চট্টগ্রামের পাল্টা মনসার আসরের ছবি অবলম্বনে প্রথম আলো গ্রাফিকস
চট্টগ্রামের পাল্টা মনসার আসরের ছবি অবলম্বনে প্রথম আলো গ্রাফিকস

মঙ্গলকাব্যের পদ্মাপুরাণ: বাংলাদেশের লোকধারা

লৌকিক দেব-দেবীর মাহাত্ম্য কীর্তন করে রচিত আখ্যানমূলক পদ্য মঙ্গলকাব্য। এই কাব্যধারার প্রধান আখ্যান ও কাহিনিগুলোর বৈশিষ্ট্য স্বমহিমায় উজ্জ্বল। যার প্রধান বৈশিষ্ট৵ তার কাব্যরীতি ও বিষয়বস্তু। মঙ্গলকাব্যরীতির বেশ কিছু গ্রন্থের নাম পাওয়া যায়। এর মধ্যে দেবলোক ও মর্ত্যলোক মিলে রচিত আখ্যান ‘পদ্মাপুরাণ’। কালকেতু ও ফুল্লরার কাহিনি বা দেবী চণ্ডীর মহিমা নিয়ে রচিত আখ্যান ‘চণ্ডীমঙ্গল’। রাঢ় অঞ্চলের লৌকিক দেবতা গৌড়ের রাজা ও মহাপ্রতাপশালী লাউসেনের কাহিনি বা ‘ধর্মঠাকুর’-এর মাহাত্ম্য নিয়ে রচিত আখ্যান ‘ধর্মমঙ্গল’ কাব্য অন্যতম।

এ ছাড়া মঙ্গলকাব্য রীতিতে দেবদেবী উপজীব্য করে রচিত কিছু ছোট আখ্যান রয়েছে। অন্নদামঙ্গল কাব্য, শিবায়ন বা শিবমঙ্গল, কালিকামঙ্গল, সারদামঙ্গল, শীতলামঙ্গল, কমলামঙ্গল ইত্যাদি। মনে করা হয় ১৩০০ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে রচিত এসব আখ্যান মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ।

এই মঙ্গলকাব্য ধারার অন্যতম আখ্যান পদ্মাপুরাণ। রচয়িতার জবানিতে ‘মা মনসা অধিষ্ঠান হয়ে তাঁকে দিয়ে এই গ্রন্থ রচনা করিয়েছেন।’কাজেই মনসার ভক্তরা মনে করেন, এই কাব্য শ্রবণে মঙ্গল হয় এবং বিপরীতে হয় অমঙ্গল; যে কাব্য মঙ্গলাধারা, এমনকি যে কাব্য ঘরে রাখলেও মঙ্গল হয়। মঙ্গলের আধার যে কাব্যগ্রন্থ, তা–ই মঙ্গলকাব্য।

মঙ্গলকাব্য ধারার মনসামঙ্গল বা পদ্মাপুরাণ গ্রামবাংলার প্রাচীনতম ঐতিহ্য। সর্পদেবীকে নিয়ে দেবলোক বাদ দিয়ে বাকি কাহিনিজুড়ে আছে লৌকিক বেহুলা-লখিন্দর কাহিনি। মধ্যযুগের কবিদের মধ্যে পদ্মাপুরাণের রচয়িতা কানাহরি দত্ত, বিজয়গুপ্ত, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ ও নারায়ণ দেবের নাম করা যায়। পদ্মাপুরাণ সাধারণত মনসাবন্দনা হিসেবেই পাঠ করা হয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি পঠিত বিজয় গুপ্তের পদ্মাপুরাণ। কারণ, বরিশালের বিজয় গুপ্ত রচিত পদ্মাপুরাণের ভাষা অন্যগুলোর চেয়ে অনেকটাই সরল।

তবে ভারতের করিমপুর থেকে প্রকাশিত ‘বাইশ কবি পদ্মপুরাণ’নামের কাব্যগ্রন্থ এ সময়ে দেশের সর্বত্রই পঠিত হয়। এই বইতে পদ্মাপুরাণকে পদ্মপুরাণ বলা হয়েছে। এখানে একটি বিষয় আলোচ্য হলে  বোঝার সহজ হবে। হিন্দু ধর্মের ১৮ টি পুরাণের কথা আছে যার একটি পদ্মপুরাণ। এই বাইশ কবি পদ্মপারাণের নাম  সেই অতিপুরাণ থেকে নেয়া বলেই মনে হয়। কাহিনীতেও তার কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়।  
মনসাভক্তরা মধ্য শ্রাবণ থেকে পদ্মাপুরাণ কাব্য পাঠ শুরু করেন। ধারাবাহিক পাঠ চলে, শ্রাবণ মাসের শেষ দিন পাঠ শেষ করে মনসাকে প্রণতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে সারা বছরের মনসাবন্দনার ইতি টানেন ভক্তকুল।

দীর্ঘদিনের লৌকিক গায়কি রীতি ও আঞ্চলিক পরিবেশনা–পদ্ধতির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পদ্মাপুরাণের আঞ্চলিক ও লৌকিক প্রচলনে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। সেই সঙ্গে স্থানভেদে পদ্মাপুরাণ, বেহুলার গান, বেহুলা-লখিন্দরের গান, ঝাপান গান, ভাসান গান, সাতঘাটের মাগন, বেহুলার নাচারি, শাওনের ঢালা, বিষহরির গান, পাল্টা মনসা, রয়ানি গান—এমন নানা নামে ডাকা হয়।

সামাজিক–অর্থনৈতিক অবস্থা ও পরিবেশগত কারণে, প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের প্রভাবে বিভিন্ন অঞ্চলের পদ্মাপুরাণের পরিবেশনা রীতি, শাব্দিক ও গায়কি পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। দেশের সর্বদক্ষিণের জনপদ বরিশাল থেকে শুরু করে উত্তরের জনপদে পা রাখলে সারা দেশের একটি চিত্র পাওয়া যেতে পারে।

বরিশালের রয়ানি গান

রয়ানি গান

বরিশালের আঞ্চলিক ধারায় পদ্মাপুরাণের বিশেষ গায়কি ঢংকে বলা হয় রয়ানি গান। পদ্মাপুরাণের রচয়িতা বিজয় গুপ্তের জন্মস্থান আগৈলঝাড়ার গৈলায় আছে কবির প্রতিষ্ঠিত মনসা মন্দির। এই মন্দিরে রয়ানি গানের আসর প্রায় সারা বছরই হয়ে থাকে। তবে শ্রাবণ মাসে আয়োজন করেই পদ্মাপুরাণ পাঠ করা হয়। বিশেষজ্ঞমতে বরিশাল, পটুয়াখালী, ফরিদপুর, মাদারীপুর এবং শরীয়তপুর নিয়ে রয়ানি সংগীতাঞ্চল। কবি বিজয় গুপ্ত নিজেই বলেছেন, এই পদ্মাপুরাণ স্বয়ং মনসা দেবী তাঁর ওপর ভর করে লিখেছেন। কাজেই গানে মনসাভক্তি ও প্রণতি প্রধান।

স্বভাবে পাঁচালী গীত নানা দোষময়।
না লবে গীতের দোষ পণ্ডিত যিবা হয়।
বিজয় গুপ্ত বলে গাইন হও সাবহিত।
পয়ার এড়িয়া বল ল্যাচারীর গীত।
বিজয় গুপ্ত রচে পুথি মনসার বর।
স্বপ্নাধ্যায় পালা গাই এখানে সোসার।

অগৈলঝাড়ায় দেশসেরা রয়ানি শিল্পীরা পরিবেশন করেন রয়ানি গান।

তবে মাঠপর্যায়ে ক্ষেত্রসমীক্ষায় এটা বলা যায়, এ সময়ের রয়ানি গানের সেরা শিল্পী ঝালকাঠির ইন্দ্রজিৎ কীর্তনিয়া। এক রাতে ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার পশ্চিম চেঁচরি গ্রামে কীর্তনিয়ার নিজ বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। বাড়ির আঙিনার এক পাশে আছে মনসা মন্দির, আঙিনাজুড়ে শামিয়ানা টানানো হয়েছে। মাটিতে বিছানো হয়েছে ধানের খড়। মধ্যখানে পাটি বিছিয়ে তার মাঝখানে জায়গা রেখে গোল হয়ে বসেছেন বাদ্যযন্ত্রীরা। মাঝখানে কীর্তনীয়া ও তিনজন সহযোগীকে নিয়ে বাবরি চুলের বাহারি নাচে পরিবেশন করছেন গান। ইন্দ্রজিৎ কীর্তনিয়ার স্ত্রী, সঙ্গে বাদকসহ দুজন সহযোগী শিল্পীকে নিয়ে তাঁদের দল।

চলছে বেহুলার বর্ণনা—
চুল নাই তোর, নাই অভাগী
কুলের লেইগ্গা কান্দে,
কচুপাতা ডিপা দিয়া
ডাঙ্গর খোঁপা বান্দে।

এক অপূর্ব গায়কি ঢং। মাঝখানে দাঁড়িয়ে নির্দেশনা ও নেতৃত্ব দিচ্ছেন কীর্তনিয়া। তাঁর সহযোগীরা চারদিকে বসা দর্শককে উদ্দেশ করে ঘুরে ঘুরে গান করছেন। আগত সব দর্শক–শ্রোতাকে সমান গুরুত্ব দিতে ঘুরে ঘুরে আঙুল নির্দেশ করে গাইছেন।

দুজন নবজীবন প্রার্থী রোগীর সুস্থতা কামনায় মানতের অংশ হিসেবে পরিবেশিত হচ্ছে এই গান।

‘রজনী প্রভাতু কালে কাকে ডাকে ঠাই ঠাই।
নল খাঁক কাটিয়া তলে বুনিল খাড়ৈ,
মন দিয়া সাত ভাই রহিল হাতাহাত।
আঙ্গল অস্তু বা দল এক এক গাছ বেতি।
আথেবাথে খাড়ৈ বুনাইয়া করিল সাখা।
---
খাড়ৈ হাতে করিয়া গঙ্গার জলে যাহা ।।
তোর সতীপনা দেখুক লোক সকল।
গাঙ্গ হইতে তোল তুমি এক খাড়ৈ জল।
স্বরূপে যদি তুও সতী হেন জানি।
পান্ডৈ হক্টতে না পড়িবে এক ফোটা পানি ।।’

অনন্য এক কাব্যের আবেশরাত্রি শেষ হয়ে আসে। মানতের কর্মসাধনে ব্রতী হন কীর্তনিয়া। কীর্তনিয়া নিজেই পণ্ডিত, নিজেই ঠাকুর, নিজেই মনসা আর মানতকারীর মিডিয়া হিসেবে কাজ করেন।

গান শেষে ভান্ডারিয়ার মালাকারদের তৈরি শোলার বেহুলা-লখাইর প্রতীকী বিয়ে সম্পাদনের মধ্য দিয়ে ভোর হওয়ার আগেই শেষ হয় রয়ানি গান।

‘ধনে জনে চৌদ্দ নাও জোড়ানী আছিল।
সকল বেহুলার স্থানে বুঝাইয়া দিল।
একে একে উঠিল।
চান্দর ডিঙ্গা চৌদ্দ গোটা।
বিদায় লইয়া চলে পবনের বেষ্ট।
দেখিয়া কৌতুক অতি বেহুলাসুন্দরী।’

ইন্দ্রজিৎ কীর্তনিয়া এভাবেই সম্পন্ন করেন কবিবর বিজয় গুপ্ত প্রণীত পণ্ডিত কালীকিশোর বিদ্যাবিনোদ সম্পাদিত কলকাতার বেণীমাধব শীল’স লাইব্রেরি থেকে প্রকাশিত ‘পদ্মাপুরাণ বা মনসামঙ্গল’ কাব্য বা রয়ানি গান পাঠ।

সুন্দরবনের মুন্ডা সম্প্রদায়ের ঝাপান গান

ঝাপান গান

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনীর দাতিনাখালীর বটুক মুন্ডার বাড়িতে বসেছে গানের আসর। বাড়ির আঙিনা শ্রাবণের বৃষ্টিতে কাদায় মাখামাখি। ক্যামেরা–বান্ধব একটি ভালো জায়গা দেখে বসে পড়লাম। যারাই আসছে ‘সোল্লাগী’ দিচ্ছে, মানে সালাম জানাচ্ছে।

বর্ষীয়ান নীলকান্ত মুন্ডা পাহান বা পুরোহিত, তাঁর সঙ্গে আছেন কয়েকজন সহযোগী। এর মধ্যে মনোরঞ্জন মুন্ডা, আরুবালা মুন্ডা বেশ সরব।

গানের শুরুতে তাঁর গুরু হরিপদ মণ্ডলের নাম স্মরণ করেন। আরও স্মরণ করেন তাঁর দুই সমসাময়িক অধির মুন্ডা ও অখিল মুন্ডার কথা। শ্রাবণ মাসের শেষ দিন বা সংক্রান্তিতে দিনমান উপবাস সম্পন্ন করে রাতব্যাপী নানা আয়োজন–গানে মনসাতুষ্টির জন্য নানা কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করেন, যাকে বলা হয় ‘জাগরণ’। ঝাপানের জাগরণ। তাঁরা এই আয়োজনকে ঝাপান বলেন। কেতাবি পদ্মাপুরাণ নয়, পদ্মাপুরাণ কাব্য তাঁদের নিজস্ব ভাষা এবং বাংলা ভাষা মিলিয়ে পাঠ করেন। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে—তাঁদের হাতে লেখা পদ্মাপুরাণে মহাভারত, মনসামঙ্গলের অন্যান্য পুরাণ এবং পদ্মাপুরাণ বই থেকে কিছু সংকলন করে নিজেরাই লিখেছেন লৌকিক ও তাঁদের জন্য গায়কিবান্ধব ঝাপান গান।

চলছে পুজার থান তৈরির ‘তৈয়ারি’। চারটি ছোট সাইজের কলাগাছ এনে উঠানের মাঝখানে পুঁতে চারকোণাকৃতির থান করা হয়েছে। বৃষ্টিভেজা কাদামাটিতে নলখাগড়া ব্যবহার করা হয়েছে। কলাগাছে ঘেরা ঘরের ভেতর মাটির সাতটি ডিবি করা হয়েছে, যাকে সাত বোন হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলেন পাহান। থানের বাইরে আছেন মহাদেবের থান। সেই থানের চারপাশে চালের গুঁড়া ও সিঁদুর দিয়ে আলপনা আঁকলেন পাহান নিজে।

গঙ্গাজল ছিটিয়ে থানে বসেন পাহান নীলকান্ত মুন্ডা। প্রাথমিক কার্যাদি শেষে ঘট মাথায় নিয়ে থানের চারপাশে সাত চক্কর দিয়ে ঘট পূর্ণ করতে ঢোল, কাঁসর, মন্দিরা সহযোগে গান গাইতে গাইতে চলেন চুনো নদের ঘাটে।

‘মাকে আনতে যাবো চুনোই নদীর তীরে
মাকে আনতে যাবো।
মাথে দেবো লাল গামছা
কর্ণে জবা ফুল
মাকে আনতে যাবো।’

চুনো নদের গলা পানিতে নেমে ঘট পূর্ণ করা শেষ হলে ঘট বহনকারী উঠে আসেন। ঘট পূর্ণ করে আবার বাড়ির পথ ধরেন। পেছনে সেই ভক্তকুল কাঁসর-মন্দিরা ঢোলক নিয়ে গাইতে থাকেন। গাইতে গাইতে ঘট নিয়ে ফের উঠানে এসে থানের চারপাশে সাত পাক ঘুরতে হয়। বাঁশের তৈরি কুলাতে ধান-দূর্বা-প্রদীপ জ্বালিয়ে ঘট বরণ করে নেন বাড়ির বউ-ঝিরা। তারপর ঘট ফের থানে স্থাপন করা হয়। থানের পেছনে মনসার ছবি ও থানের পাশে ধূপকাঠি বা আগরবাতি জ্বালানো হয়। এরপর মনসাবন্দনা শুরু করেন পাহান—

‘পান সুপারি দিয়ে ডাকি মা মনসা
এসো হে।
ধান-দূর্বা দিয়ে ডাকি মা মনসা
এসো হে।
কলা দিয়ে দিয়ে ডাকি মা মনসা
এসো হে।
দই-মিষ্টি দিয়ে ডাকি মা মনসা
এসো হে।’

বাড়ি বাড়ি থেকে ফল ও পান-সুপারিসহ তুষ্টির নানা জিনিস নিয়ে ভক্তরা আসেন,  সাত পাক দিয়ে সেই প্রসাদ অর্পণ করেন থানে। মাঝে মধে৵ চলে চা–পানের বিরতি। নিজেদের রচিত ঝাপান কাহিনি পড়ার সঙ্গে মাঝে মধে৵ কিছু গান পরিবেশন করা হচ্ছে। এর মধ্যে মুন্ডাপাড়ার সংগীতের অন্যতম মুখ, সারা আসর যিনি জমিয়ে রাখেন, তিনি মনোরঞ্জন মুন্ডা, সঙ্গে তাঁর বোন আরুবালা মুন্ডা। এখন গাইছেন মুন্ডা পাড়ার প্রচলিত গান—

‘আশা না ফুরায়, বেলা ডুবে যায়
ছাড়ে না মোরে যায় তো ছাড়ি
একদিন আমায় যেতে হবে
ছেড়ে বাড়ি।
কেন এলাম এই ভবেতে,
হিসাব দিবো কি যে শেষে
আমি সেই ভাবনা ভাবছি বসে।’
অন্য একজন ধরলেন আরেক গান—
‘শালুক লতায় ঘর বেঁধেছি
করে হিকির ফিকির
কালো মেঘ সাদায় উড়ে যায়।
চিংড়ি মাছের খড়খড়ি
তাতে দিয়ো ফুলের বড়ি
ভালো করে রেঁধেছিলো
বেহুলা সুন্দরী।’
আরেকজন ধরেন গান—
‘ও প্রাণো কোকিলা কইয়া যাও
কোন দেশে যাও,
আমার পরান কান্দে।
কালো কোকিলা ও কালো কোকিলা
তুমি আর না ডাকিও
ভাঙ্গিলো সোনারো সংসার
তোমরা সুখে থাকো কালো কোকিলা।’
এবার পাহান তাঁর ঝাপান গানে ফিরে যান—
‘বাসর বান্দিলাম বান্দিলাম
সাঁতালি পর্বতে বাসর বান্দিলাম।
সেই ঘরেতে বসত করবে
বেহুলা-লখিন্দর বাসর, বান্দিলাম।’
মাঝে বেহুলার কাহিনি বলেন। কাহিনির প্রয়োজনে এর পরের গান,
‘তোমার কলমে ছিল না কালি,
দারুন বিধিরে—’
আবার গান—
‘উচা পারি, বেহুলা গো রাঢ়ি
চিরল চিরল দাঁতি,
আজি বাসর রাতে খাইলো গো পতি
না পোহালো রাতি গো
বলো হরি হরি।’
সাপের সুনাম করাই এই গানের প্রধান স্তুতি—
‘সাপুরা-বাপুরা, মন তোর করলাম গুহে,
সখিগণ সব ডাকেন বসে
আজ জানেন কিন্তু সখিরে গোবিন্দ হরে রাম রাম।’
অনেকটা গান হয়ে গেছে। এবার আসর বন্দীর গান শুরু করেন পাহান—
‘বন্দিলাম আর সিদ্ধিদাতা
শ্রী গুরুর চরণ বন্দী
দেবী আয় আমার আসরে
শত ধুলায় পরে কাতর হয়ে
ডাকি যে তোমায়
দেবী আয় দেবী আয় মা।’

আসর জমে গেছে মনসার গান রেখে নিজেদের প্রিয় সব গান গেয়ে চলেন ভক্তকুল।আবার শুরু হয় পাহানের পালা গাওয়া—

‘বেহুলা কান্দেনগো কান্দে বেহুলা
তরি বেয়ে করে।
নাই নাই রে কেউ
আরে সাঁতালি পর্বতে করি এক লৌহ ঘর
মোর কন্যা রাখে সেই ঘরেরো ভেতর।
চান্দ বেনে বেটা তোর কে, কি সাপে দংশিলো গো।
চুনি নগরে বাস বড় সওদাগর
গন্ধবেনে জাতি সেই সু-ভাগো সুন্দর
বেহুলা কাঁদেন গো, কান্দে বেহুলা
তরি বেয়ে করে।’

আবার মনের হরষে, মুন্ডা পাড়ায় প্রচলিত  গান ধরেন মনোরঞ্জন ও আরুবালা—

‘ও ছেড়ি
পাশা খেলব না, খেলব না
বারণ করে দে।
এবার পাশা খেললে পরে গৌরী এনে দে।’
এমন করে গানের কলি থেকে কলি গেয়ে চলেন—
‘ফুলের আসন, ফুলের বসন,
ফুলের সিংহাসন।
ফুলের ওপর বসে আছেন
মামুন সাহারা গো
ও মা দেবিগণ।
রাধার ফুলের সিংহাসনে,
ফুলের কলি, ফুলের বালি, ফুলের সিংহাসন।’
মা মনসাকে নিয়ে গান—
‘মায়ের ঠুমকি চলনা,
দুই পায়ে দুই সোনার নূপুর;
বেশি বাজে না গো।
চলিতে চলিতে মায়ে
অতি ধীরে ধীরে,
কালিয়াতে কাজল চোখে দেখে মিটি মিটি।
কালো হয়েছে,
তবে স্বাদ সত্য মিঠা আছে
তাইতে যমুনার জল।
ভাসিতে ভাসিতে গেল
কদমতলীর ঘাটে।
কালো হয়েছে,
তবে স্বাদ সত্য মিঠা আছে
তাইতে যমুনার জল।
ভাসিতে ভাসিতে গেল
কালীদহ ঘাটে।’
একটা গান খুব লম্বা করছিলেন—
‘ফুলো ও ও ও - জ্বলো-মলো করে গো বাবা,
কাল বৈরবি ই ই - চাঁদ বদনে।
ফুলো ও ও ও -জ্বলো-মলো করে গো বাবা,
কাল বৈরবি ই ই শীল বদনে।’

গানের তালে উষার আলো জানান দেয়, ভোর হলো। ক্যামেরা, ট্রাইপড গুছিয়ে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে উঠান থেকে বেরিয়ে এলাম। উজ্জ্বল দাদার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে শ্যামনগরের পথে পা বাড়ালাম। খুলনার পথে ছেড়ে যাওয়া প্রথম বাস ধরতে হবে।

ভিন্ন ধরনের পরিবেশনাকেও ঝাপান বলা হয়। ঝিনাইদহ ও যশোরে  ঝাপান হলো একটি বিশেষ জায়গায় অঞ্চলের যত সাপের ওঝা একত্র হয়ে গান করা । তাঁরা তাঁদের পোষা সাপের নানা কীর্তি দেখান গানে গানে। এর জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থাও থাকে।

সাতক্ষীরার পদ্মাদেবির গান

পদ্মা দেবীর গান

সাতক্ষীরা শহরের প্রাণকেন্দ্র কালীবাড়ির মোড়। তার কাছেই চায়না-বাংলা মোড়, অপজিটেই আছে গোলপুকুর বা গুড়পুকুর। পুকুরের পাড়েই আছে প্রাচীন বটবৃক্ষ, পলাশপোলের এই বটের তলেই প্রতিবছর ভাদ্রসংক্রান্তিতে বসে মনসা প্রণতির অনুষ্ঠান, সেই সাথে বসে মেলা।

মিথ বা লোক0মুখে প্রচলিত, সাতক্ষীরার জমিদার প্রাণনাথ রায় চৌধুরীর আমলে পলাশপোলের বটগাছতলায় একজনকে সাপে কাটে। মৃতপ্রায় অবস্থায় আগত মানুষেরা বটতলায় মনসাপূজা করেন। পুজার ফলে সেই যুবক সুস্থ হয়ে ওঠেন। সে–ই থেকে শুরু,  প্রতিবছর বটতলে মনসাপূজা হয়। আর এই পূজাকে কেন্দ্র করে বসে গুড়পুকুরের মেলা। তবে পুরোনো সেই বটগাছ আর বেঁচে নেই। এখন যে বটগাছটি আছে, সেটি পরে রোপণ করা হয়েছে।

মনসাতলার মুখে পূজার ভোগের সারি সারি দোকান বসেছে। মাটির পেয়ালায় কলা, বেলপাতা ও জবা ফুল। সেই সঙ্গে ছোট বোতলে দুধ বিক্রি করছেন তাঁরা। আগত মানুষেরা প্রবেশমুখ থেকে ভোগ নিয়ে মনসাতলায় প্রবেশ করছেন।

পূজার সমান্তরাল চলে মনসাবন্দনা পদ্মাদেবীর গান। ভাদ্রসংক্রান্তিতে মনসাপূজাকে কেন্দ্র করে মনসাতলায় বসে এই পদ্মাপুরাণের পরিবেশনা।

খেজুরপাতায় জবা ফুল গুঁজে এক পাশে রাখা হয়। কলার খোল দিয়ে গড়া হয় ডিঙা, পুতুল দিয়ে বেহুলা-লখিন্দর। প্লাস্টিকের সাপ, সেই সঙ্গে কলার খোলে সিঁদুর দিয়ে আঁকা মনসার ছবি। এই হলো সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী নারীদের গানের দল পদ্মাদেবীর গানের পূজার মণ্ডপ। মূলত নারীদের দলটি বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি এবং পদ্মাপুরাণ–নির্ভর একটি ধারাবাহিক লোকগান পরিবেশন করেন। পদ্মাদেবীর গানের জন্য নগরঘাটার কালী মাসির দল বেশ নামকরা। গানের সূচনা পর্বে সাধারণত দেবী মনসা ও বিভিন্ন দেব-দেবীকে স্মরণ করে বন্দনা গান গাওয়া হয়—

‘ও মা মাগো আকাল বন্দন পাতাল বন্দন,
বন্দনা করলাম আমি গুরুদেবের চরণে,
জয় জয় মা মনসা জয় বিষহরি গো,
বন্দনা করি মাগো মা মনসার চরণে,
জয় জয় মা মনসা’

বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনিতে বেহুলা ভেলাতে করে মৃত স্বামীকে নিয়ে জলপথে দেবলোকে যাওয়ার সময়, গোদা পাটানির ঠিকানায় যে গোদাঘাটের কথা আছে। সেই জয়গা সাতক্ষীরায় বলে অনেকে মনে করেন।

‘পাঁচো পাকো, ছয়ো পাকো
সাতো পাকো দেয় গো।
খোপে দিলো সই গো বকুল ফুলের মালা।
এত দিন ছিলা ফুলো বকুলেরো ডালে,
আইজ কেন আইছ ফুলো পূজারো বন্দনে নারে’,
সাতক্ষীরায় সাপের প্রকোপ বেশি হওয়ায় দেবী মনসার ভজনও হয় বেশি—
‘সাধের বাগান,
ও বাগান ভাঙ্গে গেল এবার।’

টাঙ্গাইলের ভাসান গানের পরিবেশনা

ভাসান গান

অর্জুনার খোকা মণ্ডলের বাড়ির আঙিনায় চলছে ডালা ও চরিত্র সাজানোর কাজ। প্রতিবারের মতো এবারও কুটিবয়রার ক্রাশ বাউন্ডেলে বারেক সাজবে বেহুলা আর কুটিবয়রা হাটের আখ বিক্রেতা সেলিম সাজবেন লখিন্দর। কৃষক জামাল পাচালিকার, শাহ আলম মনসা, আরফান মিয়া, আতিকুল ইসলাম, বাদশা মিয়া, আবদুল আলিম, জহুরুল, শ্যামল কান্তি, আমান আলী, হালিম মিয়া, জাহাঙ্গীর, দুলু ও দলপতি সুরুজ মিয়া করবেন অন্যান্য চরিত্র। সবাই খেটে খাওয়া মানুষ। বিটিভির স্যুর্টিং দলের সঙ্গে সহযোগিতা বা সমন্বয় করছেন স্থানীয় কলেজ শিক্ষক আবদুস সাত্তার খান।

শিল্পীদের সাজসজ্জা সম্পন্ন করার, তাঁরা দেন দলপতি। শুরু করেন বন্দনা—

‘ওকি আইস পদ্মামাদব আ-আ-আয়-সরে।
আসিলে বসিতে গো দিব এই আসরের মাঝে।
আইস পদ্মামাদব আ-আ-আয়-সরে।
প্রথমে বন্দনা করি আল্লাহ নিরাঞ্জনরে,
আইস পদ্মমাদব আ-আ-আয়-সরে।
তার পরে রাসুলের চরণে,
আইস পদ্মমাদব আ-আ-আয়-সরে।
তার পরে বন্দনা করি আলীর চরণে
আইস পদ্মমাদব আ-আ-আয়-সরে।’

বন্দনা শেষে সামনে বসে গানের দলের অধিকর্তা খোকা মণ্ডলের গুরু বা ওস্তাদ আইয়ুব আলী সরকার। বন্দনার মধ্য দিয়ে পা ছুঁয়ে তাঁর কাছ থেকে বিদায় নেওয়া হয়। ওস্তাদের সম্মতি নিয়ে কৈলাশতুষ্টি গান করেন তাঁরা।

বাঁশের ডালায় দুধ, কলা ও চিড়া নিয়ে মাগনে পা বাড়ান দলপতি। এই দলটি মুসলিম প্রধান হওয়ায় এরা বলছেন, পদ্মামাধবের জন্য এ ঢালা।

বেহুলারূপী বারেকের হাতে ঢালা। এবার হাটে টাকা তোলার পালা।

‘ভিক্ষা দেন গো নগরবাসীরা
সতী বেহুলা করে গো ভিক্ষা পতিরো লাগিয়া রে।
ভিক্ষা দেন গো নগরবাসীরা।’

ভিক্ষাশেষে হাটসংলগ্ন যমুনার ঘাটে ভেড়ানো নৌকায় আরোহণ করেন ঢালা নিয়ে খোকা মণ্ডল। নৌকার গলুইয়ে রাখেন দুধ, কলা, জবা ফুল, ধান, দূর্বা সাজানো ঢালা। কুটিবয়রা হাটের ঘাট থেকে নৌকায় উঠে বসেন। দলের মানুষ তো উঠবেনই, তবে সাধারণ দর্শকের জন্য একটা সম্মানী নির্ধারিত। সেই সম্মানী দিয়ে তবেই তাঁরা নৌকায় উঠতে পারবেন।

নৌকা ভাসে নদীতে। কুটিবয়রা ঘাটের তীরে ব্যাপক লোকসমাগম। যমুনার জল ভেঙে এগিয়ে চলে নৌকা, নৌকার এগিয়ে চলার ছন্দে পাটাতনে কুশীলবদের পরিবেশনা কাহিনি চমৎকৃত করে শ্রোতাদের।

‘আগে দাসী পিছে দাসী মধ্যখানে সতীলো
ওকি আ-ই-ও ও ওই যে—
যায় গো বেইলা যমুনা পারে।
আটু জলে নাইমা গো বেইলা-আটু মলিন করে।
ওকি আ-ই-ও ও ওই যে—
যায়রে বেইলা যমুনা পারে।’
------
বেহুলার শরীর কিংবা সৌন্দর্য, যা–ই বলি, তাতে কিন্তু লখিন্দর কুপোকাত। মাথা নষ্ট লখিন্দর মাছ ধরার বড়শির ছিপ দিয়ে আঘাত করে বেহুলার কলসি ভেঙে ফেলে। বেহুলা হা-হুতাশ করা শুরু করে, বাড়ি গিয়ে সে কী জবাব দেবে। কলসি কিনে দেওয়ার কথা দিয়ে লখিন্দর বেহুলাকে আমন্ত্রণ করে নতুনবাজারে আসার। বেহুলা সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে—

‘ওকি ও-ও-ই-ও ওই যে যায় গো বেইলা নতুন বাজারে
নতুন বাজারে যাইয়া, বেইলা পুতুল খরি-ই-ই-দ করে-এ এ
ঐ যে চান্দের বেটা সুযোগ করে আতে ধরে।
আয়না-ও দোকানে ও-ও-ই-ও ওই ও
আয়না খরিদ করে...
ও-ও-ই-ও ওই যে যায় গো বেইলা
ন–তু-ন-বাজারে।’
-----
যমুনার কিছু পথ পাড়ি দিয়ে নৌকা পৌঁছে যায় গুলবেচা। ঘাটে নৌকা থামিয়ে এক গেরস্তের উঠানে চলে পাঁচালির পরবর্তী অংশ। আশপাশের বাড়ির মানুষ এক উঠানে এসে গোল হয়ে জড়ো হয়েছেন। উঠানের মাঝখানে দল নেমে ভাসানের পরবর্তী অংশ—
‘আমায় কে দিল পিরিতির বায়না—
লেচুর-বাগানে।
বন্ধুর বাড়ি, আমার বাড়ি,
মধ্যখানে ধারা।’
------
চলছে বেহুলা-লখিন্দরের প্রণয় পর্ব। যমুনার পাড় ঘেঁষে যখন নৌকা চলে, গ্রামের বউ-ঝিরা ডাকতে থাকেন, ‘এই আমোগো বাড়িতে আইসো’ সব ঘাটে তো ভেড়া সম্ভব না। তবে বউ-ঝিদের অনুরোধ রক্ষায় সাতঘাটের বেশিই পরিবেশনা হয়। এভাবে ঘাটে ঘাটে উঠানে এগিয়ে চলে বেহুলার পাঁচালি। প্রণয় পর্ব শেষে অবশেষে বিয়ে হয় বেহুলা-লখিন্দরের। মনসার অভিশাপ লখিন্দরের মাথায় থাকায় চাঁদ সওদাগর ছেলের জন্য লোহার বাসরঘর তৈরি করেন; কিন্তু কথায় আছে—কপালের লিখন না যায় খণ্ডন।

‘পৈথানেতে যায়
আচম্বিতে কামড় মারলারে
লখিন্দরের পায়...
রে বিধির কী হইল গো...’

নদীতে নৌকাতে চলে পাঁচালি। যমুনার কিনারায় সারি সারি মানুষ দাঁড়িয়ে, দেখছে বেহুলা আর সখীর নাচন। কাহিনি এগিয়ে চলে—

‘সাত ভাইয়ের বইন বেইলা গো
নয় মামার ভাগিনি
কাল রাত্রে হইয়া রাঢ়ি গো
দেশে দেশে ঘুরি
রে বিধির কী হইল গো...’

জগৎপুর, নলিন পার হয়ে পিংনা পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুর গড়িয়ে গেছে। অবশেষে পরিবেশনা শেষ হয়ে আসে। রাধানগর, জয়নাল ঘাট হয়ে তারাকান্দি গিয়ে শেষ হয় সাত ঘাট।

মনসা দেবী চাঁদ সওদাগরের সব ফিরিয়ে দিল, বেঁচে উঠল লখিন্দর, ভেসে উঠল চৌদ্দ ডিঙা। বেহুলার সাত জনমের ধন সাপে কাটা লখিন্দরকে নিয়ে চম্পকনগরে ফেরা। বেহুলার বাপ আর শ্বশুর মাংতা মানে বেদে সম্প্রদায়ের। ছেলেদের প্রাণ ফিরে পাওয়ার অনিচ্ছায় বেহুলার অনুরোধে একটি ফুল ছুড়ে দেয় মনসার কোলে। মা মনসা খুশি হন, এর মধ্য দিয়েই জগতে দেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন মনসা।

খোকা মণ্ডল স্বস্তিতে চিড়া মুখে দিলেন। ভাঙলেন সারা দিনের উপোস। শাওনের ঢালা, সাতঘাটের মাগন, বেহুলার নাচারি, নাচারি গান—এসব নামে ডাকা হয় টাঙ্গাইল-জামালপুরে ভাসান গানকে। বাদ্যযন্ত্রীযোগে বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনিনাট্য পরিবেশনা শিল্পকলায় প্রকাশ করেন কুশীলবরা। টাঙ্গাইলে এই গানে অংশ নেওয়া নারী চরিত্রে রূপদানসহ সবাই স্থানীয় কৃষক-মজুর এবং সবাই পুরুষ। দিন শেষে দুধ-কলার ঢালা যমুনায় ভাসিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় ভাসান গান বা সাতঘাটের মাগন বা বেহুলার নাচারি বা শাওনের ঢালা।

টাঙ্গাইলে অনেকগুলো দল আছে, এর মধ্যে কুটিবয়রার খোকা মণ্ডলের দলের যমুনায় ভেসে ও সাতগ্রামে নেমে পরিবেশনা, এটা ছিল ২০১৫ সালে। ২০১৭ সালে বাসাইলের রহিম মিয়ার দলের মানতের অংশ হিসেবে বাড়ির আঙিনায় রাতব্যাপী পরিবেশনা—রহিম ভাদাইম্যা সেই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় ‘রসের মেলা’য় পরিবেশন করে। ২০১৮ সালে আগতেরিল্লার মেম্বারের দলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় ‘রসের মেলা’য় পরিবেশনা। ২০২০ সালে অর্জুনার কুটিবয়রার বারেকের দলের পরিবেশনা বিটিভিতে প্রচারের জন্য বড় দল নিয়ে দৃশ্যধারণ করেছিলাম, যার কথক ছিলেন জামাল মিয়া। ২০২২ সালে পাঁচঠিকরির হাটখোলার ফটিক শেখের দলের নদীতে ঘুরে পরিবেশনা ও পরে দলটি ঢাকায় এসেছিল ‘রসের মেলা’য়। ২০২৬ সালে নৌকায় পরিবেশন করে নলিনের ইলেকট্রিক মিস্ত্রি রফিকুলের দল। এই সবার গানের বিষয়বস্তু এক, পরিবেশনার রীতিও একই বর্ণনার সময় কাহিনির আগপিছ হয় কখনো কখনো।

চা বাাগনের বিষহরির গান

বিষহরির গান

সোনারুপা চা–বাগানে প্রতিবছরের মতো বসেছে বিষহরিপূজা। বিকেলের সোনারুপা চা–বাগান অনন্য এক রূপনগর। পাহাড়ের কোনাকানি মাড়িয়ে একটি পাহাড়ের মাথায় বাড়ি। বাড়ির সামনেই মন্দির। মানুষ আসছে-যাচ্ছে। সবার হাতেই পূজার অর্ঘ্য। ফুল, নারকেল, আখ ও ফলফলারি। প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা ঘট পূর্ণ করতে দল বেঁধে কবিরাজ গাঙের পথে রওনা করেন। সঙ্গে ঢাক, ঢোল, কাঁসর ও মন্দিরা হাতে গায়কের দল।

‘মাকে আনতে চলো গো নিড়াই নদীর পাড়ে
মাথে দিব লাল জবা ফুল,
চরণে দেবো ফুল, মাকে আনতে চলো।’

দোলছড়ি নদের পাড়ে সেই বনেদি ব্রিটিশ আমলের ইট-সিমেন্টে বাঁধানো ঘাট। শ্রীনিবাস কবিরাজ ও তাঁর সহকারীরা সেই ঘাটে পূজা দিয়ে ঘট পূর্ণ করে, ফিরে চললেন বাড়ির পানে।

শুরু হয় পূজা। মন্ত্রপাঠ সম্পন্ন করে ভক্তকুলের আনা সবজি ও ফল বলি দেওয়ার পালা। এই অর্পনের মধ্য দিয়ে ভক্তদের মনোবসনা পূর্ণ হয় বলে জানালেন আগতরা। যাঁরা পেয়েছেন—তাঁরা বলেন, তাঁরা সুস্থ হয়ে গেছেন।

সন্ধ্যা, রাত দ্বিপ্রহর ও নিশি—এই তিন প্রহরে চলে পূজা। এর মধে৵ই চলে পদ্মাপুরাণ পাঠ।

‘কাণ্ড এ বিপুলা মা তুই
রহিল এই আকুতি,
কৃপা করো দয়াময়ী
হৃদিপদ্মাবতী।’

সারা রাত চলে আরাধনা। নানান বাড়ি থেকে চা–বাগানের শ্রমিকেরা নারকেলসহ নানা উপটৌকন নিয়ে হাজির হতে থাকেন।

‘প্রণমহি ধনপতি, পিতা হংসমতি
বিপদে স্মরণে আসো হৃদে।
গো মাগো জগৎ জননী।’

একজন পাঠ করছিলেন, অন্যজন নিলেন হাতে পদ্মপুরাণ তিনি পড়া শুরু করলেন—

‘দুই সখী একো প্রাণো,
নাইও অন্যথা।
গৃহছিদ্র পদ্মাবতী চান্দ্র সর্বদা
জয় সখী পদ্মাবতী।
দেবতার কপটতা,
মনুষ্য নাহি জানে,
চাঁদেরো কারণে, চাঁদেরো ঝলকে।
জলে জন্ম দেবে বলে কলসি বাঁধিয়া,
সুখে নিদ্রা যায় যেন ঘরে অগ্নি দিয়া,
অমৃত বলিয়া যেন বিষ পানো করে।
দিনে দিনে উহু বারুই উদরে
অমৃত বলিয়া যেন।’

এই আয়োজনে লৌকিকতা আর আধ্যাত্মিকতা মিলেমিশে একাকার। গহিন জঙ্গলে বৃক্ষরাজি আর নির্জনতা এই অঞ্চলে সাপের উপদ্রব অতি। যে কারণে বসতিজনেরা শঙ্কিত মনে থাকেন। যার কারনে এই মনসাপূজার রঙিন আয়োজন।

‘আকবরি-সকবরি বিদায়ের বেশ
মা আমার চলে যাবে আপনারই দেশ।’

সারা রাত শেষে ভোরে ঘট নদীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজা শেষ হয়। প্রতিমা বিসর্জন হয় আরও পরে।

চা–বাগানের বাইরে জুড়ির চৌহদ্দি ছাড়িয়ে বড়লেখায় মনসাপূজা হয় বাড়ি বাড়ি পদ্মপুরাণ পাঠের মাধ্যমে। এখানে পালপাড়ায় অনিমা রানী পাল একটি বিশেষ ধরনের ঘট তৈরি করেন। জ্যামিতিক ডিজেইনের এই ঘট সারাদেশের ঘট থেকে স্বতন্ত্র।

বড়লেখা ভারতের করিমগঞ্জ সীমান্তে হওয়ার কারণে মনে হয়, তাঁরা করিমগঞ্জ থেকে প্রকাশিত ‘বাইশ কবি পদ্মপুরাণ’ পাঠ করেন। মৃদঙ্গ ও মন্দিরা হাতে বেঞ্চে বসে নামকীর্তন ঢঙে তারা পদ্মপুরাণ পাঠ করেন—

‘যুগে যুগে ভজ হৃদ
স্বরি আমার মাগো
হায়রে হৃদয়ে বেদন রে আমার
বলি মা তোর স্মরণ।’

সংগীতপ্রেমী ও সংগীত ও বাদ্যযন্ত্র গবেষক জাকির হোসেন বগুড়ার একটি মনসার পুথি খুঁজে পেয়েছেন, যার নাম বিষহরির পুথি। যেখানে গায়কি ঢং একেবারেই পুথির মতো।

‘ও কি ও রে, আয় হায়
কহিল তরাসে আয় হায়
পণ্ডিত হইয়া নাথ, বাক্য বলো অসম্পাত
ও কি ও রে, আয় হায়
কহে কন্যা মনে রো তরাসে
আরে হায় হায়
কহে বালি মনেরো তরাসে।
আরে হায়
আর রাত্রে বিয়ান নিজ পতি
কি লাভি মা মোহরতি
না হইলো বৎসর ছয়ো মাস।
ওকি ও রে
সকলে করিবে উপহাস।’

কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ রচিত পদ্মাপুরাণ এটি।

চট্টগ্রামের পাল্টা মনসার আসর

পাল্টা মনসা

কর্ণফুলীপাড়ের দাসপাড়ার প্রবেশমুখে দাঁড়ালেই মনসাপূজার কর্মযজ্ঞ অনেকটাই ঠাহর করা যায়। কয়েক জায়গায় বসে মাটির তৈরি বাহারি রং করা মনসার ঘট বিক্রি হচ্ছে। একমুখী, দ্বিমুখী এবং পঞ্চমুখী ঘট নিয়ে সুমিতা দাসী বসেছেন বিক্রি করতে।

পাড়ার ক্লাবঘরের সামনে প্যান্ডেল করা হয়েছে। সৌরভ কুমার শীল ব্যস্ত সময় পার করছেন, আয়োজন সম্পন্ন করতে। শ্রাবণ মাসের শেষ দিন আজ পদ্মপুরাণ গান হবে। দুপুরের পর থেকেই এবাড়ি–ওবাড়ি থেকে একেক করে এসে জড়ো হচ্ছেন সবাই।

চট্টগ্রামের দাসপাড়ার ঘরের বউ-ঝি আর ছোট ছেলেমেয়েরা মাসের শুরু থেকে প্রতিদিন দুপুরের পর সংসারের কাজকর্ম শেষ করে দল বেঁধে একেক বাড়ির উঠানে পুঁথিপাঠের আসর বসান। ‘বাইশ কবি পদ্মপুরাণ’ বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধারাবাহিক পাঠ করেন তাঁরা। ঢোলক, মন্দিরা, খঞ্জনিসহ বাদক দল থাকে সঙ্গে। শেষ দিন ঝর্ণা হোরের আঙিনায় সমর্পিত হবে মা মনসার উদ্দেশে।

‘ও মা তোমার পুঁথি তুমি পড়ো
উপলক্ষ আমি রে,
শ্রাবণ মাসের শেষ তারিখে
তোমার পূজা করি রে
জয়য়ো রে মনসা দেবী রে।...’

হালিশহরের উপকণ্ঠে প্রায় কয়েক হাজার জেলে পরিবারের বাস। একসময় এই পাড়ার মানুষের পেশা মাছ ধরা হলেও শহুরে হাওয়ায় অনেকেই আজ সরকারীর ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী। তবে পৌরাণিক ও নিজস্ব পালা-পার্বণ নিয়মিতই করেন তাঁরা। ২২ কবি রচিত এই পুঁথিতে ২২ রকমের কবিতার সম্মোহনী সুর বিরাজ করে—

‘ওগো এসো মাগো সরস্বতী,
কণ্ঠে রাখো রে পা,’
দোহারেরা তান ধরেন—
‘শ্রাবণেতে।
ওরে বিদ্যামূলে লিপ্ত করো
সরস্বতী মা,
শ্রাবণেতে।...’

ঝর্ণা হোরের আঙিনায় পুঁথি সম্পন্ন করে সবাই যাঁর যাঁর বাড়ি ফিরে যান। সন্ধ্যায় ক্লাবঘরের আঙিনায় পালটা মনসা। সেখানে যেতে হবে।

এদিকে তৃপ্তি দাস তাঁর ‘পঞ্চমুখী ঘটের তৈয়ারি’করছেন। পঞ্চমুখের দুই মুখে রাখতে হয় বাঁশপাতা, অন্যগুলোতে বটপাতা, শাপলা ফুল, কচুর ফোপা। এরপর আরাধনার জন্য ঘট বসাতে হয় আসনে। প্রসাদ, শাড়ি, শঙ্খ, সিঁদুর, চিরুনি চাঁপা কলা, আপেল, নারকেল, কমলাসহ নানা ফল দিয়ে ঘটের সামনে আসন সাজানো হয়।

আর বর্ষীয়ান মঞ্জুরি দাসের মনসাপূজা পুরাণের নিয়মে হয়। মঞ্জুরি দাস বলেন, পদ্মপুরাণে বলা আছে—

‘কাঁচা বাঁশ কাইট্টা আনি
বিষহরি বানাই। ...’

এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মঞ্জুরি দাস বলেন, জগতে প্রথম ঘট বাঁশ দিয়ে তৈরি ছিল। তাই তার আরাধনায় বাঁশের ঘট শোভা পাচ্ছে।

মঞ্জুশ্রীর মতো অনেকে আষাঢ় মাস থেকে শুরু করেন মনসাবন্দনা। শ্রাবণ মাসের শেষ দিন শেষে রাতে আগকুলা, তেল, সিঁদুর, পানের খিলি মায়ের হাতে দিয়ে মাকে বিদায় করতে হয়।

সাজের আগেই ক্লাবঘরের উঠানে শুরু হয় পালটা মনসার গান। মেঘনাথ সরকার শিবের পক্ষে আর শ্যামল শীল শ্রোতার পক্ষ নিয়ে পালটা মনসা পুঁথিতে অংশ নেন। মেঘনাথ শুরু করেন—

‘বছরে ছত্রিশ দিনে খুদে খোদা
চামিল পরে দেখ যমুনার পারে,
মানুষ নাম লিখে আর মরে।
এইভাবে দেশ হয়রে স্বাধীন,
বছরে যায়গো বারো দিন,
সুযোগ পাইলে এক দিনের নাই ভরসা
মনের কোটা ধরে।
বিয়েশাদি হইলে পরে
জাতের তালাশ করে।
খেয়াঘাটে গেলে পরে
দুজনে এক নৌকায় চড়ে।’

মেঘনাথ সরকার রমেশ শীলের লেখা গান শেষ করেন। এর পর প্রশ্ন ছুড়ে দেন প্রতিপক্ষের কাছে, বিয়েশাদিতে জাতপাত জানার প্রয়োজন পড়ে, খেয়াঘাটে কেন পড়ে না?

শ্যামল শীল শুরু করেন, মনসা কর্তৃক চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙা ডোবানোর মন্ত্রণা—

‘চম্পক নগরে ঘর চাঁদ সদাগর।
মনসা সহিত বাদ করে নিরন্তর
দেবীর কোপেতে তার ছয় পুত্র মরে।
তথাপি দেবতা বলে না মানে তাঁহারে
এনস্তাপ পায় তবু না নোয়ায় মাথা।
বলে চেঙ্গীমুড়ী বেটী কিসের দেবতা।
হেঁতাল লইয়া হস্তে দিবানিশি ফেরে
মনসার অন্বেষণ করে ঘরে ঘরে।
বলে একবার যদি দেখা পাই তার
মারিব মাথায় বাড়ি না বাঁচিবে আর
আপদ ঘুচিবে মম পাব অব্যাহতি।
পরম কৌতুকে হবে রাজ্যেতে বসতি
এই রূপে কিছুদিন করিয়া যাপন।
বাণিজ্যে চলিল শেষে দক্ষিণ পাটন
শিব শিব বলি যাত্রা করে সদাগর।
মনের কৌতুকে চাপে ডিঙার উপর
বাহ্ বাহ্ বলি ডাক দিল কর্ণধারে
সাবধান হয়ে যাও জলের উপরে।
চাঁদের আদেশ পাইয়া কান্ডারি চলিল
সাত ডিঙা লয়ে কালীদাহে উত্তরিল
চাঁদ বেনের বিসম্বাদ মনসার সনে।
কালীদহে সাধু দেবী জানিল ধেয়ানে
নেতা লইয়া যুক্তি করে জয় বিষহরী।
মম সনে বাদ করে চাঁদ অধিকারী
নিরন্তর বলে মোরে কানী চেঙ্গীমুড়ী।
বিপাকে উহারে আজি ভরাডুবি করি
তবে যদি মোর পূজা করে সদাগর।
অবিলম্বে ডাকিল শতেক জলধর
হনুমান বলবান প্রতাপর বীর।
কালীদহে কর গিয়ে প্রবল সমীর
পুষ্প পান দিয়া দেবী তার প্রতি বলে
চাঁদ বেনের সাত ডিঙা ডুবাইবে জলে
দেবীর আদেশ পাইয়া কাদম্বিনী ধায়।
বিপাকে মজিলো চাঁদ কেতকাতে গায়।’

এভাবে সারা রাত চলে পালটা মনসার পালা আর বাহাস। একজন গান শেষ করে প্রশ্ন ছুড়ে দেন। অন্যজন আবার সেই প্রশ্নের উত্তর করেন। ভোর হতে হতে পালটা মনসা পুঁথির আসরে ইতি টানেন দুই পালাকার।

লোকগবেষকরা বলে থাকেন গ্রাম থেকে গ্রামে ভাষা, জীবন সংস্কৃতির ব্যতীক্রম পরিলক্ষিত। এই ছোট্ট জীবনে ক্ষেত্রসমীক্ষা করতে গিয়ে যা দেখেছি, বলতে পারি গ্রাম থেকে গ্রাম কেনো! গ্রামের এক মাথার মানুষ থেকে অন্য মাথার বসতির জীবনাচরন ভিন্ন, এমন প্রমাণও দেখেছি ভুরি ভুরি।

এটাও বলতে হয় বাংলাদেশের মতো এমন ছোট্ট দেশের লোকসংস্কৃতি আত্মস্থ করা এক জীবনে সম্ভব নয়। তার পরেও যতটুকু পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছি, তা থেকেই লোকসংস্কৃতি প্রেমিদের জন্য  এই আলোচনা উপস্থাপন করলাম।

বলতে হয় লোকজ পরিবেশনা, লোকাচার, লোকসংস্কৃতি স্থির নয়। কোন গবেষকই সংগৃহীত তথ্যকে চিরসত্য বলতে পারেন না। সাধারণত মানুষে মুখে মুখে চর্চিত হতে হতে লিখিত রূপেও অবয়ব পরিবর্তিত হয়। আবার সময় ও স্থানের বিভিন্নতায় সংস্কৃতির বিষয়বস্তুতেও কখনো কখনো পরিবর্তন আসে। সমাজ সংস্কৃতির বিবর্তনেও কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটতে পারে। এভাবে আঞ্চলিক প্রভাবে লোকসংগীত সুর, কথা, তাল এবং পরিবেশনায় আসে ভিন্নতা, হয়ে ওঠে বৈচিত্রময়। পদ্মাপুরাণের বেলাতেও তাই ঘটেছে।

এটাই লোকসংস্কৃতির পরিবেশনা শিল্পের বৈশিষ্ট্য।