণী’ কিংবা ‘সিন্ধু’র মতো বিখ্যাত কবিতায়ও এই প্রবণতা চোখে পড়ে। তাঁর গদ্যে পৌরাণিক প্রতীকের ঘনত্ব কমে গেলে আবেগের ভার অনেক সময় রুচিশীল পাঠকের কাছে ক্লান্তিকর মনে হয়।

প্রেমের কবিতা ও গানেও নজরুলের স্বভাবজাত দ্বৈততা স্পষ্ট। একদিকে তিনি বিদ্রোহী, সংগ্রামী ও সমাজচেতন কবি; অন্যদিকে গভীর প্রেমবেদনায় আচ্ছন্ন রোমান্টিক সত্তা। ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ–তূর্য’—এই আত্মপরিচয় তাঁর সাহিত্যিক ব্যক্তিত্বের যথার্থ রূপক। তাঁর অন্তর্জগৎ যেন দুটি পৃথক প্রকোষ্ঠে বিভক্ত—একটিতে দ্রোহ ও অগ্নি, অন্যটিতে প্রেম, বিরহ ও অশ্রু। একই সময়ে তিনি যেমন ‘ভাঙার গান’ বা ‘সাম্যবাদী’ লিখেছেন, তেমনি ‘দোলনচাঁপা’, ‘চোখের চাতক’, ‘চক্রবাক’ কিংবা অসংখ্য প্রেমের গানও রচনা করেছেন। বিস্ময়কর বিষয়, এ দুই সত্তা পরস্পরকে খুব কমই প্রভাবিত করেছে।

তাঁর প্রেমের কবিতার প্রধান সুর বিচ্ছেদ, অতৃপ্তি ও না-পাওয়ার বেদনা। বিরহ, অবহেলা, স্মৃতিজনিত যন্ত্রণা, প্রত্যাখ্যানের ক্ষোভ ও অমিলনের আকুতি তাঁর প্রেমকাব্যের কেন্দ্রীয় অনুভূতি। কিন্তু এই প্রেমে গভীর দার্শনিকতা বা আত্মিক উত্তরণ তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত। এটি মূলত ইন্দ্রিয়নির্ভর, আবেগঘন ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রেম। বৈষ্ণব পদাবলির রাধার মতো তাঁর প্রেমিকসত্তাও ব্যাকুল, অস্থির ও কান্নাময়; তবে সেখানে বৈচিত্র্যময় অনুভূতির সূক্ষ্ম রূপান্তর কম। ফলে একই ধরনের বেদনা ও আকুতির পুনরাবৃত্তি অনেক সময় একঘেয়েমি সৃষ্টি করে। তাঁর প্রেম যেন এক অন্তহীন আকাঙ্ক্ষা, যা পূর্ণতার দিকে নয়; বরং অতৃপ্তির দিকে ধাবিত।

তবু এই সমস্ত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নজরুল বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য শক্তি। তাঁর কাব্যের প্রাণশক্তি, ছন্দের গতি, শব্দের উন্মাদনা, সংগীতের আবেদন এবং আবেগের বিস্ফোরণ বাংলা সাহিত্যকে নতুন প্রাণ দিয়েছে। তিনি হয়তো সুসংহত দার্শনিক কবি নন; কিন্তু তিনি বাঙালির ইতিহাসে এমন এক কবি, যিনি নিপীড়িত মানুষের রক্তের উত্তাপ, প্রেমিক হৃদয়ের আকুতি এবং পরাধীন জাতির স্বাধীনতার স্বপ্নকে একই সঙ্গে কণ্ঠ দিয়েছেন। তাঁর সাহিত্য তাই কেবল শিল্প নয়, এক যুগের উন্মত্ত প্রাণস্পন্দনের দলিল।

৩.

নজরুল ইসলামের সাহিত্যিক প্রতিভার সর্বাধিক ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী প্রকাশ ঘটেছে তাঁর সংগীতে। বাংলা গানের ইতিহাসে তিনি এমন এক যুগস্রষ্টা, যিনি কেবল অসংখ্য গান রচনা করেননি; বরং বাংলা সংগীতের ভাষা, সুর, ধারা ও রসপরিসরকে অভূতপূর্বভাবে সম্প্রসারিত করেছেন। তাঁর রচিত গানের সংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও সাধারণভাবে দুই থেকে তিন হাজারের অধিক গান তাঁর সৃষ্টিকর্মের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হয়। এই বিপুল সংগীতভান্ডারের মধ্যে রয়েছে প্রেমের গান, ইসলামি সংগীত, শ্যামাসংগীত, কীর্তনধর্মী গান, দেশাত্মবোধক সংগীত, রাগাশ্রিত গান, গজল, ভাটিয়ালি, লোক–প্রভাবিত সুর, হাসির গান, গণসংগীত ও আধ্যাত্মিক সাধনামূলক সংগীত। বিষয়বৈচিত্র্য ও সুরসৃষ্টির এই বিপুলতা বাংলা গানের জগতে নজরুলকে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—একজন গীতিকবিকে কি আদৌ দার্শনিক বা সমাজতাত্ত্বিক মানদণ্ডে বিচার করা উচিত? কবির কাজ তো মূলত অনুভূতিকে ভাষা দেওয়া, মানুষের অন্তর্জগতের আবেগকে শিল্পে রূপান্তর করা। সেই বিচারে নজরুল তাঁর সময়কে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিলেন। তিনি যে প্রাণশক্তি, উদ্দীপনা ও মানবিক আবেগ বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে সঞ্চার করেছিলেন, তা আজও সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়নি। তাঁর কবিতা ও গান আজও সংগ্রামী মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়; অন্যায়, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

নজরুলের সংগীত প্রতিভার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো তাঁর সুরের বহুসাংস্কৃতিক উৎস। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত, আরবি-ফারসি সুরধারা, তুর্কি-মধ্যপ্রাচ্যের সংগীতভাবনা, কীর্তন, বাউল, কাওয়ালি, মার্শ সংগীত এবং লোকঐতিহ্যের নানা সুরকে তিনি এক বিস্ময়কর দক্ষতায় বাংলা গানে রূপান্তরিত করেছেন। তাঁর গজল বাংলা ভাষায় এক নতুন সংগীতধারার সূচনা করে। এর আগে বাংলা ভাষায় ফারসি-উর্দু গজলের আবহ, ধ্বনি ও রস এত সার্থকভাবে আত্মীকৃত হয়নি। ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’, ‘কে বিদেশি মন উদাসী’, ‘চেয়ো না সুনয়না’ কিংবা ‘ভুলি কেমনে আজও যে মনে’—এসব গানে তিনি প্রেম, বিরহ ও সুরলালিত্যের এক অনন্য সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। আবার ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’, ‘ইসলামের ঐ সওদা লয়ে’ কিংবা ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’—এসব ইসলামি সংগীতে ধর্মীয় অনুভূতিকে তিনি সহজ, মানবিক ও হৃদয়গ্রাহী রূপ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ‘বল রে জবা বল’, ‘মহাকালের কোলে এসে’, ‘আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায়’—এসব শ্যামাসংগীতে ভক্তি, রস ও কাব্যিক আবেগকে মিলিয়েছেন এক অসাধারণ শিল্পবোধে।

বাংলা গানের জগতে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত সুরের ক্ষেত্রেই। তিনি কেবল প্রচলিত রাগ–রাগিণী ব্যবহার করেননি; বরং বহু নতুন মিশ্র রাগ সৃষ্টি করেছেন এবং শাস্ত্রীয় সুরকে গণমানুষের উপযোগী করে তুলেছেন। তাঁর সুরে যেমন শাস্ত্রীয় গভীরতা আছে, তেমনি আছে লোকজ সহজতা ও নাটকীয় গতি। এ কারণেই তাঁর গান শিক্ষিত রসজ্ঞ সমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কণ্ঠেও সমান জনপ্রিয়তা পেয়েছে। রবীন্দ্রসংগীত যেমন একটি স্বতন্ত্র সংগীতধারা ও শিল্পরীতি নির্মাণ করেছে, তেমনি নজরুলগীতিও গড়ে তুলেছে নিজস্ব গায়কি, স্বরভঙ্গি ও পরিবেশনশৈলী। ‘নজরুলগীতি’ আজ একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান; এর নিজস্ব শিল্পী, প্রশিক্ষণপদ্ধতি ও রসগ্রাহী শ্রোতৃসমাজ রয়েছে।

তবে সংগীতের ইতিহাস আমাদের শেখায় যে কোনো শিল্পধারাই চিরস্থায়ী নয়। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের রুচি, অনুভূতি, ভাষা ও সুরবোধও পরিবর্তিত হয়। যে সুর একসময় মানুষের প্রাণকে আন্দোলিত করেছে, পরবর্তী সময়ে তা হয়তো ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। সংগীত মূলত সময়ের শিল্প; এটি মানুষের জীবনযাপন, সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং মানসিকতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বৈদিক স্তোত্র থেকে ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা, কীর্তন, বাউল, কাওয়ালি, ব্রহ্মসংগীত কিংবা আধুনিক বাংলা গান—প্রতিটি যুগই তার নিজস্ব সুরভাষা নির্মাণ করেছে এবং সময়ের স্রোতে অনেক ধারাই ম্লান বা বিলুপ্ত হয়েছে। আজ যেমন গম্ভীরা, গাজন, রামপ্রসাদী কিংবা উনিশ শতকের বহু জনপ্রিয় গীতিধারা কেবল সীমিত পরিসরে টিকে আছে, তেমনি দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ বা মুকুন্দদাসের গানও আর গণজীবনের কেন্দ্রে নেই। ফলে এ প্রশ্ন স্বাভাবিক যে ভবিষ্যতে নজরুলগীতির অবস্থান কী হবে?

সম্ভবত এর উত্তর নিহিত রয়েছে তাঁর সংগীতের অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তিতে। নজরুলের গান কেবল সুরনির্ভর নয়; তা একই সঙ্গে কাব্যিক, আবেগঘন এবং সাংস্কৃতিকভাবে বহুমাত্রিক। তাঁর অনেক গান সাহিত্যিক সৌন্দর্যের বিচারে কবিতার মর্যাদাও লাভ করেছে। এখানে তিনি রবীন্দ্রনাথের কাছাকাছি এসে দাঁড়ান। যেমন রবীন্দ্রসংগীত কেবল সুরের জন্য নয়, গভীর জীবনদর্শন, ভাষার পরিশীলন ও মননের ঐশ্বর্যের জন্যও অমরত্বের দাবি রাখে, তেমনি নজরুলের বহু গানও কাব্যিক শক্তি, আবেগের তীব্রতা ও সুরের অভিনবত্বে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। তবে দুই শিল্পীর প্রকৃতি ভিন্ন। রবীন্দ্রনাথের সংগীতে আত্মমননের প্রশান্তি ও দার্শনিক গভীরতা বেশি; নজরুলের সংগীতে আবেগের উচ্ছ্বাস, প্রাণের স্পন্দন ও নাটকীয় শক্তি বেশি প্রবল।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—একজন গীতিকবিকে কি আদৌ দার্শনিক বা সমাজতাত্ত্বিক মানদণ্ডে বিচার করা উচিত? কবির কাজ তো মূলত অনুভূতিকে ভাষা দেওয়া, মানুষের অন্তর্জগতের আবেগকে শিল্পে রূপান্তর করা। সেই বিচারে নজরুল তাঁর সময়কে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিলেন। তিনি যে প্রাণশক্তি, উদ্দীপনা ও মানবিক আবেগ বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে সঞ্চার করেছিলেন, তা আজও সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়নি। তাঁর কবিতা ও গান আজও সংগ্রামী মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়; অন্যায়, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কারণ, তিনি যে সমস্যাগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘোষণা করেছিলেন—দারিদ্র্য, শোষণ, সাম্প্রদায়িকতা, সামাজিক অবিচার ও পরাধীনতার মানসিকতা—সেগুলো আজও সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি।

নজরুলের আরেকটি অসামান্য বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি বিভাজনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করতে পেরেছেন। রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্মীয় পরিচয় বা সাংস্কৃতিক বিভক্তির নানা সংঘাতে যখন বাঙালি সমাজ ক্রমাগত বিভক্ত হয়েছে, তখন নজরুল উভয় বাংলায় সমানভাবে গ্রহণযোগ্য থেকেছেন। তাঁকে একক কোনো গোষ্ঠী সম্পূর্ণভাবে নিজেদের বলে দাবি করতে পারেনি। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ই তাঁকে নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাঁর কবিতায় যেমন ইসলামি ইতিহাস ও আরবি-ফারসি ঐতিহ্যের গৌরব উচ্চারিত হয়েছে, তেমনি হিন্দু পুরাণ, শাক্ত ভাবনা ও বৈষ্ণব রসও সমান আন্তরিকতায় স্থান পেয়েছে। ফলে তিনি কেবল একজন মুসলিম কবি নন, কিংবা কেবল বিদ্রোহী কবিও নন; তিনি বাঙালির সামগ্রিক সাংস্কৃতিক চেতনার এক সম্মিলিত প্রতীক।

তাঁর জনপ্রিয়তার মূল উৎসও এখানেই। নজরুল মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করেছিলেন। তাঁর ছিল অদম্য প্রাণশক্তি, উচ্ছ্বাসময় যৌবন এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। তিনি নিপীড়িত মানুষের দুঃখকে নিজের দুঃখ হিসেবে অনুভব করেছিলেন। শোষকের বিরুদ্ধে তাঁর ক্রোধ এবং বঞ্চিত মানুষের প্রতি তাঁর মমতা ছিল গভীর মানবিকতার প্রকাশ। তাঁর বিদ্রোহের মূলে ছিল প্রেম—মানুষের প্রতি প্রেম, স্বাধীনতার প্রতি প্রেম, ন্যায়ের প্রতি প্রেম। তিনি নিজেই লিখেছিলেন—‘আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম।’ এই স্বীকারোক্তির মধ্যেই তাঁর শিল্পীসত্তার অন্তর্নিহিত সত্য প্রকাশিত হয়েছে। তিনি মানুষের ভালোবাসা চেয়েছিলেন এবং সেই ভালোবাসাই তিনি পেয়েছেন বিপুলভাবে।

সমালোচনার বিচারে নজরুলের সীমাবদ্ধতা যতই থাকুক, তাঁর সাহিত্য ও সংগীতের প্রাণময়তা অস্বীকার করা যায় না। তিনি হয়তো সুসংহত দার্শনিক নন, স্থির মতবাদের কবিও নন; কিন্তু তিনি এমন এক শিল্পী, যিনি যুগের বিক্ষুব্ধ আবেগকে কণ্ঠ দিয়েছেন। তাঁর কাব্যে যেমন আছে দ্রোহের আগুন, তেমনি আছে প্রেমের অশ্রু; যেমন আছে সাম্যের ডাক, তেমনি আছে ভক্তির নিবেদন। এই বহুমাত্রিক মানবিকতাই তাঁকে আজও জীবন্ত করে রেখেছে। তাই কাজী নজরুল ইসলাম কেবল সাহিত্য ইতিহাসের এক অধ্যায় নন; তিনি বাঙালির আবেগ, সংগ্রাম, প্রেম ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের এক চিরজাগ্রত ব্যক্তিত্ব।