চট্টগ্রামের মিনা পাল ঢাকায় এসে হয়ে গেলেন চিত্রনায়িকা কবরী। তারপর দর্শকের মনের মণিকোঠায় তিনি থাকলেন বহু বহুকাল। কবরীকে কেন তখন গ্রহণ করেছিলেন সিনে–দর্শকেরা? আজ এই নায়িকার মৃত্যুবার্ষিকীতে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সোনালি সময়ের কিংবদন্তি নায়িকা কবরী। ষাটের দশকে চলচ্চিত্রের পর্দায় অভিষেক ঘটলেও মূলত সত্তর ও আশির দশকে নিজের অভিনয় দিয়ে এ দেশের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর অভিনীত গ্রামীণ নারী চরিত্র কিংবা কিশোরীর চাঞ্চল্যমাখা চরিত্রগুলো বাঙালির কাছে ‘আপন’ মনে হতো। ‘কাছের কেউ’ মনে হতো। ফলে দর্শক স্বাভাবিক প্রবণতায় কবরীকে গ্রহণ করেছিলেন।
এই দর্শক কারা?
গ্রামীণ ও শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। আদতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির দর্শকের স্বপ্ন ও চাওয়া-পাওয়ার এক অপ্রত্যাশিত নায়িকা রূপ নির্মাণে কবরীর কুশলতাকে অবশ্যই স্মরণ করতে হয়।
১৯৬৪ সালে সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘সুতরাং’ সিনেমার জরিনা চরিত্র রূপায়নের মাধ্যমে ঢাকাই চলচ্চিত্রে যাত্রা সূচিত হয়েছিল কবরীর। এই সিনেমার মধ্য দিয়েই মাতা–পিতার দেওয়া নাম ‘মিনা পাল’ ক্রমেই হারিয়ে গিয়ে মানুষের মনে স্থান করে নিল নতুন একটি নাম—কবরী। মিনা পাল থেকে তাঁর কবরী হয়ে ওঠার যে যাত্রা, সেদিকে দৃষ্টি দিলে এটা স্পষ্ট হবে যে সে সময়ের মানুষের আকাঙ্ক্ষা, নৈতিকতা ও আচরণ তথা জনসংস্কৃতির ভেতর থাকা উপাদানগুলো কবরী অভিনীত চরিত্রসমূহের মধ্যে জাগ্রত ছিল, জাগরুক ছিল কবরীর নিজের মধ্যেও।
সংগত কারণেই ‘সুতরাং’-এর পরিচালক সুভাষ দত্তের দেওয়া নাম নিয়েই পরবর্তী সময়ে এ দেশের মানুষের কাছে রোমান্টিকতার সমার্থক হিসেবে আবিভূর্ত হন কবরী। সেই সঙ্গে তাঁর মিষ্টি তথা ভুবন ভোলানো হাসি এবং চঞ্চল কিশোরীপনায় ক্রমেই পরিচিতি পান ‘মিষ্টি মেয়ে’হিসেবে।
চলচ্চিত্রের কাহিনিতে গ্রামীণ নারীর চরিত্রে কবরীকে বাস্তবিক গ্রামের মেয়ে কিংবা শহুরে মধ্যবিত্ত নারীর অবয়ব হিসেবেই দেখা যেত। আবার এটাও বলা যায়, সে সময়ের পুরুষ দর্শক যেভাবে প্রেয়সী বা স্ত্রীকে কল্পনা করতেন, অর্থাৎ লজ্জাবতী, আকর্ষণীয়, হাস্যোজ্জ্বল প্রেমিকা কিংবা প্রেমের প্রতি অনুগত এক নারী, ঠিক সে রকমই যেন হয়ে উঠেছিল কবরীর অভিনয়প্রক্রিয়া। ফলে সে সময়ের দর্শক কবরীর অভিনীত চলচ্চিত্র ও তাঁর রূপায়িত চরিত্রকে অবলীলায় গ্রহণ করেছিলেন। আবার অভিনয়ের ক্ষেত্রে কবরীর শারীরিক অভিনয়দক্ষতা, অর্থাৎ তাঁর চোখ, মুখ, কণ্ঠ প্রভৃতির ব্যবহারও ছিল মানুষের কাছে পছন্দের।
চলচ্চিত্রের কাহিনিতে গ্রামীণ নারীর চরিত্রে কবরীকে বাস্তবিক গ্রামের মেয়ে কিংবা শহুরে মধ্যবিত্ত নারীর অবয়ব হিসেবেই দেখা যেত। আবার এটাও বলা যায়, সে সময়ের পুরুষ দর্শক যেভাবে প্রেয়সী বা স্ত্রীকে কল্পনা করতেন, অর্থাৎ লজ্জাবতী, আকর্ষণীয়, হাস্যোজ্জ্বল প্রেমিকা কিংবা প্রেমের প্রতি অনুগত এক নারী, ঠিক সে রকমই যেন হয়ে উঠেছিল কবরীর অভিনয়প্রক্রিয়া। ফলে সে সময়ের দর্শক কবরীর অভিনীত চলচ্চিত্র ও তাঁর রূপায়িত চরিত্রকে অবলীলায় গ্রহণ করেছিলেন।
চলচ্চিত্রে কবরীর মায়াবী চোখ, মাধুর্যময় কণ্ঠ, চরিত্রের চঞ্চলতা, মিষ্টি হাসি, চুলের ব্যবহার প্রভৃতির সমন্বয়ে বাঙালি নারীর সৌন্দর্যেই স্নিগ্ধ ও মায়াবী নায়িকা হিসেবে এ দেশের মানুষের হৃদয় জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন কবরী। ফলে কেউ কেউ তাঁর অভিনয় দেখে ‘পাশের বাড়ির মেয়ে’, বা ‘ঘরের মেয়ে’ আবার কেউ ‘মিষ্টি মেয়ে’ হিসেবে সহজেই গ্রহণ করেছিলেন। কেননা, আবার বলি, তাঁর অভিনয়ে গ্রামীণ নারীজীবনের সহজতা, সরলতা, রোমান্টিকতা প্রভৃতির অপূর্ব এক সংমিশ্রণ ঘটেছিল। একই সঙ্গে তাঁর অভিনীত চরিত্রের মুখে গীত গানসমূহও তাঁর জনপ্রিয়তাকে বিশেষ উচ্চতা দিয়েছিল।
চলচ্চিত্রের চরিত্রের অভিনয়ে কবরীর কাপড় পরা, চুল বাঁধা, হাঁটা-চলা থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছুতে ছিল গ্রামীণ ও শহুরে মধ্যবিত্ত নারীর সাধারণ নিদর্শনের প্রতিফলন। ফলে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ চলচ্চিত্র–দর্শকের কাছে কবরীর জনপ্রিয়তা পেতে বেগ পেতে হয়নি।
জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে মানুষের প্রতিদিনকার জীবনযাপনের প্রক্রিয়া ফুটে ওঠাও বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য। কবরী অভিনীত চরিত্রগুলো সে সময়ের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চিন্তা-চেতনায় এবং বাস্তবিকতায় বিরাজমান নারীর প্রতিরূপই নির্মাণ করতে পেরেছিল, যে কারণে কবরী হয়ে উঠেছিলেন মানুষের জনপ্রিয় ও প্রত্যাশিত নায়িকা।
বেশি মানুষের মনোরঞ্জন করতে পারা কিংবা মানুষকে একাত্ম করতে পারাও জনপ্রিয় সংস্কৃতির অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য। সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রধারায় কবরী অভিনীত বিবিধ চরিত্র, চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্রের গানগুলো এ দেশের অধিকাংশ চলচ্চিত্র–দর্শনার্থীকে একাত্ম করতে সক্ষম হয়েছিল, যা আগেই বলা হয়েছে। কবরী অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘সুতরাং’, ‘রংবাজ’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘আবির্ভাব’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘ময়নামতি’, ‘অধিকার’, ‘স্মৃতিটুকু থাক’, ‘দেবদাস’, ‘সারেং বৌ’, ‘সুজন সখী’ প্রভৃতি ব্যবসায়িকভাবে সফলতা অর্জন করেছিল। এর মধ্যে ‘সুজন সখী’কে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য রোমান্টিক চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে জনপ্রিয় রোমান্টিক জুটি হিসেবে উল্লেখযোগ্য ছিল রাজ্জাক-কবরী। তাঁদের অভিনীত ‘ময়নামতি’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়েই এ দেশের মানুষ রোমান্টিক নায়ক-নায়িকার প্রতিরূপ দেখতে পেয়েছিল যেন–বা। বিশেষ করে, গ্রামীণ বা সামাজিক কাহিনির প্রক্রিয়ায় এই দুই অভিনয়শিল্পীর প্রেমিক-প্রেমিকারূপী কুশলতা ও রসায়ন তৎকালীন তরুণ-তরুণীর প্রতিরূপকেই চলচ্চিত্রে প্রতিফলিত করেছিল। তাই সহজেই এই জুটি সে সময়ের মানুষের কাছেও পেয়েছিল গ্রহণযোগ্যতা। আবার এ কথাও সত্য, এ দেশের পুরুষপ্রধান সংস্কৃতির ধারায় পুরুষের দৃষ্টিতে কবরী কর্তৃক রূপায়িত নারী—প্রেমিকা কিংবা স্ত্রী চরিত্রসমূহ এ দেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় কল্পিত নারী, প্রেমিকা বা স্ত্রীর প্রতিরূপায়িত রূপ হিসেবেও বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। তাই এ–ও স্বীকার করা জরুরি যে তৎকালীন সমাজকাঠামো এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতির ভোক্তা শ্রেণি হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরুষ দর্শকও কবরীর জনপ্রিয়তার বিশেষ এক সক্রিয় উপাদান।
সব মিলিয়ে তৎকালীন সমাজ বাস্তবতায় সাধারণ নারীর প্রতিরূপ নির্মাণে অসাধারণ অভিনয়ক্রিয়া, মনোমুগ্ধকর হাসি ও একজন নারীর সাধারণ অভিব্যক্তিগুলোর প্রতিফলনের মধ্য দিয়েই ‘মিনা পাল’ থেকে ক্রমে এ দেশের মানুষের হৃদয়ে কবরী সারোয়ার কিংবদন্তি নায়িকারূপে স্থান করে নিয়েছিলেন।