যে কারণে আবদুর রশীদ মরে গিয়েও মরলেন না

মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
ছবি: সংগৃহীত
কয়েক দিন আগে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন শহীদুল জহিরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং ‘শহীদুল জহির সমগ্র’-এর সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুর রশীদ। মারা যাওয়ার পরও কেন মারা যাননি আবদুর রশীদ, তা নিয়ে লিখেছেন শহীদুল জহিরের লেখার ইংরেজি অনুবাদক শাহরোজা নাহরিন।

‘মানুষের মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু তার তাৎপর্য হবে থাই পাহাড়ের চেয়ে ভারী বা বেলে হাঁসের পালকের চেয়ে হালকা।’ চীনা দার্শনিক সিমা ছিয়েনের এই বাণী দিয়ে শুরু হয় শহীদুল জহিরের উপন্যাস ‘আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু’।

গত ১ ফেব্রুয়ারি ‘শহীদুল জহির সমগ্র’-এর সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুর রশীদের মৃত্যুটা ছিল পাখির পালক খসে পড়ার মতোই নিঃশব্দ। কোথাও কোনো সাড়া–শব্দ হলো না। নিকটজনের অনেকের কাছেই বিষয়টা মাসখানেক অজানা রয়ে গেল। মৃত্যুর অনেক পরে, সপ্তাহ দুই আগে তাঁকে নিয়ে কবি টোকন ঠাকুর ও অনুবাদক ভি রামস্বামীর দুটি পৃথক স্মৃতিচারণা পত্রিকায় এল। আবার জীবদ্দশায় আবদুর রশীদ সাহিত্যজগতে যে আঁচড় কেটে গেলেন, তার গুরুত্বও অনেকটা পাহাড়সম।

বন্ধু শহীদুল জহিরের মৃত্যুর প্রায় পাঁচ বছর পর তাঁর গ্রন্থিত, অগ্রন্থিত ও অপ্রকাশিত সব সাহিত্যকর্ম, চিঠিপত্র, ডায়েরির অংশ, সাক্ষাৎকার, মূল্যায়ন ও স্মৃতিচারণা একত্র করে ‘শহীদুল জহির সমগ্র’ সংকলন করেন তিনিই। সেখানে জহিরের অনুবাদকর্মের সঙ্গে আছে লেখকের স্বহস্তাক্ষরে চিঠি। প্রাপক সম্পাদক নিজেই! সেসব চিঠিতে মিতভাষী জহির, তাঁর ব্যক্তিগত সংকট, রাজনৈতিক মন্তব্য, প্রেম ও হাস্যরসে কেমন মুখর হয়ে ওঠেন!

এর আগে ২০১০ সালে আবদুর রশীদ সম্পাদনা করেন ‘শহীদুল জহির স্মারকগ্রন্থ’। বইটি এখন আউট অব প্রিন্ট। বলাই বাহুল্য, সংকলনগুলো জহিরের সব কাজকে সাহিত্যানুরাগী, অনুবাদক ও গবেষকদের নাগালের মধ্যে এনে দিয়েছে। হয়তো তাঁদেরই কারও কাজের সূত্র ধরে আগামী সময়ে বিশ্বসাহিত্যের আসরে জহির আলোচিত হবেন। হবে তর্ক–বিতর্ক, আলাপ ও সংলাপ।

জহিরের গল্প ইংরেজিতে অনুবাদ করার ক্ষেত্রেও আবদুর রশীদ আমাকে ও ভি রামস্বামীকে যথেষ্ট উৎসাহিত করেছিলেন।

মোহাম্মদ আবদুর রশীদের সেলফিতে শাহরোজা নাহরিন ও তাঁর স্বামী রাশেকুর রহমান

গত বছর মে মাসে অধ্যাপক রশীদের সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়। সেটা ছিল আমার বিয়ের দুদিন পর। চারটে রজনীগন্ধার স্টিক ও একবাক্স রসগোল্লা নিয়ে তিনি পাঠক সমাবেশে হাজির। আমাকে শুভেচ্ছা জানাতে! এরপর আমি মন্ট্রিয়লে ফিরে এলাম। তখন ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদুল জহিরের ওপর স্নাতকোত্তর করছি। আমার গবেষণায় কাজে লাগবে ভেবে জহিরের সেই আউট অব প্রিন্ট স্মারকগ্রন্থ আবদুর রশীদ কীভাবে যেন জোগাড় করে ফেললেন! এরপর আমার বরের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজেই উত্তরা থেকে বাসে করে কাঁটাবনে এসে পৌঁছে দিলেন বইটা। তাঁর আচরণে কখনোই কোনো অহম প্রকাশ পায়নি।

বিজ্ঞজনেরা বলেন, শিল্পের নিজস্ব সত্ত্বা আছে। জীবন ও মৃত্যু আছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর রূপ বদলায়। পুনরুজ্জীবিত হয়। শিল্প কোনো নির্জন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রকল্প নয়। অনেকের হাত ধরে তা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছায়। শিল্পের সেই বিস্তারের স্বার্থে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দিতে যে ঔদার্যের প্রয়োজন, আবদুর রশীদের মধ্যে তা ছিল।

জহিরের অনেক লেখায় বহুবচনের ব্যবহার আছে। ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’য় এর আভাস পাওয়া যায়। ‘আমাদের কুটিরশিল্পের ইতিহাস’-এ তা পূর্ণ রূপে ধরা দেয়। যেমন শেষেরটিতে, গল্পের বক্তা বলেন, ‘তখন মহল্লায় মাছি বেড়ে যায় এবং আমরা তরমুজওয়ালাদের বলি, মিয়ারা, মাছির দিনে তরমুজ লয়া আহ ক্যালা!’ জহির কেন বহুবচনে লেখেন, সে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে রশীদ বলেন, ‘জহির “সিংগুলার” নাম্বার থেকে কেন “প্লুরাল” নাম্বারে গেলেন? “আমি” নয় “আমরা”, “মহল্লার লোকেরা”, “তারা দেখতে পেল” ইত্যাদি… এর ভেতর দিয়ে যৌথ জীবনযাপনবোধ, সামাজিক-সামষ্টিক সত্যের শাশ্বত দিকটিই উন্মোচন করতে চেয়েছেন জহির। “আমিত্ব” নয় “আমরা”। কেননা “আমিত্ব” খণ্ডিত, “আমরা”ই পূর্ণাঙ্গ।’ ব্যক্তিগত জীবনে রশীদ নিজেও ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে সামষ্টিক স্বার্থকে বড় করে দেখেছেন। তিনি নিজে বলেছেন, এই সমগ্র ছাপতে প্রকাশকের কাছ থেকে একটি পয়সাও নেননি।

আমার কানাডাবাসের সময় রশীদ সাহেবের সঙ্গে ফেসবুকে যোগাযোগ হতো। সেই সুবাদে তাঁর কাছ থেকে জহিরের লেখনী সম্বন্ধে পেয়েছি চমকপ্রদ সব তথ্য। যেমন, জহির নাকি ‘আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু’ বইটি প্রায় বাতিল করতে বসেছিলেন! আর সেই উপন্যাসই কিনা প্রথম আলো বর্ষসেরা পুরস্কার (১৪১৫) পেল। আরেকবার শুনেছিলাম, জহির যখন গল্পের চরিত্রের নামকরণ নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়তেন, তখন অনুপ্রেরণার খোঁজে পুরান ঢাকার অলি–গলিতে হেঁটে বেড়াতেন। এরপর ব্যানার বা পোস্টারে পাওয়া কোনো নাম পছন্দ হলে খাতায় টুকে নিতেন। পরে আমি রেজাউল করিমের নেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে জহিরের জবানবন্দি পাই, ‘আমি নাম নির্ণয় করতে পারি না। এ জন্য অনেক সময় পত্রিকায় নাম দেখলে আমার পছন্দ হলে পরে নলেজে রাখি। যেমন কিছু মহিলার নাম আমি পত্রিকা থেকে পেয়েছি। নিমফল দাসী নামটি পত্রিকা থেকে পাওয়া। খৈমনও পত্রিকা থেকে পাওয়া।’

আমার কানাডাবাসের সময় রশীদ সাহেবের সঙ্গে ফেসবুকে যোগাযোগ হতো। সেই সুবাদে তাঁর কাছ থেকে জহিরের লেখনী সম্বন্ধে পেয়েছি চমকপ্রদ সব তথ্য। যেমন জহির নাকি ‘আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু’ বইটি প্রায় বাতিল করতে বসেছিলেন! আর সেই উপন্যাসই কিনা প্রথম আলো বর্ষসেরা পুরস্কার (১৪১৫) পেল। আরেকবার শুনেছিলাম, জহির যখন গল্পের চরিত্রের নামকরণ নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়তেন, তখন অনুপ্রেরণার খোঁজে পুরান ঢাকার অলি–গলিতে হেঁটে বেড়াতেন। এরপর ব্যানার বা পোস্টারে পাওয়া কোনো নাম পছন্দ হলে খাতায় টুকে নিতেন।

মাঝেমধ্যে আবদুর রশীদ আক্ষেপও করতেন। তাঁর অনুবাদের গতি আগের তুলনায় শ্লথ হয়ে গেছে, লেখালেখিতে উৎসাহ-উদ্দীপনা খুঁজে পান না ইত্যাদি। আবদুর রশীদের মৃত্যুর পর তাঁর পুরোনো ফেসবুক বার্তা আমার চোখে ভিন্ন আলোয় ধরা দিল। আমরা কেন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সেভাবে কথা বলি না!

তাঁর পুরোনো লেখায় আমি যেন পুরোনো ‘আমি’কে খুঁজে পেলাম। নিজের দিকে ফিরে তাকালাম। যে উদ্যম ও কর্মস্পৃহা নিয়ে আমি বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলাম, তা নানা ঘটনার টানাপোড়েনে স্তিমিত হতে চলেছিল! যে সাহস নিয়ে দেশ পাড়ি দিয়েছিলাম, সে সাহস অনেকটাই ক্ষয়ে গিয়েছিল! সেই ‘আমি’-এর সামনে আবদুর রশীদের মন্তব্যগুলোর মর্মার্থ এখন ভিন্ন। শ্রোতা হিসেবে আমার কী করণীয় ছিল? একজন বিপন্ন মানুষ কি আরেক বিপন্ন মানুষকে টেনে তুলতে পারে? নাকি দুজনই একসঙ্গে বিপন্ন হয়?

আবদুর রশীদ নিঃসঙ্গ বোধ করলে কী করতেন? কাজে বুঁদ হয়ে যেতেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুর রশীদ একাধারে মৌলিক ও অনুবাদগ্রন্থ রচনা করেছেন। অনুবাদ করেছেন স্যামুয়েল পি হান্টিংটনের ‘দ্য ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস অ্যান্ড দ্য রিমেকিং অব ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ (২০০৯), নোয়াম চমস্কির ‘ফেইল্ড স্টেটস’ (২০০৯), অরল্যান্ডো ফাইজেসের ‘রেভল্যুশনারি রাশিয়া, ১৮৯১-১৯৯১’ ইত্যাদি। এ ছাড়া তাঁর ‘বাংলাদেশের রাজনীতি: যুদ্ধাপরাধী জামায়াত এবং জঙ্গী প্রসঙ্গ’ শীর্ষক মৌলিক গ্রন্থটি ছয় খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।

অবসরে বাগান করতেন আবদুর রশীদ। সংগীতে খুঁজে পেতেন স্বস্তি। শহীদুল জহির নাকি তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত পছন্দ করতেন! হঠাৎ গানের কলি ভাঁজতে ভাঁজতে শিশুকালের কথাও পাড়তেন রশীদ। স্মরণ করতেন প্রথম কলের গান শোনার অভিজ্ঞতা, সন্ধ্যায় বাবার পুঁথিপাঠ। আর স্মৃতিচারণার ফাঁকে তাঁর বাগানের ফুলের গল্প করতেন। সুযোগ পেলেই ফিরে যেতেন পূর্বাচলে, নিজের ফুলের বাগানে। সেই বাগানের ছবি বন্ধুদেরও পাঠাতেন।

শহীদুল জহির

‘আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু’ উপন্যাসের শেষ ভাগজুড়ে শুধু কবরস্থানের বর্ণনা। জহির লিখেছেন, ‘আবু ইব্রাহীমের মৃত্যুর পর তার কবরের ওপর সবুজ ঘাস ছেয়ে যায়, সেখানে নির্মেঘ আকাশে চাঁদ হেসে ওঠে, ছুঁচোর চিৎকারে বাতাস মুখরিত হয়’। নিশ্চয়ই আবদুর রশীদ চলে যাওয়ার পর তাঁর ফুলবাগানেও ফুলেদের গায়ে শিশিরফোঁটা জমে। বাতাসে দুলে ওঠে পাতারা। শুধু সেই রসাস্বাদন করার লোকটি অনুপস্থিত থেকে যান। কারণ, জন্মদিনের আগের সন্ধ্যায় বাজার নিয়ে ফেরার পথে জীবনানন্দ দাসের মতো ট্রেনের নিচে কাটা পড়েন তিনি।

প্রাসঙ্গিক কি অপ্রাসঙ্গিক, রশীদ প্রায়ই একটা কথা উচ্চারণ করতেন। কোনো দিন আচমকা লিখে বসতেন, ‘আমি আর খুব বেশি দিন পৃথিবীতে আছি, এমন ভরসা করতে পারছি না। ধরে নিন, আমি আপনার কাছে দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছি।’ অথবা ‘আমার অবর্তমানে শহীদের কাজগুলোর ধারাবাহিকতা আপনাদেরই (মানে, ভি রামস্বামী ও আমাকে) করতে হবে!’ এ মুহূর্তে তাঁর নির্দেশ বা অনুরোধ আমার কাছে অলঙ্ঘনীয় ঠেকছে। যেন রিলেরেসের পরবর্তী ব্যাটন দিয়ে গেলেন। উপমাটা যদিও আমার নয়, মাহমুদুজ্জামান বাবুর।

আবদুর রশীদ মরে গিয়েও মরলেন না। মানুষ তাঁর কাজের মধ্যেই তো বেঁচে থাকে!