রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (২৫ বৈশাখ ১২৬৮—২২ শ্রাবণ ১৩৪৮)। প্রতিকৃতি: আনিসুজ্জামান সোহেল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (২৫ বৈশাখ ১২৬৮—২২ শ্রাবণ ১৩৪৮)। প্রতিকৃতি: আনিসুজ্জামান সোহেল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

নিবন্ধ

রবীন্দ্রনাথের অর্থনীতি-চিন্তা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকীতে আমাদের দায় তাঁর সুগভীর পর্যালোচনা। এ সংখ্যায় তাঁর অর্থনীতি–ভাবনা নিয়ে আমরা এক তর্কমুখর বোঝাপড়ায় লিপ্ত হয়েছি। পাশাপাশি বুঝতে চেয়েছি পশ্চিমের ভাবনা ও কল্পনার সঙ্গে তাঁর নিজের বিতর্ক।

বাংলা ও বাঙালির জীবনে যে মানুষ এককভাবে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছেন, তিনি রবীন্দ্রনাথ। আমাদের জীবন ও সমাজের এমন কোনো দিক নেই, যা তাঁর চিন্তাচেতনা, রচনা বা বক্তৃতায় স্থান পায়নি। এককথায় বলা চলে, বাংলা ও বাঙালির জীবনে রবীন্দ্র-প্রভাব সর্বপ্লাবী। তবে এ প্রভাব শুধু রবীন্দ্রনাথের সর্বতোমুখী প্রতিভার কারণেই নয়; বরং এর অন্যতম কারণ এ দেশ, মাটি, সমাজ, মানুষ ও জীবনের প্রতি তাঁর অসীম অনুরাগ ও মমত্ববোধ। বাংলার সমাজ, ধর্ম, শিক্ষা, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রচুর প্রত্যক্ষ রচনা আছে, যা প্রমাণ করে তিনি শুধু শুদ্ধ নন্দনতাত্ত্বিক কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমাজসচেতন, শিক্ষিত, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন আধুনিক মানুষ। সেই সঙ্গে এসব রচনা উল্লিখিত বিষয়সমূহে তাঁর গভীর ও স্বচ্ছ চিন্তারও পরিচয় বহন করে।

সমাজজীবনের যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথকে অপেক্ষাকৃত নীরব বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, সেটি হচ্ছে অর্থনীতি। এ মনে হওয়ার পেছনে দুটি কারণ অত্যন্ত জোরালো—প্রথমত, সমাজ, শিক্ষা, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের যে রকমের একাধিক জনপ্রিয় প্রত্যক্ষ রচনা রয়েছে, অর্থনীতি বিষয়ে ‘শ্রীনিকেতন’ বা ‘পল্লীসমাজ’ ইত্যাদি ছাড়া রবীন্দ্রনাথের সে অর্থে তেমন বহুলপ্রচারিত কোনো প্রত্যক্ষ রচনা নেই এবং দ্বিতীয়ত, অর্থনীতি বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের চিন্তাচেতনার সঙ্গে আমাদের পরিচিত করার ব্যাপারে, অন্তত আমাদের জানামতে, এ পর্যন্ত রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞদের মধ্যে, কয়েকটি ব্যতিক্রম ভিন্ন, তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রয়াস পরিলক্ষিত হয় না। ফলে অর্থনীতি বিষয়ে রবীন্দ্র-চিন্তা আমাদের কাছে তুলনামূলকভাবে অপরিচিত থেকে গেছে। কিন্তু অর্থনীতি বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের উৎসাহ শুধু তাঁর পুত্র রথীন্দ্রনাথকে বা জামাতা নগেন্দ্রনাথকে কৃষি বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষার জন্য আমেরিকায় প্রেরণে কিংবা শ্রীনিকেতন স্থাপনের পেছনে তাঁর একটি অর্থনৈতিক চিন্তার অবস্থিতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের যে অত্যন্ত গভীর, সুবিন্যস্ত ও আধুনিক ধ্যানধারণা ছিল, সেই প্রমাণ তাঁর বিভিন্ন রচনায় বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে আছে। সেসব ধ্যানধ্যারণাকে গ্রথিত করলে রবীন্দ্রনাথের অর্থনীতি-চিন্তাও তাঁর অন্য চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চোখে অনেক বড় হয়ে ওঠে।

রবীন্দ্রনাথের অর্থনৈতিক চিন্তাচেতনার পটভূমির দুটি দিক সম্পর্কে আমাদের সচেতনতা অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রথমত, রবীন্দ্রনাথের অর্থনৈতিক চিন্তাচেতনা তাঁর সমাজ-চেতনার পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত। রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় সমাজকে একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চেষ্টা করেছেন যে সমাজে বস্তুগত সম্পর্ক নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মার বন্ধন হবে মুখ্য, যে সমাজের মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে পল্লি অঞ্চল এবং যে সমাজ ঐতিহাসিকভাবে ভারতবর্ষে যেভাবে ছিল, সেভাবে স্বনির্ভর হয়ে গড়ে উঠবে। এ–জাতীয় সমাজের স্বপ্ন রবীন্দ্রনাথের মনে ছিল এবং ‘শান্তিনিকেতন’ গড়ার পেছনে এ–জাতীয় চিন্তাচেতনা তাঁর মনে কাজ করেছে। রবীন্দ্রনাথের অর্থনীতিবিষয়ক ধ্যানধারণা এ কাঙ্ক্ষিত সমাজকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। দ্বিতীয়ত, রবীন্দ্রনাথ প্রচণ্ড রকমভাবে মানবতাবাদী ছিলেন এবং মানুষের আত্মার উৎকর্ষই ছিল তাঁর কাছে মানবজীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য। সুতরাং তাঁর অর্থনৈতিক চিন্তাচেতনায় রবীন্দ্রনাথ বস্তুগত বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করেননি ঠিকই, কিন্তু বারবারই তিনি মানুষের মনুষ্যত্ব ও আত্মিক দিককে টেনে এনেছেন। এর ফলে রবীন্দ্রনাথের অর্থনৈতিক মানুষ শুধু বস্তুতান্ত্রিক মানুষ নয়, সে মানবতাবাদী ও আত্মিক উৎকর্ষ বিধান চেষ্টায় নিমগ্ন এবং রবীন্দ্রনাথের অর্থনীতি শুধু বস্তুগত কোনো প্রায়োগিক ব্যাপার নয়, এটি একটি নীতিশাস্ত্রও বটে। এর ফলে রবীন্দ্রনাথ অর্থনীতিশাস্ত্রকে একটি সীমাবদ্ধ সংজ্ঞার গণ্ডি থেকে মুক্তি দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সে জন্য কোথাও কোথাও তিনি একে স্বপ্নিল করেছেন, বাস্তববর্জিত করেছেন এবং অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বেরও সৃষ্টি করেছেন। অবশ্য রবীন্দ্রনাথের মতো মানবতাবাদী ও মানবাত্মায় বিশ্বাসী দার্শনিকের পক্ষে এ ভিন্ন অন্য কোনো পথ ছিল বলেও আমাদের মনে হয় না।

তবে একজন সমাজসচেতন মানুষ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ অর্থনীতিকে সমাজের অন্যান্য দিক্-বিচ্ছিন্ন একটি শুদ্ধ শাস্ত্র হিসেবে দেখেননি। এর পরিপ্রেক্ষিতে যখনই তিনি অর্থনীতি বিষয়ে আলোচনা করেছেন, তখনই তিনি শিক্ষা, ধর্ম, রাজনীতি ও জাতীয়তাবাদ বিষয়গুলোর পরিপ্রেক্ষিতেই আলোচনা করেছেন। সুতরাং অর্থনীতির সঙ্গে সমাজ-প্রেক্ষিতের এসব দিকের যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে, সে বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ সচেতন ছিলেন এবং অর্থনীতির সঙ্গে এদের মিথস্ক্রিয়ার ব্যাপারটিও তাঁর আলোচনায় এসেছে।

এ সমাজকাঠামোর সংগঠন ও সম্পর্কের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মাঝেই রবীন্দ্রনাথ এ সমাজের ক্রমাগত অনুন্নয়ন ও অবক্ষয়ের কারণ খুঁজেছেন। তিনটি কারণকে এ ক্ষেত্রে মৌলিক বলে তিনি চিহ্নিত করেছেন—যে কারণগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত।

এখানে একটা কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। এ দেশের সমাজ, তার স্বরূপ ও প্রকৃতি, তার গতিময়তা—এসব সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ঘটে, যখন জমিদারির কাজ উপলক্ষে তিনি পূর্ববঙ্গের শিলাইদহ ও শাহজাদপুরে এসেছিলেন এবং বেশ কিছুদিন সেখানে অবস্থান করেছিলেন। বস্তুত এ দেশের পল্লিসমাজ, কৃষিব্যবস্থা, গ্রামীণ দারিদ্র্যের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় তাঁর পূর্ববঙ্গে অবস্থানকালেই। অতএব তাঁর সমাজসচেতনতা, অর্থনৈতিক ধ্যানধারণা এবং সার্বিক চিন্তাধারার গঠন, পরিবর্তন এবং পরিপক্বনের ক্ষেত্রে পূর্ববঙ্গ এবং পূর্ববঙ্গের জীবন একটি অনন্যসাধারণ ভূমিকা পালন করেছে বলে আমাদের বিশ্বাস।

ভারতীয় সমাজব্যবস্থার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে স্বনির্ভর পল্লিসমাজ ছিল এ ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র। এ ব্যবস্থার দুটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল: এক. এ সমাজে প্রত্যেক মানুষ একে অন্যের প্রয়োজন মেটাত এবং দুই. এ সমাজে গ্রামপতি ও গ্রামবাসীদের মধ্যকার সম্পর্কটি ছিল রক্ষণ ও আনুগত্যের। এ সমাজকাঠামো থেকে কয়েকটি জিনিস বেরিয়ে আসে—যেমন এখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের ব্যবসায়িক বন্ধন ছিল নিঃসন্দেহে, কিন্তু সে বন্ধনকে ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে উঠেছে একটি আত্মীয়তার বন্ধন; এখানে শাসক ও শাসিতের মধ্যকার সম্পর্ক শোষণের ছিল না, বরং শাসক শাসিতের স্বার্থ যথার্থভাবে রক্ষা করতেন এবং শাসিত শাসকের অনুগত ছিল। এখানে ধনের আধিক্য দ্বারা যেমন নেতৃত্ব লাভ করা যেত না, তেমনি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণেও সম্পদের কোনো মুখ্য ভূমিকা ছিল না। ভারতীয় সমাজের এ রূপটিকেই রবীন্দ্রনাথ আদর্শস্থানীয় ও কাম্য বলে গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর অর্থনৈতিক চিন্তাচেতনায় এ–জাতীয় একটি সমাজকাঠামোয় পৌঁছুনোর প্রয়োজনীয় কর্মধারা প্রাধান্য পেয়েছিল।

এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রবীন্দ্রনাথের অর্থনৈতিক চিন্তাচেতনার কয়েকটি দিক বেরিয়ে আসে। তাঁর দৃষ্টিতে, মাতৃভূমির যথার্থ স্বরূপ গ্রামের মধ্যেই এবং পল্লিসমাজের সম্পর্কের মূল ভিত্তি হচ্ছে আত্মীয় ও প্রতিবেশী সম্পর্ক। একে সম্পূর্ণ ধ্বংস হতে দিলে মানবসম্বন্ধের মাধুর্য অন্য কোনো আধারে রক্ষা করা যাবে না, এটাই ছিল রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাস। মানুষের সঙ্গে মানুষের কিছু সম্পর্ক থাকে, যাকে বলা চলে প্রয়োজনের সম্পর্ক অথবা ব্যবসায়িক সম্পর্ক। সেখানে একজন মানুষ অন্য মানুষের কাছে মূলত একটি কার্যসাধনের কল। আবার অন্য এক সম্বন্ধ আছে, যাতে প্রয়োজনও হয়তো মেটে, কিন্তু প্রয়োজনের বেশি কিছু পাওয়া যায়। মানুষে-মানুষে এ দ্বিতীয় সম্বন্ধের ভিত্তিতেই রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় সমাজকে চিহ্নিত করেছেন এবং সে সমাজ মুখ্যত পল্লিসমাজ।

এ আত্মীয় বা প্রতিবেশী সমাজে এমন দিন ছিল, যখন গ্রামের সম্পন্ন ব্যক্তিরা, জমিদার শ্রেণি ও গ্রামপতিরা গ্রামত্যাগী হতেন না, পল্লিই তাদের বাসস্থান ছিল। ধনীর ও পল্লিপতির একটা দায়িত্ব সেদিন ধর্মে স্বীকৃত ছিল; সে-অনুশাসন সবাই সমানভাবে মানতেন এমন নয়, তবু গ্রামসমাজে যাঁরা বিত্তবান, তাঁদের বিত্ত নানা প্রকার দানের ভেতর দিয়ে সমাজের সেবায় নিযুক্ত হতো। তাঁরাও সমাজের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সম্মান ও আনুগত্য পেতেন তাঁদের কর্মের কারণে, বিত্ত বা বৈভবের কারণে নয়। দেশের-সমাজের অভ্যন্তরেই সে ব্যবস্থা ছিল, যার দ্বারা সমাজ নিয়ত রক্ষা পেত ও পুষ্ট হতো।

এ দেশের সমাজের গতিময়তা সম্পর্কে এটাই ছিল রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাস। তিনি আরও বিশ্বাস করতেন যে ভারতীয় ইতিহাসে চিরদিন রাষ্ট্র ও সমাজ দুটি ভিন্নতর সত্তা ছিল, এখানে রাষ্ট্রনীতি ও সমাজনীতির মধ্যে একটা দূরত্ব ছিল। রাষ্ট্র সমাজকে গ্রাস করতে পারেনি। রাজ্য নিয়ে যুদ্ধ চলেছে, এক রাজবংশের পতন ও অন্য বংশের অভ্যুত্থান ঘটেছে, রাজধানীতে পালাবদল দেখা গেছে, দেশি-বিদেশি নানা জাতি, নানা শক্তি সেখানে পর্যায়ক্রমে প্রভুত্ব করেছে; কিন্তু এসবই ওপরতলার ইতিহাস, ভারতীয় সমাজ তথা পল্লিসমাজের সংগঠন ও সম্পর্ককে তা কোনোভাবেই বদলায়নি।

এ সমাজকাঠামোর সংগঠন ও সম্পর্কের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মাঝেই রবীন্দ্রনাথ এ সমাজের ক্রমাগত অনুন্নয়ন ও অবক্ষয়ের কারণ খুঁজেছেন। তিনটি কারণকে এ ক্ষেত্রে মৌলিক বলে তিনি চিহ্নিত করেছেন—যে কারণগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত।

ক্রমান্বয়ে রবীন্দ্রনাথের এ উপলব্ধি এসেছিল যে পল্লিসমাজে ধনী বা গ্রামপতিদের অবস্থিতি ও তাঁদের দানদক্ষিণার দ্বারা পল্লিসমাজ একটি আত্মতোষণমূলক পর্যায়েই স্থবির হয়ে থাকবে; কিন্তু এ–জাতীয় দয়াদাক্ষিণ্যে গ্রামের দুর্দশাও দূর করা যাবে না, কিংবা পল্লি অঞ্চলে উন্নয়নের গতিময়তাও সৃষ্টি করা যাবে না।

এর প্রথম কারণটি হচ্ছে বিদেশি বণিক ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্বনির্ভর পল্লিসমাজ বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার ফলে এ সমাজে উৎপাদনব্যবস্থার স্থানীয় প্রয়োজন মেটানোর পরিবর্তে বিশ্ববাজারের চাহিদা মেটানোর কাজে নিয়োজন, এ স্বনির্ভর সমাজের স্বনির্ভর রূপটুকু হারানো এবং এ সমাজ থেকে সম্পদের স্থানান্তর। দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে বাণিজ্যের মাধ্যমে ধনসম্পদের কেন্দ্রীভূতকরণ ঘটছিল কিছু হাতে। এর দুটি ফলাফল দেখা গিয়েছিল—প্রথমত, আত্মীয় ও প্রতিবেশী সমাজে ব্যবসায়িক সম্পর্কটি বড় হয়ে উঠছিল এবং দ্বিতীয়ত, গ্রামপতি ও সাধারণ মানুষের সম্পর্কের আগের মানবিক ভিত্তি নষ্ট হয়ে তা ধনকেন্দ্রিক হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। সমাজের জন্য সুকর্ম ও গ্রামবাসীদের জন্য মমত্ববোধ তখন আর নেতৃত্বের কারণ হয়ে রইল না। সেই সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধির কারণে রাজ্য পরিচালন কেন্দ্রগুলো নগরকেন্দ্রে পরিণত হলো, যার ফলে রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গে বণিকশক্তির একটি যোগাযোগ ঘটল। তৃতীয়ত, উল্লিখিত দুটি কারণে গ্রামের যাঁরা ধনবান ও বিদ্বান, তাঁরা হলেন নগরবাসী। গ্রামের উদ্বৃত্ত ধন আর গ্রামে নিযুক্ত রইল না, পুঞ্জীভূত হলো শহরে। রবীন্দ্রনাথের মতে, এইখানেই গ্রাম সমাজের দুর্দশার, অবক্ষয়ের ও অনুন্নয়নের শুরু এবং তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে এ গ্রামীণ সমাজের অবক্ষয় ও অনুন্নয়নকে রোধ করে আত্মীয় ও প্রতিবেশী সমাজভিত্তিক স্বনির্ভর পল্লিসমাজ গড়ে তোলাতেই এ দেশের উন্নতি নিহিত।

এ বিশ্বাসকে সামনে রেখেই তিনি পল্লিতে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন, কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন পল্লির প্রাঙ্গণকে এবং স্থাপন করেছিলেন শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনের মতো প্রতিষ্ঠান। জীবনের ঠিক মধ্যবিন্দুতে এসে রবীন্দ্রনাথ তাঁর আশ্রম ও কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিলেন শান্তিনিকেতন ও সুরুলের গ্রাম; শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজ সংগঠন নিয়ে বীরভূমের ওই পল্লিপরিবেশে চলল চল্লিশ বছরব্যাপী তাঁর অক্লান্ত সাধনা। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘পল্লীসঞ্জীবনই আমার জীবনের প্রধান কাজ।’ এ সঞ্জীবন কাজটি করতে গিয়ে তিনি একটি দীর্ঘমেয়াদি, স্থায়ী পরিকল্পনার রূপরেখা গভীরভাবে ভেবেছিলেন।

তাঁর অর্থনীতি-চিন্তা বিকাশের প্রথম দিকে রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, যে স্বনির্ভর গ্রামীণ সমাজ তিনি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চান, তার রূপরেখা ঐতিহাসিকভাবে যে স্বনির্ভর পল্লিসমাজ এ দেশে ছিল ঠিক তার মতোই হবে অর্থাৎ এ সমাজ মানুষে-মানুষে আত্মীয়তা ও প্রতিবেশী-সম্পর্কভিত্তিক হবে এবং সেই সঙ্গে এ সমাজের নেতার সঙ্গে অনুগামীদের সম্পর্ক আমাদের পল্লিসমাজের ঐতিহ্যবাহী সম্পদ-নিরপেক্ষ রক্ষণ-আনুগত্যভিত্তিক হবে। তাঁর এ চিন্তাধারার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায় ১৩১১ সালে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘স্বদেশী সমাজ’, ‘স্বদেশী সমাজের পরিশিষ্ট’, ‘সফলতার সদুপায়’ ইত্যাদি প্রবন্ধে এবং ১৩১৪ সালে পাবনা প্রাদেশিক সম্মিলনীতে প্রদত্ত সভাপতির অভিভাষণে। উল্লেখিত তাঁর কাঙ্ক্ষিত স্বনির্ভর গ্রামীণ সমাজের প্রথম বৈশিষ্ট্যের প্রতি রবীন্দ্রনাথ চিরকালই অভিন্ন মত পোষণ করতেন—সেটা তাঁর মানবতাবাদী দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কিংবা মানুষের আত্মিক উৎকর্ষ সাধনই তার মনুষ্যজীবনের লক্ষ্য এ–জাতীয় একটি বিশ্বাসের কারণে হতে পারে। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি সম্পর্কে প্রথম দিকে তাঁর ধারণা ঐতিহ্যগত ধারণা থেকে ভিন্ন ছিল না। তিনি নিজে পল্লিতে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। এমন কথাও বলেছিলেন যে ‘রাজগৌরবের সঙ্গে প্রজাদের একটি মানবিক সম্বন্ধ থাকে,’ যদিও সে গৌরবে প্রজাসাধারণের অর্থনৈতিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয় কি না, সে সম্পর্কে কিছু বলেননি, প্রমথ চৌধুরীর ‘রায়তের কথা’ প্রবন্ধের জবাব দিতে গিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে প্রজার স্বার্থ জমিদারের হাতে অত্যন্ত নিরাপদ, কারণ জমিদার প্রজার স্বার্থ সংরক্ষণে নীতিগতভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু খুব অল্পকালের মধ্যেই নেতা ও তার অনুগামীদের সঙ্গে এ–জাতীয় একটি সম্পর্ক যে পরিবর্তিত অবস্থায়ও সম্ভব—এ বিভ্রান্তি খুব সম্ভবত তাঁর কেটে যায়। কারণ, রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন যে ওই রকম একটি সম্পর্কের জন্য জমিদার বা গ্রামপতিকে যথার্থ অর্থে ধার্মিক, নীতিবান, বদান্য—এককথায়, কিছুটা অতিমানব হতে হবে, যেটা খুব সম্ভবত তাঁর নিজের মতো জমিদার ছাড়া অন্যান্য সাধারণ জমিদারদের হওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, ক্রমান্বয়ে রবীন্দ্রনাথের এ উপলব্ধি এসেছিল যে পল্লিসমাজে ধনী বা গ্রামপতিদের অবস্থিতি ও তাঁদের দানদক্ষিণার দ্বারা পল্লিসমাজ একটি আত্মতোষণমূলক পর্যায়েই স্থবির হয়ে থাকবে; কিন্তু এ–জাতীয় দয়াদাক্ষিণ্যে গ্রামের দুর্দশাও দূর করা যাবে না, কিংবা পল্লি অঞ্চলে উন্নয়নের গতিময়তাও সৃষ্টি করা যাবে না। বরং এ–জাতীয় একটি ব্যবস্থার অবস্থিতির ফলে গ্রামবাসী তাদের বাঁচার উপায় যে তাদেরই হাতে, এ কথা বিশ্বাস করার মতো শক্তি হারিয়ে ফেলবে এবং তারা কখনোই নিজেদের সমবেত শক্তির ওপর নির্ভর করার জন্য প্রস্তুত হবে না।

তবে সমবায়কে রবীন্দ্রনাথ একটি আচার হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন একটি মতবাদ হিসেবে, যার ভেতর থেকে বহু কর্মধারা সৃষ্ট হতে পারে, যার ভেতর কর্মের ও উদ্দেশ্যের প্রকৃতি অনুযায়ী বহু রূপভেদ সম্ভব। সমবায়ের মাধ্যমে একটি স্বনির্ভর, প্রতিবেশী সমাজভিত্তিক গ্রামীণ সমাজ গড়ে তোলাই রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশ্য ছিল

এর পরিপ্রেক্ষিতে এ দেশের পল্লিসমাজের শ্রীবৃদ্ধির জন্য একটি পথের দিকেই রবীন্দ্রনাথ দিক্-নির্দেশ করেছিলেন—সেটি হচ্ছে সমবায়ের পথ। গ্রামের মানুষের বাঁচার উপায় যে তাদেরই হাতে, সমবায়নীতির দ্বারা এ সত্যকে সাধারণের মধ্যে প্রচার করা প্রত্যেকের কর্তব্য বলে রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন। প্রকৃত প্রস্তাবে ‘সমবায়’ শব্দটিকে রবীন্দ্রনাথ একটা বৃহৎ অর্থে গ্রহণ করেছিলেন। পরিহাস করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘কো-অপারেটিভের যোগে অন্য দেশে যখন সমাজের নিচের তলায় একটা সৃষ্টির কাজ চলছে, আমাদের দেশে টিপে টিপে টাকা ধার দেয়ার বেশি কিছু এগোয় না।’ রবীন্দ্রনাথের কাছে সমবায়ের পথ ছিল সত্যের পথ। সে সত্যকে তিনি দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন—প্রথমত, সমবায়ই মানুষের মধ্যে আত্মনির্ভরতা, আত্মবিশ্বাস ও সম্মানবোধের জন্ম দিতে পারে, যেকোনো উন্নয়নের জন্যই যেসব গুণের অবস্থিতি অপরিহার্য শর্ত। আত্মশক্তিতে একবার বিশ্বাস স্থাপন করতে পারলে বিচ্ছিন্নভাবে যারা ক্ষুদ্র ও দুর্বল তারাও নিজ নিজ শক্তিকে সমবেত করে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে নেবে। দ্বিতীয়ত, সমবায়ের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের কাঙ্ক্ষিত আত্মীয় বা প্রতিবেশী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। একদিকে এর মাধ্যমে যেমন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যথা: উৎপাদনপ্রক্রিয়া ও ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে একটি সহযোগিতা ও যৌথ প্রয়াস সম্ভব, তেমনি অন্যদিকে এর মাধ্যমে মানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিচ্ছিন্নতা পরিহার করা অসাধ্য নয়। কৃষি হোক, স্বাস্থ্য হোক, আনন্দের উপায় হোক, সমস্যা সমাধানের জন্য মনের ভেতর মিলনের একটা ক্ষেত্র সমবায়ের মাধ্যমে করা যায়। সমবায়নীতিকে রবীন্দ্রনাথ মনুষ্যত্বের মূলনীতি হিসেবে দেখেছেন; কারণ মানুষ সহযোগিতার জোরেই মানুষ হয়েছে। জ্ঞানের ক্ষেত্রে, ভাবের ক্ষেত্রে, কর্মের ক্ষেত্রে সমবায় একটি ঐক্যবোধে নিয়ে যায় এবং ঐক্যবোধের দ্বারাই সব রকমের ঐশ্বর্যের সৃষ্টি—এ কথা রবীন্দ্রনাথ মানতেন। সুতরাং গ্রামীণ দারিদ্র্যের অবসান, গ্রামের মানুষকে স্বাধীনভাবে সমাজজীবনের দৃঢ়তর ভিত্তির ওপর দাঁড়ানোর ব্যবস্থার মাধ্যমে পল্লিসমাজের উন্নতির একমাত্র উপায় হিসেবে সমবায়কে তিনি চিহ্নিত করেছেন। তবে সমবায়কে রবীন্দ্রনাথ একটি আচার হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন একটি মতবাদ হিসেবে, যার ভেতর থেকে বহু কর্মধারা সৃষ্ট হতে পারে, যার ভেতর কর্মের ও উদ্দেশ্যের প্রকৃতি অনুযায়ী বহু রূপভেদ সম্ভব। সমবায়ের মাধ্যমে একটি স্বনির্ভর, প্রতিবেশী সমাজভিত্তিক গ্রামীণ সমাজ গড়ে তোলাই রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশ্য ছিল এবং এর জন্য যে সমবায়ের রূপরেখা তিনি দিয়েছিলেন, তার মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল:

ক. দেশের সমস্ত গ্রামকে নিজের সব রকমের প্রয়োজন সাধনক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে। কতগুলো পল্লি নিয়ে এক একটি মণ্ডলী গড়ে উঠবে।

খ. প্রত্যেক মণ্ডলীর প্রধান গ্রামের সব কাজের ও অভাব-মোচনের ব্যবস্থা করে মণ্ডলীকে নিজের মধ্যে পর্যাপ্ত করে তুলবেন, যাতে মণ্ডলীগুলোই স্বায়ত্তশাসনের স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে।

গ. নিজের পাঠশালা, শিল্প শিক্ষালয়, ধর্মগোলা, সমবেত পণ্য ভাণ্ডার ও ব্যাঙ্ক স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ প্রত্যেক মণ্ডলীকে গ্রহণ করতে হবে। প্রত্যেক মণ্ডলীর একটি করে সাধারণ মণ্ডপ থাকবে, যেখানে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘কর্মে ও আমোদে সকলে একত্র হইবার স্থান পাইবে এবং সেইখানে ভারপ্রাপ্ত প্রধানেরা মিলিয়া সালিসের দ্বারা গ্রামের বিবাদ ও মামলা মিটাইয়া দিবে।’

ঘ. জোতদার ও রায়তকে জোট বাঁধতে হবে এবং কৃষিক্ষেত্রে এক একটা মণ্ডলী বা এক একটি গ্রামের সকলকে একত্র হয়ে নিজেদের সব জমি একত্রে মিলিয়ে দিয়ে চাষবাস করতে হবে। এতে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার সম্ভব হওয়ায় উৎপাদনশীলতা বাড়বে ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া ব্যয়-দক্ষ হবে।

ঙ. শিল্পক্ষেত্রে ও সমবায় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিল্প স্থাপন, তাতে কাঁচামাল সরবরাহ, উৎপাদনপ্রক্রিয়া পরিচালনা, উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ ও লভ্যাংশ বণ্টন করতে হবে। পল্লি অঞ্চলে সেই সব শিল্পই স্থাপন করতে হবে, যা পল্লির মানুষের সর্ব অর্থে উন্নতি সাধন করবে।

চ. গ্রামবাসীদের বাসস্থান যাতে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর হয়, তাদের স্বাস্থ্য যাতে সুরক্ষিত হয়, তাদের জীবনপ্রণালি যাতে মানুষের মতো হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।

আমাদের দেশে যেভাবে নগর গড়ে উঠেছে, তাতে নগরে যোগ হয়েছে রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গে বণিক শক্তির; রাষ্ট্রযন্ত্র ও বণিকতন্ত্রের মধ্যে বাঁধা পড়ে গিয়েছিল আমাদের গ্রামগুলো। নগরগুলো আমাদের দেশের শক্তির ক্ষেত্র, কিন্তু গ্রামগুলো প্রাণের ক্ষেত্র—এ বলে রবীন্দ্রনাথ এ সমাজে নগর ও গ্রামের অবস্থানকে চিহ্নিত করেছেন। নগরের সে-শক্তির উৎস যন্ত্র, রাষ্ট্রক্ষমতা ও বাণিজ্য।

এ পুরো পরিকল্পনার ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই এসে যায়—যেমন এর সাফল্যের পূর্বশর্ত কী, পল্লিসমাজ উন্নয়নে নগর-কেন্দ্রের ভূমিকা কী হবে, বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পৃত্তকরণ কী জাতীয় হবে, বৃহৎ শিল্প ও প্রযুক্তির সঙ্গে ক্ষুদ্র শিল্পের সহাবস্থানের রূপরেখা কী হবে ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গ্রাম-উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি এসব সম্পূরক প্রশ্নের অত্যন্ত যুক্তিসংগত ও ব্যবহারিক উত্তর দিয়ে গেছেন। এ ব্যাপারে তাঁর বিস্তারিত চিন্তাধারা নিচে বিশ্লেষিত হলো।

রবীন্দ্রনাথের গ্রামোন্নয়ন পরিকল্পনার সাফল্যের কয়েকটি পূর্বশর্ত তিনি চিহ্নিত করে গেছেন। যেমন, প্রথমত, তাঁর মতে এর জন্য প্রয়োজন হবে বুদ্ধির সাহস ও জনসাধারণের প্রতি দরদবোধ। সেই সঙ্গে প্রয়োজন হবে ব্যবহারিক জ্ঞান—শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয়, চিন্তার বিস্তার ও সাধারণ মানুষের মানসিকতা বোঝার ক্ষমতা। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আমাদের কলেজে যারা ইকনমিক্স্-এথনোলজি পড়ে তারা অপেক্ষা করে থাকে য়ুরোপীয় পণ্ডিতের—পাশের গ্রামের লোকের আচার-বিচার বিধি-ব্যবস্থা জানার জন্য।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘আমাদের দেশে আমরা পরবাসী, অর্থাৎ আমাদের জাতের অধিকাংশের দেশ নয়। সে দেশ আমাদের অদৃশ্য, অস্পৃশ্য।’ দ্বিতীয়ত, এর জন্য প্রয়োজন হবে নিজস্ব চেষ্টার ওপর নির্ভরতা ও সব রকমের পরনির্ভরতা কমানো। রবীন্দ্রনাথের মতে, এর জন্য শিক্ষিত সমাজকে, যুবসমাজকে গ্রামের ভার গ্রহণ করে তাকে ব্যবস্থাবদ্ধ করতে হবে। এটা করার জন্য একটি কর্মীবাহিনী গড়ে তুলতে হবে এবং তাদের উপযুক্ত শিক্ষার জন্য, তাদের প্রস্তুত করার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রস্তাবও রবীন্দ্রনাথ করেছেন। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে জনগণের সরকারনির্ভরতা কমাতে হবে। তাঁর মতে, মধ্যবিত্তসহ সাধারণ ভারতবাসী ক্রমেই সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ছে। এতে সাধারণ মানুষের আত্মনির্ভরতা, আত্মবিশ্বাস ও সম্মানবোধ সবই নষ্ট হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘সরকার-বাহাদুর নামক একটা অমানবিক প্রভাব ছাড়া আমাদের অভাব-নিবারণের আর কোনো উপায় আমাদের হাতে নেই, এই রকম ধারণা মনে বদ্ধমূল হওয়াতেই আমরা নিজের দেশকে যথার্থভাবে হারাই।’ এর কারণ রাষ্ট্রপ্রধান দেশে রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যেই বিশেষভাবে বন্ধ থাকে, দেশের মর্মস্থান; সমাজপ্রধান দেশে দেশের প্রাণ সর্বত্র ব্যাপ্ত হয়ে থাকে, যার কারণেই রবীন্দ্রনাথ ‘রাষ্ট্রতন্ত্র’ ও ‘সমাজতন্ত্রের’ মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রনামীয় একটি হৃদয়হীন যন্ত্রের হাতে সমাজ উন্নয়নকে ছেড়ে দেওয়া যায় না। তৃতীয়ত, এর সাফল্যের জন্য পল্লিসমাজে তিনটি বিষয়ের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে—শিক্ষা, কৃষি ও যন্ত্র। শিক্ষার বিস্তারের মাধ্যমে, কৃষিক্ষেত্রের উন্নয়নের দ্বারা ও উন্নততর প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রাম উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব।

আমাদের দেশে যেভাবে নগর গড়ে উঠেছে, তাতে নগরে যোগ হয়েছে রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গে বণিক শক্তির; রাষ্ট্রযন্ত্র ও বণিকতন্ত্রের মধ্যে বাঁধা পড়ে গিয়েছিল আমাদের গ্রামগুলো। নগরগুলো আমাদের দেশের শক্তির ক্ষেত্র, কিন্তু গ্রামগুলো প্রাণের ক্ষেত্র—এ বলে রবীন্দ্রনাথ এ সমাজে নগর ও গ্রামের অবস্থানকে চিহ্নিত করেছেন। নগরের সে-শক্তির উৎস যন্ত্র, রাষ্ট্রক্ষমতা ও বাণিজ্য। নগর তাই প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র, গ্রামের সহযোগিতাবৃত্তি সেখানে যথোচিত উৎসাহ পায় না। নগর তার শক্তির দাপটে গ্রামকে শোষণ করেছে দীর্ঘকাল ধরে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর পল্লিভিত্তিক সমাজ পরিকল্পনায় নগরের একটি স্বাভাবিক স্থান চিহ্নিত করেছেন। সার্বিক সমাজের মূলভিত্তি হবে স্বায়ত্তশাসিত গ্রাম, যার আর্থিক উন্নয়নের পথ তৈরি হবে বিজ্ঞান ও সমবায়কে ভিত্তি করে। গ্রামের সঙ্গে যোগ থাকবে শহরের, কিন্তু সে যোগ হবে না আধিপত্য ও অধীনতার, শোষক ও শোষিতের। সে যোগের ভেতর দিয়ে অবিরত চেষ্টা চলবে এক নতুন সমন্বয়ের। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘নগর আপন নাগরিকতার অভিমান সত্ত্বেও গ্রামগুলোর সঙ্গে জ্ঞাতিত্ব স্বীকার করবে। কতকটা যেন বড়ো ঘরের সদর-অন্দরের মতো। সদরে ঐশ্বর্য ও আড়ম্বর বেশি বটে, কিন্তু আরাম ও অবকাশ অন্দরে; উভয়ের মধ্যে হৃদয়সম্বন্ধের পথ খোলা।’ সেই সঙ্গে সঙ্গে তিনি এ কথাও বলেছেন যে ‘আমি যখন ইচ্ছা করি যে আমাদের দেশের গ্রামগুলি বেঁচে উঠুক, তখন কখনও ইচ্ছে করি নে যে, গ্রাম্যতা ফিরে আসুক। গ্রাম্যতা হচ্ছে সে রকম সংস্কার, যা গ্রামসীমার বাইরের সঙ্গে বিযুক্ত।’ রবীন্দ্রনাথ একদিকে যেমন স্বনির্ভর পল্লিসমাজের ওপর জোর দিয়েছেন, অন্যদিকে বাইরের জগতের সঙ্গে দেবার ও নেবার পথ উন্মুক্ত রাখবার আকাঙ্ক্ষাও ব্যক্ত করেছেন। সে যোগাযোগের মূল সূত্র রবীন্দ্রনাথের মতে হবে, জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং দর্শন। শান্তিনিকেতন স্থাপনের একটি অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল জ্ঞানবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ভারত ও বিশ্বের মধ্যে একটা অবারিত আতিথ্যের মিলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা।

রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রজার রাজগৌরবও গ্রহণযোগ্য, কিন্তু কোনোমতেই তার ধনমোহ গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু যে কথাটা তিনি ভুলে যাচ্ছেন, তা হচ্ছে রাজগৌরবে প্রজার গৌরব করার মধ্যে একটি আবেগ ও চিন্তা-বৃত্তির দিক হয়তো আছে, কিন্তু তার বাইরে প্রজা কিছু পাচ্ছে কি?

প্রথম জীবনে বৃহৎ যন্ত্র, বৃহৎ শিল্প ও আধুনিক প্রযুক্তির বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের একটা বিরূপ মনোভাব ছিল। তাঁর ধারণা ছিল যে বৃহৎ যন্ত্র ও শিল্প এমন এক সমাজ তৈরি করে, যেখানে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় নগরে, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে ও শাসনযন্ত্রে। এতে মানবিক সম্পর্ক গুঁড়িয়ে যায় এবং মানুষ নিজেই হয়ে যায় একটা যন্ত্র, বা যন্ত্রের দাস। কিন্তু গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের পরে রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করতে পারলেন যে বৃহৎ শিল্প ও আধুনিক প্রযুক্তিকে বাদ দিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব নয়, উন্নয়ন সম্ভব নয় এবং বৃহৎ শিল্প ও আধুনিক প্রযুক্তি তাঁর স্বনির্ভর পল্লিসমাজের চিন্তার সঙ্গে দ্বন্দ্বমূলক নয়। তাই গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য যখন তিনি সমবায়ের কথা বলেছেন, তখন সমবায়ভিত্তিক কৃষি ও শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কথাও তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় বিজ্ঞান-শিক্ষা ও ব্যবহারিক জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তার উল্লেখও তিনি করেছেন। বৃহৎ শিল্প ও আধুনিক প্রযুক্তির গুরুত্ব তিনি আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করেন তাঁর রাশিয়া ভ্রমণের পরে। বাংলাদেশের মন ও অঙ্গ যন্ত্র ব্যবহারে মূঢ় বলেই আমাদের দুর্দশা—এ কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন। আমাদের দেশের তাঁতিরা যে উন্নত প্রযুক্তির অভাবে উৎপাদনশীলতা না বাড়াতে পারার কারণে মরেছেন, সে কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন এবং যথার্থ প্রযুক্তি শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানের মাধ্যমে মন ও মানসিকতা তৈরির গুরুত্বও স্বীকার করেছেন। তবে প্রযুক্তি বিষয়ে তাঁর শেষ কথা হচ্ছে, ‘আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যাকে শুধু তার শক্তিতে মুগ্ধ হয়ে গ্রহণ করাটা মানুষের কর্তব্য নয়, বরং মন্যুষত্বের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যন্ত্র ও প্রযুক্তিকে নতুনভাবে নির্মাণ করাই জরুরি।’১০ রবীন্দ্রনাথের অর্থনৈতিক চিন্তাচেতনায় মানবতাবোধ ও আত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি বস্তুগত বিষয়কে ছাপিয়ে গেছে বারবার। সাধারণভাবে অর্থনীতিতে প্রয়োজনের সম্বন্ধটাই বড় এবং একমাত্র সম্বন্ধ; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাকে হৃদয়ের সম্বন্ধ দ্বারা শোধন করে তবে ব্যবহার করতে বলেছেন।

রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রজার রাজগৌরবও গ্রহণযোগ্য, কিন্তু কোনোমতেই তার ধনমোহ গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু যে কথাটা তিনি ভুলে যাচ্ছেন, তা হচ্ছে রাজগৌরবে প্রজার গৌরব করার মধ্যে একটি আবেগ ও চিন্তা-বৃত্তির দিক হয়তো আছে, কিন্তু তার বাইরে প্রজা কিছু পাচ্ছে কি? দ্বিতীয়ত, যে রাজগৌরবে প্রজা গৌরবান্বিত বোধ করছে, রাজার সে গৌরব কি রাজার ধনমোহ বা সম্পদের কেন্দ্রীভূতকরণ থেকে আসেনি? অর্থনীতির বস্তুগত দিককে মানবিক জলে শোধন করার ওপর এত গুরুত্ব দেওয়ার ফলে রবীন্দ্রনাথ বহু জায়গায় অসংগতিপূর্ণ বক্তব্যের জন্ম দিয়েছেন। জমিদারের দানদক্ষিণাকে তিনি প্রশংসা করেছেন; কিন্তু ধনকে নির্মম ও নৈর্ব্যক্তিক বলে তিনি আখ্যায়িত করেছেন, অথচ এর ফলে যে কথাটা তিনি অস্বীকার করেছেন, তা হচ্ছে তাঁর প্রশংসিত কাজটির মূল কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ওই নির্মম ও নৈর্ব্যক্তিক ধন। রবীন্দ্রনাথের মতে, অর্থ মানবিক দিক নষ্ট করে কিন্তু মানবিক দিকের প্রশংসনীয় ব্যাপারগুলো কি সব সময়ে ধনবিচ্ছিন্ন? শুদ্ধ বস্তুগত বিষয়কে খর্ব করার উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ মানুষের ভোগের একান্ত স্বাতন্ত্র্যকে সীমাবদ্ধ করে দিতে বলেছেন, অথচ সেই সঙ্গে তিনি মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারকে স্বীকার করেছেন। প্রথম কথাটি রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ব্যক্তিস্বার্থপরতা খর্ব করার জন্য, আর দ্বিতীয় কথাটি তিনি উল্লেখ করেছেন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার জন্য। কিন্তু ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে স্বীকার করে ব্যক্তি–স্বার্থপরতা খর্ব করা কি সব সময় সম্ভব? ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে স্বীকার করলে বহু ক্ষেত্রেই তার ব্যক্তিস্বার্থকে কি প্রকারান্তরে স্বীকার করা হয় না? অর্থনীতির বস্তুগত দিকটিকে মানবিকতার প্রলেপ দিতে গেলে বহু ক্ষেত্রেই অসংগতি দেখা দেয়, যা রবীন্দ্রনাথের অর্থনৈতিক ধ্যানধারণায় সুস্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথের ধারণা, বাণিজ্যে মানুষ যে লক্ষ্মীর সন্ধান পেয়েছিল, সেটা শুধু ঐশ্বর্যের কারণে নয়, তার সৌন্দর্যে—কারণ বাণিজ্যের সঙ্গে তার মনুষ্যত্বের বিচ্ছেদ ঘটেনি। লক্ষ্মীকে সম্পদের সমার্থক করলে বাণিজ্যে লক্ষ্মীর সন্ধান মানুষ শুদ্ধ বস্তুগত দিক থেকেই পেয়েছিল, সেখানে হৃদয়বৃত্তির কোনো কারণ ছিল বলে মনে হয় না। যখন কল বাণিজ্যের বাহন হলো, তখন রবীন্দ্রনাথের মতে বাণিজ্য হলো শ্রীহীন। কিন্তু তাতে অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বাণিজ্যের কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হয়েছে বলে আমাদের তো মনে হয় না।

রাশিয়া ভ্রমণ রবীন্দ্রনাথের অর্থনীতি চিন্তাচেতনায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল বলে আমরা মনে করি। এটা যে শুধু একটি ভিন্নতর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় ঘটিয়েছিল তা–ই নয়, বরং অর্থনীতি বিষয়ে তাঁর অনেক নন্দনতাত্ত্বিক ধ্যানধারণা এ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পাল্টে দেয়।

‘মুনাফা আমরা চাই ভোগের বাহুল্যের জন্য নয়, সাহসের আনন্দের জন্য’, এ কথাটায়ও চিত্তবৃত্তি বড় প্রকট, তবে সেখানে শুদ্ধ অর্থনীতি-চিন্তা কতখানি মুখ্য তা ভাববার বিষয়।১১ যে কথাটা আমি বলতে চাচ্ছি তা হচ্ছে অর্থনীতির বস্তুগত বিষয়ের সঙ্গে চিত্ত ও হৃদয়বৃত্তির যোগে হয়তো ওই শাস্ত্রে নতুন মাত্রিকতা রবীন্দ্রনাথ যোগ করছেন, তবে তাতে অর্থনীতির বিষয়বস্তুর শুদ্ধতা, বিজ্ঞানমনস্কতা নষ্ট হয়েছে কি না, তা বিশ্লেষিত হওয়া প্রয়োজন। ভোগের বাসনাকে সৌন্দর্যবোধের দ্বারা সংযত করার কথা বলা কিংবা অনাড়ম্বরকে আড়ম্বরের অভাব না বলে পূর্ণতারই একটা ভাব হিসেবে চিহ্নিত করা নন্দনতাত্ত্বিক দর্শনের অংশ হতে পারে, তবে তা অর্থনীতি নয় কোনোমতেই। কারণ এটা অর্থনীতি হলে দারিদ্র্যকেও সম্পদের অভাব বলা যাবে না, সেটাও পূর্ণতার একটা ভাব হয়ে দেখা দেবে।

রাশিয়া ভ্রমণ রবীন্দ্রনাথের অর্থনীতি চিন্তাচেতনায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল বলে আমরা মনে করি। এটা যে শুধু একটি ভিন্নতর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় ঘটিয়েছিল তা–ই নয়, বরং অর্থনীতি বিষয়ে তাঁর অনেক নন্দনতাত্ত্বিক ধ্যানধারণা এ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পাল্টে দেয়। রাশিয়া ভ্রমণের আগে বৈষম্যভিত্তিক একটি সমাজকাঠামোয়ও ধনী-দরিদ্রের যেকোনো মানবিক সম্পর্ককে তিনি প্রশংসা করেছেন, যেকোনো রকমের ধনমোহের তিনি নিন্দা করেছেন এই বলে যে এ মোহ এ ধরনের মানবিক সম্পর্ককে নষ্ট করে দেয়, সেই রবীন্দ্রনাথই রাশিয়া ভ্রমণের পরে বলছেন, ‘মানুষের মনে ধনভোগ করার ইচ্ছা আছে, সেই ইচ্ছাকে কৃত্রিম উপায়ে দলন করে মেরে ফেলা যায় না। সেই ইচ্ছাকে বিরাটভাবে সার্থক করার দ্বারাই তাকে তার সঙ্কীর্ণতাকে মুক্ত করা যেতে পারে।’১২ এখানে অর্থনীতির স্পষ্ট বস্তুগত দিকটির স্বীকৃতি সুস্পষ্ট, যা এত দিন ধরে রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। তবে এখানে উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথ উল্লিখিত উক্তিটি করেছিলেন সমবায়নীতি প্রসঙ্গে অর্থাৎ ধনীর নয়, দরিদ্র সমবায়ীর উন্নত জীবনযাত্রার ইচ্ছাকেই এখানে সমর্থন করা হয়েছে। রাশিয়ার সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে আন্দোলিত করেছে—তাদের কৃষি ও শিক্ষাব্যবস্থায় তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন।

কিন্তু যে কথাটা এখানে উল্লেখ করা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তা হচ্ছে রাশিয়া ভ্রমণ রবীন্দ্রনাথকে সমবায়ী করেছিল, কিন্তু সমাজতন্ত্রী করতে পারেনি। রাশিয়ার ব্যবস্থা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ যদিও এমন সব কথা বলেছেন, ‘অন্য দেশে যাদের আমরা জনসাধারণ বলি, এখানে তারাই একমাত্র’, ‘অসাম্য চলতে পারে না চিরদিন—কারণ অসামঞ্জস্য বিশ্ববিধির বিরুদ্ধে’, সেই সঙ্গে এসব কথাও বলেছেন যে ‘মানুষের ব্যষ্টিগত ও সমষ্টিগত সীমা এরা যে ঠিকমতো ধরতে পেরেছে, তা আমার বোধ হয় না। সে হিসেবে এরা ফ্যাসিস্টদের মতো। এই কারণে সমষ্টির খাতিরে ব্যষ্টির প্রতি পীড়নে এরা কোনো বাধাই মানতে চায় না।’১৩ তবে ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে রুশদের পার্থক্য রবীন্দ্রনাথ চিহ্নিত করেছেন এই বলে যে ‘মানুষকে এরা দেহের দিকে নিপীড়িত করেছে, মনের দিকে নয়।’১৪ সুতরাং পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটা মাঝামাঝি ব্যবস্থা রবীন্দ্রনাথ কাম্য মনে করেছেন। তাঁর ভাষাতেই, ‘এর একটা মাঝামাঝি সমাধান ছাড়া উপায় আছে বলে মনে করি নে; অর্থাৎ ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকবে অথচ তার ভোগের একান্ত স্বাতন্ত্র্যকে সীমাবদ্ধ করে দিতে হবে। সেই সীমার বাইরেকার উদ্বৃত্ত অংশ সর্বসাধারণের জন্য ছাপিয়ে যাওয়া চাই।’১৫ অর্থাৎ অর্থনীতির সব ক্রিয়াকাণ্ডে সমবায় নীতি গ্রহণ।

আসলে রবীন্দ্রনাথের পক্ষে সমাজতন্ত্রী হওয়া সম্ভব নয়। যে মানুষটি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের অত বড় পূজারি, যিনি সৌন্দর্যতত্ত্বে প্রচণ্ডরকম অনুরাগী এবং যিনি অর্থনীতিতে বস্তুগত বিষয়ের চেয়ে চিত্ত-বৃত্তিকে প্রাধান্য দেন, তাঁর পক্ষে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য সম্পূর্ণ রহিত করে উৎপাদন-উপাদানের পূর্ণ সামাজিকীকরণ, প্রয়োজনবোধে শক্তি প্রয়োগে সমষ্টিগত স্বার্থের কাছে ব্যক্তিস্বার্থের নতিস্বীকারে বাধ্য করা এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির অতিপ্রকাশ্য বস্তুগত বিষয়গুলোকে কী করে মেনে নেওয়া সম্ভব? রবীন্দ্রনাথের মনমানসিকতার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর পক্ষে খুব বেশি হলে মৌল মানবতাবাদী হওয়া সম্ভব, কিন্তু প্রকৃত সমাজতন্ত্রী হওয়া সম্ভব নয়। তিনি ওই পর্যন্তই বলতে পারেন, ‘বহুকাল থেকেই আশা করেছিলুম, আমাদের জমিদারি যেন আমাদের প্রজাদেরই জমিদারি হয়, আমরা যেন ট্রটির মতো থাকি। অল্প কিছু খোরাক-পোশাক দাবি করতে পারবো কিন্তু সে ওদেরই অংশীদারের মতো।’১৬ আমরা একে মৌল মানবতাবোধসম্পন্ন একজন সমবায়ীর উক্তি বলে মানতে পারি না।

আসলে তাঁর উন্নয়ন-চিন্তাধারায় রবীন্দ্রনাথ সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে যে পার্থক্য করেছিলেন, উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে রাষ্ট্র-নিরপেক্ষ করে যেভাবে সমাজনির্ভর করতে চেয়েছিলেন এ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক, রাষ্ট্রীয় ও সমাজকাঠামোয় তা বাস্তবসম্মত নয়। রাষ্ট্র যেমন আজ আর স্বয়ম্ভূ কোনো জিনিস নয়, সমাজও তেমনি রাষ্ট্র-নিরপেক্ষ কোনো ব্যাপার নয়।

অর্থনীতি-চিন্তায় রবীন্দ্রনাথের মানবতাবোধ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের স্বীকৃতি তাঁর উপন্যাস ও ছোটগল্পে অত্যন্ত স্পষ্ট। ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসে নিখিলেশ যখন তার জমিদারির হাটে বিলিতি কাপড় বিক্রিতে তার প্রজাদের বাধা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তার কারণ তো দুটি। প্রথমত, এতে দরিদ্র প্রজাদের অসুবিধা হবে এবং দ্বিতীয়ত, এটা তাদের ব্যক্তিগত অধিকারের ওপরে হস্তক্ষেপ। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে দরিদ্র প্রজার যে দুর্দশা, তা কেলাসিতরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে শাস্তি গল্পে এবং তার ছাপ পড়েছে ‘মেঘ ও রৌদ্র’, ‘উলুখড়ের বিপদ’, ‘হালদার গোষ্ঠী’ প্রভৃতি গল্পে।

রবীন্দ্রনাথ ১৯৩০ সালে প্রতিমা দেবীকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘জীবনের যা লক্ষ্য ছিল শ্রীনিকেতনে শান্তিনিকেতনে তা সম্পূর্ণ সিদ্ধ না হোক, সাধনার পথ অনেকখানি প্রশস্ত করেছি।’ জীবনের এ লক্ষ্যের মধ্যে তাঁর অর্থনৈতিক চিন্তাচেতনাও প্রাধান্য পেয়েছে এবং এ কথা দ্বিধাহীন চিত্তে বলা যায় যে রবীন্দ্রনাথের অর্থনৈতিক ধ্যানধারণার ব্যবহারিক ক্ষেত্র হিসেবেই শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনের জন্ম। শান্তিনিকেতনকে যাঁরা শুধু ব্রহ্মচর্য আশ্রম কিংবা বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অথবা জ্ঞানবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলনস্থল বলে মনে করেন, তাঁরা শান্তিনিকেতনের খণ্ডিত চিত্রই পান। আত্মীয়তা বা প্রতিবেশী সমাজভিত্তিক যে স্বনির্ভর পল্লিসমাজের স্বপ্ন রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন, শান্তিনিকেতনকে তারই নিরীক্ষাগার বলা চলে। শ্রীনিকেতন সম্পর্কেও সে একই কথা প্রযোজ্য।১৭

রবীন্দ্রনাথের কথা দিয়েই আমরা আমাদের প্রবন্ধের উপসংহার টানতে চাই। ‘সমগ্র দেশ নিয়ে চিন্তা করবার দরকার নেই। আমি একলা সমস্ত ভারতবর্ষের দায়িত্ব নিতে পারবো না। আমি কেবল জয় করবো একটি বা দুটি গ্রাম। এদের মনকে পেতে হবে, এদের সঙ্গে কাজ করবার শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। সেটা সহজ নয়, খুব কঠিন কৃষ্ণসাধন। আমি যদি দুটি-তিনটি গ্রামকেও মুক্তি দিতে পারি অজ্ঞতা, অক্ষমতার বন্ধন থেকে, তবে সেখানেই সমগ্র ভারতের একটি ছোট আদর্শ তৈরি হবে। তোমরা কেবল ক’খানা গ্রামকে এভাবে তৈরি করে দাও। আমি বলবো এই ক’খানা গ্রামই আমার ভারতবর্ষ। তা হলেই প্রকৃত ভারতকে পাওয়া যাবে।’১৮

রবীন্দ্রনাথের এ কথায় আবেগ ও একটি স্বাপ্নিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পেয়েছে নিঃসন্দেহে, কিন্তু তাতে বাস্তবতার ছোঁয়া খুবই সামান্য। দারিদ্র্য বা অনুন্নয়ন থেকে মুক্তি একটি সামগ্রিক ও সর্বাত্মক চেষ্টার মাধ্যমেই কেবল আসতে পারে, কোনো বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিত প্রয়াসের মাধ্যমে নয়। সুতরাং দুটি গ্রামের উন্নয়নের মাধ্যমে একটি দেশের প্রকৃত রূপকে খুঁজে পাওয়া যায় না, কিংবা দুটি উন্নত গ্রাম মানেই একটি উন্নত সমাজ নয়। অর্থনৈতিক ও সমাজ উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে পুরো কাঠামোর মধ্যে প্রয়োজনীয় মৌলিক সংস্কার সাধন, যা বিচ্ছিন্ন বা আংশিকভাবে করা যায় না।

আসলে তাঁর উন্নয়ন-চিন্তাধারায় রবীন্দ্রনাথ সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে যে পার্থক্য করেছিলেন, উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে রাষ্ট্র-নিরপেক্ষ করে যেভাবে সমাজনির্ভর করতে চেয়েছিলেন এ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক, রাষ্ট্রীয় ও সমাজকাঠামোয় তা বাস্তবসম্মত নয়। রাষ্ট্র যেমন আজ আর স্বয়ম্ভূ কোনো জিনিস নয়, সমাজও তেমনি রাষ্ট্র-নিরপেক্ষ কোনো ব্যাপার নয়। সুতরাং সে অবস্থায় আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত ও রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বনির্ভর গ্রামীণ সমাজের উন্নয়ন সম্ভব নয়। সমাজের শ্রেণিস্বার্থের সঙ্গে রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্রের সংযোগ আছে, আবার রাষ্ট্রও সম্পৃক্ত আন্তর্জাতিক পটভূমির সঙ্গে। সেখানে পুরো কাঠামোয় মৌল সংস্কার ছাড়া উন্নয়ন ও মুক্তি সম্ভব নয়—না ব্যক্তি-মানুষের, না সমাজের।

সেলিম জাহান: লেখক ও অর্থনীতিবিদ

...

গ্রন্থপঞ্জি

১. অম্লান দত্ত, গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথ, কলকাতা, আনন্দ পাবলিশার্স লিমিটেড, ১৩৯৩,

২. গোলাম মুরশিদ, রবীন্দ্রসাহিত্যে পূর্ববঙ্গ, ‘সীমার মাঝে অসীম’, ঢাকা, বাংলা একাডেমি, ১৩৯৩, পৃ. ১৪০-১৭৮

৩. প্রমথ চৌধুরী, রায়তের কথা, কলকাতা, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, ১৩৫৪

৪. রবীন্দ্র রচনাবলী (বিংশ খণ্ড), কলকাতা, বিশ্বভারতী, ১৩৫২

তথ্যনির্দেশ

১. অম্লান দত্ত, গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথ, কলকাতা, ১৩৯৩, পৃ. ৮৪

২. উপসংহার রাশিয়ার চিঠি, (পূর্বোল্লিখিত), পৃ. ৩৩২ ও প্রমথ চৌধুরী (পূর্বোল্লিখিত পৃ. ১১

৩. রাশিয়ার চিঠি, ৩, রবীন্দ্র রচনাবলী, পূর্বোল্লিখিত, পৃ. ২৮৫। এখানে উল্লেখ্য, এত বছর পরও বর্তমানে সমবায়ের কার্যক্রম বলতে আমরা ঐ কাজকেই বুঝি, যার প্রতি রবীন্দ্রনাথ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন

৪. সভাপতির অভিভাষণ, পাবনা প্রাদেশিক সম্মিলনী, ১৩১৪

৫. ‘পল্লীসেবা’, শ্রীনিকেতনের উৎসবে পঠিত, ১৩৩৭

৬. প্রাগুক্ত

৭. অম্লান দত্ত, পূর্বোল্লিখিত, পৃ. ৮৫

৮. ‘সমবায়নীতি’, পুস্তিকা, বিশ্বভারতী, ১৩৩৫

৯. অম্লান দত্ত, পূর্বোল্লিখিত, পৃ. ৯৪

১০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯১

১১. এ উক্তিটি কবির জাভাযাত্রীর পত্র, ৩ থেকে নেওয়া

১২. অম্লান দত্ত, পূর্বোল্লিখিত, পৃ. ৯২

১৩. উদ্ধৃতিগুলো রাশিয়ার চিঠির বিভিন্ন অংশ থেকে নেওয়া হয়েছে। রবীন্দ্র রচনাবলী (পূর্বোল্লিখিত)

১৪. রাশিয়ার চিঠি, ১৩, পূর্বোল্লিখিত, পৃ. ৩২৮

১৫. রাশিয়ার চিঠি, ৫, পূর্বোল্লিখিত, পৃ. ২৯৩

১৬. প্রতিমা দেবীকে লিখিত পত্র থেকে উদ্ধৃত ১৯৩০

১৭. আমার এ বক্তব্যের সমর্থন মিলবে শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন রচনা ও অভিভাষণে, রবীন্দ্র রচনাবলী, সপ্তবিংশ খণ্ড, ১৩৫২

১৮. ‘শ্রীনিকেতনের ইতিহাস ও আদর্শ’, শ্রীনিকেতনের কর্মীদের সভায় পঠিত, ১৩৪৬