সম্প্রতি ঘটে যাওয়া রবীন্দ্রনাথের দেয়ালচিত্রে কালি প্রলেপের ছবি অবলম্বনে প্রথম আলো গ্রাফিকস
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া রবীন্দ্রনাথের দেয়ালচিত্রে কালি প্রলেপের ছবি অবলম্বনে প্রথম আলো গ্রাফিকস

রবীন্দ্রনাথ কেন টার্গেট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কেন্দ্র করে যুগে যুগে এ দেশে যে মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তা কোনো সাধারণ সাহিত্যিক মতপার্থক্য নয়। প্রশ্ন জাগে, যাঁকে বাদ দিয়ে বাংলার ইতিহাস বা সাহিত্য ভাবাই যায় না, তাঁকে নিয়ে এত বিদ্বেষ কেন? কারা আসলে চায় না রবীন্দ্রনাথ এ দেশের মানুষের চেতনায় সজীব থাকুন? এ প্রশ্নের উত্তর যতটা সাহিত্যের পাতায় আছে, তার চেয়ে বেশি আছে ইতিহাস, মনস্তত্ত্ব আর রাজনীতির গভীর অন্দরে। এর উত্তর বহুবার বহুজন দিয়েছেন। তবু বারবার প্রশ্ন ওঠে, তাই পুরোনো উত্তর আবার নতুন করে দিতে হয় আমাদের।

ঔপনিবেশিক বাংলার আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট রবীন্দ্রনাথকে অনেকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করালে আমরা তাঁকে দেখতে পাই জোড়াসাঁকোর ‘জমিদার’ হিসেবে। সন্দেহ নেই, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তিনি জমিদার ছিলেন; পূর্ববঙ্গের শিলাইদহ, শাহজাদপুর আর পতিসরের জমিদারির দায়িত্বও তাঁকে সামলাতে হয়েছিল। কিন্তু প্রজাসাধারণের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তো সাধারণ সামন্তপ্রভুদের মতো ছিল না। পদ্মার দুর্ধর্ষ ও স্নিগ্ধ রূপ, এখানকার মানুষের হাহাকার আর দারিদ্র্য কবিকে ভেতর থেকে নাড়া দিয়েছিল। রোমান্টিক ভাববাদিতা থেকে তাঁর চেতনায় ঘটেছিল এক গভীর জীবনবাদী রূপান্তর। পতিসরের সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা কিংবা নোবেল পুরস্কারের অর্থ কৃষকদের কল্যাণে উৎসর্গ করার মতো ঘটনা প্রমাণ করে, প্রজার অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতি তিনি কতটা সংবেদনশীল ছিলেন। তা সত্ত্বেও, ঔপনিবেশিক কাঠামোর একটা মায়া ও টানাপোড়েন তো ছিলই। পরবর্তী সময়ে যখন বিশ শতকের প্রথমার্ধে পূর্ববঙ্গে উদীয়মান মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটল, তখন ব্রিটিশ আমলের বঞ্চনার শিকার এই সমাজ নিজেদের শিকড় খুঁজতে গিয়ে কলকাতার বাবু সংস্কৃতি আর সামগ্রিক রবীন্দ্র-আধিপত্যকে একধরনের ‘ভিনদেশি’ ও কুলীন সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে দেখতে শুরু করল। এই যে নাগরিক মনস্তত্ত্ব আর গ্রামীণ জনপদের ঐতিহাসিক দূরত্ব, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্বার্থান্বেষী মহল সুকৌশলে এ সুযোগটাই লুফে নিল। তারা রবীন্দ্রনাথকে দাঁড় করিয়ে দিল পূর্ববঙ্গের সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিপরীতে।

রবীন্দ্রবিরোধিতার এই রাজনৈতিক খেলায় সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র হয়ে উঠেছে ধর্মীয় মনস্তত্ত্ব ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতা। মৌলবাদী ও কট্টরপন্থী শক্তিগুলো সব সময় সমাজকে একটি নির্দিষ্ট ও প্রশ্নহীন শৃঙ্খলে আটকে রাখতে চায়। পক্ষান্তরে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও দর্শনজুড়ে রয়েছে মানুষে মানুষে মেলবন্ধন, বহুত্ববাদ আর মুক্তির জয়গান। তিনি শিখিয়েছেন মানুষের বড় পরিচয় তার মানবসত্তা, কোনো গোত্র বা ধর্ম নয়। একটি কূপমণ্ডূক সমাজব্যবস্থার জন্য এই মুক্তচিন্তা সব সময়ই বড় ভয়ের কারণ। তাই তো বিরোধীরা জেনেশুনে ইতিহাস বিকৃত করে। ভাষাসংগ্রামী ও গবেষক আহমদ রফিক থেকে শুরু করে প্রাজ্ঞজনেরা বারবার বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম, যা একেশ্বরবাদ ও সংস্কারমুক্ত উপাসনার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি এই সত্য বেমালুম চেপে যায়। রবীন্দ্রনাথে ধর্ম সম্পর্কিত লেখাগুলো তারা সামনেই রাখতে চায় না। তারা ব্রাহ্ম ও হিন্দু পরিচয়ের তফাত মুছে ফেলে রবীন্দ্রনাথকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে বন্দী করতে চায়। তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পরিষ্কার—সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুর আবেগ উসকে দিয়ে বাঙালি মুসলমানের মন থেকে রবীন্দ্রনাথের সর্বজনীনতাকে মুছে ফেলা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এই বিদ্বেষের বীজ কেবল সামাজিকভাবেই ছড়ায়নি, খোদ রাষ্ট্রযন্ত্র একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল পাকিস্তান আমলে। ১৯৪৭-এর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্র শুরু থেকেই বাঙালি জাতিকে তার হাজার বছরের সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করার চক্রান্তে নামে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী রবীন্দ্রনাথকে চিহ্নিত করল ‘হিন্দু সংস্কৃতি’ আর ‘ভারতীয় আধিপত্যের’ প্রতীক হিসেবে। পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পর থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের মদদপুষ্ট উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠী বাংলা ভাষা, বর্ণমালা এবং সামগ্রিক বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ চালায়। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি মুসলমানের মন থেকে রবীন্দ্র-অনুরাগ মুছে ফেলে তাকে কৃত্রিম একটি ‘পাক-ইসলামি’ সংস্কৃতির ছাঁচে ঢেলে দেওয়া। সে সময় রেডিও-টেলিভিশনে তাঁর গান প্রচার নিষিদ্ধ করা হলো। কিন্তু বাঙালি কি দমে গিয়েছিল? ১৯৬১ সালের আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এই পূর্ববঙ্গেই উদ্‌যাপিত হয়েছিল রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সুফিয়া কামাল বা সন্‌জীদা খাতুনদের নেতৃত্বে যে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তা কেবল গান বাঁচানোর লড়াই ছিল না; তা ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিত্তিপ্রস্তর, যা শেষ পর্যন্ত একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। দুঃখের বিষয় হলো, আজকের স্বাধীন বাংলাদেশেও পাকিস্তান আমলের সেই পুরোনো বয়ান নতুন বোতলে মদ ঢালার মতো ফিরে এসেছে। ভাস্কর্য ভাঙচুর কিংবা শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি লেপনের ঘটনা প্রমাণ করে—সেই কূপমণ্ডূকতা আজও মরেনি।

আরেকটি মজার বিষয় হলো রবীন্দ্রবিরোধিতার ক্ষেত্রে প্রচার করা মিথ বা প্রোপাগান্ডা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় মিথ হলো ‘রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই কাল্পনিক গল্পটি এমনভাবে ছড়ানো হয়, যেন তরুণ প্রজন্ম বিশ্বাস করে বসে, রবীন্দ্রনাথ এ দেশের শিক্ষার শত্রু ছিলেন! অথচ ঐতিহাসিক দলিলপত্র, প্রশান্তকুমার পালের প্রামাণ্য ‘রবিজীবনী’ বা তৎকালীন খবরের কাগজ বলছে অন্য কথা। ১৯১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক আলোচনা যখন চলছে, তখন রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় ছিলেনই না; তিনি শিলাইদহের পদ্মার বোটে নিভৃতে সাহিত্যচর্চায় মগ্ন ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে কার্জন হলে সংবর্ধনা ও ‘ডি–লিট’ উপাধি দেয়, যা তিনি সানন্দে গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে বিশ্বভারতীর ট্রাস্টি করার ইতিহাসও সাক্ষ্য দেয়, এ দেশের শিক্ষাঙ্গনের প্রতি তাঁর কতটা অনুরাগ ছিল। অথচ এ সত্যগুলোকে আড়াল করে একশ্রেণির প্রোপাগান্ডিস্ট তরুণদের মনে কৃত্রিম ঘৃণা তৈরি করতে চায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (২৫ বৈশাখ ১২৬৮—২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ)

বিচিত্র এই রবীন্দ্রবিরোধিতার চরিত্র। ডানপন্থী ধর্মীয় রাজনীতির বাইরে বামপন্থী রাজনীতির একটি নির্দিষ্ট ধারা থেকেও অতীতে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার নজির আছে। যেমন ১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথের চীন সফরের সময় সেখানকার কিছু তরুণ কমিউনিস্ট লিফলেট বিলি করে তাঁর বিরোধিতা করেছিল। তাদের দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ‘বুর্জোয়া’ সংস্কৃতির প্রতিনিধি। সাহিত্যের আধুনিকতাবাদী বলয় (যেমন ত্রিশের দশকের কল্লোল যুগ) যখন কবিতার গতানুগতিক ছন্দ ও রোমান্টিকতা ভেঙে নতুন নাগরিক ভাষা ও বাস্তববাদের জন্ম দিচ্ছিল, সেটি ছিল মূলত সাহিত্যের নিজস্ব ভাঙন ও নবায়নের পথ—যার সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক বিদ্বেষ ছিল না। খোদ রবীন্দ্রনাথও তরুণদের এই অন্বেষণকে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন। কিন্তু যখন শৈল্পিক বা তাত্ত্বিক সমালোচনার আড়ালে রাজনৈতিক সংকীর্ণতা ও ধর্মীয় অন্ধত্বকে উসকে দেওয়া হয়, তখন তা হয়ে ওঠে সংস্কৃতির জন্য বিপদের কারণ।

আজকের ডিজিটাল যুগে ফেসবুকের রিলস, ট্রল আর ভুয়া পোস্টের মাধ্যমে এই রবীন্দ্রবিদ্বেষকে আরও সুকৌশলে তরুণ প্রজন্মের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য একটাই—বাঙালির অসাম্প্রদায়িক আত্মপরিচয়ের ভিত্তিটাকে আলগা করে দেওয়া।

রবীন্দ্রবিরোধিতা আদতে রবীন্দ্রনাথের কোনো সাহিত্যিক দুর্বলতার কারণে নয়; এটি যেন পাকিস্তান আমলের পাকিস্তান সরকারের প্রতিশোধ। এই ধ্যানধারণা আমাদের মাতৃভাষা, মুক্তচিন্তা এবং বহুত্ববাদী বাঙালি সত্তাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত। যখনই কোনো উগ্র মতাদর্শ সমাজে একরৈখিক আধিপত্য কায়েম করতে চায়, তখনই তাদের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ান রবীন্দ্রনাথ। তাই অন্ধ বিদ্বেষ বা রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার কুয়াশা ভেদ করে আমাদের আজ বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস ও চেতনার আলোয় সত্যকে চিনতে হবে। রবীন্দ্রনাথ কেবল অতীতের কোনো পুরোনো ধুলোমাখা নাম নন; তিনি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের এমন এক শিকড়, যাঁকে অস্বীকার করার অর্থ নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা।