কোলাজ অলংকরণ: অশোক কর্মকার
কোলাজ অলংকরণ: অশোক কর্মকার

নভেরা, অমৃতা, কাহলো

তিন ভূগোলের শৈল্পিক ঐক্য

বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পচর্চার প্রেক্ষাপটে নভেরা আহমেদ একইসঙ্গে অনন্য ও অবহেলিত নাম। তাঁর কাজ ও জীবনকে বুঝতে হলে তাঁকে কেবল দেশীয় পরিসরে নয়, বৈশ্বিক শিল্পধারার সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে হয়।

মতিউর রহমান—নভেরাকে তুলনা করেছেন ভারতীয় আধুনিকতার অগ্রদূত অমৃতা শেরগিল এবং মেক্সিকান শিল্পী ফ্রিদা কাহলোর সঙ্গে। প্রত্যেকেরই শিল্পে ব্যক্তিগত সংগ্রাম, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক বোধ একই রকমভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

নিবন্ধটি তিনটি ভিন্ন ভূগোলের শিল্পীসত্তার এক অন্তরাল ঐক্যের শক্তিশালী স্বীকৃতি।

ষাটের দশকের শুরু থেকেই এই ভূখণ্ডে ছাত্র–গণ–আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সেই পটভূমিতে কবি, লেখক, শিল্পী, নাট্যশিল্পী এমনকি চলচ্চিত্রের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত ছিলেন—সবাইকে নিয়ে একটি বৃহত্তর মঞ্চ তৈরি হয়েছিল। আমরা সেসব প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সেই সময়ই আমরা ভাস্কর নভেরা আহমেদের কথা প্রথম শুনতে পাই।

১৯৬৩ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরির পেছনে তখন শরিফ মিয়ার ক্যানটিন নামে একটি ছোট খাবারের দোকান ছিল। সেই ক্যানটিনে যাওয়ার পথে দেখতাম উন্মুক্ত জায়গায় ঘাসের ওপর এলোমেলোভাবে অবহেলা আর অনাদরে পড়ে আছে নভেরার তৈরি বেশ কয়েকটি ভাস্কর্য।

ঢাকা আর্ট কলেজের (গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস) প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যাচের শিল্পীদের মুখে আমরা নভেরা সম্পর্কে আরও অনেক কিছু জানতে পারি। শিল্পী আমিনুল ইসলাম, রশীদ চৌধুরী, মুর্তজা বশীরের লেখায়–কথায় বিভিন্ন সময়ে উঠে আসে নভেরা প্রসঙ্গ। এই শিল্পীদের ওপর একটি বামপন্থী চিন্তার প্রভাব ছিল। ১৯৫০–৫২ সালে তাঁরা স্কেচ করতে চলে যেতেন শ্রমজীবী এলাকায় কিংবা গ্রামের কৃষকের কাছে। ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর পাশে পেশাজীবী–শ্রমজীবী মানুষের ছবি পরম যত্নে তাঁরা ফুটিয়ে তুলতেন তাঁদের স্কেচবুকে। আমিনুল ইসলাম, আবদুর রাজ্জাক ও মুর্তজা বশীরের সেই সময়কার ড্রয়িং যদি আমরা দেখি, সেখানে পাই সেই সময়ের শ্রমিজীবী মানুষের মুখ। সেই সব সময় বা ড্রয়িং স্কেচের প্রভাব সম্ভবত নভেরার মধ্যেও ছিল।

উন্মুক্ত পরিসর, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল আবহের সঙ্গে আমরা নভেরা আহমেদের চিন্তাভাবনার সাদৃশ্য দেখতে পাই। নভেরার বন্ধুদের কাছে জানতে পারি, সুযোগ পেলেই নভেরা গ্রামবাংলায় চলে যেতেন, মাঝে মাঝেই হয়ে যেতেন হঠাৎ উধাও।
নভেরা আহমেদ (২৯ মার্চ ১৯৩৯—৬ মে ২০১৫)

শিশু, নারী, পরিবার, গ্রাম, গরু ও শান্তির সন্ধানমুখর নভেরার যে কাজগুলো আমরা দেখলাম, সর্বতোভাবে সেগুলো সেই বাংলাদেশেরই (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান)। একটা উন্মুক্ত পরিসর, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল আবহের সঙ্গে আমরা নভেরা আহমেদের চিন্তাভাবনার সাদৃশ্য দেখতে পাই। নভেরার বন্ধুদের কাছে জানতে পারি, সুযোগ পেলেই নভেরা গ্রামবাংলায় চলে যেতেন, মাঝে মাঝেই হয়ে যেতেন হঠাৎ উধাও।

নভেরা আহমেদ প্রসঙ্গে ভাবলে প্রথমেই আমার মনে পড়ে ভারতীয় শিল্পী অমৃতা শেরগিলের কথা। জাতীয়ভাবে স্বীকৃত ভারতের অন্যতম প্রধান এই শিল্পী—প্রভাবিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিল্পকলা দ্বারা। অমৃতা শেরগিলকে আধুনিক ভারতীয় শিল্পকলার পুরোধা বলা যায়। আমাদের দেশের একজন শ্রেষ্ঠ শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া বহুদিন আগে আমাকে বলেছিলেন, আধুনিক ভারতীয় শিল্পকলার প্রধান দুই স্তম্ভ হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং অমৃতা শেরগিল। শেরগিলের নাম আগে আমরা খুব একটা জানতাম না, এখন তিনি বহুল পরিচিত। দিল্লির ন্যাশনাল গ্যালারি অব মডার্ন আর্ট গ্যালারিতে তাঁর অনেক ছবি আছে। একবার বহু সময় ধরে সেখানে শিল্পী যামিনী রায়, রামকিঙ্কর ব্যেইজ ও অমৃতা শেরগিলের অনেক ছবি দেখেছিলাম।

অদ্ভুত সাহসী, উদ্যমী ও বেপরোয়া জীবন ছিল অমৃতা শেরগিলের। সাধারণ মানুষের প্রতি ভালোবাসা, গ্রামের মানুষের প্রতি মমতা বিশদভাবে উঠে এসেছে শেরগিলের ছবিতেও। সেই যে তাঁর স্বাধীন উন্মুক্ত জীবনযাপন এবং একটা নতুন শিল্পকলার জগৎ তৈরি করার মধ্য দিয়ে তাঁর স্বীকৃতির জায়গা যখন একটি সম্মানজনক স্তরে পৌঁছাল, তখনই তাঁর মৃত্যু হলো ১৯৪১ সালে। তিনি বেঁচে ছিলেন মাত্র ৩৮ বছর। অনেক দিক থেকে আমি অমৃতা শেরগিল আর নভেরা আহমেদের মধ্যে মিল খুঁজে পাই।

আরেকটু দূরে গেলে মেক্সিকোর ফ্রিদা কাহলোর কথা মনে পড়ে যায়। ফ্রিদা কাহলো শৈশব থেকে পোলিও রোগে আক্রান্ত ছিলেন। ১৮ বছর বয়সে সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর পিঠ, কোমর, পা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপরও বেশ কয়েকটি অপারেশন হয় তাঁর শরীরে। বলা যায়, সারা জীবন তিনি পঙ্গু জীবন–যাপন করে গেছেন।

নভেরা আহমেদ প্রসঙ্গে ভাবলে প্রথমেই আমার মনে পড়ে ভারতীয় শিল্পী অমৃতা শেরগিলের কথা। জাতীয়ভাবে স্বীকৃত ভারতের অন্যতম প্রধান এই শিল্পী—প্রভাবিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিল্পকলা দ্বারা।
অমৃতা শেরগিল (৩০ জানুয়ারি ১৯১৩—৫ ডিসেম্বর ১৯৪১)

কাহলো বামপন্থী ছিলেন, আমৃত্যু তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যও ছিলেন। সব কাজের পেছনে তাঁর উৎসাহ ছিল শ্রমজীবী মানুষ। কাহলো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন—মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি যুক্ত থাকবেন মানুষের মুক্তির সংগ্রামে, মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করে যাবেন। সেটাই তিনি করেছিলেন। ফ্রিদা কাহলোর সঙ্গে সোভিয়েত বিপ্লবের নেতা ট্রটস্কির বন্ধুত্ব ছিল। এ প্রসঙ্গ টানা হলো নভেরার সময় ও তাঁর কাজকে একটা বিশ্ব প্রেক্ষাপটে দেখার প্রচেষ্টায়—যেখানে অমৃতা শেরগিল এবং ফ্রিদা কাহলো তাঁদের কাজের প্রতি বিশ্বাস, আস্থা, স্বাধীনতা, উদ্যোগ এবং সাহসের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন, যা নভেরার জীবন ও শিল্পকর্মের সঙ্গে অনেকটা তুলনা করা যায়।

’৬০–এর দশকের ঢাকার এসব প্রদর্শনীর পর ১৯৭০ সালে ব্যাংককে নভেরার শেষ প্রদর্শনীর কথাই আমরা জানতাম এত দিন। সেই সময় পাকিস্তানি জাতীয় বিমান সংস্থা ‘পিআইএ’ প্রদর্শনীটি স্পনসর করে। তখন নভেরার এক পুরোনো বন্ধু সাংবাদিক এস এম আলীও ব্যাংককে থাকতেন। আলী তখন ব্যাংকক পোস্ট–এ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হিসেবে কর্মরত। প্রসঙ্গক্রমে তাঁদের সেই পুরোনো বন্ধুত্ব ও একে অপরকে সহযোগিতার কথাও আমরা তখন জানতে পারি। সেই প্রদর্শনীর পর থেকে নভেরার আর কোনো খবর আমরা জানতাম না।

সেই সত্তরের দশক থেকে শুরু করে প্রায় নব্বই দশক পর্যন্ত তাঁর কোনো খোঁজ ছিল না। ওই সময়ের মধ্যে তাঁকে নিয়ে অনেক জল্পনাকল্পনা, অনেক রহস্য; কবিতা–উপন্যাস তৈরি করা হয়ে গেছে। হাসনাত আবদুল হাই তাঁকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন। সায়ীদ আতীকুল্লাহ লিখেছেন কবিতা। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৮ সালে আমাদের বন্ধু আনা ইসলাম, প্রখ্যাত শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদের স্ত্রী (ভোরের কাগজে তিনি তখন সাংবাদিকতা করতেন), প্যারিস থেকে লিখলেন, নভেরা আহমেদ বেঁচে আছেন। তিনি সেই আগের মতোই আছেন। ব্যস্ত আছেন তাঁর শিল্পকর্ম নিয়ে। তিনি তখনো শাড়ি পরতেন, সেই কালো শাড়ি। এভাবে আমরা নতুন করে নভেরাকে আবার খুঁজে পেলাম। সেই সময় আনা ইসলামের মাধ্যমে তাঁর জন্য কালো জামদানি শাড়ি পাঠিয়েছিলাম। সেই উপহার তিনি গ্রহণও করেছিলেন।

মেক্সিকোর শিল্পী ফ্রিদা কাহলো বামপন্থী ও আমৃত্যু কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন—মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি যুক্ত থাকবেন মানুষের মুক্তির সংগ্রামে, মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করে যাবেন। সেটাই তিনি করেছিলেন।
ফ্রিদা কাহলো (৬ জুলাই ১৯০৭—১৩ জুলাই ১৯৫৪)

আমরা জানি, ১৯৫৬ সালে লন্ডন থেকে ভাস্কর্যের ওপর ডিগ্রি নিয়ে নভেরা ঢাকায় ফিরে এসেছিলেন। তখন ঢাকা আর্ট কলেজের বয়স সাত–আট বছরে গড়িয়েছে। তখনো ভাস্কর্য বিভাগ খোলা হয়নি। আমার মনে এ প্রশ্ন জাগে, নভেরা আহমেদকে ঢাকা আর্ট কলেজ বা আর্ট ইনস্টিটিউট (বর্তমান চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) কেন তখন গ্রহণ করল না? তাঁকে নিয়ে কেন ভাস্কর্য বিভাগ শুরু হলো না? এখানে যদি তিনি কাজ করতেন, থাকতেন, তাহলে হয়তো তাঁর কাজের সুযোগ ও সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যেত। হতে পারে তাঁর জীবনযাপন, কাজের ধারাপদ্ধতির যে কথা আমরা জানি, সেখান থেকে তিনি মুক্ত থাকতে পারতেন। কাজের আনন্দে থাকতে পারতেন। ছাত্রছাত্রীদের শেখাতে পারতেন এবং নিজের কাজ করে যেতে পারতেন। একটি স্বীকৃতি পেতেন।

নিশ্চিতভাবে এটা বলা যায়, তিনি ঢাকা ছেড়ে এক অনিশ্চিত জীবনের দিকে চলে গেলেন। স্বল্প আয়ে একজন তরুণী ভাস্কর কীভাবে চলবেন? তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন লেখায় আমরা দেখতে পাই, তাঁর আর্থিক অনটন না হলেও তিনি বেশ অসুবিধার মধ্যে ছিলেন। তাঁর মডেল বা তাঁর সিমেন্ট, কংক্রিট...এসব দিয়ে ভাস্কর্য তৈরি করার যে ব্যয়, তা বহন করার মতো ক্ষমতা তাঁর ছিল কি? ঢাকায় তখন তেমন কমিশন বা কাজ বেচাকেনা করা লোকের সংখ্যা হাতে গোনা, সে জন্য তিনি লাহোরে চলে গেলেন। লাহোর ভারতবর্ষে সব সময়ই শিল্পকলার একটি বড় কেন্দ্র ছিল, সেখানে তিনি কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজের সহযোগিতা পেলেন। এস এম আলীও তখন লাহোরে ছিলেন। কিন্তু সেখানেও তিনি দেখলেন, কাজের জায়গা, সুযোগ–সুবিধা অনেক সীমিত। ধারণা করি, ঢাকা বা লাহোরে কাজের ক্ষেত্র হিসেবে যে আশা–আকাঙ্ক্ষা ও সম্ভাবনা তিনি দেখতে পেয়েছিলেন, পরে আর সেই বাস্তবতা তিনি খুঁজে পাননি। হয়তো এ কারণের জন্যই ঢাকা বা লাহোর কোথাও স্থায়ী হতে পারলেন না।

নভেরা এই অঞ্চলে যেভাবে বেড়ে উঠেছেন—জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় এখানে কাটিয়েছেন, যদিও সে সময়টা খুব দীর্ঘ ছিল না। তবু তাঁর জীবনযাপন, আচার–আচরণ, শাড়ির প্রতি ভালোবাসা, সর্বোপরি তাঁর কল্পনাজগতে ছিল এই দেশ।

প্যারিসে দীর্ঘদিন থাকলেও জীবনাচরণে তিনি বাঙালি ছিলেন। ছিলেন আমাদের বাংলাদেশেরই একজন। সেদিক থেকে নভেরার খোঁজ বা নভেরার খোঁজে আমাদের এ যাত্রা এখনো শেষ হয়নি। ভাস্কর নভেরা আহমেদকে জানতে ও বুঝতে হলে আমাদের আরও প্রচেষ্টা ও উদ্যোগের প্রয়োজন।