সুলতান কতুবউদ্দিন মুবারক খিলজির স্বর্ণমুদ্রা ও সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির প্রতিকৃতি অবলম্বনে। প্রথম আলো গ্রাফিকস।
সুলতান কতুবউদ্দিন মুবারক খিলজির স্বর্ণমুদ্রা ও সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির প্রতিকৃতি অবলম্বনে। প্রথম আলো গ্রাফিকস।

সুলতানের জন্য বন্ধ ছিল সুফির দরজা

‘কুজা অনদখতাম দার দেল/ মাগার অনদখতাম দার গেল’

দিল্লির মসনদে তখন সুলতান কুতুবউদ্দিন খিলজি। আর দিল্লির উপকণ্ঠে শহরতলি গিয়াসপুরে চিশতিয়া তরিকার মহান শায়খ হজরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়ার খানকাহ। ভক্ত, মুরিদ ও আপামর জনসাধারণের মাঝে তিনি ‘হুজুর মাহবুবে ইলাহি’ নামে সুপরিচিত। সুলতানের দরবার থেকে পয়গাম এল মাহবুবে ইলাহির নামে। হজরত তখন ভক্ত-মুরিদদের নিয়ে মজলিসে। সুলতানের দূত পয়গাম তুলে দিলেন মাহবুবে ইলাহির হাতে। অভিযোগ গুরুতর। সুলতানের কাছে গোয়েন্দা তথ্য আছে যে নিজামউদ্দিন আউলিয়ার আস্তাবলে ঘোড়া বাঁধার জন্য স্বর্ণের খুঁটি ব্যবহার করা হয়! অথচ হজরত একজন সুফি! দুনিয়া পরিত্যাগের দাবি করেন! ভক্ত-মুরিদদেরও সেই মতে দেশনা দেন! তবে কেন এ দ্বিচারিতা! অনতিবিলম্বে হজরতের কাছ থেকে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। নিজামউদ্দিন আউলিয়া মুচকি হাসলেন। লেফাফার ওপর কেবল লিখে দিলেন পঙ্‌ক্তি দুটি। যার বঙ্গানুবাদ করলে দাঁড়ায়—‘হৃদয়ে রাখিনি তা, বরং গেড়েছি পঙ্কের মাঝে।’ এর মাধ্যমে খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া বোঝালেন যে সুলতানের মতো সুফির অন্তরে স্বর্ণের বাসনা নেই। স্বর্ণ যদি কোথাও থেকে থাকে তবে সেটি তার প্রকৃত স্থান তথা কাদার মধ্যেই আছে। সুফির উত্তরে কলেবরে কম, কিন্তু বহরে বেশি। পঙ্‌ক্তিদ্বয় বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে এর মাধ্যমে হুজুর মাহবুবে ইলাহি একদিকে নিজের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করলেন, অন্যদিকে দুনিয়ার মোহমায়ায় আচ্ছন্ন সুলতানের হৃদয়কে কাদার সঙ্গে তুলনা করলেন।

চিশতিয়া তরিকার সুফিগণ সুলতানদের সংশ্রব এড়িয়ে চলতেন। সুলতানদের দরবারে তাঁরা যেমন যেতেন না, তেমনি সুলতানদেরও নিজেদের খানকাহতে আসার অনুমতি দিতেন না। হজরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া এ রীতি কঠোরভাবে মেনে চলতেন। সুলতান তথা ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি মাহবুবে ইলাহি তাঁর পূর্ববর্তী এক সুফির গল্পের মাধ্যমে বয়ান করেছিলেন। ওই সুফি পারস্যের কোনো এক শহরে বসবাস করতেন। একদিন স্বীয় খানকাহর দরজায় বসে তিনি কাপড় সেলাই করছিলেন। পা দুটি সামনের দিকে টেনে রাখা, ঊরুর ওপর কাপড় রেখে তিনি সূচিকর্মে নিবিষ্ট ছিলেন। এমন সময়ে সে অঞ্চলের সুলতান মোসাহেব ভ্রমণে বের হলেন। ঘুরতে ঘুরতে একসময় তিনি হাজির হলেন সুফির খানকাহর সামনে। সুফির কোনো বিকার নেই। মোসাহেবরা ক্ষেপে গেলেন। তাঁরা সুফিকে তিরস্কার করে বললেন—‘স্বয়ং সুলতান এসেছেন, আর আপনি তাঁকে দাঁড়িয়ে সম্মান জানানো তো দূর কি বাত, এমনকি পা দুটিও গুটিয়ে নিচ্ছেন না!’ সুফি স্মিতহাস্যে বললেন, ‘বাছা, আমি তো হাত গুটিয়ে নিয়েছি, পা টেনে রাখতে তাই কোনো বাধা নেই আর!’ অর্থাৎ সুফি কোনো বিষয়েই সুলতানের মুহতাজ নন। তাই দুনিয়াদার যেভাবে সুলতানকে সম্মান জানাবে, সেভাবে সম্মান জানাতে তিনি বাধ্য নন। খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মালফুজাত ‘ফাওয়ায়েদ আল ফুয়াদ’ গ্রন্থে এ গল্পটি সংকলিত হয়েছে। হুজুর মাহবুবে ইলাহির অন্যতম মুরিদ হজরত খাজা আমির হাসান সিজঝি এ মালফুজাতের সংকলক। নিজামউদ্দিন আউলিয়ার ব্যাপারে এ মালফুজাতকেই সবচেয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে ঐতিহাসিকগণ রায় দিয়েছেন। খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়ার পীর ছিলেন হজরত খাজা বাবা ফরিদউদ্দিন মাসউদ (র.)। তাঁর উপাধি ছিল গঞ্জে শকর (অর্থ—চিনির বাজার)। সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন একদা বাবা ফরিদের খানকাহতে গিয়েছিলেন। তখনো তিনি সুলতান হননি। দিল্লির সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের অধীন তিনি তখন পাঞ্জাব প্রদেশের প্রশাসক ছিলেন। বাবা ফরিদের খানকাহ ছিল পাঞ্জাবের পাকপাতান (পূর্ব নাম আজোধান) শহরে। বলবন বাবা ফরিদকে নজরানাস্বরূপ সুলতানি মোহর ও মদদে মা’আশ হিসেবে কয়েকটি গ্রাম দিতে চাইলেন। বাবা ফরিদ সেসব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন—‘এমন অনেকেই আছে, যাদের এসবের প্রয়োজন আমার চেয়ে বেশি। আপনি এগুলো বরং তাঁদেরকেই দিয়ে দিন।’ ঘটনাটি নিজামউদ্দিন আউলিয়ার বয়ানে ফাওয়ায়েদ আল ফুয়াদে পাওয়া যায়। সুলতান জালালউদ্দিন খিলজি নিজামউদ্দিন আউলিয়াকে মদদে মা’আশ হিসেবে দুটি গ্রাম দিতে চেয়েছিলেন। বাবা ফরিদের পদাঙ্ক অনুসরণে নিজামউদ্দিন আউলিয়াও তা প্রত্যাখ্যান করেন।

সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি হজরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়ার ভক্ত ও অনুরক্ত ছিলেন। তাঁর পুত্র খিজির খান ও শাদি খান, উজির খতির উদ্দিন, কোতোয়াল আলাউল মুলকসহ দরবারের বহু আমির ওমরাহ হুজুর মাহবুবে ইলাহির অনুরক্ত ছিলেন। খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মুরিদদের মধ্যে অন্যতম হজরত আমির খসরু, হজরত আমির হাসান সিজঝি, হজরত জিয়াউদ্দিন বারানি সুলতানের দরবারের আমির ছিলেন। আমির খসরু ও আমির হাসান সিজঝি কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন এবং জিয়াউদ্দিন বারানি ঐতিহাসিক হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। দিল্লি সালতানাত বিষয়ে বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ ‘তারিখ-ই-ফিরোজ শাহী’ তাঁরই রচনা। সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি বহুবার নিজামউদ্দিন আউলিয়ার খানকাহতে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু মাহবুবে ইলাহি প্রতিবার তাঁকে এই বলে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, ‘ফকিরের খানকাহতে সুলতানের কী কাজ! আমি তাঁর জন্য দোয়া করি যেন তিনি যথাযথভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন। আমার এখানে আসার কোনো প্রয়োজন নেই।’ তারপরও সুলতান নানাভাবে চেষ্টা করতে লাগলেন। এমনকি আমির খসরুর মাধ্যমেও তিনি খাজা নিজামের কাছে তদবির করেন। আমির খসরু ছিলেন মাহবুবে ইলাহির সবচেয়ে প্রিয় মুরিদ। তাই সুলতান ভেবেছিলেন যে হয়তো নিজামউদ্দিন আউলিয়া আমির খসরুর অনুরোধ ফেলতে পারবেন না। কিন্তু এ উপায়েও সুলতান ব্যর্থ হলেন। একপর্যায়ে সুলতান ঘোষণা দেন যে তিনি জোর করে সুফির খানকাহতে যাবেন। তখন খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া বলেছিলেন, ‘এ ফকিরের খানকাহতে দুটি দরজা। যদি সুলতান সামনের দরজা দিয়ে খানকাহতে প্রবেশ করেন, তবে আমি আমার দরবেশদের নিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে যাব এবং এ স্থান পরিত্যাগ করব।’ সুফির এ কথায় সুলতান অতঃপর এহেন প্রচেষ্টায় ক্ষান্ত দেন।

সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির পুত্র সুলতান কুতুবউদ্দিন মুবারক খিলজি পিতার মতো খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়ার অনুরক্তে ছিলেন না। বরং তিনি খাজা নিজামের আধ্যাত্মিক প্রভাবকে নিজের মসনদের জন্য হুমকি মনে করতেন। সুলতান কুতুবউদ্দিন ১৩১৬ থেকে ১৩২০ সাল অবধি দিল্লির সুলতান ছিলেন। সিংহাসনে আরোহণের পথে তিনি প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাঁর ভাই খিজির খান ও শাদি খানকে হত্যা করেছিলেন। উভয়েই মাহবুবে ইলাহির মুরিদ ছিলেন। এ ছাড়া সুলতানের দরবারের বহু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা খাজা নিজামউদ্দিন ভক্ত ও মুরিদ ছিলেন। এ কারণে সুলতান সব সময় একটা অমূলক চিন্তায় ভুগতেন যে নিজামউদ্দিন আউলিয়া বুঝি তাঁর প্রভাব খাটিয়ে সালতানাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাবেন। তাই কুতুবউদ্দিন খাজা নিজামের প্রতি চূড়ান্ত বিদ্বেষ পোষণ করতেন এবং সুফিকে নানাভাবে আক্রমণ করতে থাকেন। নিজামউদ্দিন আউলিয়াকে দমনের জন্য সুলতান সোহরাওয়ার্দী তরিকার শায়খ হজরত রুকনউদ্দিন সোহরাওয়ার্দীকে মুলতান থেকে দিল্লিতে আমন্ত্রণ জানান। খাজা রুকনউদ্দিন ছিলেন সোহরাওয়ার্দী তরিকার বিখ্যাত শায়খ হজরত খাজা বাহাউদ্দিন জাকারিয়া মুলতানির (র.) দৌহিত্র। এখানে একটি মজার ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। খাজা রুকনউদ্দিন যেদিন দিল্লিতে আগমন করেন, সেদিন সুলতান স্বয়ং দিল্লি নগরের প্রধান তোরণ থেকে তাঁকে স্বাগত জানান। সুলতান খাজা রুকনউদ্দিনের ঘোড়ার রজ্জু ধরে সসম্ভ্রমে তাঁকে প্রশ্ন করেন, ‘বলুন তো, এ শহরের মধ্যে আপনার সঙ্গে প্রথম কে সাক্ষাৎ করেছেন?’ খাজা রুকনউদ্দিন সহাস্যে উত্তর দেন, ‘এ শহরের সর্বোত্তম ব্যক্তিই সর্বপ্রথম আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।’ সুলতানের মুখে গর্বের হাসি। কারণ, তিনিই তো প্রথম খাজা রুকনউদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সুলতান তাই আবার বললেন, ‘মহোদয় কি দয়া করে তাঁর নামটি সবার সামনে উচ্চারণ করবেন?’ সুলতানের মুখের হাসি মিলিয়ে দিয়ে খাজা রুকনউদ্দিন বললেন, ‘আমার সঙ্গে সর্বপ্রথম যিনি সাক্ষাৎ করেছেন, তাঁকে সারা হিন্দুস্তানের জনগণ সুলতানুল মাশায়েখ খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া নামে জানে!’ বস্তুত খাজা রুকনউদ্দিনের দিল্লিতে আসার দিনক্ষণ খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া অবগত হয়ে দিল্লির প্রধান তোরণ থেকে আরও খানিকটা এগিয়ে গিয়ে খাজা রুকনউদ্দিনকে অভ্যর্থনা জানিয়ে এসেছিলেন। সে সংবাদ সুলতানের কাছে ছিল না। সোহরাওয়ার্দী ও চিশতি তরিকার মাঝে শুরু থেকেই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। খাজা রুকনউদ্দিনের পিতামহ খাজা বাহাউদ্দিন জাকারিয়া মুলতানি ও নিজামউদ্দিন আউলিয়ার পীর হজরত বাবা ফরিদউদ্দিন মাসউদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তাই খাজা রুকনউদ্দিন ও নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মধ্যে অন্তরঙ্গতা তৈরি হতেও বেশি সময় লাগেনি। খাজা রুকনউদ্দিন নিজামউদ্দিন আউলিয়ার এতটাই গুণমুগ্ধ ছিলেন যে তিনি নিজামউদ্দিন আউলিয়াকে ‘শাহেনশাহে দ্বীন’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। খাজা নিজামের ওফাতের পর তাঁর জানাজা পড়িয়েছিলেন হজরত রুকনউদ্দিন সোহরাওয়ার্দী।

সুলতানের পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। কিন্তু উদ্যম কমল না। তিনি নিত্যনতুন উপায়ে নিজামউদ্দিন আউলিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ শাণাতে লাগলেন। সুলতানি দরবারের একটা রীতি ছিল যে প্রতি চান্দ্রমাসে নতুন চাঁদ ওঠার রাতে দিল্লি শহরের সব আমির–ওমরাহ, আলেম–ওলামা, শায়খ, সুফি, বুজুর্গ সবাই সুলতানকে সম্মান জানাতে তার দরবারে যেতেন। কিন্তু নিজামউদ্দিন আউলিয়া কখনো যাননি। তিনি বরং তার প্রতিনিধি হিসেবে কাউকে পাঠিয়ে দিতেন। এ নিয়ে সুলতানের মনে চরম ক্ষোভ ছিল। সুলতান খাজা নিজামের খানকাহতে ফরমান পাঠালেন যে এ চান্দ্রমাসের চাঁদরাতে অবশ্যই নিজামউদ্দিন আউলিয়াকে সুলতানের দরবারে হাজির হয়ে সুলতানকে সম্মান জানাতে হবে। কোনো প্রতিনিধি পাঠানো চলবে না। অন্যথায় তাঁকে দিল্লি শহর ত্যাগ করতে হবে। এদিকে নিজামউদ্দিন আউলিয়ার ছোটবেলা থেকেই একটি আদত ছিল যে তিনি প্রতি চাঁদরাতে তাঁর জননীকে কদমবুচি করে দোয়া নিতেন। মায়ের ইন্তেকালের পরও এ রীতিতে ছেদ পরেনি। প্রতি চাঁদরাতে তিনি মায়ের মাজার জেয়ারতে যেতেন। উল্লেখ্য, হজরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মা হজরত বিবি জোলায়খাও (রহ.) একজন সুফি ছিলেন। অদ্যাবধি দিল্লির আপামর জনসাধারণের মাঝে তিনি ‘মায়ি সাহেবা’ নামে পরিচিত। সুলতানের এ ফরমান জারির পর খানকাহর সবাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলেন। হুজুর মাহবুবে ইলাহি কিন্তু অবিচলিত। ধীরে ধীরে চাঁদরাত ঘনিয়ে আসতে লাগল। এর মধ্যে হুজুর মাহবুবে ইলাহি একসময় মায়ি সাহেবার মাজার জিয়ারত করে ফরিয়াদ করলেন, ‘আম্মাজান, আমি প্রতি চাঁদরাতে আপনার জিয়ারতে আসি। কিন্তু আর হয়তো আমি জিয়ারতে আসতে পারব না। আপনার নিজামকে দিল্লি ছেড়ে চলে যেতে হবে। আপনি আমার জন্য দোয়া করবেন।’ খোদার কুদরত! দিল্লি সালতানাতে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র লেগেই থাকত। তেমনি এক প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে সেই চাঁদরাতের আগেই সুলতান কুতুবউদ্দিন খিলজি নিহত হন।

সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক ভারতবর্ষে তুঘলকি শাসনামলের প্রতিষ্ঠাতা। ১৩২০ থেকে ১৩২৫ সাল অবধি তাঁর রাজত্বকাল। তিনিও খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়াকে সুনজরে দেখতেন না। তাঁর ওফাতের সঙ্গেও নিজামউদ্দিন আউলিয়ার একটি কারামতকে সম্পর্কিত করা হয়। সুলতান একবার বাংলায় বিদ্রোহ দমন করতে গেলেন। সেখান থেকে তিনি নিজামউদ্দিন আউলিয়ার প্রতি ফরমান জারি করলেন যে সুলতান দিল্লিতে পৌঁছার পূর্বেই যেন খাজা নিজাম দিল্লি শহর ত্যাগ করেন। অন্যথায় হুজুর মাহবুবে ইলাহির জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। এ ফরমান নিজামউদ্দিন আউলিয়ার হাতে এলে তিনি তাঁর জবাবে লেফাফার এক কোনায় লিখে দেন, ‘হনুজ দিল্লি দুর আস্ত’, অর্থাৎ দিল্লি এখনো দূর আছে! সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক বাংলার বিদ্রোহ দমন করে ফিরলে দিল্লি উপকণ্ঠে তাঁর অভ্যর্থনার জন্য বিশাল মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়। সুলতান সে মঞ্চে আরোহণ করলে একপর্যায়ে মঞ্চ ধসে গিয়ে তিনি নিহত হন।

সুলতানুল মাশায়েখ হজরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়ার খানকাহ ছিল আধ্যাত্মিক সাধনার প্রাণকেন্দ্র। তিনি ছিলেন এমন এক সুফি, যার দুয়ারে এসে সব সুলতানের বিজয়রথ থেমে যেত। তাঁর ওফাতের পর তাঁর মাজার হয়েছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব আত্মানুসন্ধানী মানুষের রুহের সুকুন। হজরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়ার ইন্তেকালের পর আট শতক পেরিয়ে গেছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাঁর রুহানি ফুয়ুজাতের তেজ!