হুমায়ূন আজাদ ও প্রকাশিত নিবন্ধ অবলম্বনে
হুমায়ূন আজাদ ও প্রকাশিত নিবন্ধ অবলম্বনে

যেভাবে লেখা হলো নারী

প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে হুমায়ুন আজাদ (২৮ এপ্রিল, ১৯৪৭—১২ আগস্ট, ২০০৪) জীবদ্দশায় লিখেছিলেন তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ ‘নারী’ নিয়ে। নিবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘যেভাবে লেখা হলো নারী’। এত দিন লেখাটি প্রথম আলোর কাগুজে সংস্করণেই ছিল, আজ হুমায়ুন আজাদের প্রয়াণদিবস স্মরণে নিবন্ধটি অন্য আলো অনলাইন পাঠকের সম্মুখে তুলে ধরা হলো।

মনে হচ্ছিল নিজেকে আমি অপচয় করে চলেছি কলাম লিখে লিখে—সে এক উত্তেজনামাতাল সময় এসেছিল কলাম লেখার; খুব জনপ্রিয় ছিল ওগুলো, আর আমার ঘেন্না লাগছিল, ক্লান্ত হচ্ছিলাম; সম্পাদকদের জানাচ্ছিলাম আর পণ্ডশ্রম পারব না, নষ্ট রাজনীতি লিখতে আমার বমি পাচ্ছে, কিন্তু কলাম লেখার আবেদনকাতর চাপ ছিল তখন তীব্র। একটি কলাম লিখেছিলাম, সম্ভবত ১৯৮৯-এ, ‘নারী ও মৌলবাদী-মার্ক্সবাদী প্রতিক্রিয়াশীলতা’ নামে; ওই ছোট কলামটিই নারীর সূচনা। ওটিই একদিন হয়ে ওঠে একটি গ্রন্থ—‘নারী’। তবে তখনই আমি ‘নারী’ লিখতে বসে যাইনি; একটি স্ফুলিঙ্গের দরকার ছিল, সেটি জ্বালিয়ে দেয় মোজাম্মেল বাবু। বাবু আবেদন জানাতে থাকে, যদি আমি কলাম লিখতে না চাই, তাহলে একটি বই লিখতে পারি নারী নিয়ে। হঠাৎ ঝিলিক বোধ করি আমিও; মনে পড়ে যায় অনার্সে পড়ার সময় থেকেই আমি উত্সাহী নারীবাদে; তখন থেকেই কিনছি নারীবাদীদের অনেক বই—১৯৬৫-৬৬-তে সম্ভবত সাত টাকায় কিনেছিলাম সিমোন দ্য বোভোয়ারের মহাগ্রন্থ ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’। হয়তো সাড়ে চার টাকায় বেটি ফ্রাইডানের ‘ফেমিনিন মিস্টিক’; কিছুটা পড়েছিলাম এবং না পড়ে রেখে দিয়েছিলাম; এডিনবরায় কিনেছিলাম কেইট মিলেটের প্রচণ্ড লৈঙ্গিক রাজনীতি, গ্রিয়ারের নারী নপুংসক, এবং আরও অনেক বই, কোনোটিই ভালো করে পড়া হয়নি। ঝিলিকটি ঝলসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ওই বইগুলো বের করি শেলফ থেকে, তখনো বুঝিনি কী অগ্নিগিরি অপেক্ষায় আছে বিস্ফোরণের। প্রথম পড়তে শুরু করি কেইট মিলেট, দেখি পারমাণবিক বোমার থেকেও বিপর্যয়কর বই লৈঙ্গিক রাজনীতি, যার প্রতিটি পঙ্‌ক্তি তেজস্ক্রিয়, প্রতিটি স্তবকে মেধার তীক্ষ্ণ বিভা। বইটি শেষ করি ভূমিকম্পে কাঁপতে কাঁপতে, বুঝতে পারি আমার ভেতরে সমাজ, রাষ্ট্র, সভ্যতা, নারী, ধর্মসাহিত্য প্রভৃতি সম্পর্কে যে ধারণাগুলো ছিল অস্পষ্টভাবে, যাকে আমি হয়তো কখনো তাত্ত্বিকরূপ দিতে পারতাম না, কেননা এ অঞ্চলে তাত্ত্বিক কাঠামোর বালাই নেই, তার অপূর্ব তাত্ত্বিকরূপ দিয়েছেন মিলেট। মিলেটের বইটি একটি পিএইচডি সন্দর্ভ, যা হয় সাধারণত বিনীত ভদ্র পোষমানা; কিন্তু এটি ভয়াবহ এবং প্রকাশের পর হয় সাড়াজাগানো বেস্টসেলার। এমন ঘটনা বেশি ঘটেনি। বলব কি আমার বিশ্বদৃষ্টিই বদলে যায় ওই বই পড়ার ফলে? একটির পর একটি বড় পড়তে থাকি নারীবাদীদের—সিমোন দ্য বোভোয়ারের মহাগ্রন্থ ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ পড়তে গিয়ে দেখি জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিশ্লেষণ ও শিল্পকলার অসামান্য রূপ বইটি, যা বাংলা ভাষায় কখনো হবে না। কয়েক মাসে আমি আনন্দে উল্লাসে পড়ে উঠি বিপুলসংখ্যক বই, সম্ভবত চল্লিশ হাজার পাতা; এবং আমার মনে হয় আমি প্রস্তুত, এখনই একটি বই লিখতে পারি, যে বই বাংলায় লেখা হয়নি।

হুমায়ুন আজাদ (২৮ এপ্রিল, ১৯৪৭—১২ আগস্ট, ২০০৪)

আমি পড়তে থাকি এবং লিখতে থাকি, রচিত হয়ে উঠতে থাকে নারী। নারী লেখা হচ্ছে বিপুলসংখ্যক বই পড়ার ফল; তবে ওই পড়া আগের মতো নয়। তবে নারীবাদীদের বইই শুধু পড়িনি আমি, পড়তে হয়েছে নারী, সমাজ, সভ্যতার সংক্রান্ত অজস্র বই, পারলে পৃথিবীর সব বই পড়ে ফেলতাম; পড়তে হয়েছে প্লাতো আরিস্ততল রুশো রাসকিন এঙ্গেলস টেনিসন রবীন্দ্রনাথ ফ্রয়েড শরিয়া হিন্দু আইন, রোমান আইন ও আরও অজস্র বই।

রুশো আর নতুন করে রবীন্দ্রনাথকে পড়তে গিয়ে কষ্ট আর মজা পেয়েছি খুব; হায়, রোমান্টিক রুশো আর রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ধারণা ছিল তারা মানুষের মুক্তিদাতা, কিন্তু দেখতে পাই তার বিপরীত। রবীন্দ্রনাথকে আমি বেশ ধরেছি, দেখেছি তার ভেতরে জড়ো হয়ে আছে ভিক্টোরীয় ও পুরোনো ভারতের বহু বাজে বস্তু; এবং তার যে-ব্যাখ্যা দিয়েছি, তিনি তা দেখলে অনকে কিছু নতুন করে লিখতেন। মেরি ওলস্টোনক্র্যাফটের ‘ভিন্ডিকেশন অব দ্য রাইটস অব ওমেন’ সংগ্রহ করতে একটু সময় লাগে, ঢাকার একটি বইয়ের দোকানেই পেয়ে যাই; পড়ে দেখি এক অপূর্ব বিস্ময় ওই বই, দুই শ বছর আগে মাত্র কয়েক দিনে ওই বই লিখে গেছেন এক তরুণী, যার কথা মনে হলেই আমি দেখতে পাই অগ্নিশিখা ও অশ্রুবিন্দু। বিশ শতকের দ্বিতীয়াংশে সবচেয়ে বিপ্লবাত্মক বইগুলো লিখেছেন নারীরা, পুরুষদের বই ওগুলোর পাশে ঠান্ডা মাংসের মতো। ওই বিপ্লবী নারীরা শুধু মুক্তাঞ্চল ইউরোপ আমেরিকায় দেখা দেননি, দেখা দিয়েছেন বদ্ধাঞ্চলে; যেমন মরোক্কোর ফাতেমা মেরনিসসি লিখেছেন মুসলমানের অবচেতনায় নারী, মিসরে নওএল লিখেছেন হাওয়ার লুকোন মুখ: আরব বিশ্বে নারী—খুবই মারাত্মক বই। তাঁরা তাদের সততা সাহসের জন্য পেয়েছেন পুরুষতন্ত্রের পুরস্কার।

নারী লেখা শুরুর আগে ঠিক করে নিই কয়েকটি বিষয়: প্রথমেই ভাবি আমার গদ্যের কথা; এমন গদ্য লিখতে হবে, যাতে আমার গদ্য বিকশিত হয়, তা যেন একই সাথে করতে পারে বিশ্লেষণ ও শিল্পসৃষ্টি। তারপর সূচি; আমার মনে হয় যেহেতু আমি লিখছি গরিব বাংলায়, এ বিষয়ে বছর বছর বইতে লেখা হবে না গরিব ভাষাটিতে, তাই শুধু একটি বই লেখা হবে না গরিব ভাষাটিতে, তাই শুধু একটি তাত্ত্বিক মহাগ্রন্থ লিখলেই চলবে না; এতে নারীর অবস্থার যেমন দিতে হবে পূর্ণ পরিচয়, তেমনি উপস্থাপিত করতে হবে নারীবাদের সমগ্র এলাকা; আর পশ্চিমের তত্ত্ব ও মহাপুরুষদের ব্যাখ্যা করলেই চলবে না; খুঁজতে হবে এই অন্ধকার অঞ্চলকেও, দেখতে হবে এখানে কতটা অন্ধকার ও কতটা জ্যোত্স্না। দেখি অন্ধকারই ছড়ানো দিকে দিকে, শুধু তীক্ষ্ম আলো জ্বলছেন তিন চারজন—রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রোকেয়া। আমি যে সবই লিখি, সেগুলো লিখতে খাটতে হয় খনিশ্রমিকের থেকেও বেশি, নারী লিখতেও তাই হয়েছে, তবে ধন্যবাদ একটি সাম্প্রতিক বিস্ময়কে, অ্যাপল ম্যাকিনটোশ প্লাসটিকে, ওটি ছাড়া নারী লেখা হতো না। হাতে লেখা আমি ১৯৭৩ সাল থেকেই ছেড়ে দিয়েছি; একটি মুনীর অপটিমা ছিল আমার আঙুল; কিন্তু ওটি এক আদিম যন্ত্র, আমার হৃৎপিণ্ডটিকে পীড়ন করে চলছিল ওটি, আক্রমণটুকু শুধু করে উঠতে পারেনি; আর ম্যাকিনটোশ প্লাসটি আমার কল্পনার থেকেও কল্পনাপ্রবণ, ঐন্দ্রজালিকের থেকেও ইন্দ্রজালময়; আমি যা-করতে চাই, ওটি পারে তার চেয়ে বেশি। নারী ছোট বই নয়; হাতে লিখলে কয়েক বছর লাগত, আঙুলগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত, আর আগের দিনের পাইকায় ছাপলে কম্পোজ প্রুফ দেখা ছাপায় লাগত কয়েক বছর এবং বইটি হতো হয়তো এক হাজার পাতার। নোটে নোটে ভরে উঠত চারপাশ, ভুলে যেতাম অনেক কিছু; কিন্তু ম্যাকিনটোশ প্লাস উদ্ধার করে আমাকে, বলে, আমি আছি, যেভাবে চাও ব্যবহার করো। আমি বইয়ের পর বই পড়তে থাকি, নোট নিতে থাকি প্লাসে, যেসব উদ্ধৃতি ব্যবহার করব, সেগুলো বিন্যস্ত করে রাখি প্লাসে; অনেক শ্রম কমে যায় আমার, লেখার সময় শুধু প্রয়োজনীয় নোটগুলো উদ্ধৃতগুলো কপি করে করে লাগাতে থাকি ঠিক জায়গাটিতে। এসব যদি হাতে করতে হতো, তাহলে আমার যে কী হতো, আমি ভাবতে পারি না। টাইপরাইটার ও কম্পিউটারে লিখতে লিখতে আমার একটি অভ্যাস হয়ে গেছে; কলম হাতে ভাবনাগুলো সৃশৃঙ্খলভাবে আসে না, অক্ষর দেখতে খারাপ লাগলে, কাগজ খারাপ হলে, আমি লিখতে পারি না, আর আমি সংশোধন করি বহুবার, একমাত্র কম্পিউটারই এগুলো দিতে পারে অবলীলায়; এবং নারী লিখতে ম্যাকিনটোশ প্লাস এসব দিয়েছে আমাকে। এর নাম আমার একটি বই উত্সর্গ করা উচিত।

বইটির প্রথম দিকে লিখছিলাম ধীরে ধীরে, ওটি ধারাবাহিক বেরোচ্ছিল সাপ্তাহিক পূর্বাভাস-এ; তারপর দেখে আমি ধীরে ধীরে লিখতে পারছি না, দুপুর বিকেলএবং সন্ধ্যেয় লিখছি; এমনকি রাত তিনটের দিকে আমার ঘুম ভেঙে যেতে শুরু করেছে। চারদিক নিস্তব্ধ, আমি উঠছি, মুখ ধুয়ে নিজ হাতে চা বানাচ্ছি, লিখতে বসছি, চলছে সিগারেট, চা আর লেখা। আজ আর আমি এটা পারব না। প্রত্যেক মানুষ বিশেষ কাজ করতে পারে বিশেষ সময়ে; আজ আমি ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না লিখতে পারব না, নারীও পারব না; আজ যা পারি তা পারতাম না ১৯৮০ বা ১৯৯০-এ। প্রত্যেকটি বই বিশেষ সময় ও শারীরিক ও মানসিক অবস্থার সৃষ্টি। নারীর পরিচ্ছেদগুলোর নাম আকর্ষণীয় বলে মনে হয় অনেকের, আমার কাছেও; ওই নামগুলো আমার মনে এসেছে অবলীলায়। যেমন ‘নষ্টনীড়’ নামটি, আমার বেশ পছন্দ; নারীর স্রাবের ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এ চিত্রকল্পটি আমার মনে পড়ে, যে-নামে অনশ্বর গল্প আছে রবীন্দ্রনাথের। এ পরিচ্ছেদের বিষয় এক ট্যাবো, বাঙলায় এ-নিয়ে কোনো ভালো লেখা নেই; আর আমি চিকিত্সা পরিভাষাও ব্যবহার করতে চাইনি, বিষয়টি নিয়ে আসতে চেয়েছি কবিতার কাছাকাছি। নারীর শরীরের আমি বর্ণনা দিয়েছি বিস্তৃত; কেননা নারীদের সাথে কথা বলে দেখেছি, তারা যে জিনিসটিকে সবচেয়ে কম চেনে, সেটা তাদের শরীর। তারা তাদের তথাকথিত নিষিদ্ধ অঙ্গগুলোকে চেনে না, যেন এগুলো নেই; আছে বলে তারা খুব লজ্জিত; ওগুলো তাদের জানার দরকার নেই। ওগুলো তো তারা নিজেরা ব্যবহার করে না; যারা ব্যবহার করে, জানতে তারা, পুরুষেরা। আমি বয়স্ক ডক্টরেট কয়েক সন্তানের জননী নারী অধ্যাপকের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি তারা জানেন না ঠিকমতো ঋতুচক্র হিসাব করতে, পুলকের কথা শোনেননি এবং জানেন না জীবনকেই। তাই নারী শরীরের দিয়েছি বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক কাব্যিক বর্ণনা; তাতে অনেকে শিউরে উঠেছে সুখী হয়েছে অনেকে। এক অধ্যাপিকা তো আমাকে বলেছিলেন যে একজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক হয়ে এমন বই লেখা আমার ঠিক হয়নি, কেননা নারী ব্যাপারটি অশ্লীল! কয়েক দিন আগে এক নিঃসঙ্গ ভগ্নবিবাহ আইনজীবী নারী জানিয়েছেন ওই পরিচ্ছেদটি তিনি আবার পড়ে নিজেকে জেনেছেন, যদিও বারো বছর আগে তার একটি কন্যা জন্মেছিল, তবু তিনি নিজের দেহকে জানতেন না; এখন জানেন, এবং এ অংশের কিছু পরামর্শ তিনি নিয়মিত ব্যবহার করে পরম সুখ লাভ করেন।

নারী সংস্করণে সংস্করণে বেড়েছে; দ্বিতীয় সংস্করণে যোগ করেছি দুটি নতুন পরিচ্ছেদ: ‘নারীবাদী সাহিত্যতত্ত্ব ও সমালোচনা’, ও ‘নারীদের নারীরা, নারীদের উপন্যাসে নারীভাবমূর্তি’। আমি যা কিছু লিখি তাকেই যেহেতু সাহিত্য করে তুলতে চাই, নারীও সাহিত্যসৃষ্টিই, তাই এ দুটি পরিচ্ছেদ ছাড়া সুখ পাচ্ছিলাম না। নারীবাদী সাহিত্যতত্ত্ব এ সময়ের সবচেয়ে মৌলিক সাহিত্যতত্ত্ব; তারা সাহিত্য বিচারের স্বভাবতই বদলে দিয়েছে। প্রথাগত সাহিত্য সমালোচনা হচ্ছে লেখক-দেবতাদের পদতলে প্রণাম ও পুষ্পার্ঘ নিবেদন; নারীবাদীরা অনেকটা আস্তিন চেপে ধরেছেন তথাকথিত মহৎদের; বলছেন, হে মহান পুরুষ লেখক, হে অমর, আপনি যে এসব লিখেছেন, পুরুষরা যেসবকে মহৎ মনে করে, সেগুলো তো অনেকাংশে ছাইপাঁশ। ‘নারীদের নারীরা: নারীদের উপন্যাসে নারীভাবমূর্তি’ লিখতে গিয়ে বিপদ হয় যে বাঙলার নারী লেখকদের বই দুষ্প্রাপ্র্য; তাদের উপন্যাস নিম্নমানের বলে নিন্দিত ও নিষ্ক্রান্ত। এটা ঠিক তারা কেউ তলস্তয় জয়েস রবীন্দ্রনাথ নন; কিন্তু তাদের লেখায় সাংঘাতিক সব প্রশ্ন আছে; আবার তাদের মধ্যে রয়েছেন পুরুষতন্ত্রের চর্চাও, যারা চক্রান্ত করেছেন নারীদের নিজেদেরই বিরুদ্ধে। তৃতীয় সংস্করণে যোগ করেছি একটি পরিচ্ছেদ: ‘ধর্ষণ’, যা সাম্প্রতিক বাঙালি মুসলমানের প্রধান সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। নারীবাদীরা তৈরি করেছেন ধর্ষণের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব; দেখিয়েছেন পুরুষতন্ত্র ধর্ষণকে পরিণত করেছে তার দর্শনে, কাজে লাগাচ্ছে লৈঙ্গিক রাজনীতিতে, ব্যবহার করছে নারীকে সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত করার উপায় রূপে।

নারী লিখে আমি সুখ পেয়েছি, যেমন সুখ পাই কবিতা লিখতে, গবেষণায়, আজকাল উপন্যাস লিখতে। পাঠকেরা এটিকে গ্রহণ করেছিলেন, যদিও নারী সহজ-সরল বই নয়; অনেকে নাম শুনেই কিনেছেন, ভেবেছেন হয়তো এতে পাবেন তাদের অবদমিত কামনাবাসনার উত্তেজক খাদ্য, কিন্তু পড়তে গিয়ে দেখেছেন—নারী কী দুরূহ; কিন্তু ওই দুরূহতায় তারা পেয়েছেন আনন্দ, বদলে গেছে অনেকের বিশ্বদৃষ্টি। আজকাল নারী নিয়ে প্রচুর লেখা হচ্ছে, নারী বলতে লজ্জা পান এমন নারীলাজুক পুরুষরাও লিখেছেন নারী নিয়ে; এসবের ওপর রয়েছে নারী বইটির প্রভাব। অনেকে অবলীলায় নারীর পাতার পর পাতা নিজেদের ভুল ভাষায় চয়ন করেন তাদের লেখায়, আর নারীর অজস্র পরিভাষা পরিণত হয়েছে তাদের নিজস্ব সম্পত্তিতে।

(কিঞ্চিৎ পরিমার্জিত)