গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

একুশের বিশেষ আয়োজন

রাষ্ট্রভাষা প্রশ্ন: বিকল্প রাজনৈতিক পরিসর হিসেবে আদালত

বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় এখনো পর্যন্ত আইন-আদালত ও বিচারব্যবস্থা উপেক্ষিত রয়ে গেছে। বিচারব্যবস্থার ইতিহাস রচনার কোনো উল্লেখযোগ্য প্রয়াস দেখা যায়নি। আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রেও আইন-আদালতসংক্রান্ত উপাদান বিবেচনায় নেওয়া হয় না। ভাষা আন্দোলন কিংবা পাকিস্তান আমলের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। আধুনিক রাষ্ট্রে শাসন-শোষণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় রাষ্ট্রের সর্বত্র জড়িয়ে থাকা বিস্তৃত আইনি কাঠামো। আইন-আদালত কীভাবে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে ক্ষমতাসীনদের প্রতিধ্বনি করেছিল এবং জনক্ষমতায়নের পথে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে, একটি রিপোর্টেড মামলার সূত্র ধরে এ লেখায় আমরা তা দেখার চেষ্টা করব।

১.

আদালতের ভাষা হিসেবে বাংলা প্রথম আনুষ্ঠানিক (ছদ্ম) স্বীকৃতি লাভ করে ১৮৩৭ সালে। সে বছর বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি আইন নং ২৯–এর মাধ্যমে ফারসির পরিবর্তে ওডিশি, বাংলা ও হিন্দুস্তানি (উর্দু) ভাষাকে আদালতের ভাষা করা হয়। তৎকালীন গভর্নর জেনারেল কাউন্সিলের সদস্য টি সি বরার্টসনের ১৮৩৯ সালের একটি বক্তৃতা থেকে বোঝা যায়, আইনটি প্রণয়নের উদ্দেশ্য ছিল ‘স্থানীয় ভাষাগুলোকে দিয়ে ফার্সিকে বরখাস্ত করার কাজ সম্পন্ন করার পর পর্যায়ক্রমে সেগুলোকে হটিয়ে ইংরেজি প্রতিষ্ঠা করা।’

এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার একটা বিবরণীও পাওয়া যায় ১৮৫৯ সালে বাংলার প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর এফ জে হ্যালিডের সিলেক্ট কমিটির বক্তৃতায়। তিনি বলেন, স্থানীয় আদালত থেকে আরজি-জবাব ইত্যাদি রেকর্ড বাংলা কিংবা ওডিশায় আসতে থাকে। একটি রুল জারি করে ব্যারিস্টার ও ইংরেজি–জানা স্থানীয় উকিলদের জন্য আদালতের কার্যক্রমে ইংরেজির ব্যবহার অনুমোদন করা হয়। আইনশিক্ষার মাধ্যমও অত্যাবশ্যকীয়ভাবে ইংরেজি। বিলেত গিয়ে ব্যারিস্টারি ডিগ্রি নিয়ে আসাও জনপ্রিয় হয়। এভাবে ইংরেজি–জানা স্থানীয় উকিলদের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজিই আদালতের ভাষা হিসেবে প্রতিস্থাপিত হয়, স্থানীয় ভাষা হয়ে পড়ে ব্যতিক্রম।

১৮৩৭ সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি আইন নং ২৯–এর মাধ্যমে ফারসির পরিবর্তে ওডিশি, বাংলা ও হিন্দুস্তানি (উর্দু) ভাষাকে আদালতের ভাষা করা হয়। আইনটি প্রণয়নের উদ্দেশ্য ছিল ‘স্থানীয় ভাষাগুলোকে দিয়ে ফার্সিকে বরখাস্ত করার কাজ সম্পন্ন করার পর পর্যায়ক্রমে সেগুলোকে হটিয়ে ইংরেজি প্রতিষ্ঠা করা।’

পুরো ঔপনিবেশিক আমলজুড়ে এটা চলেছে: উচ্চ আদালতে ইংরেজি, অধস্তন আদালতে কমবেশি বাংলা। কিন্তু ১৯২০-এর দশক থেকে রাজনীতি ও সংস্কৃতিবিষয়ক বিতর্কে ‘জাতীয় ভাষা’ গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ আকারে হাজির হয়। পাকিস্তান-পর্বে তা প্রত্যক্ষ আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা শুরু হয়, ভাষা-প্রশ্ন স্বাধিকার আন্দোলনের আঁতুড়ঘর হিসেবে আবির্ভূত হয় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে।

১৯৫৪ সালের ২১ দফার প্রথম দফায় বলা হয়: ‘বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হবে।’ ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানের ২১৪ নং অনুচ্ছেদে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা হয়। কিন্তু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় যে পরবর্তী ২০ বছরের জন্য ইংরেজি অফিস-আদালতের ভাষা হিসেবে বহাল থাকবে এবং সংসদ চাইলে এর পরেও রাষ্ট্রীয় কাজে ইংরেজির ব্যবহার অব্যাহত রেখে আইন করতে পারবে, দশ বছর পর প্রেসিডেন্ট ইংরেজি প্রতিস্থাপনের সুপারিশ করার জন্য একটি কমিশন করবেন। প্রাদেশিক সরকার চাইলে ইংরেজির পরিবর্তে উর্দু বা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে কোনো বাধা থাকবে না।

এ রকম কোনো নীতি বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হয়। ১৯৬২ সালে প্রণীত আইয়ুব খানের ‘স্বৈরতান্ত্রিক সংবিধানে’ (২১৫ নং অনুচ্ছেদ) বাংলার পরিধি আরও সংকুচিত করা হয়। এবার বাংলা ও উর্দুকে বলা হয় ‘জাতীয় ভাষা’, সঙ্গে বলা হয় ১০ বছর পর দাপ্তরিক কাজে ইংরেজির বদলে অন্য ভাষা চালু করা যায় কি না, তা বিবেচনার জন্য প্রেসিডেন্ট একটি কমিশন করবেন। ইংরেজিকে আবার রক্ষাকবচ দেওয়া হয়: ‘কিন্তু এই অনুচ্ছেদকে অন্য ভাষা ব্যবহারের প্রতিবন্ধক হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। বিশেষত ইংরেজি ভাষা দাপ্তরিক ও অন্যান্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যেতে পারে যত দিন পর্যন্ত এর প্রতিস্থাপনের কোনো ব্যবস্থা গৃহীত না হয়।’

নতুন সংবিধানের মাধ্যমে আইয়ুব খান তাঁর ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেন। পুরো ষাটের দশকে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা-নিয়ন্ত্রণ, সভা-সমিতি-সংবাদপত্র দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচনসহ বিরোধী মতের ওপর খড়্গগ্রস্ত হওয়ার কারণে রাজনৈতিক পরিসর ছিল খুব সংকুচিত। এ সময় বিকল্প রাজনৈতিক পরিসর হিসেবে হাজির হন আদালত।

২.

কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় আইন-আদালতকে রাষ্ট্রের দমনমূলক চেহারার ওপর প্রলেপ দিয়ে ক্ষমতার বৈধকরণসহ বিচিত্র উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় ব্যাপক জনরোষকে বিকল্প পথে পরিচালিত করে বৃহত্তর আন্দোলনকে খণ্ডীকরণের জন্য আদালতকে কাজে লাগানো হয়। কিন্তু এ প্রক্রিয়া সর্বদা শাসকগোষ্ঠীর জন্য অবিমিশ্র আশীর্বাদ হিসেবে ধরা দেয় না। বরং আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়ন্ত্রিত নাগরিক অধিকার এবং ঔপনিবেশিক আইনি কাঠামোর মধ্যে প্রতিকারের সম্ভাবনা সীমিত হলেও সামরিক-বেসামরিক কর্তৃত্ববাদের কালে অনেক সময় বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য একটি বিকল্প পরিসর হিসেবে উন্মোচিত হয় আদালত, নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক পরিসরে রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় নীতিকে চ্যালেঞ্জ করার সংকীর্ণ কিন্তু সম্ভাবনাময় পথ হিসেবে আবির্ভূত হয়। এ রকম একটি বিকল্প রাজনৈতিক লড়াইয়ের জমিন হিসেবে আবির্ভূত হয় ১৯৬০-এর দশকের পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট বা ঢাকা হাইকোর্ট, কখনো তা গিয়ে গড়ায় পাকিস্তানের তৎকালীণ সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। ১৯ ডিএলআর ১৯৬৭ ৪৮৩-তে প্রকাশিত ‘শামছ্উদ্দিন আহমদ বনাম রেজিস্ট্রার, ঢাকা হাইকোর্ট’ মামলার রায়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বর্ণবাদী ও বৈষম্যমূলক ভাষা-নীতি এবং একই সঙ্গে বৈষম্যমূলক বিচারব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেন আইনজীবী শামছ্উদ্দিন আহমদ।

৩.

শামছ্উদ্দিন আহমদ আইন পরীক্ষা পাস করে ১৯৬৩ সালে ঢাকা জজ কোর্টে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। গাজীউল হকের ‘উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার প্রচলন’ বইয়ের বরাতে আমরা জানতে পারি, ছয় দফার আন্দোলন চলাকালে ১৯৬৬ সালের ১৬ আগস্ট শামছ্উদ্দিন ঢাকা হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য বাংলায় একটি আবেদনপত্র বার কাউন্সিলের কাছে দাখিল করেন। হাইকোর্টে বাংলা ভাষা অচল এই অজুহাতে বার কাউন্সিল সম্পাদক তাঁকে সনদ মঞ্জুর করতে অস্বীকৃতি জানান। শামছ্উদ্দিন কড়া ভাষায় প্রতিবাদপত্র লিখে বলেন, সম্পাদকের কোনো অধিকার নেই বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করার এবং তাঁকে ইংরেজিতে দরখাস্ত লিখতে বাধ্য করার। শেষ পর্যন্ত বার কাউন্সিলের সভাপতি এ বি এম হুসেনের মধ্যস্থতায় তাঁকে সনদ দেওয়া হয়।

১৯৬৬ সালের ৫ ডিসেম্বর শামছ্উদ্দিন পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টে বাংলায় লেখা একটি ক্রিমিনাল রিভিশন পিটিশন দাখিল করেন। হাইকোর্টের অ্যাফিডেভিট কমিশনার আদালতের বিশেষ অনুমোদন ছাড়া বাংলা পিটিশনের অ্যাফিডেভিট করতে অস্বীকৃতি জানান। শামছ্উদ্দিন বিষয়টি হাইকোর্টের একজন বিচারকের আদালতে মেনশন দেন। বিচারক তাঁকে এ বিষয়ে হাইকোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে যেতে বলেন। পিটিশনার রেজিস্ট্রারের কাছে বাংলাতেই লেখা একটি অভিযোগ দাখিল করে বলেন, অ্যাফিডেভিট কমিশনার বাংলায় লিখিত হলফনামার সত্যতা যাচাই করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, যা আইনসংগত নয়। এমনকি হাইকোর্টের সব পিটিশন ইংরেজিতে দাখিল করতে হবে মর্মে ১৯৫৬ সালে প্রণীত হাইকোর্ট রুলসের বিধান ১৯৬২ সালের সংবিধানের ২১৫ অনুচ্ছেদের বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, ফলে বাতিল ও কার্যকারিতাশূন্য। রেজিস্ট্রার কোনো কারণ না দেখিয়ে পিটিশনটি ফেরত পাঠান। রেজিস্ট্রারের এই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে ১৯৬৭ সালের ২৫ এপ্রিল তিনি সংবিধানের ৯৮ অনুচ্ছেদ অনুসারে ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এস এম মোর্শেদ ও বিচারপতি আব্দুল্লাহর ডিভিশন বেঞ্চে রিট পিটিশন দায়ের করেন। হাইকোর্ট (বিস্তারিত শুনানি না করে) সংক্ষিপ্তভাবে তা খারিজ করেন দেন এই যুক্তিতে যে, যেহেতু এখনো পর্যন্ত বাংলাকে আদালতের ভাষা করে কোনো আইন প্রণীত হয়নি, সেহেতু বাংলায় লেখা কোনো পিটিশন হাইকোর্টে পেশ করা যাবে না। ফলে রেজিস্ট্রার সঠিকভাবেই উক্ত রিভিশন আবেদন ফেরত পাঠিয়েছেন।

হাইকোর্টে বাংলা ভাষা অচল এই অজুহাতে বার কাউন্সিল সম্পাদক তাঁকে সনদ মঞ্জুর করতে অস্বীকৃতি জানান। শামছ্উদ্দিন কড়া ভাষায় প্রতিবাদপত্র লিখে বলেন, সম্পাদকের কোনো অধিকার নেই বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করার এবং তাঁকে ইংরেজিতে দরখাস্ত লিখতে বাধ্য করার।

শামছ্উদ্দিন হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আবার পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টে স্পেশাল লিভ টু আপিল আবেদন করেন। প্রধান বিচারপতি এ আর কর্নেলিয়াস, বিচারপতি এস এ রহমান, বিচারপতি ফজলে আকবর, বিচারপতি হামুদুর রহমান ও বিচারপতি ইয়াকুব আলীকে নিয়ে বেঞ্চ গঠিত হয়। এই কোর্টেও তিনি বাংলায় আবেদন দাখিল করেন। তাঁর জোরাজুরির ফলে প্রধান বিচারপতির আদেশে এই পিটিশন ও এর সংযুক্তিসমূহ ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় অ্যাটর্নি জেনারেল গিয়াস মুহাম্মদ, পশ্চিম পাকিস্তানের অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজা সাইদ আকবর, পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাডভোকেট জেনারেল টি এইচ খানসহ সুপ্রিম কোর্টের বাঘা বাঘা আইনজীবীদের সামনে আবেদনকারী শামছ্উদ্দিন স্বপক্ষে এই মামলায় শুনানি করেন। ১৯৬৭ সালের ১২ জুন ঢাকার সুপ্রিম কোর্ট অধিবেশনে ফুল বেঞ্চে শুনানি শুরু হয়। শামছ্‌উদ্দিন বাংলায় বক্তব্য উপস্থাপন করেন। বাঙালি বিচারকেরা বাংলায় কথা বললেও তাঁকে ইংরেজিতে বক্তব্য দেওয়ার জন্য জোর করতে থাকেন। তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। আদালত রূঢ় ভাষায় চাপ দিতে থাকেন। কারণ, তিনজন বিচারপতি অবাঙালি এবং আদালতের ভাষায় ‘বাংলার সঙ্গে পরিচিত নন’। শামছ্উদ্দিন তখন বলেন, পাকিস্তানের প্রধান ভাষা না বুঝলে তাদের চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়াই ভালো। কোনো কোনো বিচারপতি চটে যান, পূর্ণাঙ্গ শুনানি ছাড়াই দরখাস্ত খারিজ করা হয়। তবে আদেশ তাঁকে বাংলাতেই শোনানো হয়। ক্ষমতাসীন এলিটদের আস্থাভাজন বাঙালি বিচারক হামুদুর রহমান রায় লেখেন।

১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রদের মিছিলের ওপর পুলিশের নির্বিচার হামলা। ছবি: সংগৃহীত

এই রায় পড়লে দেখা যাবে, আদালত হয়ে উঠেছিল স্বাধিকারের দাবিতে আন্দোলনেরত পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষী কিংবা মাতৃভাষায় বিচারলাভের অধিকারবঞ্চিত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি শামছ্উদ্দিন আহমদ বনাম পাঁচ বিচারক, ততোধিক সরকারি উকিল কিংবা পুরো পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক-কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যকার তর্কবিতর্ক ও বাকযুদ্ধের ক্ষেত্র।

রায়ে শামছ্উদ্দিনকে তীব্রভাবে ভর্ৎসনা করা হয়। বলা হয়, শামছ্উদ্দিন স্বীকার করেছেন যে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা ইংরেজিতে দিয়ে কৃতকার্য হয়েছেন, তারপর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব পরীক্ষায় তিনি ইংরেজিতে ‘কোনোমতে’ পাস করেছেন। কিংবা তিনি অধস্তন আদালতেও বাংলায় সওয়াল-জবাব করতেন। আদালত অভিযোগ করেন, শামছ্উদ্দিন ভালোভাবেই জানতেন যে এই বেঞ্চের কমপক্ষে তিনজন বিচারক ‘বাংলার সঙ্গে পরিচিত নন’, তারপরও তিনি বাংলায় দরখাস্ত দেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করেন। ইংরেজি বুঝতে ও বলতে পুরোপুরি সক্ষম হলেও তিনি বাংলায় শুনানি করার জন্য পীড়াপীড়ি করেন। তিনি ‘আদালতের সাধারণ বিধিবিধানেরও কোনোরূপ তোয়াক্কা না করে জোরাজুরি করেন যে, তাঁর বাংলায় কথা বলার অধিকার আছে। কারণ, তা জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃত।’

আদালত রূঢ় ভাষায় চাপ দিতে থাকেন। কারণ, তিনজন বিচারপতি অবাঙালি এবং আদালতের ভাষায় ‘বাংলার সঙ্গে পরিচিত নন’। শামছ্উদ্দিন তখন বলেন, পাকিস্তানের প্রধান ভাষা না বুঝলে তাদের চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়াই ভালো। কোনো কোনো বিচারপতি চটে যান, পূর্ণাঙ্গ শুনানি ছাড়াই দরখাস্ত খারিজ করা হয়।

শামছ্উদ্দিনের সব যুক্তি নাকচ করা হয় আইনের খুবই আক্ষরিক, টেকনিক্যাল ও পজিটিভিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। শামছ্উদ্দিন প্রধানত তিনটি যুক্তি উপস্থাপন করেন। প্রথমত, হাইকোর্টে আবশ্যিকভাবে ইংরেজিতে আরজি দাখিলের বিধান সংবিধানের সাংঘর্ষিক এবং ফলে বাতিল ও কার্যকারিতাশূন্য। দ্বিতীয় যুক্তি হিসেবে শামছ্উদ্দিন বলেন, ২১৫ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা বাংলা ও উর্দু’ অংশটুকু অনুচ্ছেদের মৌলিক (substantive) অংশ এবং বাকি অংশটুকু ব্যতিক্রম আকারে এসেছে, যা মৌলিক অংশের কার্যকারিতাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে না। দুটি যুক্তিই আইনব্যাখ্যার স্বতঃসিদ্ধ নীতির বরাতে নাকচ করা হয়। সর্বশেষ এবং সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী যুক্তি হিসেবে শামছ্উদ্দিন দাবি করেন, হাইকোর্ট কর্তৃক বাংলায় পিটিশন গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানানো মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন, প্রত্যেক নাগরিকের আইনের সমান স্বীকৃতি ও ‘আইন অনুযায়ী এবং কেবলই আইন অনুযায়ী’ ব্যবহার পাওয়ার অবিচ্ছেদ্য অধিকারের লঙ্ঘন। আইনের উদার ব্যাখ্যার মাধ্যমে নাগরিক অধিকারের পরিসরকে বিস্তৃত করার সুযোগ ছিল, গণতান্ত্রিক সমাজে আদালতের অনুমিত ভূমিকাও তা-ই হওয়া উচিত। কিন্তু বিচারক এই বিস্তৃত জুরিসপ্রুডেন্সিয়াল তর্কে যেতে রাজি নয়। বরং সহজ টেকনিক্যাল গ্রাউন্ডে তাকে উড়িয়ে দেওয়া হয় যে, ‘ইংরেজিতে হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করা তার জন্য কষ্টসাধ্য হবে এটা ছাড়া তিনি সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারেননি তার কোন মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। আমরাও এমন কোনো সুনির্দিষ্ট মৌলিক অধিকার আবিষ্কার করতে সক্ষম হইনি যা এখানে লঙ্ঘিত হয়েছে বলে চিহ্নিত করা যায়।’ অর্থাৎ কোনো আইন প্রণীত হলেই সার, তা যতই জনবিরোধী অধিকার-সংকোচনকারী হোক, তা জনগণের ওপর প্রয়োগ করা যাবে।

এই রায় প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালের ১২ জুন। শামছ্উদ্দিন ৩ জুলাই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের ঢাকা কার্যালয়ে ১২৫ টাকা কোর্ট ফি প্রদান করে একটি রিভিউ পিটিশন দাখিল করেন। এবারও তিনি বাংলায় মুসাবিদা করেন। সুপ্রিম কোর্টের ঢাকাস্থ সহকারী রেজিস্ট্রার তা ফেরত পাঠালে তিনি ডাকযোগে লাহোর পাঠিয়ে দেন। লাহোরস্থ ডেপুটি রেজিস্ট্রার জানান ইংরেজিতে করতে হবে। উত্তরে তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালের পর এ দেশের জনগণ ইংরেজিতে লিখতে বাধ্য নয়। বিচারপতি কর্নেলিয়াস তখন আদেশ দেন, দরখাস্ত ফেরত দেওয়া হোক। তবু তিনি যদি বাংলায় দরখাস্ত করতে চান, তা নিজ খরচে ইংরেজিতে অনুবাদ করে দাখিল করতে হবে। শামছ্উদ্দিন ১৯ টাকা খরচ করে অনুবাদ করে ঢাকায় দাখিল করেন। দরখাস্তটি শুনানির জন্য গৃহীত হয়। কিন্তু নানা অজুহাত দেখিয়ে শুনানি বন্ধ থাকে। ১৯৬৮ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি আরেকটি পিটিশন করেন, তা-ও পুনরায় খারিজ করা হয়।

ঔপনিবেশিক শাসন থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাকিস্তান যে বিচারব্যবস্থা পেয়েছিল, তার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, আইনের প্রত্যক্ষ বিধানের বাইরে নাগরিক অধিকার, সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশ বিচারকদের বিবেচ্য নয়। কোনো স্বৈরশাসক ক্ষমতা দখল করে সংবিধান বাতিল ও মৌলিক অধিকার স্থগিত করলে তা-ও সই, কারণ নতুন আইনে সেরকমই বলা আছে। এই সুপ্রিম কোর্টই পাকিস্তানের প্রথম দশকের সকল রাজনৈতিক বিপর্যয়ে ক্ষমতাসীনদের প্রধান বৈধতা উৎপাদনকারী অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের আদালতও একই ঐতিহ্যে লালিত। সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা এবং ১৯৮৭ সালে সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন আইন প্রণীত হলেও ১৯৯১ সালের হাশমতউল্লা বনাম আজমিরী বিবি মামলায় (৪৪ ডিএলআর ১৯৯২ ৩৩২) আদালতের ভাষা প্রশ্নে উচ্চ আদালত একই অবস্থান গ্রহণ করেন। তিন দশক পেরিয়ে নানা বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ দেখা দিলেও এখনো আমাদের আইন-আদালতে ইংরেজি ভাষারই আধিপত্য রয়ে গেছে।