
কবিতা লেখা শেখানো যায় কি না—এই প্রশ্নের ভেতরেই একটা চোরাকাঁটা লুকিয়ে থাকে। প্রশ্নটা যদি হতো ‘সাঁতার শেখানো যায় কি না’, উত্তর সহজ—যায়। কিন্তু কবিতা নিছক দক্ষতা নয়; তার ভেতরে এমন কিছু থাকে, যাকে সাবেকি ভাষায় বলি ‘প্রতিভা’, আরও পুরোনো ভাষায় বলি ‘দৈব স্পর্শ’। ঠিক এই দৈব আর দক্ষতার মাঝখানের অস্পষ্ট এলাকাতেই দাঁড়িয়ে আছে কবিতার কর্মশালা। উপযোগিতা কতটুকু, কর্মশালা কাউকে কবি বানাতে পারে কি না, আর কাব্যজগতের বিস্তারে তার ভূমিকা কী—এই প্রশ্নগুলো আসলে একই সুতোয় গাঁথা। আমেরিকার কাব্যজগতে রবার্ট লোয়েলের নাম কবিতা কর্মশালার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর সঙ্গে আছেন স্নোডগ্রাস, অ্যান সেক্সটন, সিলভিয়া প্লাথ, ম্যাক্সিন কুমিন প্রমুখ কবিগণ। ক্লাসে রবার্ট লোয়েলের শিক্ষাদানের পদ্ধতি ছিল স্বজ্ঞাত এবং খোলামেলা। তিনি কোনো ছাত্রের কবিতা পড়ার পরে, এর মাধ্যমে উদ্ভূত আরেকটি কবিতা পড়তেন। তুলনা অবশ্য প্রায়ই বেদনাদায়ক হতো। যেন ঠান্ডা ছেনি দিয়ে চেঁছে দিতেন, একজন দন্তচিকিৎসকের চেয়ে বেশি কোনো করুণা ছিল না। একেবারে ক্ষয় বের করে আনতেন। হ্যাঁ, কবিতার প্রতি সদয় না হলেও, কবির প্রতি সব সময়ই সদয় ছিলেন তিনি।
তাহলে, কী দিতে পারে কর্মশালা? প্রথমেই স্বীকার করা ভালো, কর্মশালার একটা বাস্তব ও প্রয়োজনীয় জায়গা আছে। একজন তরুণ যে সদ্য কলম ধরেছে, তার কাছে কর্মশালা হচ্ছে প্রথম আয়না। নিজের লেখা নিজে পড়লে যা চোখে পড়ে না, অন্যের চোখে পড়লে তা-ই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ছন্দের হোঁচট, শব্দের অপচয়, একটা চিত্রকল্পের পুনরাবৃত্তি বা আবেগের অতিরিক্ত প্রকাশ—এসব সাধারণত লেখক নিজে দেখতে পান না, কারণ লেখার সময় তিনি নিজের অনুভূতির ভেতরে বন্দী। কর্মশালা সেই বন্দিত্ব থেকে সাময়িক মুক্তি দেয়। অন্যের প্রতিক্রিয়া শুনে, প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে, লেখক বুঝতে শেখেন—পাঠক যা বোঝেন আর তিনি যা বোঝাতে চেয়েছিলেন, তার মধ্যে ফারাক কতটা। এ ছাড়া কর্মশালা একধরনের শৃঙ্খলা শেখায়। কবিতা লেখা একটা একলা, অনিয়মিত, খামখেয়ালি অভ্যাস হতে পারে—মন এলে লেখি, মন না এলে লেখি না। কর্মশালার একটা নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট আসর, নির্দিষ্ট প্রত্যাশা থাকে বলে লেখক নিয়মিত লিখতে বাধ্য হন, নিয়মিত পড়তে বাধ্য হন। এই বাধ্যবাধকতাই অনেক সময় প্রতিভাকে অলসতার হাত থেকে বাঁচায়। ছন্দ, অলংকার, চিত্রকল্প নির্মাণ, শব্দচয়নের সূক্ষ্মতা, লাইন-ব্রেকের কৌশল—এই কারিগরি বিষয়গুলো কর্মশালায় আলোচিত হতে পারে এবং এগুলো নিঃসন্দেহে শেখার বিষয়, চর্চার বিষয়। যেমন একজন ছুতোর কাঠ চেনা, হাতিয়ার চালানো শেখে, তেমনি একজন কবি-প্রার্থীও শব্দের বুনন, স্তবকের গঠন, বিরামচিহ্নের ব্যবহার শিখতে পারেন। এই শেখাটুকু কর্মশালা দিতে পারে এবং এই সামর্থ্যকে খাটো করে দেখার কারণ নেই।
ছন্দ, অলংকার, চিত্রকল্প নির্মাণ, শব্দচয়নের সূক্ষ্মতা, লাইন-ব্রেকের কৌশল—এই কারিগরি বিষয়গুলো কর্মশালায় আলোচিত হতে পারে এবং এগুলো নিঃসন্দেহে শেখার বিষয়, চর্চার বিষয়। যেমন একজন ছুতোর কাঠ চেনা, হাতিয়ার চালানো শেখে, তেমনি একজন কবি-প্রার্থীও শব্দের বুনন, স্তবকের গঠন, বিরামচিহ্নের ব্যবহার শিখতে পারেন। এই শেখাটুকু কর্মশালা দিতে পারে এবং এই সামর্থ্যকে খাটো করে দেখার কারণ নেই।
আরও একটা বড় কাজ কর্মশালা করে—সমালোচনা গ্রহণ করার ক্ষমতা তৈরি করা। প্রথম যৌবনে লেখা নিয়ে আমরা এতটাই অহংকারী বা এতটাই ভীত থাকি যে কোনো প্রতিক্রিয়া সহজে নিতে পারি না। কর্মশালার পরিবেশ, বারবার নিজের লেখা অন্যের সামনে মেলে ধরার অভ্যাস, ধীরে ধীরে সেই অহং আর ভয়—দুটোকেই নরম করে। একজন লেখক শেখেন কীভাবে সমালোচনাকে আক্রমণ না ভেবে উপকরণ হিসেবে দেখতে হয়। এই মানসিক পরিণতিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু কবি হওয়া বা কবিতা লেখা কি শেখানো যায়? এখানে এসেই প্রশ্নটা কঠিন হয়ে ওঠে। কারিগরি শেখানো যায়, কিন্তু কবিতার প্রাণভোমরা কি কারিগরির মধ্যে থাকে? রবীন্দ্রনাথ কোনো কর্মশালায় যাননি, জীবনানন্দ দাশ যাননি, শামসুর রাহমান কিংবা আল মাহমুদ যাননি। তাঁরা কবি হয়ে উঠেছিলেন পড়ে, ভেবে, একা হেঁটে, ব্যর্থ হয়ে, আবার লিখে—এক দীর্ঘ নিঃসঙ্গ সাধনায়। এই সাধনার কোনো নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম হয় না। কবিতা আসলে একধরনের দেখার ভঙ্গি, জগৎকে অনুভব করার একটা অন্য রকম স্নায়ুতন্ত্র। এই দেখার ভঙ্গিটা কাউকে শিখিয়ে দেওয়া যায় না, কারণ এটা কোনো কৌশল নয়, এটা একধরনের অস্তিত্বের অবস্থা। একজন মানুষ জগৎকে যেভাবে বিস্ময়, বেদনা, আশ্চর্য বা করুণা দিয়ে দেখেন, সেই দেখাটাই তাঁর কবিতার ভিত্তি হয়ে ওঠে। কর্মশালা এই ভিত্তি তৈরি করতে পারে না, কারণ এই ভিত্তি তৈরি হয় জীবনের ভেতরে, ব্যক্তিগত ইতিহাসে, একাকিত্বে, পাঠে, আর কখনো কখনো আঘাতে।
তাহলে কী বলব, কর্মশালা একেবারেই অকেজো? তা নয়। বরং এভাবে বলা যায়—কর্মশালা বীজ বপন করতে পারে না, কিন্তু যে বীজ ইতিমধ্যে মাটির নিচে আছে, তাকে জল-হাওয়া দিতে পারে। যাঁর ভেতরে কবিতার সেই আদিম তাড়না নেই, তাঁকে হাজার কর্মশালা ঘুরিয়েও কবি বানানো যাবে না। কিন্তু যাঁর ভেতরে তাড়নাটা আছে অথচ কারিগরি দুর্বলতার কারণে সেই তাড়না ভাষায় রূপ পাচ্ছে না, তাঁর জন্য কর্মশালা একটা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণক্ষেত্র হতে পারে। অর্থাৎ কর্মশালা কবি তৈরির কারখানা নয়; বরং কবি হয়ে ওঠার পথে একটা সহায়ক ধাপ, একটা মধ্যবর্তী বিদ্যালয়।
নয় মাস রাতদিন হাটে-ঘাটে সমর, হয় দহন গ্রাম-শহরপথ
হত্যায় মৃত্যুর লাশে ভরেছে সব খালপুকুরজল, নদী তীর
ইজ্জত-সম্ভ্রম হারাল কত বোন ঠিক হিশেব আর কি হয় তার!
মসজিদ-মন্দির বাকি ছিল না আর সর্ববিধ্বংসী তাণ্ডব
মৃত্যুর সামনেই রেখে বাজি জীবন হয় শহিদ, বীর যে সন্তান
রক্তের যুদ্ধের বিনিময়ে পেলাম জয় এ-বাংলার, স্বাধীন দেশ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী তাঁদের অন্তর্বর্তীকালীন পরীক্ষার অংশ হিসেবে মন্দাক্রান্তা ছন্দে কবিতা লিখে জমা দিয়েছিলেন। ওপরের এই কবিতাটি তারই একটি। এখানে একটা বিপদের কথাও বলা দরকার। পশ্চিমা সাহিত্য-সমালোচনায় ‘ওয়ার্কশপ পোয়েম’ বলে একটা কটাক্ষপূর্ণ পরিভাষা প্রচলিত আছে—এমন কবিতা, যা টেকনিক্যালি নিখুঁত, প্রতিটি লাইন যত্ন করে কাটাছাঁটা, কিন্তু যার ভেতরে কোনো ঝুঁকি নেই, কোনো বিস্ময় নেই, কোনো ব্যক্তিগত ক্ষত নেই। কর্মশালার সমষ্টিগত রুচি অনেক সময় লেখককে নিরাপদ পথে হাঁটতে শেখায়, যা সবাই পছন্দ করবে, যাতে কেউ আপত্তি তুলবে না। কিন্তু মহৎ কবিতা প্রায়ই আসে ঠিক তার উল্টো দিক থেকে—এমন কিছু লিখে ফেলা যা প্রথম পাঠে অস্বস্তিকর, অগোছালো, এমনকি ‘ভুল’। কর্মশালার সমষ্টিগত সম্পাদনা যদি সেই অস্বস্তিকে ছেঁটে ফেলে মসৃণ করে দেয়, তবে তা কবিতার ক্ষতি করে। ফলে কর্মশালা যেমন একজন লেখককে শাণিত করতে পারে, তেমনি অসতর্ক হলে তাঁর কণ্ঠস্বরকে অন্য দশজনের মতো একই ছাঁচে ফেলেও দিতে পারে। এই দ্বিধা কর্মশালার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। বন্ধু সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের জন্য কবি জুয়েল মাজহার মন্দাক্রান্তা ছন্দে লিখেছিলেন ‘ঈর্ষার এঞ্জিন’ কবিতাটি। আসুন সেই কবিতার কয়েকটি লাইন পড়ি—
ঈর্ষার এঞ্জিন গরজি ওঠে আজ। ঘুরছে মঞ্জুল মেঘাঙ্কুর;
ঘুম এক চিৎকার। আকাশে চুনিলাল সূর্য-ক্রন্দন ঝারায় খুন
উন্মাদ চায় তার অধরে অনিবার স্বর্গবেশ্যার স্তনাগ্র
কোন্ মনকির কোন্ নকিরে লিখে মোর কোন্ সে-পাপ কোন্ অধর্মে?
অন্ধের তন্দ্রায় ক্রমশ খসে যায় রাত্রে বর্তুল ডালিমফল;
জন্মের জঙ্ঘায় অঝোরে ঝরে মেঘ; ফুটছে ফুল এক অলক্ষ্যে
নিঃসীম কান্তার ঘুমে ও তৃণে পার। রজ্জুপথ দূর, গভীর ডাক;
এক-ক্লোন চণ্ডাল ঢুঁড়েছে পিপাসায় নফ্সের আম্মার—কি লান্নত!
কর্মশালা কাব্যজগতের বিস্তারে কী ভূমিকা রাখছে। এই জায়গাটায় কর্মশালার অবদান বোধ হয় সবচেয়ে স্পষ্ট এবং সবচেয়ে ইতিবাচক। বাংলা কবিতার ইতিহাসে আমরা দেখেছি, বড় বড় সাহিত্য-আন্দোলন প্রায়ই জন্ম নিয়েছে আড্ডা থেকে, পত্রিকা-গোষ্ঠী থেকে, এক ছাদের নিচে জড়ো হওয়া কয়েকজন তরুণের তর্কবিতর্ক থেকে।
এবার আসা যাক তৃতীয় প্রশ্নে—কর্মশালা কাব্যজগতের বিস্তারে কী ভূমিকা রাখছে। এই জায়গাটায় কর্মশালার অবদান বোধ হয় সবচেয়ে স্পষ্ট এবং সবচেয়ে ইতিবাচক। বাংলা কবিতার ইতিহাসে আমরা দেখেছি, বড় বড় সাহিত্য-আন্দোলন প্রায়ই জন্ম নিয়েছে আড্ডা থেকে, পত্রিকা-গোষ্ঠী থেকে, এক ছাদের নিচে জড়ো হওয়া কয়েকজন তরুণের তর্কবিতর্ক থেকে। কল্লোল যুগের আড্ডা, কৃত্তিবাসের চারপাশে জড়ো হওয়া কবিকুল, ছোট পত্রিকার সম্পাদকীয় বৈঠক—এসবই এক অর্থে কর্মশালারই পূর্বসূরি। আধুনিক কর্মশালা সেই একই কাজ করে, কিন্তু আরও সংগঠিত রূপে। এটি বিচ্ছিন্ন তরুণ কবিদের একত্র করে, তাদের মধ্যে একটা সম্প্রদায়-বোধ তৈরি করে। একা লিখতে থাকা মানুষ প্রায়ই নিজের লেখা নিয়ে সংশয়ে ভোগেন, নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করেন। কর্মশালা তাকে জানিয়ে দেয়—সে একা নয়, তার মতোই আরও অনেকে একই তাড়নায় লিখছে।
এই সম্প্রদায়-বোধের একটা বাস্তব ফলও আছে। কর্মশালার ভেতর দিয়ে অনেক সময় ছোট পত্রিকা জন্ম নেয়, প্রকাশনার সুযোগ তৈরি হয়, একজন আরেকজনের লেখা নিয়ে আলোচনা করে, অনুবাদ করে, অন্য ভাষার কবিতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এভাবে কর্মশালা কাব্যচর্চার একটা বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম তৈরি করে, যেখানে নতুন কণ্ঠস্বর বেড়ে ওঠার জন্য একটা ন্যূনতম পরিকাঠামো পায়। বিশেষ করে যাঁদের পরিবারে বা চারপাশে সাহিত্যচর্চার কোনো ঐতিহ্য নেই, তাঁদের কাছে কর্মশালা একটা প্রবেশদ্বার হয়ে ওঠে—যেখানে তাঁরা প্রথমবার জানতে পারেন কবিতা লেখার পেছনে একটা চিন্তার জগৎ আছে, একটা ঐতিহ্য আছে, একটা কারিগরি ভাষা আছে। এই অর্থে কর্মশালা কবিতাকে গণতান্ত্রিক করে তোলে—শুধু প্রতিভাবানদের সংরক্ষিত সম্পত্তি না রেখে, আগ্রহী যে কাউকে কবিতার কাছাকাছি আসার সুযোগ দেয়।
তবে এই বিস্তারের একটা ঝুঁকিও আছে। যখন কর্মশালা সংখ্যায় বাড়ে, তখন কবিতার উৎপাদনও বাড়ে, কিন্তু মানের নিশ্চয়তা বাড়ে না। প্রচুর কবিতা লেখা হচ্ছে মানেই প্রচুর ভালো কবিতা লেখা হচ্ছে, এমন নয়। কখনো কখনো কর্মশালা-সংস্কৃতি একধরনের আত্মপ্রতারণাও তৈরি করতে পারে—নিয়মিত কর্মশালায় যোগ দেওয়া, সার্টিফিকেট বা স্বীকৃতি পাওয়াকেই কবি হয়ে ওঠার প্রমাণ ভেবে নেওয়া। প্রকৃত কবিতা যে দীর্ঘ, অনিশ্চিত, প্রায়ই ব্যর্থতায় ভরা এক সাধনা—এই সত্যটা কর্মশালার আরামদায়ক কাঠামোর মধ্যে অনেক সময় ঢাকা পড়ে যায়। তাই বলা দরকার, কর্মশালা যেমন কাব্যজগতের বিস্তারে সহায়ক, তেমনি এই বিস্তারকে গভীরতার সঙ্গে মেলানোর দায়িত্বও শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি লেখকের নিজের। কবিতার কর্মশালা হচ্ছে প্রদীপের মতো। প্রদীপ নিজে আগুন তৈরি করে না, কিন্তু যে শিখা কোথাও একটুখানি জ্বলছিল, তাকে প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারে, বাতাসের ঝাপটা থেকে আড়াল করতে পারে, অন্য প্রদীপের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে আলোকে ছড়িয়ে দিতে পারে। কর্মশালা কাউকে কবি বানাতে পারে না, কারণ কবিত্ব কোনো ডিগ্রি নয়, কোনো সার্টিফিকেটও নয়—এটা একধরনের অন্তর্গত সত্য, যা লেখকের নিজের জীবন, পাঠ আর একাকী শ্রমে গড়ে ওঠে। কিন্তু যে আগুন ইতিমধ্যে জ্বলছে, তাকে কারিগরি দক্ষতা দিয়ে, শৃঙ্খলা দিয়ে, সমালোচনা গ্রহণ করার ক্ষমতা দিয়ে, আর সবচেয়ে বড় কথা—একটা সহমর্মী সম্প্রদায় দিয়ে ঘিরে রাখার কাজটা কর্মশালা চমৎকারভাবে করতে পারে।
আর কাব্যজগতের বিস্তারের প্রশ্নে, কর্মশালার ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। এটি নতুন কণ্ঠস্বরদের একত্র করছে, বিচ্ছিন্নতা ঘোচাচ্ছে, প্রকাশনার পথ খুলে দিচ্ছে এবং কবিতাকে অভিজাত সংরক্ষিত এলাকা থেকে বের করে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। এই বিস্তার মূল্যবান, কারণ কবিতার ভবিষ্যৎ কোথায় লুকিয়ে আছে, তা কেউ আগে থেকে বলতে পারে না—হয়তো হাজার কর্মশালা-শিক্ষার্থীর মধ্যে একজনই সত্যিকারের কবি হয়ে উঠবেন, কিন্তু সেই একজনকে খুঁজে পাওয়ার জন্যও হাজারজনের চর্চাটা প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত সত্যটা বোধ হয় এ রকম—কর্মশালা কবিতার সঙ্গী হতে পারে, কবিতার প্রতিস্থাপক নয়। যে তরুণ কর্মশালা থেকে ফিরে গিয়ে একা ঘরে বসে, নিজের ব্যর্থতা আর অপূর্ণতার মুখোমুখি হয়ে, তবু লিখে চলেন—কর্মশালা তাঁকে সেই একাকী লড়াইয়ের জন্য কিছুটা প্রস্তুত করে দিতে পারে, কিন্তু লড়াইটা তাঁকেই লড়তে হয়। কবি হয়ে ওঠা তাই শেষ পর্যন্ত কোনো শ্রেণিকক্ষের ঘটনা নয়; বরং একটা সারা জীবনের নিঃসঙ্গ যাত্রা, যেখানে কর্মশালা বড়জোর প্রথম কয়েক মাইলের পথপ্রদর্শক হতে পারে।
মুশকিল দিনকাল ধরেছি ভাঙা হাল ঢেউ তো উত্তাল আকাশ ঘোর
উত্তর দক্ষিণ ভুলেছি বহুদিন; ভ্রান্ত, দিকহীন বরাতজোর
ধরবার মাত্রই—আরে! সে গেল কই! আস্থাহীন নই, তবুও আজ
বিশ্বাস বদলায়, যেভাবে ভেঙে যায় অস্ত সন্ধ্যায় মেঘের সাজ
নক্ষত্রের রাত বাড়িয়ে দেবে হাত, সেই আলোকপাত কেমন দূর?
কোন পথ কোন দিক কে বলে দেবে ঠিক, উগ্র আস্তিক মুমুক্ষুর
ঈশ্বর কোন জন? তাকে যে প্রয়োজন,—নয় নিমজ্জন সুনিশ্চিত
ঝলসায় বিদ্যুৎ, আকাশে আলোদূত, আমরা প্রস্তুত…কোথায় জিত্?
[নিখোঁজ নাবিকের গান/মন্দাক্রান্তা সেন]