অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান
অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

ফারসি ও উর্দু কবিতা

কেন ইকবাল

এই লেখাটি এখন যাঁদের চোখে পড়ছে, তাঁদের কেউ কেউ হয়তো ভাববেন, এই মুহূর্তে, ‘হঠাৎ কেন ইকবাল?’ কিন্তু আমি নিশ্চিত, মির্জা গালিব বা ফয়েজ আহমদ ফয়েজকে নিয়ে লিখলে এই প্রশ্ন জাগবে না, এমনকি প্রশ্ন জাগবে না ফিরাক গোরখপুরি বা অন্য কাউকে নিয়ে লিখলেও। একবার আল্লামা ইকবালকে নিয়ে ই এম ফরস্টারের একটি লেখা দেখে একজন পাঠক বলেছিলেন, ‘ইকবালকে নিয়ে ই এম ফরস্টারও তাহলে লিখেছিলেন!’ ইকবালের মৃত্যুর পর কত আগে তাঁর কবিতা যে ‘বিশ্বজনীন’, তার উল্লেখ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ; তবু ইকবাল সম্পর্কে এমন প্রতিক্রিয়া এখনো অব্যাহত।

মুহাম্মদ ইকবাল (১৮৭৭-১৯৩৭ খ্রি.) বিষয়ে এমন সপ্রশ্ন মনোভাব তৈরি হওয়ার পেছনে খোদ তাঁর জীবন ও কর্ম যতটা দায় বহন করে, তার অধিক দায় নিতে হয় তাঁর জ্ঞাত ও অজ্ঞাত অনুরাগীদের। বিশেষত তাঁরা, যাঁরা ইকবালচিন্তাকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে চেয়েছেন এবং করে অনেক ক্ষেত্রে সফলও হয়েছেন। রাজনীতির ক্ষেত্রে মুহাম্মদ ইকবাল শুরুর দিকে ছিলেন অখণ্ড ভারতের পক্ষপাতী, তাঁর বিখ্যাত ‘সারে জাহাঁ সে আচ্ছা হিন্দুস্তাঁ হামারা’ গানটি সম্পর্কে কে না জানেন, তাই বলে তাঁকে সব সময়ের ‘অখণ্ড ভারতবাদী’ বলে চিহ্নিত করাও ঠিক নয়। তাঁর বাংগ-এ-দারা কাব্যগ্রন্থে যে গ্রহিষ্ণু দৃষ্টিভঙ্গি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিচয় রয়েছে, তা যেকোনো পরাধীন দেশের মানুষের জন্য একটি দৃষ্টান্তমূলক প্রতীক ও অনুপ্রেরণা হতে পারে। পূর্ববর্তী দুই দশকব্যাপী রচিত কবিতাগুচ্ছ নিয়ে ইকবালের এই বইটি প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালে। তখন ঔপনিবেশিক শাসন চলমান, ফলে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তিনি নানা রূপক ও প্রতীক ব্যাপক ব্যবহার করে ঘুমন্ত জাতিকে জাগাতে চেয়েছিলেন। এখানে রয়েছে ভারতীয় পুরাণ ও পুরাণ-চরিত্রের মুক্ত ও ব্যঞ্জনাময় ব্যবহার, রামকে নিয়ে লিখেছেন এমন পঙ্‌ক্তিও: ‘আহল নজর সমঝতে হে উছ কো ইমাম-এ-হিন্দ’। রাম এখানে ‘অভিধা’ বা ‘লক্ষণা’—অর্থের উদাহরণ নয়, ‘ব্যঞ্জনা’র উদাহরণ, অর্থাৎ ধর্মীয় ইমাম বা নেতা নন, পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে উদ্ধারকর্তারূপী প্রতীক ও প্রেরণা।

‘ইকবালকে নিয়ে ই এম ফরস্টারও তাহলে লিখেছিলেন!’ ইকবালের মৃত্যুর পর কত আগে তাঁর কবিতা যে ‘বিশ্বজনীন’, তার উল্লেখ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ; তবু ইকবাল সম্পর্কে এমন প্রতিক্রিয়া এখনো অব্যাহত।

এই সময়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন প্রবল হচ্ছে, আফ্রিকা থেকে ফিরেছেন মহাত্মা গান্ধী, আন্তজার্তিক পর্যায়েও ভারত-স্বাধীনতার পক্ষে দাবি উঠছে—এই পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশনীতির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার পাঁয়তারা চলছিল। ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িক সংকট তৈরি হতে শুরু করে, এর এক যুগ পরে, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিশ্বাসের সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠলে, ১৯৩৬ সালে রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে ‘হিন্দু মুসলমানের বিরোধ’শীর্ষক বক্তৃতা দিতে যাবেন কাজী আবদুল ওদুদ। কিন্তু বিরোধ না কমে তা আরও তীব্র হয়ে উঠবে। এই সব পরিস্থিতির কারণে, নানা প্রতিঘাত-প্রতিক্রিয়ায় মতের পরিবর্তন হবে ইকবালের, যার ফলে পাকিস্তানের সমর্থকেরা একসময় তাঁকে পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টারূপেও পেয়ে যাবে। তবে, তাঁর চিন্তায় পাকিস্তানের সপক্ষ মত কখনো কখনো জোরালো হলেও তিনি চরম জাতিগর্বী ছিলেন না, বরং সব ধর্মের মানুষের প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। ই এম ফরস্টার থেকে শুরু করে অনেক যুগন্ধর বিশ্বপ্রতিভা ইকবালের এই চিন্তার তারিফ করেছেন। ইকবালের বহুমুখী অধ্যয়ন, সুগভীর দর্শনচর্চা ও রেনেসাঁসের প্রভাব তাঁর জীবনে পড়েছে। তারপরও রাজনৈতিক কারণে সাধারণ স্তরে তো বটেই, শিক্ষিত সমাজেও ইকবালের যে ভাবমূর্তি তৈরি হয়, তা তাঁর সৃষ্টিকর্ম গ্রহণের বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

এই প্রেক্ষাপটের কারণেই মূলত ইকবালকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ‘হঠাৎ কেন ইকবাল?’ এই প্রশ্নের মোকাবিলা করতে হয়েছিল শঙ্খ ঘোষকেও। নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়াটা অবশ্য বাঙালি পাঠকের জন্য শাপে বর হয়েছে—দীর্ঘদিনের কাজের পর ইকবাল থেকে নামে তাঁর যে—বইটি বেরিয়েছে, বাংলা ভাষায় তা এক অনবদ্য নজির হয়ে আছে। এই বইয়ে শঙ্খ ঘোষের অনুবাদ, গ্রন্থতুল্য সুদীর্ঘ ভূমিকা এবং অনুবাদের প্রসঙ্গ ও পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের সঙ্গে পাণ্ডিত্যপূর্ণ পত্রালাপে ইকবালপ্রতিভার অনেক অজানা বিষয়, প্রাচ্য-প্রতীচ্য ধর্ম ও পুরাণ ও ফারসি সাহিত্যের বহু কিছু আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কেমব্রিজে অবস্থানকালে পরিচয় হওয়া ইকবালের বান্ধবী আতিয়ার কাছে কীভাবে অপরিচিত হয়ে দেখা দিল তাঁর পরবর্তীকালের কবিমানস, তার সপ্রমাণ বর্ণনা রয়েছে ভূমিকায়, তা থেকে ইকবালপ্রতিভার দ্বন্দ্বের দিকটিও আর অস্পষ্ট থাকে না।

ইকবালকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ‘হঠাৎ কেন ইকবাল?’ এই প্রশ্নের মোকাবিলা করতে হয়েছিল শঙ্খ ঘোষকেও। দীর্ঘদিনের কাজের পর ইকবাল থেকে নামে তাঁর যে—বইটি বেরিয়েছে, বাংলা ভাষায় তা এক অনবদ্য নজির হয়ে আছে।

তবে ইকবাল সম্পর্কে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক ও পর্যবেক্ষণধর্মী মন্তব্যটি করেছিলেন ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব। তিনি বলেছিলেন, ইকবাল পুরোনো সব প্রথা চুরমার করে দিয়ে ফারসি ও উর্দু কবিতাকে নতুন ভাষা দিলেন এবং শাস্ত্রকে আক্রমণ করে, আবার সুফি ঘরানাকে প্রত্যাখ্যান করে, এত দিনে ‘খুদি’ নিয়ে যে আদর্শ তৈরি হয়েছিল, তাকেও অস্বীকার করলেন। একই সঙ্গে তাঁর লেখায় ‘আছড়ে পড়ল’ নিটশের গ্রেট ম্যান থিওরি, প্যান-ইসলামিজম, সোশ্যালিজম ও জাতীয়তাবাদ—সবকিছুই। এ রকম নানামুখী মতবাদ এক স্থানে একত্র হলে যে ‘প্রাথমিক বৈপরীত্য’ তৈরি হয়, ভাষা ও কাব্যের গুণে তিনি তা ছাপিয়ে যেতে পেরেছিলেন। ইরফান হাবিবের ভাষায়:

‘ইশক’ নিয়ে যে গজল-সেই ধর্মটাকেই পালটে দিলেন, তিনি গজলের কাপলেট বদলে নিয়ে গেলেন দীর্ঘ কবিতার মেজাজে, যাকে বলে ‘নাজম কা মাসনাওয়ি’। আবেগে মথিত করে তুললেন জাতীয়তাবাদীদের, কমিউনিস্টদের এবং সমাজবাদীদের। তাঁর কবিতা গর্জে উঠল ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে, প্রতিবাদ করে উঠল শ্রমিকদের শোষণের বিরুদ্ধে।

কিন্তু ইকবাল সম্পর্কে ইরফান হাবিবের চিহ্নায়ক মন্তব্যটি মাথায় রেখেও যে কথাটি এখানে না বললেই নয়, গজলকে যে জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন ইকবাল, সেখানে পৌঁছলে স্বতন্ত্রভাবে তার বিষয়গুণ হয়তো কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছায়, কিন্তু তাতে গজলের তগজ্জুল বা গজলত্ব আর থাকে না। এতে অবশ্য ইকবালপ্রতিভার মহত্ব একটুও ক্ষুণ্ন হয় না। ইকবাল যে শুরুতে গজল লিখতেন, তাতে দুই মির্জার—দাগ আর গালিবের কিছু প্রভাব থাকলেও সেখানে নতুনত্ব এনেছিলেন, কিন্তু সেই কথা হলো, তিনি সেই পথে বেশি দূর এগোননি। অনুমান করি, ১৯০৫ সাল থেকে কয়েক বছরব্যাপী এগুলো লিখেছিলেন ইকবাল। কারণ, ১৯১১ সালে আতিয়া ফৈজিকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, পাঁচ-ছয় বছর ধরে তিনি ‘ব্যক্তিগত বোধের’ কবিতা লিখেছেন। তবে একই চিঠিতে তাঁর বান্ধবীকে এই তথ্যও জানান যে তাঁর বাবা তাঁকে বু আলি কলন্দরের মতো ফারসিতে মসনবি লেখার কথা বলেছেন, কাজটি তাঁর জন্য মুশকিল হলেও তিনি তা করবেন। এর চার বছর পর, ১৯১৫ সালে প্রকাশিত হবে আসরারে খুদি এবং তার পর তিনি ধীরে ধীরে নিজ সম্প্রদায়ের নানা রকম সংকটে তাড়িত হতে থাকবেন এবং স্মৃতি হয়ে থাকবে ব্যক্তিগত বোধের আবেগময় প্রেম ও প্রকৃতির কবিতাগুলো। এখানে আল মুজাহিদীর গদ্যানুবাদে একটি গজল পড়লে এ কথা বোঝা যাবে:

‘এই নক্ষত্রপুঞ্জের আগে আরও পৃথিবী আছে
প্রেমের অন্বীক্ষা আরও রয়ে গেছে
এই সংকীর্ণ জীবনে বসন্ত প্রাপ্য নয়
এখানে সহস্র কারাভাঁ হেঁকে চলেছে।
পৃথিবীর রংতামাশায় বুঁদ হয়ে থেকো না যেন,
আরও উদ্যান আরও আবাসস্থল রয়ে গেছে।
একটি নীড় হারিয়েছ তো কী দুঃখ তোমার,
আরও দুঃখ-আকরের সন্ধান পাবে তুমি।
তুমি বাজপাখি, ওড়াই তোমার ব্রত
তোমার সামনে আরও নভোমণ্ডল পড়ে আছে।
তুমি দিনরাত উৎকণ্ঠায় অস্থির হয়ে থেকো না
তোমার কাল আর কুলা আরও রয়ে গেছে।
বিগত দিনে এই মাহফিলে একা ছিলাম আমি
এখানে তো আমার মতো রহস্যবিদ আরও আছে।’

১৯৪৩ সালে অনুষ্ঠিত একটি আলোচনা সভার বক্তা ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, হেকিম হাবিবুর রহমান ও অধ্যক্ষ আবদুল হাকিম। তাঁরা প্রত্যেকে প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা করেন; কিন্তু কেউই ইকবালকে কবি হিসেবে বিবেচনা করেননি।

গজলের চিরাচরিত কিছু প্রসঙ্গ এতে হাজির হলেও পরবর্তী সময়ে কবিতায় ইকবাল যে দার্শনিক আইডিয়া ও মননধর্মী সংবেদন প্রকাশে আগ্রহী হয়ে উঠবেন তার খানিকটা আভাস এই গজলেও রয়েছে। ইকবাল তাঁর ব্যক্তিগত নোটবই-এ লিখেছিলেন: ‘দর্শন হচ্ছে শীতল রাতে মানববুদ্ধির থর থর করে কাঁপতে থাকা একগুচ্ছ বিমূর্তন। কবি এসে একে উদ্দেশ্য দিয়ে উষ্ণ করে তোলেন।’ (অনু. জাভেদ হুসেন) বাস্তবেও সেই উদ্দেশ্য সাধন করতে চেয়েছেন ইকবাল, তাতে দর্শন-ঋদ্ধ বহু উৎকৃষ্ট কবিতা রচিত হয়েছে, কিন্তু করুণ ব্যথিত আর্তির গজল আর শোনা যায়নি। শুধু গজলই-বা বলছি কেন, তাঁর দর্শন-ঋদ্ধ কবিতাও তো যথার্থভাবে সামনে আসতে পারল না। সৈয়দ আলী আহসান ‘কবি ইকবাল : আমার সাক্ষ্য’ শিরোনামক একটি লেখায়, প্রথমে মানবজীবনের অগ্রযাত্রা বিষয়ে ইকবালের একটি কবিতার উল্লেখ করে লেখেন : চলার পথে কখনো উদ্যান, কখনো মরুভূমি, কখনোবা সমুদ্রের সঙ্গে দেখা হবে, কিন্তু সবকিছুর সঙ্গে সংগতি রক্ষা করা জরুরি। ইকবালের এ ধরনের কবিতার প্রতি তাঁর আগ্রহ প্রকাশ করে ১৯৪৩ সালে অনুষ্ঠিত একটি আলোচনা সভার বর্ণনা দেন সৈয়দ আলী আহসান, যেখানে বক্তা ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, হেকিম হাবিবুর রহমান ও অধ্যক্ষ আবদুল হাকিম। তাঁরা প্রত্যেকে প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা করেন; কিন্তু কেউই ইকবালকে কবি হিসেবে বিবেচনা করেননি। সৈয়দ আলী আহসানের ভাষায়: ‘এদের প্রত্যেকের দৃষ্টিতে ইকবাল ছিলেন ইসলামী দার্শনিক, মুসলমানদের জন্য একজন ভবিষ্যৎদ্রষ্টা এবং ইসলামের উজ্জীবনের জন্য আদর্শ বাণী উচ্চারণের নকীব।’ ইকবালের ক্ষেত্রে যা ছিল দর্শন, অন্যদের কাছে তা-ই ধর্ম হয়ে ধরা পড়ল। ‘ইকবাল আমাদের’ শিরোনামক একটি প্রবন্ধে যতীন সরকারও দেখিয়েছেন, ইকবালকে ইসলামের পুনরুজ্জীবনবাদী কবি বানানোর চেষ্টা যেমন করা হয়েছে, তেমনি নিম্নোক্ত কবিতা উদ্ধৃত করে তাঁকে প্রগতি জোটের কবি বানানোর চেষ্টাও হয়েছে:

‘ওঠো, দুনিয়ার গরীব ভুখারীদের জাগিয়ে দাও
ধনীর প্রাসাদ প্রাকারের ভিত্তিকে পর্যন্ত কাঁপিয়ে দাও
যে-ক্ষেত থেকে কিষাণের রুটি জোটে না,
পুড়িয়ে দাও তার প্রতিটি গমের ছড়াকে’

কিন্তু আশার কথা এই যে ইকবালের নোটবই–এ বর্ণিত সেই ‘দর্শন’কে ‘উদ্দেশ্য’মুখী বা সম্প্রসারিত করে তোলেন পরবর্তীকালের কোনো কোনো কবি। এ কথা স্বীকার করতে হবে যে পশ্চাদপদতার কারণে, কখনোবা বঞ্চিত হওয়ার কারণে, স্বধর্ম ও স্বজাতির জাগরণ এবং উন্নতির জন্য সরব হয়েছেন ইকবাল এবং তা যে শুধু ভারতের আপৎকালীন প্রেক্ষাপটের কারণে, তা নয়, তা বহু আগেই শুরু হয়েছিল। ‘কভি হম সে কভি গৈরোঁ সে শনাসায়ী হ্যয়/ বাত কহ্নে কি সহিঁ তু তো হরজাঈ হ্যায়’ (কখনো আমার কখনো ওদের সঙ্গে তোমার লীলা/ বলবার মতো কথা না-তুমিও বহুজনরঙ্গিলা’)—এই চরণ উদ্ধৃত করে শঙ্খ ঘোষ ইকবালমননের একটি সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন: ‘এই যে ধর্মের ভাবনায় পৌঁছতে হচ্ছে ইকবালকে, তাঁর মূল উৎসটা কোথায়? সেটা কোনো অলীক আধ্যাত্মিকতার টানেই নয়, কোনো রহস্যমদির উদাসীনতায় নয়, ধর্মকে তিনি ছুঁতে চেয়েছিলেন জীবনকে সুস্থতর করবার স্বপ্নে। ১৯০৫ থেকে ১৯০৮ সালের বিদেশবাসের পূর্বে একদিকে যেমন তিনি প্রগাঢ় দর্শনচর্চা করেছেন, অন্যদিকে তেমনি লক্ষ করেছেন পশ্চিমি জাতিগুলোর সাম্রাজ্যবাদী ছলার বিস্তার, তার কূটকৌশল।’ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ–পূর্ববর্তী এই দুরবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই তাঁর বঞ্চিত স্বজাতির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। কারও কারও মনে পড়বে হয়তো, ইকবালের মৃত্যুর এক বছর আগে ১৯৩৭ সালে তাঁর সঙ্গে দেখা করার পর অমিয় চক্রবর্তীর ‘যুগসংকটের কবি ইকবাল’শীর্ষক গদ্যটির কথা যেখানে এই মতটি উদ্ধৃত করেছিলেন: ‘ভারতে ইসলামী সংস্কৃতিকে অনেকে চিনল না, তাই ভূমিকাটা সরাতে রাজি হয়েছিলাম। বললেন হয়তো নিজেও কিছু মত বদলিয়েছি।’ বাংগ-ই-দারার প্রথম সংস্করণের ভূমিকাটির কথা বলছিলেন ইকবাল যেখানে নিজের ওপর ‘ভগবদগীতা’র প্রভাবের কথা তিনি উল্লেখ করেছিলেন। তাঁকে ‘মেধাবী পণ্ডিত’ সম্বোধন করে অমিয় চক্রবতী আরও লিখেছেন, ইকবালের মতো চোস্ত ইংরেজি কম ভারতীয়ই লিখেছেন, তাঁর মতে, ইকবালের সেই কসমোপলিটান মন, যা একই সঙ্গে স্বদেশি ও প্রসারী যেখানে বড় চত্বরের লেনদেন, যা ‘আধুনিকে-প্রাচীনে সমন্বয়’। যে কারণে, বৃহত্তর মানবজাতির প্রতি দায়বোধের পরিচয়ই মুখ্য হয়ে উঠেছে তাঁর কবিতা ও দর্শনচিন্তায়। এই চিন্তায় স্ববিরোধ ও জটিলতা আছে, থাকাই স্বাভাবিক, যেমন আছে রবীন্দ্রনাথ ও গ্যেটের মতো বৃহৎ প্রতিভার চেতনায়ও, তা সত্ত্বেও তাঁর সামগ্রিক পরিচয় যখন আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠবে, তখন, শুধু শঙ্খ ঘোষ কেন, আশা করি কাউকেই আর ‘হঠাৎ কেন ইকবাল’ এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে না।