অলংকরণ: আনিসুজ্জামান সোহেল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো
অলংকরণ: আনিসুজ্জামান সোহেল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

স্বাধীনতা দিবস সবিশেষ

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আইনি সনদ

বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যে বিষয়টা সব সময় আলোচনায় থাকে, তা হচ্ছে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের সামরিক হত্যাযজ্ঞ ‘অপারেশন সার্চলাইট’। বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর এই জেনোসাইডের তীব্রতা ও তাৎক্ষণিক প্রভাব এত ভয়াবহ ছিল যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নটি আর শুধু রাজনৈতিক দেনদরবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং স্বাধীনতার প্রতি বিশ্বসম্প্রদায়ের স্বীকৃতি অর্জনের উদ্দেশ্যে স্বাধীনতার আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করা তৎকালীন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের ভাবনায় ছিল। রণকৌশলের অংশ হিসেবে ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা একটা তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তবে মজলুম জনগোষ্ঠী হিসেবে বাঙালিদের স্বাধীনতাসংগ্রামের ন্যায্যতা বৈশ্বিকভাবে প্রাসঙ্গিক করার জন্য আন্তর্জাতিক আইনের গ্রহণযোগ্য কাঠামোর প্রয়োগ অনিবার্য হয়ে পড়েছিল।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১০ এপ্রিল জারি করা হয় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। এই ঘোষণাপত্র নতুন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আইনি দলিল বা জন্মসনদ। এটি বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম আইনি ভাষায় ফুটিয়ে তোলে। রাজনৈতিক নেতারা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশের একটি স্বাধীন জাতি হওয়ার অধিকার স্পষ্ট করেছেন; প্রমাণ করেছেন যে স্বাধীনতাসংগ্রাম বিচ্ছিন্নতাবাদী কোনো আন্দোলন নয়, বরং একটা বৈধ মুক্তিযুদ্ধ। আন্তর্জাতিক আইনে স্বাধীনতার এ ধরনের ঘোষণাকে বলা হয় ইউনিল্যাটেরাল ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্স বা স্বাধীনতার একপক্ষীয় ঘোষণা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রথম ঘটনা, যেখানে উপনিবেশ-উত্তর একটি রাষ্ট্রের জনগোষ্ঠী আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছিল। মনে রাখা ভালো, তখন পর্যন্ত আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে বেশি ব্যবহৃত হতো। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে একটি অগ্রণী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, স্বাধীনতা অর্জনের জন্য এই অধিকার প্রয়োগ করে। এর আগে স্বাধীনতার জন্য অনৌপনিবেশিক পটভূমিতে সফলভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার কোনো নজির ছিল না।

রাজনৈতিক নেতারা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশের একটি স্বাধীন জাতি হওয়ার অধিকার স্পষ্ট করেছেন; প্রমাণ করেছেন যে স্বাধীনতাসংগ্রাম বিচ্ছিন্নতাবাদী কোনো আন্দোলন নয়, বরং একটা বৈধ মুক্তিযুদ্ধ। আন্তর্জাতিক আইনে স্বাধীনতার এ ধরনের ঘোষণাকে বলা হয় ইউনিল্যাটেরাল ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্স।

(পাকিস্তান) রাষ্ট্রের অখণ্ডতা বনাম (বাঙালি) জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার—আন্তর্জাতিক আইনের এই দুই নীতির টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল কালের পরিক্রমায় এক সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত। রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার নীতি যে চিরস্থায়ী বা অলঙ্ঘনীয় নীতি হতে পারে না, তার নিদর্শন ছিল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঘোষণা।

বাঙালির যে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আছে এবং সেটি যে প্রয়োগ করা যায়, এই ঘোষণাপত্র ছিল তার প্রদর্শন। আন্তর্জাতিক আইনে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার জনগণের অধিকার; কোনো রাজা, সামরিক শাসক, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী বা অন্য কোনো শক্তির অধিকার নয়। জনগণ স্বাধীনভাবে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান বেছে নেবে এবং জাতিগত, লৈঙ্গিক, ভাষাগত ও ধর্মীয় বৈষম্য ছাড়াই নিজেদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সাধন করতে পারবে—এই স্বীকৃতিই হচ্ছে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার।

ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস (আইসিজে) প্রকাশিত ‘দ্য ইভেন্টস ইন ইস্ট পাকিস্তান’ (১৯৭২) শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাঙালিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আছে। কেননা, বাঙালি শুধু নৃত্বাত্তিক পরিচয় নয়, বাঙালিরা এই আত্মপরিচয় সম্পর্কে ঐতিহাসিকভাবে সচেতন এবং তা প্রতিভাত হয়েছে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের অসীম ইচ্ছাশক্তির বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে। এখানে আইসিজের যুক্তি হচ্ছে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে বাঙালিদের নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করার অধিকার আছে। দুই দশকের বেশি সময়ের পাকিস্তানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বাঙালিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রয়োগই ছিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী পাকিস্তানের শাসনক্ষমতার ন্যায্য দাবিদার রাজনৈতিক দলটির কাছে তা হস্তান্তর করা হয়নি। আগের মতো জনসমর্থনের ভিত্তি ছাড়াই একটি ভিন্ন জাতিগত ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর (প্রধানত পাঞ্জাবি-পাঠান সামরিক অলিগার্কি ও বেসামরিক আমলাতন্ত্র) দ্বারা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব পরিচালনা করা হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির পূর্ব পাকিস্তান ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের একটা কলোনি। ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় পূর্ব পাকিস্তান ঔপনিবেশিক পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটা ভূখণ্ড ছিল। তা সত্ত্বেও আত্মনিয়ন্ত্রণের সমসাময়িক রীতিনীতি যদি পাকিস্তানে অনুসরণ করা হতো এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনের নীতিটি সাংবিধানিক সুরক্ষার সঙ্গে সংখ্যালঘিষ্ঠদের কথা বিবেচনা করে প্রয়োগ করা হতো, তাহলে সংঘাত ছাড়াই এমন একটি নির্বাচিত সরকার পাকিস্তানে বিরাজ করত, যেখানে পূর্ব বাংলার জনগণ একটি নিয়ন্ত্রণকারী কণ্ঠস্বর হিসেবে টিকে থাকত। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের স্বীকৃতির বিষয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের ক্রমাগত প্রত্যাখ্যান পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে নামমাত্র একটি স্বাধীন দেশে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করেছিল।

ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস প্রকাশিত ‘দ্য ইভেন্টস ইন ইস্ট পাকিস্তান’ (১৯৭২) শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাঙালিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আছে। কেননা, বাঙালি শুধু নৃত্বাত্তিক পরিচয় নয়, বাঙালিরা এই আত্মপরিচয় সম্পর্কে ঐতিহাসিকভাবে সচেতন এবং তা প্রতিভাত হয়েছে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে।

এ আলোচনায় রোডেশিয়ার উদাহরণও বেশ প্রাসঙ্গিক। রোডেশিয়া (আজকের দিনের জিম্বাবুয়ে) একসময় ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল। ১৯৬৫ সালে প্রধানমন্ত্রী ইয়ান স্মিথ শ্বেতাঙ্গ আফ্রিকানদের শাসক হিসেবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, যেন সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গরা দেশের শাসনব্যবস্থা দখলে না নিতে পারে। জাতিসংঘসহ পশ্চিমা দেশগুলো ওই ঘোষণার প্রতি অস্বীকৃতি জানায় এই বলে যে রোডেশিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা সংখ্যালঘুর শাসন প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা, যেখানে সংখ্যাগুরুর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, জাতিসংঘ বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে দ্বিচারিতা করেছিল; রোডেশিয়ায় ইয়ান স্মিথের সংখ্যালঘুর শাসনকে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরশাসককে স্বীকৃতি না দেওয়ার ব্যাপারে যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব আছে, তা চেপে গিয়েছিল।

জাতিসংঘ রোডেশিয়ার ক্ষেত্রে কেবল ইয়ান স্মিথের সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করারই নির্দেশ দেয়নি, বরং রাষ্ট্রগুলোর প্রতি অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম ও অন্যান্য পণ্য সরবরাহ করা থেকে বিরত থাকারও আহ্বানও জানিয়েছিল। অথচ একই জাতিসংঘ নীরবতার নীতি অনুসরণ করার মাধ্যমে পূর্ব বাংলার জনগণের ওপর জবরদস্তিমূলক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পাকিস্তানকে সাহায্য করেছে। জাতিসংঘের নীরবতা কয়েকটি বৃহৎ শক্তির কাছ থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র পেতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জন্য সহায়ক হয়েছে; তারা সেগুলো ব্যবহার করে স্মরণকালের অন্যতম নৃশংস মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে।

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ১৬ দিনের মাথায় গৃহীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র মুজিবনগর সরকারকে বৈধতা দেয়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে তা কার্যকর হবে বলার মাধ্যমে কয়েকটা বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছিল। ১. ২৫ মার্চ থেকে পাকিস্তান জেনোসাইড করে চলেছিল; ২. ২৬ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, তথা ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন এবং এই স্বাধীন রাষ্ট্রের একটা কার্যকর সরকার আছে; ৩. মুক্তিযুদ্ধ ২৬ মার্চ থেকে চলমান। রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান, যেমন জনগণ, সরকার ও সার্বভৌমত্বের পাশাপাশি নিজের ভূখণ্ডের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কথা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলা আছে, যা আন্তর্জাতিক আইনে একটি বৈধ সরকারের স্বীকৃতির জন্য অন্যতম প্রয়োজনীয় নিয়ামক।

এই ঐতিহাসিক দলিল শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছিল না, ছিল রাষ্ট্রের প্রথম সংবিধানও। প্রধানত তিনটি কারণে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে দেশের প্রথম সংবিধান হিসেবে বিবেচনা করা যায়। প্রথমত, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ আইন হিসেবে উপস্থাপিত হয়। দ্বিতীয়ত, এটি বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গৃহীত হয়েছিল, যাঁরা ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছিলেন; নির্বাচনটি হয়েছিল মূলত পাকিস্তান বিধানসভা গঠনের মাধ্যমে একটি সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে। যেহেতু পাকিস্তানি শাসকেরা নির্বাচনের সেই লক্ষ্য পূরণ হতে দেয়নি, তাই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আইনত নিজেদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তথা বাংলাদেশের গণপরিষদ হিসেবে গঠন করেছিলেন। এভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র একটি গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিকভাবে বৈধ উৎস থেকে উদ্ভূত হয়েছে। তৃতীয়ত, ক্ষমতা পৃথককরণ নীতির ধারণাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সদ্য ঘোষিত স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগের (আইন, নির্বাহী ও বিচার) কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা বণ্টন করেন।

প্রধানত তিনটি কারণে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে দেশের প্রথম সংবিধান হিসেবে বিবেচনা করা যায়। প্রথমত, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ আইন হিসেবে উপস্থাপিত হয়। দ্বিতীয়ত, এটি বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গৃহীত হয়েছিল।
মুজিব নগর প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন

দেশের প্রথম সংবিধান প্রণয়নের ভিত্তি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ১০ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রতিফলিত হয়েছে: ‘...সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি যে ম্যান্ডেট দিয়েছেন সে ম্যান্ডেট মোতাবেক আমরা, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, আমাদের সমবায়ে গণপরিষদ গঠন করে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা করছি...।’

গণপরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে ‘পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার’ উল্লেখ প্রমাণ করে যে স্বাধীনতার ষোষণাপত্র প্রণয়নের কাজটি ছিল অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। শাসনের ভিত্তি হিসেবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের নীতি গ্রহণ করা ছিল ঐতিহাসিক ঘটনা। কেননা এগুলো সেই সাংবিধানিক মূল্যবোধ, যার জন্য পূর্ব বাংলার জনগণ দীর্ঘদিন ধরে সাম্রাজ্যবাদ ও পাকিস্তানি উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিল।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পৃথক্‌করণের বিষয় হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের পর একটি সংবিধান গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার নির্ধারণ করা হয়েছিল। রাষ্ট্রপতির কার্যাবলিও স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, রাষ্ট্রপতিকে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব করা হয়েছিল এবং ক্ষমা মঞ্জুর করার ক্ষমতাসহ রাষ্ট্রের সব নির্বাহী ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। সংসদ ছিল না এবং গণপরিষদ কেবল সংবিধান প্রণয়নের কাজ করতে পারে, অর্থাৎ প্রতিদিনের শাসনের জন্য আইন প্রণয়ন করতে পারে না—এ বিষয় বিবেচনায় রেখে রাষ্ট্রপতিকে অ্যাডহক ভিত্তিতে আইন জারি করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।

ক্ষমতা পৃথক্‌করণ ছাড়াও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র আন্তর্জাতিক আইনের রীতিনীতি, বিশেষ করে জাতিসংঘের সনদের নীতিগুলোকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের দ্বারা জেনোসাইডের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করায় ঘোষণাপত্রের বৈশ্বিক চেহারা প্রতিফলিত হয়।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি অস্থায়ী সাংবিধানিক ব্যবস্থা ছিল। তা সত্ত্বেও এটি একটি প্রচলিত সংবিধানের সবচেয়ে মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো অন্তর্ভুক্ত করেছিল, যার মাধ্যমে যুদ্ধকালে একটি দেশকে শাসন করা যেতে পারে। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের বেশ কিছু বিচারিক সিদ্ধান্তে স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্রের সাংবিধানিক কর্তৃত্ব ও প্রাধান্য স্বীকৃত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইনবিশারদদের কাছে স্বাধীনতার ঘোষণাপ্রসূত বাংলাদেশের অস্তিত্ব একটা দ্বান্দ্বিক বিষয় ছিল; একদিকে ঘোষিত স্বাধীনতার স্বীকৃতি নিয়ে ছিল তাত্ত্বিক সংশয়, অন্যদিকে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের টিকে যাওয়া ছিল একটা বিস্ময়। দ্য জেনেসিস অব বাংলাদেশ (১৯৭২) বইয়ে সুব্রত রায়চৌধুরী লেখেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধ যৌথভাবে বাঙালি জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রয়োগকে বৈধতা দিয়েছিল। এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক আইনের একাডেমিক ডিসকোর্সে পূর্ব তিমুর বা দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতার আইনি বিশ্লেষণ নিয়ে যে মাত্রায় বৈশ্বিক আগ্রহ দেখা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে কিছু রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর ছাড়া গবেষণানিষ্ঠ কাজ তেমন চোখে পড়ে না।

তথ্যসূত্র

১. সুব্রত রায়চৌধুরী, দ্য জেনেসিস অব বাংলাদেশ: আ স্টাডি ইন ইন্টারন্যাশনাল লিগ্যাল নর্মস অ্যান্ড পারমিসিভ কনশেন্স (বোম্বে: এশিয়া পাবলিশিং হাইস, ১৯৭২)

২. আইসিজে, ‘দ্য ইভেন্টস ইন ইস্ট পাকিস্তান’ (জেনেভা: আইসিজে সেক্ররেটারিয়েট, ১৯৭২)

৩. এম রফিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ লিবারেশন মুভমেন্ট: ইন্টারন্যাশনাল লিগ্যাল ইমপ্লিকেশনস (ঢাকা: ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ১৯৮৭)

৪. জে এন দীক্ষিত, লিবারেশন অ্যান্ড বিয়ন্ড: ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ রিলেশনস (ঢাকা: ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ১৯৯৯)

৫. ইমরান আজাদ, ‘দ্য প্রোক্লেমেশন অব ইনডিপেনডেন্স: বাংলাদেশেজ ফার্স্ট কনস্টিটিউশন’ (দ্য ডেইলি স্টার, ৯ এপ্রিল ২০১৮)

৬. মুহাম্মদ ইকরামুল হকের সাক্ষাৎকার, ‘দ্য প্রক্লেমেশন অব ইনডিপেনডেন্স: নট এ মেয়ার ক্রিয়েশন অব দ্য স্কিলফুল ড্রাফটসমেন’ (দ্য ডেইলি স্টার,২৭ এপ্রিল ২০২৩)