
অনুবাদকের ভূমিকা
সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন বিশিষ্ট মার্কিন নারীবাদী সাংবাদিক, লেখক ও চিন্তক গ্লোরিয়া স্টেইনেম। দূরদর্শী এই নামী সাংবাদিক, লেখক ও অ্যাকটিভিস্ট তাঁর সমগ্র জীবন নারী অধিকার ও সমতা অর্জনে অতিবাহিত করেছেন। ওহাইওর টোলেডোতে ১৯৩৪ সালের ২৫ মার্চ স্টেইনেমের জন্ম। বিশ শতকের শেষ ও একুশ শতকের শুরুতে তিনি নারী মুক্তি আন্দোলনের প্রধান পুরোধাদের অন্যতম হয়ে উঠেছিলেন। মিস পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম গ্লোরিয়া তাঁর অসামান্য বাগ্মিতা, রসবোধ ও ভিন্নমতকে অশ্রদ্ধা না করেই মতভেদ জানানোর কুশলতার কারণে বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর এসব গুণ তাঁকে নারীর জন্য সমতা আদায়ের লড়াইয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছিল। লৈঙ্গিক সমতার প্রশ্নে গণমাধ্যমের মুখপাত্রদের অন্যতম গ্লোরিয়া একজন সংগঠক ও বক্তা হিসেবে সারা পৃথিবী ভ্রমণ করেন। নারী অধিকার আন্দোলনে তাঁর কাজের রয়েছে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা এবং তাঁর জীবনব্যাপী অবদান আগামী প্রজন্মকেও উদ্দীপিত করবে বলে আমরা আশাবাদী। গ্লোরিয়ার জীবনের এই শেষ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল দ্য নিউইয়র্কার পত্রিকায়। তাঁর প্রকাশিত কয়েকটি বিখ্যাত বইয়ের ভেতর রয়েছে আ থাউজেন্ড ইন্ডিয়াস (১৯৫৭), দ্য বিচ বুক (১৯৬৩), আউটরেজিয়াস অ্যাক্টস অ্যান্ড এভরিডে রেবেলিয়নস (১৯৮৩), মেরিলিন: নরমা জিন (১৯৮৬), রেভোল্যুশন ফ্রম উইদিন (১৯৯১), মুভিং বিয়ন্ড ওয়ার্ডস (১৯৯৩) ইত্যাদি।
আমি সব সময়ই বলি, আমি লেখক হয়েছিলাম, যাতে আমাকে কথা বলতে না হয়। কিন্তু নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা শুরু করার পর যখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বা নারী সংগঠনের অনুষ্ঠানে কথা বলার আমন্ত্রণ পেতে শুরু করলাম, তখন আমি অবাক হয়েছিলাম। বুঝতে পারলাম, কাজটি গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমেরিকা ও অন্যান্য দেশে বক্তৃতার সঙ্গীদের নিয়ে নিয়মিত ভ্রমণ শুরু করলাম, বিশ্বব্যাপী নারী আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দিতে।
শেষ পর্যন্ত, অনেক জায়গায় ঘুরে এবং নানা বিষয়ে কাজ করতে করতে বুঝতে পারলাম, আমি একজন ভ্রাম্যমাণ সংগঠক হয়ে উঠেছি। পেশা হিসেবে এটি বেশ অপ্রচলিত, কিন্তু আসলে কাজটি খুবই সহজ। সংগঠকেরা পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করেন, তা কী হতে পারে তা দেখেন এবং সেটিকে বাস্তবে রূপ দিতে সহায়তা করেন। নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকালে এখন বুঝতে পারি, কোন কোন অভিজ্ঞতা আমাকে আমার নিজস্ব পথে চালিত করেছিল।
উনিশ শ পঞ্চাশের দশকে কলেজ থেকে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা শেষ করার পর ভারতে কয়েক বছর থাকার সময়ে নারীবাদ বিষয়ে আমি অনেক কিছু শিখেছি। সদ্য স্বাধীন হওয়া সেই দেশে কাটানো সময় আমাকে উপলব্ধি করিয়েছিল, পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের মতো জীবনযাপন করে না। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমার চারপাশের মানুষের মধ্যে বৈচিত্র্যের ভয়াবহ অভাব ছিল এবং পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার তুলনায় শ্বেতাঙ্গ মানুষ খুবই সংখ্যালঘু। ভারতে গিয়ে আমি জাতিগত বৈচিত্র্যের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠি এবং এর মূল্য উপলব্ধি করতে শুরু করি।
ভারতে সামাজিক নানা অধিকার আদায় আন্দোলনের কর্মী হিসেবে যাঁদের সঙ্গে আমি মিশেছি, তাঁদের প্রায় সবাই ছিলেন গান্ধীবাদী। আমি তাঁদের সঙ্গে কাজ করেছি, তাঁদের সঙ্গে বিদ্যালয়গুলোয় গিয়েছি এবং ভারতীয় গ্রামগুলোর ভেতর দিয়ে হেঁটেছি। আমি আবিষ্কার করলাম যে মানুষ হিসেবে আমি তাঁদের প্রতি খুবই আকৃষ্ট হতে শুরু করলাম, যেহেতু তাঁরা ছিলেন দয়ালু, মুক্ত মনের মানুষ, অহিংস। একেবারেই জাতীয়তাবাদী ধাঁচের নন। আমি মনে করি সাংস্কৃতিকভাবেই নারীরা অহিংসার প্রতি বেশি আকৃষ্ট। সম্ভবত আমরাই যেহেতু সহিংসতার প্রধান শিকার, তাই শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও আমরাই হয়ে উঠি মূল চালিকাশক্তি।
আমার জন্য, নিজেকে একজন নারীবাদী হিসেবে দাবি করার অর্থ সব সময়ই ছিল সব জাতিসত্তা, বর্ণ ও জনগোষ্ঠীর নারী ও পুরুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সাম্যে বিশ্বাস করা। জানি, এটা শুনতে এত সহজ যে ‘সমতা’ বা ‘সাম্যের’ মতো একটি শব্দ যেন ব্যবহার না করলেও চলে। তবে বাস্তবে ‘সাম্য’ বা ‘সমতা’ এখনো নিয়ম নয়, ব্যতিক্রম।
শুধু জীবনের শেষের দিকে এসে আমি বুঝেছি যে আজ নারীবাদ বলতে আমি যা বুঝি বা যেভাবে বিষয়টি প্রত্যক্ষ করি, তার পেছনে সেই বছরগুলো কতটা প্রভাব ফেলেছিল। তবে হতে পারে আমাদের এই বিষয়টিকে ‘নারীবাদ’ হিসেবে সম্বোধন করা উচিত নয়। অন্যরা যেমন অশ্বেতকায় নারীদের ক্ষেত্রে ‘ফেমিনিস্ট’ শব্দটির বদলে ‘ওম্যানিস্ট’ (এলিস ওয়াকার যেমন কালো বা অশ্বেতকায় নারীদের আন্দোলন বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন), ‘মুজেরিস্তা’ (লাতিন নারীদের ক্ষেত্রে) বা ‘নারী মুক্তিকামী’-জাতীয় শব্দাবলিও পছন্দ করেন। যে নামই হোক না কেন, যেসব শব্দ সমতার পক্ষে দাঁড়ায়, বৈষম্য থেকে সুবিধাভোগীরা সেসব শব্দকে ভীতিকর বা দানবীয় চেহারা দিয়ে থাকে। সেই সব মানুষের কাছ থেকে সব সময়ই বিরোধিতা আসবে, যারা ব্যক্তি হিসেবে নিজস্ব যোগ্যতা বা মানবীয় গুণের বদলে কিছু বিশেষ জনগোষ্ঠীতে জন্মে কিছু ক্ষমতা পেয়েছে—সেটা লিঙ্গ, বর্ণ, শ্রেণি, অথবা নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, যা–ই হোক না কেন। এই বিরোধিতা চলতেই থাকে, যেহেতু তারা আধিপত্যবাদী ক্ষমতায় বিশ্বাস করে। এই ভয়েও তারা ভীত হয়ে থাকে যে জন্মগতভাবেই যে বিশেষ সুবিধাগুলো তারা পেয়ে থাকে, তা না থাকলে কী হবে? এবং এটা দুঃখজনক যে তারা কখনোই খুঁজে পেতে না-ও পারে যে আসলে তারা কে এবং জীবনে আসলে তারা কী করতে চায়।
আমার জন্য, নিজেকে একজন নারীবাদী হিসেবে দাবি করার অর্থ সব সময়ই ছিল সব জাতিসত্তা, বর্ণ ও জনগোষ্ঠীর নারী ও পুরুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সাম্যে বিশ্বাস করা। জানি, এটা শুনতে এত সহজ যে ‘সমতা’ বা ‘সাম্যের’ মতো একটি শব্দ যেন ব্যবহার না করলেও চলে। তবে বাস্তবে ‘সাম্য’ বা ‘সমতা’ এখনো নিয়ম নয়, ব্যতিক্রম।
আমার নিজের জীবনে, নারীদের জনপরিসরে এমনকি ভাষার মধ্যেও অদৃশ্য করে রাখা হতো। মনে আছে, এমন সময়ও গেছে, যখন বিচক্ষণ পুরুষ সাংবাদিকেরা নারীতে পরিপূর্ণ একটি কক্ষের দিকে তাকিয়ে প্রতিবেদন করতেন, ‘এখানে কেউ নেই।’ আবার, আমি কিংবা অন্য কোনো নারী কোনো ধারণা প্রকাশ করতে চাইলে, তা বলার একমাত্র উপায় ছিল পাশে থাকা কোনো পুরুষকে দিয়ে সেই কথাটি বলানো।
হতে পারে যে আমাদের একে ‘সাম্যবাদ’ বা এমনকি ‘মানবতাবাদ’ বলেও ডাকা উচিত। মানবতাবাদের সমস্যা হলো একে প্রায়ই ধর্মবিরোধী হিসেবে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, সুতরাং এই শব্দটিও যথেষ্ট পরিমাণে অন্তর্ভুক্তিমূলক বলে আমি মনে করি না। আমরা একে যে শব্দেই আখ্যায়িত করে থাকি না কেন, এর মূল অর্থ হলো আমাদের প্রত্যেককে তুলনারহিত মানবিকভাবে পরস্পরের সঙ্গে আচরণ করতে হবে।
বর্ণ, লিঙ্গ ও শ্রেণির অভিজ্ঞতাগুলো খুবই বাস্তব এবং গুরুত্বপূর্ণ, তবে তারা অনেক সময়ই নির্মিত এবং বদলযোগ্য। আমাদের মানবতা ধারাবাহিক ও পবিত্র।
তবু কারও কারও কাছে এখনো রহস্যই থেকে গেছে, কেন নারীদের সমতার লক্ষ্যে আমাদের প্রচেষ্টাকে আলাদা করে চিহ্নিত করার জন্য একটি আন্দোলনের প্রয়োজন। আমার কাছে বিষয়টি বেশ স্পষ্ট। প্রথমত, পারিশ্রমিক পাওয়া ও অবৈতনিক—দুই ধরনের শ্রম হিসাব করলে দেখা যায়, পৃথিবীর মোট কাজের বেশির ভাগই নারীরা করেন। অথচ বিশ্বজুড়ে মোট শ্রম-আয়ের মাত্র প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পান তারা এবং পৃথিবীর মোট জমির ২০ শতাংশেরও কমের মালিকানা তাদের হাতে। পুরুষের তুলনায় নারী আজও অনেক বেশি হারে নিরক্ষর, ক্ষুধার্ত থাকে, মানব পাচারের শিকার হয়, অথবা পরিবারের কোনো সদস্যের হাতেই খুন হয়ে থাকে। এবং অন্যান্য গণতন্ত্রী দেশের চেয়ে ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে কখনো কোনো নারী রাষ্ট্রপ্রধান পদে নির্বাচিত হননি।
আমি যখন এ কথাগুলো লিখছি, তখন মনে হচ্ছে পৃথিবী যেন নিয়ন্ত্রণহীন ঘূর্ণাবর্তে ঘুরছে। অনেকেরই মনে হচ্ছে, আমরা এত দিন যে অগ্রগতি অর্জন করেছি, তা যেন এখন উল্টো দিকে ফিরে যাচ্ছে। আমার মতো দীর্ঘ জীবন যাপন করার সৌভাগ্য যাঁদের হয়েছে, তাঁদের একজন হিসেবে একজন প্রবীণ মানুষের ভূমিকা হলো—আমরা কতটা পথ এগিয়ে এসেছি, তা আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া।
আমার নিজের জীবনে, নারীদের জনপরিসরে এমনকি ভাষার মধ্যেও অদৃশ্য করে রাখা হতো। মনে আছে, এমন সময়ও গেছে, যখন বিচক্ষণ পুরুষ সাংবাদিকেরা নারীতে পরিপূর্ণ একটি কক্ষের দিকে তাকিয়ে প্রতিবেদন করতেন, ‘এখানে কেউ নেই।’ আবার, আমি কিংবা অন্য কোনো নারী কোনো ধারণা প্রকাশ করতে চাইলে, তা বলার একমাত্র উপায় ছিল পাশে থাকা কোনো পুরুষকে দিয়ে সেই কথাটি বলানো।
সুতরাং প্রত্যেক নারীর সঙ্গে একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে আচরণ করুন, একজন সমান মানবীয় সত্তা হিসেবে আচরণ করুন, সেটা আপনার মা যে কাজ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন সেটা করতে উদ্দীপনা জোগানো হোক, অথবা আপনার বান্ধবী আপনার রাতের খাবার রেঁধে দেবে—এমনটা প্রত্যাশা না করাই হোক। আমাদের প্রত্যেকের দিক থেকে কাজ করলেই কেবল সমতাকে আমরা জীবনের একটি সত্য ঘটনা হিসেবে দেখব।
অনেকে প্রায়ই আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, আমাদের কী করা উচিত? কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে সবার হয়ে উত্তর দেওয়াটা কঠিন। আমি বলব যে আমরা অবশ্যই একসঙ্গে কাজ করব যেন সমতামূলক আইন ও প্রথাগুলোর স্বাভাবিকীকরণ হয়। বাইরের যত ইশারাই থাক না কেন, বৃহত্তম উল্লম্ফনগুলো আমরা নিজেদের ভেতরই নিয়ে থাকি। আপনার নিজের পূর্ণ মানবতার পক্ষে দাঁড়ানো হলো একটি উদাহরণ, যা আপনি অন্যদের সামনে তুলে ধরতে পারেন। আপনার কর্মক্ষেত্র এবং বাড়িতে সমতা আনুন। ন্যায্যতা সম্পর্কে সমাজের লৈঙ্গিক ভূমিকাগুলো আকার পাওয়া শুরু করার আগেই সম্ভবত একটি শিশু হিসেবে আপনার যে বোধ ছিল, তাকে অনুসরণ করুন।
প্রগতির উল্লম্ফন আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি। লাখ লাখ নারী ও বালিকা এবং অনেক পুরুষ ও বালককেও ধন্যবাদ, যাঁরা সমতার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। এই আন্দোলনের কারণেই পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ এখন নভোচারী, ইউনিয়ন সংগঠক, কৃষক, মুক্তিদাতা ও শান্তি স্থাপনকারী হিসেবে নারীদের দেখেছে। সেই নারীদের ধন্যবাদ, যাঁরা রান্নাঘরের টেবিলে অথবা গ্রামে কুয়োর পাশে সত্যি কথা বলার জন্য সমবেত হয়েছেন, যাঁরা স্থানীয় নির্বাচনে বা জাতিসংঘে কাজ করেছেন, অথবা মানবিক সমতার জন্য যেকোনো শব্দ এখন গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আধ্যাত্মিকতা এবং শান্তির পূর্বশর্ত হিসেবে স্বীকৃত।
সুতরাং প্রত্যেক নারীর সঙ্গে একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে আচরণ করুন, একজন সমান মানবীয় সত্তা হিসেবে আচরণ করুন, সেটা আপনার মা যে কাজ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন সেটা করতে উদ্দীপনা জোগানো হোক, অথবা আপনার বান্ধবী আপনার রাতের খাবার রেঁধে দেবে—এমনটা প্রত্যাশা না করাই হোক। আমাদের প্রত্যেকের দিক থেকে কাজ করলেই কেবল সমতাকে আমরা জীবনের একটি সত্য ঘটনা হিসেবে দেখব।