তারুণ্যে একবার প্যারিসে ট্রেনে ভ্রমণ শেষে আলাঁ বাদিউ এক স্টেশনে নামেন। স্টেশনের পাশে একটি সিনেমার পোস্টারে মেরিলিন মনরোর খোলামেলা ছবি দেখে দাঁড়িয়ে পড়েন। ঠিক তখনই পাশ দিয়ে এক ভবঘুরে যেতে যেতে মন্তব্য করে, ‘যতই কাপড় খোলো না কেন, শৈশব আর ফিরে পাবে না।’
কথাটা বাদিউর মনে গেঁথে যায়। পরে তিনি বারবার এই অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন—বিশ্লেষণ করেছেন পুঁজিবাদী সমাজে নগ্নতা, ভোগবাদিতা এবং অনলাইন প্রেমের মধ্যকার সম্পর্ক। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, ‘নগ্ন শরীরে কোনো “গরম বাতাস” নেই’, এসেছে তাঁর বই ‘দ্য পর্নোগ্রাফিক এজ’ থেকে, যেখানে ফ্যাশন, যৌনতা ও সমসাময়িক সমাজব্যবস্থার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। ‘ভারসো’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও তিনি এই বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারে কথা বলেন।
এখানে ‘নগ্ন শরীর’ বলতে বাদিউ বোঝান পুঁজিবাদী শারীরিকতা, আর ‘গরম বাতাস’ মানে অনুকূলতা বা আসল আবেগ ও মানবিক উষ্ণতা—যা পুঁজিবাদে অনুপস্থিত। অর্থাৎ, যে শরীর দেখা যাচ্ছে তা আসলে পণ্যায়িত, তাতে মানবিকতার আসল স্পর্শ নেই।
আলাঁ বাদিউ জন্মগ্রহণ করেন মরক্কোর রাবাতে। পরে ফ্রান্সে পরিবারসহ চলে গিয়ে সেখানেই নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর বাবা রেমন্ড বাদিউ ছিলেন গণিতবিদ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলনের সদস্য। মা ছিলেন দর্শনের অধ্যাপক। বাদিউ গণিত ও দর্শনের সংযোগ ঘটিয়ে জীবন, রাজনীতি ও সমাজকে ব্যাখ্যা করেছেন।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বই ছিল তাঁর ‘দ্য কমিউনিস্ট হাইপোথিসিস’। এতে তিনি বলেন, সংস্কৃতির রূপান্তরই মানুষের অভিজ্ঞতাকে বদলে দেয়। সেই অভিজ্ঞতা মানুষের চেতনা ও রাজনৈতিক অবস্থান পাল্টায়। সোভিয়েত পতনের প্রধান কারণ হিসেবে তিনি দেখান—সেখানে সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটেনি, ফলে বিপ্লব টেকেনি।
বাদিউর আরেক বিখ্যাত বই ‘ইন প্রেইজ অব লাভ’–এ তিনি প্রেমকে দেখেছেন সত্য অনুসন্ধানের পথ হিসেবে। তাঁর মতে, প্রেম তখনই জন্ম নেয়, যখন দুই মানুষের আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি এক নতুন সম্মিলিত দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়। প্রেম শুধু দেখা বা মেলামেশা নয়, বরং একটি নির্মাণ—দুজন মিলে এক নতুন জীবনের দৃষ্টিকোণ তৈরি করা। এ কারণেই প্রেম, তাঁর কাছে, গণতন্ত্রের প্রতীক। তিনি বলেন, ‘যখন কেউ কেবল নিজের নয়, বরং দুজনের দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবীকে দেখতে শেখে—সেখানেই প্রেমের সত্য নিহিত।’
তবে এই প্রেমও আজকাল পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ফাঁদে পড়েছে। বাদিউ বলেন, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’—এই বাক্যটি প্রেমের সিলমোহর, কিন্তু এখন প্রেম হয়ে উঠেছে বাজারজাত একটি চুক্তি। অনলাইন ডেটিং সাইটগুলো এমন সঙ্গী খুঁজে দেয়, যার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার ঝুঁকি কম এবং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য সব শর্ত মিলে যায়। ফলে প্রেম হয়ে উঠেছে ‘সিচুয়েশনশিপ’—পরিস্থিতিনির্ভর, চুক্তিভিত্তিক একধরনের সম্পর্ক, যেখানে আবেগের জায়গা ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে। নিওলিবারেল ব্যবস্থায় প্রেমও একধরনের ভোগ্য বস্তুতে পরিণত হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে শ্রেণিগত প্রভাবও বাদিউ বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, শ্রমজীবী শ্রেণিতে প্রেম অনেক সময় হয়ে ওঠে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের একধরনের সংহতি। মধ্যবিত্তদের প্রেম তুলনামূলকভাবে বেশি ঘটলেও সেখানে আছে চাপা স্বপ্ন ও স্থায়িত্বের আকাঙ্ক্ষা। অন্যদিকে উচ্চবিত্ত শ্রেণির প্রেমে থাকে ‘স্পেস’, ‘আইডিওলজির বিকার’ এবং ‘উইলস অব ফ্রিডম’-এর খোঁজ—যা সম্পর্ককে করে তোলে কম স্বতঃস্ফূর্ত।
এখানেই বাদিউ মনে করিয়ে দেন, ‘ক্ষমতার জন্য লড়াই’ আর ‘ক্ষমতাসীনদের লড়াই’ এক নয়। সাংস্কৃতিক মুক্তির প্রশ্নে এই ক্ষমতাসীনদের লড়াইকেই তিনি চ্যালেঞ্জ জানান। তাঁর মতে, প্রেমের নামে যেসব স্বাধীনতা বিক্রি হচ্ছে, সেগুলো মূলত নিয়ন্ত্রণেরই অন্য রূপ।
বাদিউর আরেকটি বিখ্যাত বই ‘বিহাইন্ড দ্য স্কার্ফ ল দেয়ার ইজ ফিয়ার’–এ তিনি বলেন, ‘ইসলাম ফ্রান্সে মজলুমের ধর্ম।’ কারণ, ফ্রান্সের অভিবাসী সমাজে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, এবং তাদের ওপর চাপানো হয় কঠোর রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ। তিনি প্রশ্ন তোলেন—যদি হিজাব ধর্মীয় চিহ্ন হিসেবে নিষিদ্ধ হয়, তাহলে কেন পুঁজিবাদী বিজ্ঞাপনচিত্রগুলো নিষিদ্ধ নয়? হিজাবে নারীবাদীদের ‘অ্যালার্জি’ দেখে তিনি বিস্মিত। তাঁর মতে, পর্নো ইন্ডাস্ট্রি চলতে পারে, অথচ রাষ্ট্র ও নারীবাদীরা ব্যস্ত হিজাব নিষিদ্ধ করতে।
জাঁক লাকাঁকে উদ্ধৃত করে বাদিউ বলেন, পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ যতটা পুরোনো, বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যাপক ও টেকসই। পশ্চিমা ‘সেক্যুলারিজম’ আসলে একধরনের জ্ঞানব্যবস্থা, যা নিজের বাইরে অন্য আদর্শ মানতে চায় না। ফলে পুঁজিতন্ত্র একদিকে নারীকে নগ্ন করে বাজারে পণ্য করে, অন্যদিকে হিজাববিরোধী আন্দোলনও চালায়—উভয়ই এক প্রকরণ। বাদিউ বলেন, ‘নগ্ন শরীর আমরা দেখি ঠিকই, কিন্তু “গরম বাতাস”—অর্থাৎ মানবিক উষ্ণতা, স্পর্শ—সেই শরীরকে আর ছুঁতে পারে না।’ নগ্নতা একধরনের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়ায়, যার ভেতর আছে শূন্যতা ও নিঃসঙ্গতা।
‘দ্য পর্নোগ্রাফিক এজ’ বইটিতে বাদিউ সমসাময়িক গণতন্ত্র ও নব্য–উদারনৈতিক সংস্কৃতির গোপন কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণকে উন্মোচন করেছেন। তিনি বলেন, ১৮৮০-এর দশকে গণরাজনীতির উত্থানের সময় থেকে পর্নোগ্রাফিও সাংস্কৃতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে। এখনকার পর্নো সংস্কৃতি প্রযুক্তি ও প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আমাদের পছন্দকে নিয়ন্ত্রণ করছে, আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করছে, এবং শরীরকে পরিণত করছে একধরনের যন্ত্রে।
৭৯ বছর বয়সে লেখা ‘ট্রু লাইফ’ বইতে বাদিউ বলেন, ‘আজকের তরুণেরা এক নতুন জগতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, যেখানে পুরোনো রীতিনীতির ভাঙনের সঙ্গে সঙ্গে সামনে এসেছে নতুন সম্ভাবনা। কিন্তু সেই সম্ভাবনা পূরণের পথে বড় বাধা হলো ভোগবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীল ঐতিহ্যবাদ।’ তিনি তরুণদের আহ্বান জানান, সাহস নিয়ে পুরোনো ধারণা ঝেড়ে ফেলে, নতুন কিছু গড়ে তোলার।
বাদিউ সতর্ক করেন, নিওলিবারেল প্যাকেজ কিনলে বিপদ আছে। কারণ, এতে মানুষ ক্রমে বুঝতেই পারে না, সে এক কঠিন অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর ভেতর বাস করছে। সে বুঝতে পারে না, তার জীবন যেভাবে একদা নগ্ন, মুক্ত অবস্থায় শুরু হয়েছিল, সেই অবস্থায় সে আর ফিরতে পারবে না।