হেলাল হাফিজের (৭ অক্টোবর ১৯৪৮—১৩ ডিসেম্বর ২০২৪) আলোকচিত্র অবলম্বনে গ্রাফিকস প্রথম আলো
হেলাল হাফিজের (৭ অক্টোবর ১৯৪৮—১৩ ডিসেম্বর ২০২৪) আলোকচিত্র অবলম্বনে গ্রাফিকস প্রথম আলো

জন্মদিনে স্মরণ

হেলাল হাফিজ: আগুন, প্রেম ও বেদনার কবি

সেলফোনে এখনো সেই নম্বরটি সংরক্ষিত ০১৫৫.…৯৮৯। নামের পাশে কাঠের পুঁতির মালা গলায় সৌমকান্তি সেই মুখ। মনে হয় এই ফোন বেজে উঠবে, দূর থেকে ভেসে আসবে মধুর এক কণ্ঠ—‘কেমন আছ প্রিয়’। সেই ফোন আর আসে না। হাওরের জলে ভেজা সেই কণ্ঠস্বর কত দিন শুনি না ভেসে আসা ইথারে বা মুখোমুখি বসে। কেউ জানায় না সেই ‘বাসনা’—‘আগামী, তোমার হাতে/ আমার কবিতা যেন/ থাকে দুধে-ভাতে।’

কবি হেলাল হাফিজ—তাঁকে চিনতে হলে শুধু তাঁর কবিতার কাছে গেলেই হয় না; যেতে হয় তাঁর নীরবতা, দীর্ঘ বিরতি, নিঃসঙ্গতা, তুমুল যৌবন, আড্ডা, অভিমান, প্রেম, আত্মপীড়ন এবং জীবনের প্রতি অদ্ভুত নির্মোহ দৃষ্টির কাছেও। কারণ, জীবন মন্থন করে যে বিষে তিনি হয়েছিলেন নীলকণ্ঠ; সেই জীবনের পরিশ্রুত, সংক্ষিপ্ত ও নান্দনিক প্রকাশই তাঁর কবিতা। যাকে বলতে পারি জীবনের দহন থেকে উঠে আসা প্রদীপ্ত শব্দমালা।

বাংলা কবিতায় জনপ্রিয়তা অনেক কবিরই আছে। কিন্তু খুব অল্প কয়েকজন কবিই এমন জায়গায় পৌঁছেছেন, যেখানে কবিতার পঙ্‌ক্তি বইয়ের পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, প্রেম, বিরহ, রাজনৈতিক চেতনা ও প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে। হেলাল হাফিজ তাঁদের অন্যতম। তাঁর কবিতা কেউ বালিশের নিচে রেখে ঘুমিয়েছে, কেউ মিছিলে উচ্চারণ করেছে, কেউ বিচ্ছেদের রাতে প্রিয়জনকে পাঠিয়েছে, আবার কেউ নিজের অপ্রাপ্তির মুখ খুঁজে পেয়েছে তাঁর কোনো একটি পঙ্‌ক্তিতে। কবিতার এই জনজীবনে প্রবেশই তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন।

হেলাল হাফিজের মৌলিক কাব্যগ্রন্থ মাত্র দুটি—‘যে জলে আগুন জ্বলে’ এবং ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’। প্রথমটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে; দ্বিতীয়টি আসে দীর্ঘ ৩৪ বছরের বিরতির পর—২০১৯ সালে। এত দীর্ঘ কাব্যজীবনে মাত্র দুটি মৌলিক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেও যে বিপুল পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করা সম্ভব, হেলাল হাফিজ তার এক বিরল দৃষ্টান্ত। দ্বিতীয় বই প্রকাশের আগে প্রায় দুই শ কবিতা থেকে মাত্র ৩৪টি কবিতা বেছে নেওয়ার কথাও তিনি নিজেই বলেছিলেন।

তবে সংখ্যার বিচারে হেলাল হাফিজকে বোঝা যাবে না। তাঁকে বুঝতে হবে তাঁর কবিতার অভিঘাতের বিচারে। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ প্রকাশের পর বাংলা কবিতার পাঠক খুঁজে পায় একটি স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। সেখানে প্রেম আছে, কিন্তু তা নিছক রোমান্টিক প্রেম নয়; দ্রোহ আছে, তা–ও কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়; ব্যক্তিগত বেদনা আছে, যা ব্যক্তিগত ঘেরাটোপে আটকে থাকে না। তাঁর কবিতায় প্রেম ও দ্রোহ পরস্পরের বিপরীত নয়, বরং একই মানবিক বোধের দুই প্রকাশ। কবি নিজেও পরে বলেছেন—তাঁর কাছে দ্রোহ ও প্রেম একই মালার দুটি ফুল। প্রেমিক না হলে বিপ্লবী হওয়া যায় না, আবার প্রকৃত বিপ্লবীর ভেতরেও প্রেমিক সত্তা জেগে থাকে। হেলাল হাফিজের কাব্যসত্তার এই জায়গাটিই বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি রাজপথের উত্তাপ আর হৃদয়ের গোপন কাঁপনকে একই কবিতার শরীরে ধারণ করতে পেরেছেন।

‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’-এর সেই উচ্চারণ ‘এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’—শুধু একটি রাজনৈতিক সময়ের আহ্বান হয়ে থাকেনি; তা হয়ে উঠেছিল একটি প্রজন্মের আত্মপরিচয়ের অংশ। উনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থানের উত্তাল বাস্তবতা থেকে জন্ম নেওয়া এই কবিতা পরবর্তী সময়ে স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ হয়ে আমাদের যেকোনো রাজনৈতিক সংগ্রাম ও তারুণ্যের প্রতিবাদী চেতনার সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে।

হেলাল হাফিজের মৌলিক কাব্যগ্রন্থ মাত্র দুটি—‘যে জলে আগুন জ্বলে’ এবং ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’। প্রথমটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে; দ্বিতীয়টি আসে দীর্ঘ ৩৪ বছরের বিরতির পর—২০১৯  সালে। এত দীর্ঘ কাব্যজীবনে মাত্র দুটি মৌলিক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেও যে বিপুল পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করা সম্ভব, হেলাল হাফিজ তার এক বিরল দৃষ্টান্ত।

অথচ যে কবি যৌবনকে মিছিলে ও যুদ্ধে যাওয়ার আহ্বান জানালেন, প্রেমের কাছে এসে সেই তিনিই সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। তখন তাঁর কবিতায় রাজপথের শোরগোল স্তব্ধ হয়ে যায়; সেখানে প্রতিস্থাপিত কোনো নারীমুখ, একটি চিঠির অপেক্ষা, একটি বিকেলের স্মৃতি কিংবা দীর্ঘ বিচ্ছেদের নিঃশব্দ হাহাকার।

হেলেন সেই স্মৃতির কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাই হেলেনকে বাদ দিয়ে হেলাল হাফিজের প্রেমের কবিতা বোঝা কঠিন। আবার এই হেলেনকে শুধু একজন নারী হিসেবে দেখলেও কবিকে ভুল বোঝা হবে। হেলেনে এসে কখনো সবিতা মিস্ট্রেস, কখনোবা তনা এসে মিশেছে ব্রহ্মপুত্রপারে। তখন এই নারীমুখগুলো তাঁর কবিতায় রক্ত-মাংসের মানুষ থেকে প্রেম, অপ্রাপ্তি, বিচ্ছেদ ও সৌন্দর্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। কবি নিজেই জানিয়েছেন, ‘ব্রহ্মপুত্রের মেয়ে’ কবিতাটি একজনকে ভেবে লেখা হলেও কবিতাটির বিস্তার এমন যে তা ব্রহ্মপুত্রপারের যেকোনো মেয়ের জন্যই প্রযোজ্য হয়ে উঠতে পারে। এখানেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অতিক্রম করে হেলাল হাফিজের কবিতা সর্বজনীন হয়ে ওঠে। কবির প্রেমের কবিতার শক্তি সম্ভবত এই জায়গাতেই। তিনি নিজের প্রেমের কথা লিখেছেন, কিন্তু পাঠক সেখানে নিজের প্রেম খুঁজে পেয়েছে। তিনি নিজের বিচ্ছেদের কথা বলেছেন, কিন্তু পাঠকের হারানো মানুষটির মুখ সেখানে ফুটে উঠেছে। তাঁর ব্যক্তিগত বেদনা ধীরে ধীরে পাঠকের নিজস্ব বেদনায় রূপ নিয়েছে।

‘ভালোবাসা মিলনে মলিন হয়, বিরহে উজ্জ্বল’—এ ধরনের উচ্চারণের ভেতরেই তাঁর প্রেমভাবনার স্বাতন্ত্র্য ধরা পড়ে। প্রেমকে তিনি শুধু অর্জনের মধ্যে দেখেননি; হারানোর মধ্যেও তার সৌন্দর্য আবিষ্কার করেছেন। তাঁর কাছে বিচ্ছেদ প্রেমের ব্যর্থতা নয়, প্রেমেরই অন্য এক পরিণতি। ‘ব্রহ্মপুত্রের মেয়ে’ কবিতার অন্তর্গত দর্শনেও সেই বিশ্বাস–শারীরিক মিলন না ঘটলেও প্রেমের পূর্ণতায় ঘাটতি থাকে না।

হেলাল হাফিজ (৭ অক্টোবর ১৯৪৮—১৩ ডিসেম্বর ২০২৪)

এই বোধের পেছনে অবশ্যই কাজ করেছে কবির নিজের জীবনের গভীর ক্ষত। মাত্র তিন বছর বয়সে মাকে হারানো, বাবার মধ্যে একই সঙ্গে মা ও বাবাকে খুঁজে পাওয়া, শৈশবের স্নেহবঞ্চনা, কৈশোরের প্রেম, যৌবনের বিচ্ছেদ, বাবার মৃত্যু, আত্মহননের কিনারায় গিয়ে ফিরে আসা—এসব অভিজ্ঞতা তাঁর ভেতরের মানুষটিকে নির্মাণ করেছে। তাঁর কবিতার বেদনা তাই সাজানো কোনো অলংকার নয়; তা তাঁর জীবন থেকে উঠে এসেছে। ‘স্রোতস্বিনী ভালোবাসা’ কবিতার পেছনেও রয়েছে বাবা-মায়ের ভালোবাসা এবং প্রথম প্রেম হারানোর গভীর আঘাত।

তাই হেলাল হাফিজের কবিতায় বেদনা কখনো নিছক কান্না নয়। বেদনা তাঁকে ভেঙেছে, আবার সেই ভাঙনের ভেতর দিয়েই তাঁকে কবি করে তুলেছে। তিনি লিখেছেন—‘আজন্ম মানুষ আমাকে পোড়াতে পোড়াতে কবি করে তুলেছে।’ এই একটি উচ্চারণেই যেন তাঁর কবিজীবনের সারাংশ ধরা পড়ে। মানুষ তাঁকে যে কষ্ট দিয়েছে, তিনি সেই কষ্টকে শব্দে রূপ দিয়েছেন। ব্যক্তিগত ক্ষত শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে পাঠকের নান্দনিক অভিজ্ঞতা।

হেলাল হাফিজের কবিতার আরেকটি অনন্য শক্তি তাঁর ভাষা। তিনি কঠিন শব্দের বর্মে নিজেকে লুকাননি। বরং সহজ কথাকে এমনভাবে কাব্য রূপ দিয়েছেন, যা সহজের চেয়ে অনেক বেশি কিছু কাজ করে। ‘মিছিলের সব হাত, কণ্ঠ, পা এক নয়’—এই সরল বাক্যের মধ্যেই তিনি রাজনৈতিক বাস্তবতার বহুস্তর উন্মোচন করেছেন। আবার ‘নিউট্রন বোমা বোঝো,/ মানুষ বোঝো না’—দুটি লাইনে আধুনিক সভ্যতার এক নির্মম বৈপরীত্যকে ধরে ফেলেছেন। তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ এই সহজ অথচ গভীর উচ্চারণ।

হেলাল হাফিজ

তাই সহজ ভাষা মানেই সরল কবিতা নয়, অচল প্রেমের পদ্যও নয়। তাঁর কবিতায় উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প এবং শব্দের বিন্যাস অত্যন্ত সচেতন। অল্প শব্দে তিনি একটি সম্পূর্ণ দৃশ্য নির্মাণ করেছেন। ‘পাথরচাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট’—এই একটি চিত্রকল্প একই সঙ্গে দৃশ্যমান ও অনুভবযোগ্য। এক দৃষ্টিহীন সাহিত্যমোদী তাঁকে বলেছিলেন, তাঁর কবিতার সেই ‘সাদা কষ্ট’ তিনি শুধু অনুভব করেন না, দেখতেও পান। কবির জন্য এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে!

হেলাল হাফিজের কবিতা তাই শুধু পড়া যায় না, দেখা যায়; শুধু অনুভব করা যায় না, স্পর্শও করা যায়। এই দৃশ্যমানতাই তাঁর কবিতাকে স্বতন্ত্র করেছে। তাঁর নিজের জীবনও যেন এক দৃশ্যকাব্য—নেত্রকোনার শৈশব, মগড়া নদী, মাতৃহীন শিশুর নিঃসঙ্গতা, বাবার স্নেহ, সবিতা মিস্ট্রেস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ প্রাঙ্গণ, হেলেন, প্রেমের উত্তাপ, বিচ্ছেদের অন্ধকার, প্রেসক্লাবের আড্ডা, তাসের টেবিল, হোটেলের ছোট ঘর—সব মিলিয়ে তাঁর জীবনই যেন তাঁর কবিতার দীর্ঘ পাণ্ডুলিপি।

কিন্তু সেই জীবন প্রচলিত অর্থে সাফল্যের জীবন ছিল না। দীর্ঘ সময় তিনি একাকী ছিলেন। হাজার মানুষের ভিড়ের মধ্যে থেকেও তাঁর ভেতরে ছিল এক গভীর নিঃসঙ্গতা। জীবনের শেষ পর্বে ‘সুপার হোস্টেলের’ ৬ ফুট বাই ১০ ফুটের ঘরে বসেও তিনি বলেছিলেন—“সবাই জমায় টাকা, আমি চাই মানুষ জমাতে।” এই একটি বাক্য তাঁর জীবনদর্শনের গভীরতম পরিচয় বহন করে। অর্থ, প্রতিষ্ঠা কিংবা সম্পদের চেয়ে মানুষের সান্নিধ্য তাঁর কাছে ছিল বড়। তিনি মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকতে চেয়েছেন। সেই বেঁচে থাকা শুধু স্মৃতিতে নয়, ভালোবাসায়।

‘মিছিলের সব হাত, কণ্ঠ, পা এক নয়’—এই সরল বাক্যের মধ্যেই তিনি রাজনৈতিক বাস্তবতার বহুস্তর উন্মোচন করেছেন। আবার ‘নিউট্রন বোমা বোঝো,/ মানুষ বোঝো না’—দুটি লাইনে আধুনিক সভ্যতার এক নির্মম বৈপরীত্যকে ধরে ফেলেছেন। তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ এই সহজ অথচ গভীর উচ্চারণ।

বিপুল জনপ্রিয়তার মধ্যেও এক হিসেবে হেলাল হাফিজ ছিলেন নিঃসঙ্গ কবি। তাঁর চারপাশে অজস্র মানুষ, অথচ ভেতরটা এক শূন্য—খাঁ-খাঁ। আর সে জন্যই বুঝি তাঁর কবিতায় পাশাপাশি দেখি জনতার মিছিল ও একার সন্ন্যাস, বিপ্লবের পতাকা ও প্রেমিকার অনুপস্থিতি, যুদ্ধ ও বিরহ। এই দ্বৈততাই তাঁর কবিসত্তাকে গভীরতা দিয়েছে।

দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ সামনে আনে এক পরিণত হেলাল হাফিজকে। প্রথম বইয়ের আগুন এখানে অনেকটা অন্তর্মুখী। দ্রোহ আছে, কিন্তু তার প্রকাশ কোমল; প্রেম আছে, সেটা তারুণ্যের উন্মত্ত প্রেম নয়—অভিজ্ঞ, আহত ও সহিষ্ণু মানুষের প্রেম। অস্থিরতা, হানাহানি, অসহিষ্ণুতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের সময়ে তিনি কেবল প্রেম ও বিরহের কথা বলতে চেয়েছেন। কারণ, তাঁর কাছে প্রেমও প্রতিবাদের একটি ভাষা।

এখানে তাঁর কবিসত্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর লক্ষ করা যায়। তারুণ্যে বা যৌবনে হেলাল হাফিজ যেখানে আগুন দিয়ে সময়কে শুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন, পরিণত হেলাল হাফিজ সেখানে বেদনাকে ধারণ করে মানুষকে ভালোবাসার দিকে ফিরে গেছেন। তাঁর দ্রোহের ভাষা কঠোর থেকে কোমল হয়েছে; কিন্তু তার অন্তর্গত শক্তি কমেনি। বরং আরও গভীর হয়েছে। ‘যুক্তি যখন আবেগের কাছে অকাতরে পর্যুদস্ত হতে থাকে’ কবি তখন কী অবলীলায় বলেতে পারলেন, ‘মনে হয় মরণের পাখা গজিয়েছে।’

হেলাল হাফিজ

‘সুন্দরের গান’ এই পরিণত বোধের আরেকটি অসাধারণ উদাহরণ। ‘হলো না, হলো না’—এই পুনরাবৃত্তির মধ্যে জীবনের অপূর্ণতা যেমন আছে, তেমনি কবিতার শেষভাগে রয়েছে এক আশ্চর্য উদারতা—‘আমার হলো না তাতে কী হয়েছে? তোমাদের হোক।’ নিজের না পাওয়াকে অতিক্রম করে অন্যের পূর্ণতার জন্য শুভকামনা জানাতে পারা নিছক প্রেমিকের পরাজয় নয়; এটি একজন পরিণত মানুষের অর্জন। এই জায়গায় এসে হেলাল হাফিজ শুধু প্রেমের কবি নন, দ্রোহের কবিও নন। তিনি হয়ে ওঠেন মানবিকতার কবি। সেখানে ব্যক্তিগত ক্ষত সামষ্টিক বেদনায় রূপ নেয়। কবির প্রেম ব্যক্তিগত হয়েও মানবিক; তাঁর দ্রোহ রাজনৈতিক হয়েও অস্তিত্বের প্রশ্ন ছুঁয়ে যায়; তাঁর নিঃসঙ্গতা একান্ত নিজের হলেও তার পাঠকের একাকিত্বকে স্পর্শ করে।

হেলাল হাফিজ ছিলেন স্বল্পপ্রজ কবিদের একজন। এত কম লিখে এত বড় পাঠককুল তৈরি করা বাংলা কবিতায় সম্ভবত দ্বিতীয়টি নেই। দীর্ঘ বিরতির পরও তাঁর জনপ্রিয়তা কমেনি; বরং নীরবতা যেন তাঁর কবিতাকে আরও ঘনীভূত করেছে। কবিতা প্রকাশের চেয়ে কবিতার স্থায়িত্বকে তিনি বড় করে দেখেছেন।

হেলাল হাফিজ ছিলেন স্বল্পপ্রজ কবিদের একজন। এত কম লিখে এত বড় পাঠককুল তৈরি করা বাংলা কবিতায় সম্ভবত দ্বিতীয়টি নেই। দীর্ঘ বিরতির পরও তাঁর জনপ্রিয়তা কমেনি; বরং নীরবতা যেন তাঁর কবিতাকে আরও ঘনীভূত করেছে। কবিতা প্রকাশের চেয়ে কবিতার স্থায়িত্বকে তিনি বড় করে দেখেছেন। প্রায় দুই শ কবিতা থেকে মাত্র ৩৪টি কবিতা বেছে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সিদ্ধান্ত তাঁর শিল্পসচেতনতারও প্রমাণ।

তাই হেলাল হাফিজের কবিতাকে শুধু ‘জনপ্রিয় কবিতা’ বলে বিচার করলে তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে। জনপ্রিয়তা তাঁর কবিতার ফল, কারণ নয়। তাঁর কবিতার গভীরে রয়েছে সহজ ভাষায় কঠিন সত্য বলার ক্ষমতা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সর্বজনীন করে তোলার শক্তি, অল্প শব্দে বিস্তৃত আবেগ নির্মাণের দক্ষতা এবং প্রেম ও দ্রোহকে একই মানবিক বোধের মধ্যে ধারণ করার বিরল সামর্থ্য।

হেলাল হাফিজকে মনে করলে তাই প্রথমেই কোনো একটি পঙ্‌ক্তি মনে পড়ে না; বরং একজন মানুষকে দেখা যায়। একজন সৌম্য মানুষ। ধীরপায়ে হাঁটছেন। মাটির দিকে তাকিয়ে আছেন, যেন মাটির আরও গভীরে তাঁর দৃষ্টি। কখনো প্রেসক্লাবের টেবিলে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন। কখনো রসিকতায় শিশুর মতো হেসে উঠছেন। আবার কখনো হঠাৎ গভীর হয়ে বলছেন—‘আজন্ম মানুষ আমাকে পোড়াতে পোড়াতে কবি করে তুলেছে।’ অথবা সেই তিনিই কোনো এক নিঃসঙ্গ ঘরে বসে লিখছেন—‘তোমার জন্য সকল গোলাপ/ এবং রজনীগন্ধা।’

হেলাল হাফিজ

এই মানুষটির বুকের ভেতরে পাশাপাশি বাস করত প্রেমিক, বিপ্লবী, নিঃসঙ্গ মানুষ এবং কবি। তাদের কাউকে আলাদা করে দেখলে হেলাল হাফিজকে সম্পূর্ণ পাওয়া যায় না। বরং এই চার সত্তার মিলনেই তৈরি হয়েছিল তাঁর স্বতন্ত্র কবিসত্তা। তাঁকে প্রায়ই ‘প্রেম ও দ্রোহের কবি’ বলা হয়। কিন্তু এই পরিচয় তাঁর বিস্তৃত কবিসত্তাকে পুরোপুরি ধারণ করে না। কারণ, তিনি শুধু প্রেম ও দ্রোহের কবি নন; তিনি দহন থেকে সৌন্দর্য নির্মাণের কবি। বেদনার মধ্য থেকে মমতা খুঁজে নেওয়ার কবি। অপ্রাপ্তির ভেতর থেকেও অন্যের প্রাপ্তির জন্য হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কবি।

‘আমার হলো না তাতে কী হয়েছে? তোমাদের হোক।’ এই ‘তোমাদের হোক’-এর মধ্যেই যেন হেলাল হাফিজের কবিসত্তার সবচেয়ে নির্মল আলোটি জ্বলে ওঠে। জীবনের কাছে তাঁর নিজের পাওনা হয়তো পূর্ণ হয়নি, কিন্তু তাঁর কবিতা অন্যদের হাতে তুলে দিয়েছে প্রেম, প্রতিবাদ, সাহস, বিষাদ এবং বেঁচে থাকার এক আশ্চর্য ভাষা। সেখানেই তিনি মূর্ত—আগুনে, প্রেমে, দ্রোহে, বেদনায়, নিঃসঙ্গতায় এবং সর্বোপরি মানুষের গভীরতম মানবিক আকাঙ্ক্ষায়।

হেলাল হাফিজের কবিতা তাই কোনো একটি সময়ের দলিল হয়ে থেমে যায়নি। সময় পেরিয়ে তা মানুষের কাছে ফিরে ফিরে আসে, নতুন করে উচ্চারিত হয়। কোনো তরুণের বুকের ভেতর আগুন জ্বালায়, কোনো নিঃসঙ্গ মানুষের চোখে জল আনে, কোনো প্রেমিককে শেখায়—বিরহও প্রেমেরই একটি দীর্ঘ, দীপ্ত জীবন। হেলাল হাফিজ সেখানেই শাশ্বত, আর এখানেই তাঁর কবিতা নিশ্চয়তা পায় ‘দুধে-ভাতে’ থাকার।