
হেরমান হেসে (১৮৭৭-১৯৬২) বিখ্যাত জার্মান-সুইস সাহিত্যিক ও ভাবুক। চিন্তাচেতনায় ভারতীয় দর্শন ও বৌদ্ধধর্ম দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। যদিও তাঁর পারিবারিক পটভূমি ছিল খ্রিষ্টধর্ম ও মিশনারি দ্বারা পরিব্যপ্ত। তরুণ বয়সে হেসে বিভিন্ন ধর্মতাত্ত্বিক লেখার সঙ্গে, গ্যেটে, লেসিং, শিলার, নিৎশে প্রমুখ ভাবুকদের রচনার সঙ্গে পরিচিত হন এবং গ্রিক পুরাণে ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। পূর্বপুরুষদের ভারতে মিশনারি কাজের সূত্রে হেরমান হেসে প্রথম ভারতীয় দর্শনের প্রতি আগ্রহী হন; অনুরাগী পাঠক ছিলেন উপনিষদ ও শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতারও। পরিণত বয়সে শোপেনহাওয়ার ও থিওসফির পাঠ তাঁকে বৌদ্ধদর্শনে পুনরুজ্জীবিত করে। এসব বিষয় ছাড়াও জীবনের একটি পর্যায়ে তিনি মানসিক সংকটের মুখোমুখি হন, যা তাঁর চিন্তাচেতনা ও লেখালেখিতে বিশেষ প্রভাব ফেলে। তাই শেষজীবন অবধি হেরমান হেসে মূলত আত্মজ্ঞান, আত্ম–অন্বেষণ, আধ্যাত্মিকতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও জীবনার্থ অনুসন্ধানে ব্যাপৃত ছিলেন। সিদ্ধার্থ (১৯২২) হেরমান হেসের বিখ্যাত উপন্যাস। এতে ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্য জীবনবোধের সংশ্লেষে আধ্যাত্মিক ও বস্তুজাগতিক উপায়ে জীবনসত্যের উপলব্ধির অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। অর্জিত প্রজ্ঞার সঙ্গে নিজ জীবনের টানাপোড়েন ও উপন্যাসের নায়ক সিদ্ধার্থের জীবনাভিজ্ঞতা হেরমান হেসের জীবনসত্যের ধ্রুবতারা ছিল।
প্রাচীনকাল থেকে জীবনের অর্থের প্রশ্নটি বিভিন্ন সংস্কৃতিতে দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের কেন্দ্রে অবস্থান করে আসছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর মানব-অস্তিত্বের এক ভয়াবহ সংকটকালে কবি, শিল্পী, দার্শনিক ও লেখকদের মধ্যে জীবনসত্যের অনুসন্ধান তীব্রতা পায় নানাভাবে। সাহিত্য-শিল্পে প্রযুক্ত হয় বিভিন্ন তত্ত্ব ও দার্শনিক জিজ্ঞাসা। হেরমান হেসে হাঁটলেন ভিন্ন এক পথে; তবে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে, নতুন উপায়ে। সেই পথ, প্রাচ্যের পথ। একটা চিঠিতে লিখেওছিলেন, ‘অনেক দিন আগে আমি বুঝেছি যে আধ্যাত্মিক দিক থেকে ইউরোপ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, প্রাচ্যের উৎসমূলে এবার ফেরা প্রয়োজন।’ তাই হেরমান হেসে তাঁর নায়ক সিদ্ধার্থের আধ্যাত্মিক যাত্রার মাধ্যমে জীবনের চিরন্তন প্রশ্নকে গভীর মননশীলতার সঙ্গে অন্বেষণ করলেন। ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য, বিশেষত বৌদ্ধধর্ম থেকে প্রেরণা নিয়ে রচিত উপন্যাসে কেবল প্রতিষ্ঠিত মতবাদগুলো পুনরাবৃত্তি হয়নি; বরং বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সেগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধও করেছে। ফলে সিদ্ধার্থের অনুসন্ধান কেবল মুক্তিলাভের পথ নয়; বরং দুঃখ, আকাঙ্ক্ষা ও অনিত্যতায় চিহ্নিত জগতে অর্থপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার তাৎপর্য নিয়ে সুগভীর জিজ্ঞাসাও তৈরি করে।
সিদ্ধার্থ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট, কাহিনি, চরিত্র ও সাধনা ভারতীয় কিংবা বৌদ্ধধর্মের আদর্শভিত্তিক হলেও হেরমান হেসে জীবনকে অনুসন্ধান করেছেন ইউরোপীয় চিন্তাচেতনার আলোকে। তাই তিনি খোলনলচে পাল্টে দিয়েছেন অনেক কিছুর। যেমন গৌতম বুদ্ধের অপর নাম সিদ্ধার্থ হলেও উপন্যাসে দুজনে ভিন্ন ও বিপরীত মতাদর্শের মানুষ। উপন্যাসে সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধের সময়ে ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণকারী এক যুবক। তাঁর আধ্যাত্মিক অভিযাত্রা ও দর্শনকে কেন্দ্র করে হেসের জীবনার্থ বা জীবনসত্যের অনুসন্ধান পরিচালিত হয়েছে। এই সিদ্ধার্থ বা তার মাধ্যমে প্রাপ্ত জীবনসত্য বৌদ্ধধর্মের কিছু নয়, বরং হেরমান হেসের চিন্তা ও উপলব্ধির স্বাধীন প্রকাশ। ব্যক্তিগত একটি রচনায় হেসে এ নিয়ে লিখেছেন, ‘সিদ্ধার্থ তার প্রেক্ষাপট সত্ত্বেও অতিমাত্রায় একটি ইউরোপীয় বই। এটি ভারতীয় চিন্তা থেকে আমার মুক্তির অভিব্যক্তি।’ অর্থাৎ জীবনসাধনা ও জীবনার্থ সন্ধানে বৌদ্ধদর্শন হেরমান হেসের চিন্তায় যে ছাপ ফেলেছিল, তা থেকে উত্তরণের পথ সন্ধান করেছিলেন স্বকীয় চিন্তা ও উপলব্ধিতে। যদিও এই পথের রেখা বৌদ্ধদর্শন থেকে প্রাপ্ত হয়েছিলেন। অবশ্য হেরমান হেসে নিজের জীবনার্থকে মূর্ত করে তুলতে বুদ্ধের বিপরীতে তৈরি করেছিলেন নতুন আরেক বুদ্ধকে। এই বুদ্ধের রূপে ছিল পাশ্চাত্যের আদল।
সংক্ষিপ্তভাবে উপন্যাসের কাহিনি হচ্ছে: ব্রাহ্মণপুত্র সিদ্ধার্থ প্রথাগত ধর্মীয় শিক্ষায় অসন্তুষ্ট হয়ে তার বন্ধু গোবিন্দকে সঙ্গে নিয়ে গভীরতর সত্যের অনুসন্ধানে একদিন গৃহত্যাগ করে। প্রথমে সে শ্রমণদের সঙ্গে যোগ দিয়ে অরণ্যে কঠোর তপস্যা ও সংযমের চর্চা চালায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত উপলব্ধি করে যে কেবল আত্মদমন দ্বারা সত্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। পরে তারা গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর উপদেশাবলি শোনে, বুদ্ধের কিছু চিন্তা নিয়ে কিঞ্চিৎ তর্ক হলেও বুদ্ধকে সিদ্ধার্থ ভালো না বেসে পারে না। তবে গোবিন্দ বুদ্ধের অনুসারী হয়ে গেলেও সিদ্ধার্থ নিজের পথেই এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ, সে বিশ্বাস করে প্রকৃত জ্ঞান শেখানো যায় না, তা নিজস্ব অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই অর্জন করতে হয়। এরপর সিদ্ধার্থ সংসারজীবনে প্রবেশ করে এবং কমলা নামের এক সুন্দরী নগরনটীর সঙ্গে প্রেমের পাঠ নেয়। কমলার পরামর্শে ধনিক কামস্বামীর সঙ্গে ব্যবসা করে ধনসম্পদ ও ভোগবিলাসেও জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে সিদ্ধার্থ আত্মিকভাবে রিক্ত ও হতাশ হয়ে পড়ে। নৈরাশ্যের চূড়ান্ত মুহূর্তে কমলা ও নিজের ঔরসজাত পুত্রসন্তানকে রেখে সিদ্ধার্থ সেই জীবন ত্যাগ করে জীর্ণ বস্ত্রে একটি নদীর তীরে পৌঁছায়, উদ্দেশ্য আত্মহত্যা। কিন্তু নদীর আধ্যাত্মিক ‘ওম’ ধ্বনি শুনে গভীর চিন্তার মাধ্যমে সে ধীরে ধীরে অন্তরের শান্তি ও আলোকপ্রাপ্তি লাভ করে এবং সমস্ত অস্তিত্বের ঐক্য উপলব্ধি করে। নদীঘাটে তার সঙ্গে বাসুদেব নামে এক মাঝির পরিচয় হয়। বৃদ্ধ মাঝির আমন্ত্রণে তার কুটিরে তারপর বাকি জীবন কাটিয়ে দেয় সিদ্ধার্থ। বুদ্ধদর্শনের যাত্রাপথে সর্পদংশনে কমলার মৃত্যু হয় নদীর পাশেই। এখানে কমলা ও নিজপুত্রের সঙ্গে মিলনও হয় সিদ্ধার্থের—সাময়িক সংসারের মায়ায় জড়িয়ে পড়লেও শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনসত্যেই অটল থাকে সে। কাহিনির শেষে গোবিন্দ আবার সিদ্ধার্থের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং সিদ্ধার্থের অর্জিত প্রজ্ঞাকে স্বীকার করে নেয়।
সিদ্ধার্থের প্রথম পথ তাকে গৌতম বুদ্ধের আদর্শে পরিচালিত শ্রমণদের তপস্যামূলক জীবনের দিকে নিয়ে যায়, যেখানে সে আত্মনিগ্রহ ও জাগতিক আসক্তি থেকে বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে মুক্তি খোঁজে। এই পর্যায়টি গৌতম বুদ্ধের প্রারম্ভিক জীবনের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যিনি চরম তপস্যার সীমাবদ্ধতা উপলব্ধির আগে তা অনুশীলন করেছিলেন। তবে সিদ্ধার্থের জন্য তপস্যা শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট প্রমাণিত হয় না। এটি তাকে সাময়িকভাবে ইন্দ্রিয়জ বাসনা অতিক্রম করতে সাহায্য করলেও অস্তিত্বের প্রশ্নের স্থায়ী সমাধান দেয় না।
উপন্যাসের এমন কাহিনি থেকে হেরমান হেসের জীবনার্থ উপলব্ধি ও অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া অনুধাবন সম্ভব। কাহিনির শুরুতে সিদ্ধার্থ তার যাপিত জীবন আদর্শায়িত বলে মনে করে। কারণ, ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেওয়ায় সে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রখরতা, নৈতিক শৃঙ্খলা ও ধর্মীয় শিক্ষায় সমৃদ্ধ। তবু এই সুবিধাজনক অবস্থানের মধ্যেও সিদ্ধার্থ গভীর অস্তিত্বগত অসন্তোষ অনুভব করে; মনের ভেতরে দানা বেঁধে ওঠে অতৃপ্তির বীজ। এই প্রাথমিক অস্থিরতা বৌদ্ধধর্মের একটি মৌলিক উপলব্ধিকে প্রতিফলিত করে—‘দুঃখ’ সম্পর্কে সচেতনতা ও জীবনের সর্বব্যাপী অপূর্ণতা। সিদ্ধার্থ উপলব্ধি করে যে আচারনির্ভর জ্ঞান ও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিশ্বাস তার অন্তরের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারে না। বিষয়টা এমন যে সবাই সিদ্ধার্থের অপেক্ষমাণ জাহাজে তুলে দিয়েছে তাদের জ্ঞানের ভান্ডার, কিন্তু জাহাজ পূর্ণ হয়নি, তাতে বুদ্ধির তৃপ্তি নেই, আত্মার শান্তি নেই, হৃদয়ের চাঞ্চল্য ঘোচেনি। ফলে তার গৃহত্যাগ জীবনের প্রকৃত অর্থের অনুসন্ধানে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে প্রতীকী হয়ে ওঠে। বিষয়টি পরোক্ষ জ্ঞান পরিত্যাগ করে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার দিকে অগ্রসর হওয়ার সংকেত দেয়। ব্রহ্মজ্ঞান অনুযায়ী নিজের গভীর সত্তার মধ্যেই তো সবকিছুর মূল কারণ বিদ্যমান—তাকে খুঁজতে হয়, আয়ত্ত করতে হয়।
সিদ্ধার্থের প্রথম পথ তাকে গৌতম বুদ্ধের আদর্শে পরিচালিত শ্রমণদের তপস্যামূলক জীবনের দিকে নিয়ে যায়, যেখানে সে আত্মনিগ্রহ ও জাগতিক আসক্তি থেকে বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে মুক্তি খোঁজে। এই পর্যায়টি গৌতম বুদ্ধের প্রারম্ভিক জীবনের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যিনি চরম তপস্যার সীমাবদ্ধতা উপলব্ধির আগে তা অনুশীলন করেছিলেন। তবে সিদ্ধার্থের জন্য তপস্যা শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট প্রমাণিত হয় না। এটি তাকে সাময়িকভাবে ইন্দ্রিয়জ বাসনা অতিক্রম করতে সাহায্য করলেও অস্তিত্বের প্রশ্নের স্থায়ী সমাধান দেয় না। মনে প্রশ্ন জাগে, এই কি ঠিক পথ? এই কি মোক্ষ লাভের জ্ঞান ও সাধনা? নাকি যে গোলকধাঁধা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সে গৃহত্যাগ করেছে, সে একই গোলকধাঁধায় আবর্তিত হচ্ছে মাত্র? সিদ্ধার্থের এ–ও মনে হয়, এই পথে সন্ন্যাসীদের কেউই নির্বাণ পাবে না। কারণ, এ ধরনের সাধনার পথে কিছু চাতুরী আছে, যা দিয়ে সাধকেরা নিজের সঙ্গেই প্রতারণা করছে। তাতে হয়তো ক্ষণিক সান্ত্বনা মেলে, কিন্তু আসল জিনিসের সন্ধান মেলে না। সিদ্ধার্থের এই উপলব্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক মোড় নির্দেশ করে—জীবনকে অস্বীকার করে নয়, বরং তাকে যাপন করে গভীরভাবে অনুধাবনের মাধ্যমেই অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়।
শাবস্তীপুরীর নিকটবর্তী জেতাবনে বুদ্ধের সঙ্গে সিদ্ধার্থের সাক্ষাৎ ছিল একদিকে মিলনের, অন্যদিকে চিরবিচ্ছেদের। সিদ্ধার্থ বুদ্ধের শান্তি ও প্রজ্ঞায় গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল এবং তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতার জীবন্ত প্রতিমূর্তি দেখতে পায়। সে চার আর্যসত্য ও অষ্টাঙ্গিক মার্গসহ বৌদ্ধশিক্ষার সত্যতা মেনেও নেয়। কিন্তু দুঃখ থেকে মুক্তির যে বুদ্ধনির্দেশিত পথ, তাতে সামান্য ফাঁক আবিষ্কার করে—এটা মানতে পারে না সিদ্ধার্থ। তাই বন্ধু গোবিন্দ শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেও বুদ্ধের অনুসারী হতে অস্বীকৃতি জানায় সে। তার এই সিদ্ধান্তের ভিত্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি—জীবনের অর্থ কোনো মতবাদ বা শিক্ষার মাধ্যমে স্থানান্তরিত করা যায় না, তা যত গভীরই হোক না কেন। সিদ্ধার্থের কাছে মুক্তিলাভ কোনো শেখার বিষয় নয়; বরং তা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জিত এক অস্তিত্বগত অবস্থা। কারণ, এত দিনে সিদ্ধার্থ জেনে গেছে, প্রত্যেক বস্তুর মূল সত্তায় এমন কিছু আছে, যাকে জানা অসম্ভব। আত্মার স্বরূপ জানা ও শেখার বিষয় নয়, অনুভবের বিষয়; আর এই অনুভূতির বড় শত্রু হচ্ছে পাণ্ডিত্য, ধর্মশিক্ষা ও উপদেশ।
গৌতমের শিক্ষা অনুযায়ী জগৎ একটি কার্যকারণের অনন্ত শৃঙ্খল। এই শৃঙ্খলের ধারাবাহিকতা সম্পূর্ণ, কোথাও ফাঁক নেই। জগতের সবকিছুর মধ্যে রয়েছে একটা ঐক্যবোধ। জীবন, মৃত্যু, ছোট, বড়— প্রতিটি ঘটনা নিয়ে প্রবহমান নদীর মতো বয়ে চলেছে জগৎ। কোনো কিছুরই পৃথক সত্তা নেই, সব এক ও অভিন্ন। এই বাণী মেনে নিলেও সিদ্ধার্থের কাছে মনে হয়, জগতের এই অখণ্ডতার আদর্শ ব্যাহত হয়েছে একটা জায়গায়। সেটা হচ্ছে বৌদ্ধবাদের সংসারের ঊর্ধ্বে উঠবার ও নির্বাণ লাভ করার মতো বিষয়টি। জগতের অখণ্ডতার তত্ত্বে তাহলে তা ফাটল হিসেবে দেখা দেয়। বিচ্ছেদের আগে এ নিয়ে গৌতমের সঙ্গে কথাও হয় সিদ্ধার্থের। জবাবে গৌতম একে মতমাত্র বিবেচনা না করে মুক্তি পাওয়ার দিশা হিসেবে ভাবতে উপদেশ দেন। অন্যদিকে সিদ্ধার্থ মনে করে, স্বোপার্জিত জ্ঞানের আলোকে নিজের পথেই গৌতম বুদ্ধত্ব অর্জন করেছেন, শাস্ত্রবিধি কিংবা উপদেশের শিক্ষা থেকে নয়। সুতরাং অপরের উপদেশের সাহায্যে কেউ মোক্ষ পেতে পারে না। তাই সব গুরু ও তাদের শিক্ষা ত্যাগ করে সিদ্ধার্থের নতুন যাত্রা নিজের পথে একাকী। সিদ্ধার্থ নিজের জীবনের বিচার নিজে করতে চায়। এ ছাড়া পথ গ্রহণ ও বর্জন করার অধিকার তো মানুষের আছে।
বুদ্ধের মতো মহাত্মা, জ্ঞানীশ্রেষ্ঠ ও পুণ্যাত্মাকে সিদ্ধার্থ গুরু স্বীকার করতে পারেনি, গ্রহণ করতে পারেনি তাঁর উপদেশ। অথচ সে কিনা চেয়েছিল অহংকে জানতে; মুক্তি চেয়েছিল অহং থেকে; কিন্তু তা হয়নি। নিজেকে না জানা বা কম জানার কারণও খুঁজে পেল সিদ্ধার্থ। এত দিন ধরে সে শুধু খুঁজেছে আত্মাকে, ব্রহ্মকে; আত্মা, জীবন, পরমব্রহ্ম ও অপরিজ্ঞাত মূলাধারকে খুঁজতে গিয়ে নিজেকে করেছে ক্ষয় তিলে তিলে—অগ্রাহ্য করেছে নিজের অস্তিত্বকে। এসব করতে গিয়ে পথের মাঝখানে নিজেকে হারিয়েও ফেলেছে। তাই আজ সে পথ নয়, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে সিদ্ধার্থ শিক্ষা নিতে চায় জীবনের-সত্যের। একটা জাগরণ হয় সিদ্ধার্থের মধ্যে। বহুদিন থেকে সে জানে, তার অন্তরবাসী আত্মা শাশ্বত ব্রহ্মের অংশ, কিন্তু নিজের সত্তাকে সে কোনো দিন প্রকৃতভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি, দার্শনিক তত্ত্বের জটিল জালে আত্মাকে ক্ষুধার্ত করে রেখেছিল। এখন মনে হলো, অনুভূতি দমন করে শুধু তত্ত্বচিন্তা ও পাণ্ডিত্য দিয়ে সিদ্ধি লাভ হবে না। সিদ্ধির জন্য অনুভূতি ও ধ্যান দুই–ই প্রয়োজন—উভয়ের দাবিই মেটাতে হবে। সিদ্ধার্থ এখন থেকে তাই আত্মার আজ্ঞা পালন করবে।
সিদ্ধার্থ প্রতিদিন পরখ করে নদীকে, নদীর ভাষা বোঝে, নদী থেকে শিক্ষা নেয়। বাসুদেবের মাধ্যমে নদী সম্পর্কে জেনেছে—নদী সর্বত্র আছে—উৎপত্তিস্থলে, মোহনায়, জলপ্রপাতে, খেয়াঘাটে, স্রোতোধারায়, সমুদ্রে, পর্বতে এবং সর্বত্র। নদীর কাছে একমাত্র বর্তমানই সত্য, অতীত বা ভবিষ্যতের ছায়া নেই তার মধ্যে। এটি জানার পর সিদ্ধার্থ নিজের জীবন পর্যালোচনা করে দেখে, তার জীবনও নদীর মতো।
অর্থাৎ বুদ্ধকে ত্যাগ করার পর সিদ্ধার্থ ইন্দ্রিয়সুখ ও বস্তুগত সাফল্যের জগতে নিমজ্জিত হয়। কমলার সঙ্গে সম্পর্ক এবং কামস্বামীর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা তাকে প্রেম, সম্পদ ও ক্ষমতার অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত করে। কমলা সিদ্ধার্থকে শিখিয়েছে প্রেমের কলা; দান-প্রতিদান যে প্রেমে এক হয়ে মিশে যায়, সেই প্রেমের বিদ্যা। কামস্বামী শিখিয়েছে কীভাবে অর্থের কুম্ভীর হয়ে সম্পদ ও ক্ষমতা ভোগ করা যায়। এ পর্যায়টি বৌদ্ধধর্মে ‘তৃষ্ণা’ ধারণাকে প্রতিফলিত করে, যা মানুষকে দুঃখের চক্রে আবদ্ধ রাখে। জাগতিক জীবনে নিমগ্নতা প্রথমে অর্থবহ বলে মনে হলেও শেষ পর্যন্ত তা আধ্যাত্মিক শূন্যতা ও মোহভঙ্গের দিকে নিয়ে যায়। একদিন কমলা আবিষ্কার করে, প্রেমিক হলেও সিদ্ধার্থ অন্তরে শ্রমণই রয়ে গেছে। কমলার কাছে সে কামবিদ্যা অর্জন করেছে, ভালোবাসেনি। সিদ্ধার্থও বুঝতে পারল, কমলাও কাউকে ভালোবাসে না, তাহলে প্রেমকে কলা হিসেবে কীভাবে অভ্যাস করা সম্ভব? মোহভঙ্গের সূত্রপাত এখানেই। সম্পত্তি সঞ্চয়ের তৃষ্ণার নিবৃত্তিও ঘটল ক্রমশ। মোহের খেলা শেষ হলে একে একে বিদায় নিল গৃহ, শয্যা ও খাদ্য—রিক্ততা গ্রাস করে সিদ্ধার্থকে। সিদ্ধার্থের ক্রমবর্ধমান হতাশা প্রমাণ করে যে তপস্যামূলক ত্যাগ কিংবা ভোগবাদ কোনোটিই এককভাবে জীবনের উদ্দেশ্যের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারে না।
সংকট যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে, যখন সিদ্ধার্থ জীবনের অর্থহীনতায় বিপর্যস্ত হয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু মৃত্যুর অভিমুখে ঝুঁকে পড়ার মুহূর্তে সে পবিত্র ধ্বনি ‘ওম’ শুনতে পায়, যা তাকে জীবনের নতুন উপলব্ধির দিকে জাগিয়ে তোলে। সিদ্ধার্থ নিজেও ‘ওম’ উচ্চারণ করে আর ঘুমিয়ে পড়ে নদীপাড়ে। যখন জাগে দেখতে পায় বন্ধু গোবিন্দকে। তখনো দুজনের মত ভিন্ন, পথও ভিন্ন। গোবিন্দ বিদায় নিলে সিদ্ধার্থ নিজের মধ্যে সাধারণ এক মানুষকে আবিষ্কার করল। শ্রমণ হিসেবে একদা যে তিনটি মহৎ গুণ অর্জন করেছিল, তার একটাও অবশিষ্ট নেই—উপবাস, প্রতীক্ষা ও চিন্তা করার ক্ষমতা। আর এই তিনটি গুণ বিকিয়ে দিয়েছে সে তুচ্ছ ও ক্ষণস্থায়ী জিনিসের বিনিময়ে—লালসা, অর্থ ও ভোগবিলাসে মোহে। এগুলোই সিদ্ধার্থকে বুদ্ধিহারা করেছিল, ভুলিয়ে দিয়েছিল বুদ্ধের বাণী—বৈচিত্র্যের অন্তরালে ঐক্যবোধ। কিন্তু ‘ওম’ ধ্বনিতে জাগৃতি হলো আবার সিদ্ধার্থের। মনে হলো নিজ জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জীবনের সত্যতা উপলব্ধি করতে পেরেছে।
নদী—সুপ্রসন্ন নদীর তীরেই একদিকে তার সত্তার মৃত্যু হয়েছে, অন্যদিকে সিদ্ধার্থকে বাঁচিয়েও তুলেছে। অর্থাৎ তার মৃত্যু হয়েছে, নিদ্রার পরে জেগে উঠেছে আরেক সিদ্ধার্থ। নবাগত বোধ থেকে সে উপলব্ধি করতে পারল অতীতের ভুলগুলো। ব্রাহ্মণ অথবা শ্রমণ অবস্থায় সে ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে সংগ্রাম করে জয়ী হতে পারেনি। কারণ, তাতে একদিকে অন্তরায় ছিল মন্ত্র ও যাগযজ্ঞ, অন্যদিকে দেহের পীড়ন ও মাত্রাহীন কঠোর পরিশ্রম। তার অহং আশ্রয় নিয়েছিল দম্ভ, পৌরোহিত্য ও বুদ্ধির অহংকারের মধ্যে। সিদ্ধার্থ যখন উপবাস ও প্রায়শ্চিত্ত দ্বারা অহংকে ধ্বংস করেছে বলে ভাবত, তখন অহং তার দম্ভ ও বুদ্ধিমান্যতা আশ্রয় করে শক্তিশালী হয়ে উঠত। এখন বুঝতে পরছে, তার নিজের অন্তরের নির্দেশই সত্য। কোনো গুরুই তাকে মুক্তি এনে দিতে পারত না। এ জন্য তাকে যেতে হয়েছিল সংসারজীবনে—কাম, অর্থ ও ক্ষমতার কাছে। তার মধ্যকার পুরোহিত ও শ্রমণসত্তা যত দিন না নিঃশেষ হয়েছিল, তত দিন তাকে এসবে ভুলে থাকতে হয়েছে। সেসব দিনের বিবমিষার যাতনা, ব্যর্থ ও রিক্ত জীবনের উন্মাদনা থেকে সে শিক্ষা পেয়েছে। সুতরাং লালসালিপ্ত, ধনী ও ভোগী সিদ্ধার্থের মৃত্যুর এই অভিজ্ঞতার দরকার ছিল। সিদ্ধার্থের নবজাগ্রত অন্তর থেকে ডাক পেল, ‘নদীকে ভালোবাসো, এর কাছে থেকো; নদী থেকে শিক্ষা লাভ করো।’ সিদ্ধার্থ তাই এখানেই থেকে গেল, খেয়াঘাটের মাঝি হয়ে বাকি জীবন।
সিদ্ধার্থ প্রতিদিন পরখ করে নদীকে, নদীর ভাষা বোঝে, নদী থেকে শিক্ষা নেয়। বাসুদেবের মাধ্যমে নদী সম্পর্কে জেনেছে—নদী সর্বত্র আছে—উৎপত্তিস্থলে, মোহনায়, জলপ্রপাতে, খেয়াঘাটে, স্রোতোধারায়, সমুদ্রে, পর্বতে এবং সর্বত্র। নদীর কাছে একমাত্র বর্তমানই সত্য, অতীত বা ভবিষ্যতের ছায়া নেই তার মধ্যে। এটি জানার পর সিদ্ধার্থ নিজের জীবন পর্যালোচনা করে দেখে, তার জীবনও নদীর মতো। বালক, পরিণত, বয়স্ক ও বৃদ্ধ সিদ্ধার্থে আদতে কোনো ফারাক নেই—সবাই একসূত্রে গাঁথা। সিদ্ধার্থের পূর্বজীবন অতীতে হারিয়ে যায়নি, তার মৃত্যু ও ব্রহ্মের সঙ্গে মিলনও ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করছে না। কিছুই অতীত হয়ে যায়নি, ভবিষ্যতের জন্যও কিছু অপেক্ষা করে নেই। সবকিছুর অস্তিত্ব এই বর্তমানে। একদিন বর্ষায় নদীর গর্জনে সিদ্ধার্থ শুনতে পেল বহু কণ্ঠের মিলিত ধ্বনি—নদীর স্বরের মধ্যে রাজা, যোদ্ধা, পশু, পাখি, শোকার্ত মানুষ সবার ধ্বনি মিলেমিশে আছে। আর নদীর লক্ষ লক্ষ স্বর একসঙ্গে উচ্চারিত হলে যে শব্দটি বেরিয়ে আসে, তা হচ্ছে ‘ওম’। শব্দটি শুনতেও পায় সিদ্ধার্থ, অস্তিত্বজুড়ে।
শুধু কি স্বর? নদীতে কত ছবি দেখতে পায় সিদ্ধার্থ। প্রবহমান ধারায় দেখতে পায় নিজের পুত্রশোকে কাতর নিঃসঙ্গ পিতাকে, বিবর্ণ চেহারার নিজেকে, জীবনের কামনাতপ্ত পথে ব্যগ্র পুত্রকে, কমলাকে, গোবিন্দকে আরও কত লোকের ছবি, যারা প্রত্যেকে নদীর অংশ হয়ে গেছে। সিদ্ধার্থ উপলব্ধি করে এই চির প্রবহমান নদী তাকে দিয়ে, তার আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত ব্যক্তিদের দিয়ে তৈরি। আর নদীর প্রতিটি ঢেউ, প্রতিটি জলকণা দুঃখময় দীর্ঘপথ অতিক্রম করে ছুটে চলেছে লক্ষ্যের দিকে। উপন্যাসে নদীকে একটি শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে উপস্থিত করেছেন হেসে—অস্তিত্বের ঐক্য ও ধারাবাহিকতার প্রতীক। সিদ্ধার্থ নদী থেকে উপলব্ধি করে—জীবন কোনো সরলরৈখিক অগ্রগতি নয়, বরং এক চিরন্তন সমগ্র, যেখানে সব অভিজ্ঞতা আন্তসংযুক্ত। এই উপলব্ধি বৌদ্ধধর্মের ‘অনিত্যতা’ এবং পারস্পরিক নির্ভরতার ধারণার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। তবে সিদ্ধার্থের উপলব্ধি মতবাদগত সীমা অতিক্রম করে স্থিত হয়েছে। সে বুঝতে পারে যে আনন্দ ও দুঃখ, সাফল্য ও ব্যর্থতা, জীবন ও মৃত্যু—সবই একটি বৃহত্তর ঐক্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে জীবনের অর্থ জগৎ থেকে পালিয়ে যাওয়া কিংবা তাতে আসক্ত হয়ে পড়ার মধ্যে নয়; বরং বোঝাপড়া ও সহমর্মিতার সঙ্গে সমগ্র অস্তিত্বকে গ্রহণ করার মধ্যেই নিহিত।
সিদ্ধার্থ উপন্যাসে হেরমান হেসে বৌদ্ধদর্শনের অনুষঙ্গে জীবনার্থের এক সূক্ষ্ম ও গভীর অনুসন্ধান করেছেন। যদিও এই অনুসন্ধান দুঃখ, অনিত্যতা ও মুক্তিলাভের মতো বৌদ্ধ ধারণা দ্বারা প্রভাবিত, তবু শেষ পর্যন্ত তা মতবাদ অনুসরণের চেয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির প্রাধান্য দিয়ে জীবনের অর্থ নির্ধারণ করেছে। এমনকি হেসে বুদ্ধের সঙ্গে সিদ্ধার্থের সংলাপে বৌদ্ধদর্শনকে নস্যাৎ করেও দিয়েছেন। নিজের চিন্তার পদ্ধতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে আশ্রয় নিয়েছেন ভারতীয় অপরাপর দর্শনধারার সঙ্গে পাশ্চাত্য ধারার বিভিন্ন দর্শনচিন্তাও।
উপন্যাসের শেষে সিদ্ধার্থকে তার যাত্রার অন্তিম পর্যায়ে গভীর আত্মিক শান্তি লাভ করতে দেখা যায়। শৈশবের বন্ধু গোবিন্দের সঙ্গে তার পুনর্মিলন ও সংলাপ তার দার্শনিক অনুসন্ধানের পরিণতি নির্দেশ করে। সিদ্ধার্থের উপলব্ধিতে যে জগতে আমরা বাস করি তা খণ্ডিত নয়। কোনো লোক বা কোনো কাজই সম্পূর্ণভাবে সংসার বা নির্বাণ নয়, সম্পূর্ণরূপে সাধু কিংবা পাপী কেউ নয়। ভবিষ্যতের বুদ্ধ আছেন আজকের পাপীর অন্তরে; তার ভবিষ্যৎ আছে বর্তমানের অন্তরে। পাপীর মধ্যে, সবার মধ্যে ভবিষ্যতের বুদ্ধকে চিনে নিতে হয়। এই সৃষ্টি অসম্পূর্ণ নয়, প্রতিমুহূর্তেই জগৎ পূর্ণ। প্রতিটি পাপের সঙ্গে আছে ঈশ্বরের কৃপা, প্রত্যেক বালকের মধ্যে আছে ভবিষ্যতের বৃদ্ধ, প্রত্যেক দুগ্ধপোষ্য শিশুর মধ্যে আছে মৃত্যুর বীজ, প্রত্যেক মুমূর্ষুর মধ্যে আছে অনন্ত জীবনের ইঙ্গিত। বুদ্ধ আছেন দস্যুর মধ্যে, জুয়াড়ির অন্তরে; আবার দস্যুর দেখা পাওয়া যায় ব্রাহ্মণের মধ্যে। গভীর ধ্যানের সময় কালের ব্যবধান দূর করা সম্ভব হয়; যুগপৎ দেখা যায় সমগ্র অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের অখণ্ডিত রূপ। তখন উপলব্ধি করা যায় জগতের সবকিছু মঙ্গলময়, ব্রহ্মময় ও পরিপূর্ণ। সুতরাং জগতের সবকিছুই শুভ—জীবন ও মৃত্যু, পাপ ও পুণ্য, জ্ঞান ও নির্বুদ্ধিতা—সবই ভালো। এসবের প্রতিটিরই প্রয়োজন আছে মানুষের জীবনে। এদের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হয় নিজেকে, স্বীকার করে নিতে হয়। জগতের ভালো–মন্দ—সবকিছু সহানুভূতির চোখে দেখতে হয়। তাহলে জীবনের পথ সহজ হয়, কিছুই ক্ষতি করতে পারে না তখন। দেহ দিয়ে, আত্মার ব্যাকুলতা দিয়ে উপলব্ধি করতে হয়—পাপেরও প্রয়োজন আছে জীবনে। কামের, সম্পত্তি সঞ্চয়ের ও সংসারের ওপর বিতৃষ্ণারও প্রয়োজন। এসব অভিজ্ঞতা লাভ না করলে মশগুল হতে হয় কোনো এক ত্রুটিহীন কাল্পনিক জগতের স্বপ্ন নিয়ে। জীবনের এই ভালো–মন্দ—সব পথ অতিক্রম করে এসেছে বলে সিদ্ধার্থ সংসারকে ভালোবাসতে পেরেছে বলে মনে করে; সংসারের একজন হয়ে সুখও অনুভব করেছে। এ-ই সিদ্ধাথের্র জীবনার্থ-জীবনসত্য। গোবিন্দ একসময় সিদ্ধার্থের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে চায়, কিন্তু সিদ্ধার্থ কোনো আনুষ্ঠানিক মতবাদ প্রদান করে না। বরং একটি নীরব অথচ রূপান্তরমূলক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তার কপালে একটি চুম্বন এঁকে উত্তর দেয়। এই মুহূর্তটি হেসের মূল উপলব্ধিকে ধারণ করে—জীবনের অর্থ ভাষায় সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করা যায় না বা মতবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। এটি সরাসরি অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই উপলব্ধি করতে হয়।
সিদ্ধার্থ উপন্যাসে হেরমান হেসে বৌদ্ধদর্শনের অনুষঙ্গে জীবনার্থের এক সূক্ষ্ম ও গভীর অনুসন্ধান করেছেন। যদিও এই অনুসন্ধান দুঃখ, অনিত্যতা ও মুক্তিলাভের মতো বৌদ্ধ ধারণা দ্বারা প্রভাবিত, তবু শেষ পর্যন্ত তা মতবাদ অনুসরণের চেয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির প্রাধান্য দিয়ে জীবনের অর্থ নির্ধারণ করেছে। এমনকি হেসে বুদ্ধের সঙ্গে সিদ্ধার্থের সংলাপে বৌদ্ধদর্শনকে নস্যাৎ করেও দিয়েছেন। নিজের চিন্তার পদ্ধতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে আশ্রয় নিয়েছেন ভারতীয় অপরাপর দর্শনধারার সঙ্গে পাশ্চাত্য ধারার বিভিন্ন দর্শনচিন্তাও। কাহিনির বিভিন্ন সূত্রে এসেছে উপনিষদের জ্ঞান। কমলা-সিদ্ধার্থের প্রেমের পাঠ কামসূত্র দ্বারা অনুপ্রাণিত। সিদ্ধার্থের জীবনোপলব্ধিতে এসেছে গীতার বিশ্বরূপ দর্শনের বিষয়টিও। অন্যদিকে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সত্য–সন্ধানের বিষয়টি অস্তিত্ববাদের ‘সাবজেক্টিভ ট্রুথে’র সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এরূপ চিন্তায় কিয়ের্কেগার্ডের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। এ ছাড়া হেসের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের একত্রে বিদ্যমানতা কিংবা ব্যক্তি ও জগৎসত্তার অভিন্নতার উপলব্ধি অস্তিত্ববাদকে অতিক্রম করে আধ্যাত্মিক অস্তিত্ববাদী ধারণারও জন্ম দেয়, যা হাইডেগারের ‘বিয়িং’ ধারণার সঙ্গে যুক্ত। সত্তার রূপান্তরের প্রশ্নে হেনরি বার্গসনের ‘ক্রিয়েটিভ ইভাল্যুশন’ তত্ত্বের চিন্তাও সিদ্ধার্থের মধ্যে প্রতিফলিত। বৌদ্ধবাদের পটভূমিতে পশ্চিমা চিন্তার এমন প্রয়োগের জন্যই হেরমান হেসে একে ‘ভারতীয় চিন্তা থেকে মুক্তি’র বিষয়টি উল্লেখ করে থাকবেন। জীবনের অর্থ পূর্বনির্ধারিত নয়; মানুষকেই তা সৃষ্টি করতে হয়—এমন পশ্চিমা চিন্তা থেকে সিদ্ধার্থের যাত্রা দেখায় যে জীবনের অর্থ কোনো স্থির উত্তর নয়; বরং এটি এক গতিশীল উপলব্ধি, যা বেঁচে থাকা, প্রশ্ন তোলা ও অনুধাবনের মধ্য দিয়ে ক্রমে উদ্ভাসিত হয়। সিদ্ধার্থ তাই জীবনের অর্থ খোঁজে না, বরং তা নিজেই নির্মাণ করে। আধুনিক মানুষের জীবনার্থ ও সত্য-সন্ধানে হেরমার হেসের এমন প্রচেষ্টার প্রাসঙ্গিকতাকে স্বীকার করে হেনরি মিলার লিখেছিলেন, ‘সাধারণভাবে পরিজ্ঞাত বুদ্ধকে অতিক্রম করে এখানে সৃষ্টি করা হয়েছে নতুন এক বুদ্ধ এবং এই সফলতা অভূতপূর্ব।’