ইয়ান ফ্লেমিং, তাঁর বই ও জেমস বন্ড সিরিজের নায়িকাদের ছবি অবলম্বনে
ইয়ান ফ্লেমিং,  তাঁর বই ও জেমস বন্ড সিরিজের নায়িকাদের ছবি অবলম্বনে

ইয়ান ফ্লেমিংয়ের জেমস বন্ড: হানিট্র্যাপ ভেঙে ফেরা গুপ্তচর

ইয়ান ফ্লেমিংয়ের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে আজকের লেখাটি দুইটি কারণে প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ: প্রথমটি ফ্লেমিংয়ের জেমস বন্ড এবং দ্বিতীয়টি হানিট্র্যাপ। একজন লেখক হিসেবে ফ্লেমিংয়ের খ্যাতি তাঁর জীবদ্দশায় এমন এক উচ্চতার শিখরে পৌঁছেছিল, যা নিয়ে যেকোনো ধরনের প্রশংসা মোটেও অতিরঞ্জিত বলে বিবেচিত হওয়ার ন্যূনতম সম্ভাবনা নেই। বিশেষ করে গোয়েন্দাভিত্তিক উপন্যাস হিসেবে পাঠকপ্রিয়তা এবং পরে বড় পর্দায় যে দর্শকপ্রিয়তা জেমস বন্ডের সিরিজের রয়েছে, তা শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়; সাহিত্যিক এবং দার্শনিক বিচারেও বেশ পোক্ত অবস্থানে রয়েছে।

আর দ্বিতীয় বিষয়টি হলো প্রাসঙ্গিকতা। একটি গুরুত্বপূর্ণ টেক্সট বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আঙ্গিকে প্রাসঙ্গিক থাকে। যদি প্রাসঙ্গিকতা হারায় তবে সেই টেক্সটের অস্তিত্ব যথেষ্ট সংকটে রয়েছে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে ব্যর্থ হলে বুঝতে হবে কালের গহ্বরে মিলিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে সেই টেক্সটি। এই জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্মগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যুগে যুগে বিভিন্ন আঙ্গিক দিয়ে, বিভিন্ন ছাঁচে ফেলে, নানা রকম লেন্স ব্যবহার করে প্রাসঙ্গিক রাখা হয়। উদাহরণ হিসেবে উইলিয়াম শেক্‌সপিয়ারকে হাজির করা যেতে পারে। গত এক শ বছরে শেক্‌সপিয়ারের ওপর এত এত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়েছে, যা এতটা কোনো গিনিপিগের ওপরও ল্যাবরেটরিতে চালানো হয়নি। ফলে শেক্‌সপিয়ার এতটা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে, যা হয়তো তার আগের তিন শ বছরেও একাডেমিতে হয়নি। বিশেষ করে উত্তর ঔপনিবেশবাদ দ্য টেম্পেস্ট, ওথেলো কিংবা দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিসের মতো সেরা সেরা নাটকগুলোকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে এমনভাবে জেরা করেছে, যেখানে শক্তির বলয়কে আঁকড়িয়ে থাকা প্রচণ্ড প্রতাপশালী দার্শনিক এবং রাজনৈতিক তত্ত্বগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছে।

তাহলে এখন আলোচনা করব জেমস বন্ড সিরিজের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে। এই প্রাসঙ্গিকতাটাকে আরও অর্থবহ করে তুলবে হানিট্র্যাম্প নামের আইডিয়াটি। শুরুতেই বলে রাখি হানিট্র্যাপ নামের গণমাধ্যম-চাঞ্চল্যকর আইডিয়াটি মোটেও নতুন কোনো বিষয়বস্তু নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন সাহিত্য থেকে শুরু করে রাজনীতির মাঠ পর্যন্ত সব জায়গাতেই হানিট্র্যাপ নামের বিষয়টা উপস্থিত ছিল। আশ্চর্য হলেও সত্য বিশ্বসাহিত্যে প্রথম হানিট্র্যাপ ঘটিয়েছে গিলগামেস। কিন্তু সেই পদ্ধতিটা আজকের সময়ের মতো নেতিবাচক অর্থ বহন করে না। এঙ্কিদুকে সভ্য করে তোলার জন্য শামহাতকে প্রেরণ করে গিলগামেস। যেহেতু এঙ্কিদুকে বন্য প্রাণীর মতো সৃষ্টি করা হয়েছিল, সেহেতু তাকে সভ্য সমাজ-উপযুক্ত মানব করার দায়িত্বটা শামহাতের কাঁধে বর্তায়। শামহাত হলো দেবী ইন্নানার মন্দিরের মহিলা পুরোহিত। সে এঙ্কিদুকে আকৃষ্ট করে তার সঙ্গে সপ্তাহব্যাপী রতিক্রিয়ায় মত্ত থাকে। শামহাত শুধু কামসঙ্গী হয়ে থাকে না; সে অনেকটা সভ্য সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে। সে এঙ্কিদুকে শেখায় কী করে পোশাক পরিধান করতে হয়, কীভাবে মানুষের খাদ্য গ্রহণ করতে হয় কিংবা সামাজিক আচরণগুলোও আয়ত্ত করতে হয়। গিলগামেস জানত যে মানুষ সামাজিক হয়ে গেলে তার মধ্যে বিদ্যমান বন্যতা হারিয়ে যাবে। বিধায় এঙ্কিদুর সঙ্গে মল্লযুদ্ধে মুখোমুখি হলেও গিলগামেসের তেমন কোনো বেগ পেতে হবে না অপেক্ষাকৃত কম বন্য এঙ্কিদুকে হারাতে। এই ছিল প্রাচীনকালের মধু-ফাঁদ বা প্রেম-ফাঁদ।

ইয়ান ফ্লেমিং (জন্ম: ২৮ মে, ১৯০৮–মৃত্যু: ১২ আগস্ট, ১৯৬৪)

আরেকটি বিখ্যাত প্রেম-ফাঁদের গল্প আমরা জানি: হেনরি জেমসের ‘দ্য উইংস অব ডাভ’ নামক উপন্যাস থেকে। এই উদাহরণটি দেওয়ার বিশেষ একটি কারণ রয়েছে। কারণ, বর্তমানে গণমাধ্যমগুলোতে উঠে আসা প্রেম-ফাঁদগুলোতে দেখা যায় একজন নারী আরেকজন পুরুষকে ফাঁসাচ্ছে কিংবা ব্লাকমেল করছে। কিন্তু ১৯০২ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসে দেখা যায় উল্টো চিত্র: এখানে কোনো নারী অপর একটি পুরুষকে ফাঁদে ফেলছে না; বরং এক অভাবী এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণী কেট তার নিজের প্রেমিক মার্টন ডেনশারকে ব্যবহার করছে অপর এক ধনী তরুণী মিলির সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করার জন্য। মিলির রয়েছে দুরারোগ্য মরণব্যাধি। পরিকল্পনা ছিল মার্টন ডেনশার প্রেমের অভিনয় করে মিলিকে বিয়ে করবে। আর মিলির মৃত্যুর পর তার সব সম্পদের মালিক হবে মার্টন ডেনশার। ফলে মার্টন এবং কেটের বাকি জীবনটা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে কেটে যাবে। এমনটাই পরিকল্পনা করা হয়। সব ঠিকঠাকই চলছিল কিন্তু মিলির ব্যক্তিগত ডাক্তার বিষয়টা জানতে পেরে মিলিকে সব অবগত করে। এই সত্যটি অসুস্থ মিলির জন্য সহ্য করা খুব সহজ ছিল না। মার্টনকে ভালোবেসে সে অনেকটা সুস্থ বোধ করতে শুরু করেছিল। কিন্তু হঠাৎ এই ধাক্কা সবকিছু ভেঙে চুরমার করে দেয়। মিলি মারা যায়।

তারপরও মৃত্যুর আগে মিলি তার সব সম্পদ মার্টনের নামে করে দেয়। পরিকল্পনা থেকে একটু ভিন্নভাবে হলেও সম্পূর্ণরূপে সফল হয় মার্টন এবং কেট। কিন্তু বিপত্তি বাধে অন্য জায়গায়। মিলির এই মৃত্যুর জন্য মার্টন নিজেকে অপরাধী ভাবতে থাকে। আর বিবেকের তাড়নায় প্রচণ্ড পরিমাণ আহত মার্টন সম্পদ পেলেও সম্পদ ভোগের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। আর এই বিষয়টি নিয়ে কেটের সঙ্গেও সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। মার্টন এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যেখানে কেটের সামনে বাছাই করার জন্য একটি বিকল্প থাকে: মার্টন অথবা সম্পদ। কেট বেছে নেয় সম্পদ। এই ছিল বিংশ শতকের শুরুর দিকে সাহিত্যে ব্যবহৃত প্রেমের ফাঁদ।

আবার ফিরে আসি জেমস বন্ড সিরিজে। লুতুপুতু প্রেম-প্রেম বাতিক বিষয়বস্তুগুলো রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে ইয়ান ফ্লেমিংয়ের হাতে। বন্ড! জেমস বন্ড স্টাইলে পরিচয় দেওয়া এক অনন্য গুপ্তচরকে ঠেকানোর জন্য অনেক অনেক ফাঁদের মধ্যে এই প্রেম-ফাঁদ অন্যতম আকর্ষণীয় পদ্ধতি। আর তাই আমাদের আজকের আয়োজন ‘ইয়ান ফ্লেমিংয়ের জেমস বন্ড: হানিট্র্যাপ ভেঙে ফেরা গুপ্তচর’ শীর্ষক আলোচনায় বন্ডের জন্য ব্যবহৃত প্রেম-ফাঁদগুলোকে ঠিকঠাক চিহ্নিত করে দার্শনিক ব্যাখ্যা হাজির করা।

উপরিউক্ত আলোচনার পর এখন আরেকটি প্রশ্নের উদয় হয়: সাহিত্যে তো প্রেম-ফাঁদ বিষয়টি ছিল; গোয়েন্দাভিত্তিক উপন্যাস সাহিত্যেও কি ছিল?

উত্তর দেওয়ার আগে বলে ফেলা ভালো যে প্রেম শব্দটি মানবিক এবং জৈবিক বিষয়ের সঙ্গে এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে যেকোনো উপন্যাসে যদি এই বিষয়টি উপেক্ষা করা হয় তাহলেই আশ্চর্য হব। এর উদাহরণও কিন্তু আছে। যাঁরা সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা পড়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই জানেন যে নারীবিষয়ক যেকোনো ফাঁদ থেকে এই সিরিজ অবিশ্বাস্যভাবে মুক্ত। তারপরও চরমভাবে বাণিজ্য সফল: পাঠক এবং দর্শক উভয়ের কাছেই।

এবার দেখি অন্যান্য গোয়েন্দাভিত্তিক উপন্যাসে প্রেম-ফাঁদ আছে কি না। ইয়ান ফ্লেমিংয়ের আগে আরেকজন গোয়েন্দা-সাহিত্যিক চিন্তার জগতে তোলপাড় করেছিলেন। স্যার আর্থার কোনান ডয়েল। ডয়েলের প্রতিটি সাহিত্যকর্মই বিভিন্ন আঙ্গিক থেকে আলোচনার দাবিদার। তবে আজকের বিষয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা যেহেতু প্রেম-ফাঁদেই নির্দিষ্ট থাকব সেহেতু অন্তত এতটুকু বলা যায় যে কোনান ডয়েলের অন্তত একটি উপন্যাসে ক্ল্যাসিক প্রেম-ফাঁদের উদাহরণ রয়েছে। উপন্যাসের নাম ‘দ্য হাউন্ড অব দ্য বাস্কারভিলস’। এই উপন্যাসে জ্যাক স্ট্যাপলটন নামের এক চরিত্র তার নিজের অনিচ্ছুক স্ত্রী বেরিলকেই জোর করে প্রেম-ফাঁদের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে। জ্যাক তার স্ত্রী বেরিলকে নিজের বোন বলে পরিচয় দেয়। আর বেরিলের সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে হেনরি বাস্কারভিলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।

আরেকটু যদি পেছনে যাই তবে দেখতে পাই এডগার এলান পোর অগস্ত দুপা, চার্লস ডিকেন্সের ইন্সপেক্টর বাকেট, উইলকি কলিন্সের সার্জেন্ট কাফ কিংবা এমিল গ্যাবোরিয়াউ এর মসিয়ে লুকককে। এদের মধ্যে হানিট্র্যাপ বলতে যা বোঝায় তা নেই বললেই চলে। এমিল গ্যাবোরিয়াউ এর জগতে ছদ্মবেশ, প্রলোভন, নারী-পুরুষের সম্পর্ক এবং প্রতারণা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে সে অর্থে হানিট্র্যাপ নেই।

এখন আমরা দেখার চেষ্টা করব ফ্লেমিংয়ের কয়েকটি উপন্যাসের প্রেম-ফাঁদ এবং সঙ্গে সঙ্গে মূল্যায়নের জন্য প্রয়োগ করব কিছু দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা জেমস বন্ডের মতো চরিত্রকে বুঝতে সাহায্য করবে। তাই শুরুতেই বেছে নেব ভেসপার লিন্ডকে। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ক্যাসিনো রয়েলে তাকে প্রথমবারের মতো দেখা যায়। আলোচনা সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আগে পাঠকদের উদ্দেশে একটি সাধারণ প্রশ্ন: আপনি কাকে সমর্থন করেন জেমস বন্ড নাকি ভেসপার লিন্ডকে? যদি আপনি শুরুতেই ঠিক করে নেন যে জেমস বন্ড সঠিক পথে আছে, তাহলে বুঝতে হবে মগজের ওপর আপনি আপনার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন। আপনি হেলে পড়েছেন কোনো নির্দিষ্ট একটি আইডিয়ার প্রতি। শুরুতেই আপনি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন শেষে কী হবে।

জেমস বন্ড যদি রাষ্ট্রযন্ত্র দ্বারা পরিচালিত এক এজেন্ট হয়ে থাকে এবং সে এজেন্টকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য অপর পক্ষের আরেকজন এজেন্ট দোষী হয়, তবে বুঝে নিতে হবে যে বয়ানটি সৃষ্টি করা হচ্ছে, সে বয়ানে আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে কাকে হিরো বানানো হবে আর কাকে ভিলেন। জেমস বন্ড যদি ভালো কাজ করে থাকে, সে কি স্বাধীনভাবে ভালো কাজ করেছে? আর ভেসপার লিন্ড যদি খারাপ কাজ করে থাকে, সে কি স্বাধীনভাবে খারাপ কাজ করেছে? যদি উত্তর হয় ‘না’ তবে কেউই তো নিজস্ব কৃতকর্মের জন্য দায়ী না। তারা দুইজনই যদি ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রযন্ত্র দ্বারা পরিচালিত ভিন্ন আদর্শের দুইজন ভিন্ন ভিন্ন এজেন্ট হয়, তাহলে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা কোথায়? অস্তিত্ববাদী দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্র মনে করেন, প্রতিটি মানুষ তার সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী, এমনকি কঠিন পরিস্থিতিতেও। শুধু যদি দায়ী হয় তাহলে দুজনকেই দায়ী হতে হবে। নতুবা কেউই দায়ী নয়।

১৯৫৩ সালে প্রকাশিত ক্যাসিনো রয়েল উপন্যাসের প্রচ্ছদ

ক্যাসিনো রয়েলে জেমস বন্ডের প্রধান মিশন হল সোভিয়েত গুপ্তচর সংস্থার অর্থদাতা লা শিফ্রেকে জুয়া খেলায় হারিয়ে দেউলিয়া করে দেওয়া। এমনটা হলে সে সোভিয়েতের কোপানলে পড়বে এবং তাদের গোপন নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়ে যাবে। আর এই কাজে বন্ডকে সাহায্যের জন্য নিযুক্ত করা হয় ভেসপার লিন্ডকে। ভেসপার লিন্ড নিজেও সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস ৬–এর একজন এজেন্ট। ভেসপার শুরুর দিকে রেনে ম্যাথিসের সঙ্গে রেডিও বিক্রেতার ছদ্মদেশ ধারণ করে। রেনে ম্যাথিস একজন ফরাসি এজেন্ট। বন্ডকে সাহায্য করার জন্য ফ্রান্সের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘দ্য দ্যুজিয়েম ব্যুরো’ তাকে নিযুক্ত করেছে। কিন্তু তাদের প্রবেশ করতে হবে রয়্যাল-লে-জো ক্যাসিনোতে। কারণ, এখানেই ল্য শিফ্রে প্রায়ই জুয়া খেলতে আসে।

জুয়া খেলার দিন বন্ডের সঙ্গী হয় ভেসপার লিন্ড। বন্ড মুখোমুখি হয় ল্য শিফ্রের। ব্যাকারাট খেলায় ল্য শিফ্রের সব অর্থ জিতে নেয় বন্ড। এই হারের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ল্য শিফ্রে মরিয়া হয়ে ওঠে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ল্য শিফ্রের গুন্ডারা ভেসপারকে অপহরণ করে। বাধ্য হয়ে বন্ড তার সহকর্মীকে উদ্ধার করতে যায়। তারাও বন্ডের জন্য ওত পেতে থাকে। বাঁচাতে গেলে বন্ডও ধরা পড়ে। তখন ভেসপার ও বন্ড দুইজনেই তাদের কয়েদখানাতে আটকা পড়ে। কিন্তু ল্য শিফ্রে জুয়া খেলা থেকে শুরু করে দফায় দফায় বিভিন্ন কাজে সোভিয়েতের কোটি কোটি টাকা নষ্ট করে ফেলে। তাই সোভিয়েত সুপ্তচর সংস্থা স্মার্শের একজন এজেন্ট তাকে হত্যা করে। সৌভাগ্যক্রমে এই যাত্রায় বন্ড এবং ভেসপার মুক্ত হয়ে যায়। তবে তার আগে বন্ডকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়।

অসুস্থ বন্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকে। ভেসপার লিন্ড বন্ডকে প্রতিদিন হাসপাতালে দেখতে যায়। তারা একে অপরকে বুঝতে শুরু করে। বন্ড নিজেও বিস্মিত হয় যে সে সত্যি সত্যি অন্য এক নারীকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে চাইছে। গুপ্তচরের জীবন ছেড়ে সংসারের স্বপ্নও দেখতে শুরু করে সে। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলে তারা একসঙ্গে ছুটি কাটাতে যায় এবং তারা প্রেম-বন্ধনে আবদ্ধ হয়। এ পর্যন্ত তো গল্প ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু গল্পে বাঁক আসে, যখন জানা যায় যে ভেসপারের গোপন অতীত আছে। এমন অতীত যা নৈতিকতার সঙ্গে চরম সাংঘর্ষিক। ভেসপার লিন্ড আসলে সোভিয়েত স্বরাষ্ট্র ও নিরাপত্তা সংস্থা এমভিডির হয়ে করে। অর্থাৎ সে একজন ডাবল এজেন্ট। ল্য শিফ্রের হাত থেকে বন্ড যেন পালাতে না পারে, সে বিষয়টাই সে খেয়াল রাখার জন্য নিযুক্ত ছিল। এমনকি তার অপহরণের বিষয়টিও ছিল সাজানো নাটক। বন্ডের সঙ্গে পরিচয়ের আগে ভেসপার ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনীর এক অফিসারের সাথে সম্পর্ক ছিলো। কিন্তু সেই অফিসার স্মার্শের হাতে ধরা পড়লে নির্যাতনের মুখে ভেসপার সম্বন্ধে অনেক কিছুই বলে ফেলে। সেই তথ্যগুলোকে কাজে লাগিয়ে স্মার্শের ভেসপারকে ব্ল্যাকমেল করতে থেকে। ল্য শিফ্রের মৃত্যুর পর ভেসপার ধরে নিয়েছিল যে সে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারবে। কিন্তু সে বুঝতে পারে গেটলার নামক এক স্মার্শ এজেন্ট তাদের গতিবিধি অনুসরণ করছে। অর্থাৎ এর একটিই অর্থ: স্মার্শ এজেন্টরা তাদের খুঁজে বের করে হত্যা করবে। এসব ভেবে ভেবে ভেসপার মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। আর সে চায়নি তার জন্য বন্ডের কিছু হোক। তাই অতিরিক্ত মাত্রার ঘুমের ওষুধ সেবন করে আত্মহত্যা করে ভেসপার লিন্ড। এ সবকিছু জেমস বন্ড জানতে পারে লিন্ডের সুইসাইড নোট থেকে। লিন্ড স্বীকার করে যে সে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, কিন্তু বন্ডের প্রতি তার ভালোবাসা মিথ্যা ছিল না।

বিশ্বাসঘাতকতা বিষয়টাকে পুঁজি করে লিন্ডের প্রতি ভালোবাসা ঘৃণায় পরিণত করে বন্ড। এতেই সে তার মানসিক সান্ত্বনা খুঁজে পায়। উপন্যাস শেষ হয়ে বন্ডের ফোনালাপের মধ্য দিয়ে: ‘০০৭ বলছি। এটা একটি ওপেন লাইন। জরুরি অবস্থা। আমার কথা শোনা যায়? এক্ষুনি এটা বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। ৩০৩০ একজন ডাবল এজেন্ট ছিল। সোভিয়েতের হয়ে কাজ করত। হ্যাঁ, ধুর! আমি বলেছি ‘ছিল’। মাগিটা এখন মরে পড়ে আছে।’

এখন প্রশ্ন হলো ভেসপার কতটুকু ন্যায়ের পথে আছে তা জানার থেকেও বড় প্রশ্ন হলো বন্ডের অবস্থান কি?

যে নারী নিজের জীবন দিল (হয়তো কিছুদিন পরে এমনিও মারা পড়ত) যেন বন্ডের কিছু না হয় তার সম্বন্ধে বন্ডের মূল্যায়ন দিয়েই উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটে। এটা সব সময় প্রত্যাশা করা হয় যে যেকোনো গুপ্তচর জীবনকে সব সময় ফ্রান্সিস বেকনের মতো মাথা দিয়ে ভাববে; হৃদয় দিয়ে নয়। তাদের কাছে তাদের মিশনই সবচেয়ে বড় হবে। এমনটা যদি হয় তাহলেই অস্তিত্ববাদী দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্র এবং হবসের রাজনৈতিক দর্শন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জিতে যায় হবস। কারণ, হবস মনে করেন যখন রাষ্ট্রের ধারণা সৃষ্টি হয়নি, তখন শুধু প্রকৃতির আইন ছিল। কোন সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব ছিল না। যখন প্রত্যেকেই একে অপরকে সন্দেহ করত তখন নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল একমাত্র লক্ষ্য। এই দশাকে হবস বলেছেন ‘প্রত্যেকের বিরুদ্ধে প্রত্যেকের যুদ্ধ’।

রাষ্ট্র সৃষ্টির পরও কিন্তু সেই অবস্থার শেষ হয়নি। কারণ, আজও বিশ্ব-সরকার বলে কোনো সরকার নেই। আর নেই বলেই সব রাষ্ট্রকে কেউ কোনো কিছু করতে বাধ্য করতে পারে না। ফলে প্রতিটি রাষ্ট্রকে নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়। আর এসবের অংশ হিসেবে নজরদারি করতে হয়। গোপন তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। প্রতারণা কিংবা গুপ্তচরবৃত্তির মতো কাজে জড়িয়ে পড়তে হয়। এটাই হবসের বিশ্ব। আর এই বিশ্বের বাসিন্দা হলো জেমস বন্ড এবং ভেসপার লিন্ড। এখানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সোভিয়েত, চীন–সবাই শক্তিধর। আর তাই সবাই পরস্পরকে অবিশ্বাস করে। একে অপরকে পরাজিত করার জন্য ছলনার আশ্রয় নেয়। আর তাই তো যার সঙ্গে সংসার করার স্বপ্নে বিভোর ছিল যে জেমস বন্ড, সেও সময়মতো ভেসপার লিন্ডকে মাগি বলে সম্বোধন করতে দ্বিধাবোধ করল না।

১৯৫৮ সালে প্রকাশিত ইয়ান ফ্লেমিংয়ের উপন্যাস ডক্টর নো

এই হলো ক্যাসিনো রয়েলের হানিট্র্যাপবিষয়ক আলোচনা। মোটেও সহজ সমীকরণে নিষ্পত্তি করা যাবে না। তেমনই আরেকটি চরিত্র দেখতে পাই আমরা তাতিয়ানা রোমানোভা। প্রেম-ফাঁদ বিষয়টি মাথায় রাখলে এই চরিত্রটি অনেক বেশি ক্ল্যাসিক। তাতিয়ানার দেখা পাওয়া যায় ‘ফ্রম রাশা, উইথ লাভ’ নামক উপন্যাসে। তাতিয়ানা রোমানোভা ইস্তাম্বুলে সোভিয়েত কনস্যুলেটে কর্মরত এক রুশ তরুণী। সে একজন সাইফার ক্লার্ক অর্থাৎ সে গোপন সংকেত ও যোগাযোগসংক্রান্ত কাজে যুক্ত।

‘ফ্রম রাশা, উইথ লাভ’ উপন্যাসের মিশন কিন্তু ক্যাসিনো রয়েলের মতো না। এখানে বন্ডের জন্যই ফাঁদ পাতা হয়। প্রধান টার্গেট বন্ডকে হত্যা করা এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দাকে শিক্ষা দেওয়া। আর পুরো পরিকল্পনাটাই করে সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা স্মার্শ। টোপ ফেলা হয় বন্ডের দিকে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তাতিয়ানাকে দিয়ে প্রেম-ফাঁদ পাতা হয়। তাতিয়ানার সঙ্গে জেমস বন্ডের প্রথম দেখা হয় ইস্তাম্বুলে। তাতিয়ানা নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যে সে সাইফার ক্লার্ক হিসেবে কাজ করতে করতে বিরক্ত। তাই সে পশ্চিমে পালাতে চায়। আর প্রথম দেখাতেই সে বন্ডের প্রেমে পড়েছে। এভাবেই শুরু করা হয় বন্ড-তাতিয়ানার গল্প।

ইস্তাম্বুলের ব্রিটিশ এজেন্ট দারকো কেরিমের মাধ্যমে লন্ডন অবগত হয় যে তাতিয়ানা রোমানোভা নামে রাশান এজেন্ট পশ্চিমে পালাতে চায়। তাতিয়ানা আরও জানায় যে তার কাছে সোভিয়েতদের স্পেক্টার নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র আছে। এই যন্ত্রের মাধ্যমে গোপন সংকেত পাঠোদ্ধার করা হয়। আর তাতিয়ানা এই ডিকোডার যন্ত্রটি শুধু বন্ডকেই দেবে, কারণ সে বন্ডকে পছন্দ করে। আর এই যন্ত্রটি উদ্ধারের জন্যই বন্ডকে ইস্তাম্বুলে পাঠানো হয়।

কিন্তু জেমস বন্ডের মতো এত গভীর জলের মাছ কীভাবে এত সহজ টোপ গিলে ফেলবে? তাই শুরু থেকে জেমস বন্ড এবং দারকো কেরিম বিষয়টা এত হালকাভাবে গ্রহণ করেনি। প্রথম থেকেই লন্ডনের নজর ছিল সাইফার যন্ত্রটির দিকে। তাই সন্দেহের তির থাকলেও যন্ত্রটির লোভ সামলানো বেশ কঠিন ছিল। আর এজেন্টদের কাজই তো হলো ঝুঁকি নেওয়া। সেহেতু এই ঝুঁকিটুকু নিতেই হবে।

তাতিয়ানাকে অবিশ্বাস করার প্রধান দুটি কারণ ছিল: প্রথমত, সে আগ বাড়িয়ে এসেছে এবং দ্বিতীয়টি হলো, সাইফার যন্ত্রটি সে শুধুই বন্ডকে দেবে। তারপরও বন্ডের হাতে যথেষ্ট কোনো প্রমাণ ছিল, যার কারণে তাতিয়ানা রোমানোভাকে অবিশ্বাস করা যায়। সেহেতু স্রোতের সঙ্গেই যেতে হবে।

এই পরিকল্পনার প্রধান হোতা হলো কর্নেল ক্রন্সটিন এবং কর্নেল রোসা ক্লেব। এই ফন্দিফিকিরের অংশ হিসেবে সুন্দর তরুণী সাইফার-ক্লার্ক, করপোরাল তাতিয়ানা রোমানোভাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মিশন হলো জেমস বন্ডকে হত্যা করা। আর এমনভাবে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া, যেন মনে হয় জেমস বন্ড রুশদের পক্ষ হয়ে কাজ করছিল। এমনটা হলে ব্রিটিশদের ভাবমূর্তি ধুলায় মিশে যাবে। তবে তাতিয়ানাকে এই বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। সে শুধু মাছ ধরা চার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।

জেমস বন্ড ইস্তাম্বুলে পৌঁছালে দারকো কেরিমের সঙ্গে বেশ ভাব জমে তার। কিন্তু ইস্তাম্বুল তাদের জন্য মোটেও নিরাপদ শহর ছিল না। বেশ কয়েকবার হামলা করা হয় তাদের ওপর। কেরিমের কাছ থেকে জেমস বন্ড জানতে পারে এই জাতীয় ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা রুশীদের পক্ষে কাজ করে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে তাদের বাঁচতে হলে এই সন্ত্রাসীদের পালের গোদাকে হত্যা করতে হবে। এই কাজে কেরিমকে বন্ড সাহায্য করে।

ক্লান্ত পরিশ্রান্ত বন্ড যখন রাতে হোটেলে ফেরে তখন দেখতে পায় তাতিয়ানা তার জন্য বিছানায় অপেক্ষা করছে। বন্ড বুঝতে পারে ইস্তাম্বুলে আর থাকা সুবিধার নয়। সেহেতু মনস্থির করে দ্রুত লন্ডনে ফিরে যাওয়ার। বন্ড তাতিয়ানা এবং স্পেক্টর ডিকোডারসহ বিমানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যেন দ্রুত পৌঁছাতে পারে। কিন্তু তাতিয়ানা ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস নামের ট্রেনে যাওয়ার জন্য জেদ করে। তাতিয়ানার রূপে মুগ্ধ বন্ড রাজি হয়ে যায়। কিন্তু জেমস বন্ড অপর সঙ্গী হিসেবে কেরিমকেও সঙ্গে নেয়।

ট্রেনে ওঠার পর কেরিম অন্তত তিনজন রুশ এজেন্টকে চিনতে পারে। এখানেই তার মনে খটকা বাধে। কর্তৃপক্ষকে ঘুষ দিয়ে দুইজন এজেন্টকে সে ট্রেন থেকে নামতে বাধ্য করে। কিন্তু তারপরও দুশ্চিন্তা থেকে যায়। কারণ, আরও কতজন এজেন্ট উপস্থিত আছে কে জানে। এবার কেরিম নিজেই তাদের পরামর্শ দেয় যেন তারা ট্রেন থেকে নেমে বিমানে যাত্রা করে। আগের মতোই বন্ড নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেয় এবং ট্রেনে থেকে যায়। এই নির্বুদ্ধিতার দণ্ড জেমসকে না দিতে হলেও দিতে হয় কেরিমকে। কারণ, পরের দিন কেরিমের লাশ পাওয়া যায় সেই তৃতীয় এজেন্টের লাশের পাশে। এবার বন্ড তৃতীয়বারের মতো নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেয়। সে ভাবে যেহেতু এজেন্টটি মারা গেছে সেহেতু তারা এখন নিরাপদ। বন্ডের মতো একজন চৌকস গোয়েন্দার নির্বুদ্ধিতাকে বারবার ক্ষমা করা যায় না। আর এই নির্বুদ্ধিতা সে করে যাচ্ছে শুধু তাতিয়ানাকে খুশি করার জন্য। এটি তো সেই ফাঁদই, যা নিয়ে আমরা এতক্ষণ এত আলোচনা করছি। তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে বন্ড শেষ পর্যন্ত হানিট্র্যাপে পড়ে গেছে।

এরপর আকস্মিকভাবে দেখা হয় ক্যাপ্টেন ন্যাশের সঙ্গে। সে নিজেকে একজন ব্রিটিশ এজেন্ট হিসেবে দাবি করে। এই সংকট মুহূর্তে সে জেমস বন্ডকে সাহায্য করবে বলে আশ্বাস দেয়। ক্যাপ্টেন ন্যাশ আরও বলে যে সে তাতিয়ানাকে ইংল্যান্ডে পৌঁছে দিতে সাহায্য করবে। বন্ড আবারও ভুল করে। সে ক্যাপ্টেন ন্যাশকে তার কেবিনে থাকার আমন্ত্রণ জানায়।

জেমস বন্ড সিরিজের নায়িকারা

পরের দিন জানা যায় যে সে আসলে স্মার্শের খুনি রেড গ্রান্ট। সে একপ্রকার বন্ডকে বাগে পেয়ে যায়। আর তাই বন্ডকে হত্যা না করে স্মার্শের পুরো পরিকল্পনা বলতে বলতে পৈশাচিক আনন্দ পেতে থাকে। সেখানেই বন্ড জানতে পারে তাতিয়ানার আসল পরিচয়। বন্ড এ–ও জানতে পারে যে তাকে হত্যা করার পর তাতিয়ানাকেও হত্যা করা হবে। গ্রান্ট আরও বলে যে স্পেক্টর যন্ত্রটির মধ্যে বিস্ফোরক রয়েছে। যদি কেউ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে যায়, তাহলে বিস্ফোরিত হবে। গ্রান্টের এই অহেতুক প্যাঁচালের সময়টাকে কাজে লাগায়। তখন বন্ডের হাতে একটি বই ছিল। বইয়ের পাতার মধ্যে বন্ড ধাতব সিগারেট বক্সটি এমন করে ঢুকিয়ে দেয় যেন গুলি সরাসরি তার গায়ে না লাগে। গ্রান্ট গুলি ছুড়লে বন্ড এমন ভান করে যেন সে মারা গেছে। বন্ড বেঁচে আছে না মরে গেছে দেখার জন্য গ্রান্ট কাছে গেলে বন্ড হঠাৎ তার ওপর আক্রমণ করে। গ্রান্টকে মেরে ফেলে বন্ড।

সামনে আরও বিপদ আছে ভেবে বন্ড তাতিয়ানাকে নিয়ে প্যারিসে পালিয়ে যায়। কিন্তু বিপদ তখনো তাদের ধাওয়া করতে থাকে। এবার সরাসরি মিশনে অংশ নেয় রোসা ক্লেব। এই সেই মাস্টারমাইন্ড রোসা ক্লেব, যে কর্নেল ক্রন্সটিনের সঙ্গে বসে নীলনকশা এঁকেছিল।

শেষ দৃশ্যে যখন রোসা বন্ডের মুখোমুখি হয়, তখন রোসা তার জুতাতে থাকা চাকু দিয়ে বন্ডকে আঘাত করে। চাকুটি ছিল বিষাক্ত। বিষে আক্রান্ত বন্ড আস্তে আস্তে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার ভুলের মাশুল শেষ পর্যন্ত তাকেও দিতে হলো। এখানেই উপন্যাসের পর্দা পড়ে। প্রশ্ন থেকে যায় জেমস বন্ডের কী হলো। এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পরের উপন্যাস ‘ডক্টর নো’তে পাই। সেখানে পাঠক আবিষ্কার করে রোসা পরে কীভাবে বন্ডের বন্ধু রেনে ম্যাথিসের হাতে ধরা পড়ে। হয়তো সে কাস্টডিতে মারা যায়। আর বন্ড সে যাত্রায় বিষক্রিয়া প্রতিহত করতে সক্ষম হয়।

গোয়েন্দাভিত্তিক উপন্যাসের পাঠকদের একটা প্রত্যাশা থাকে তার প্রিয় এজেন্টের কাছে। তারা সব সময় চায় তাদের হিরো সব সময় জিতে যাক। কেন সব সময় জিততে হবে কিংবা এই জাতীয় মানসিকতার কারণ কী, তার বিশদভাবে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন। জেমস বন্ড, শার্লক হোমস কিংবা ফেলুদা সিরিজই হোক না কেন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই পাঠকদের এই আবদার থাকে। পাঠক ধরেই নেয় যে তাদের হিরো অনেকটা অতিমানব। সে সবকিছুই করবে। কিন্তু কোনোটাই সাধারণ মানুষের মতো করে না। টাই বাঁধা থেকে শুরু করে জুতার ফিতা বাঁধা পর্যন্ত—সবকিছুতেই সে হবে অনন্য। সেহেতু প্রেমের ক্ষেত্রেই তা ব্যতিক্রম কেন? ফলে সে যদিও সম্পর্কে জড়াতে চায়; জড়াবে। কিন্তু সাধারণদের মতো মজে যাবে না। হৃদয়ের নাটাইটা তার হাতেই থেকে যায়। যেন সে ইচ্ছেমতো ঢিল দিতে পারে; আবার গুটিয়ে নিতে পারে। এই জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে ‘নিড ফর কগনিটিভ ক্লোজার’ বা নিশ্চিত সমাপ্তির আকাঙ্ক্ষা বলে। নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এল বন্ড। তাতিয়ানার কী হয় আর তা জানা যায় না। আর পাঠকও তা জানতে চায় না। কারণ, তারা বন্ডকে দেখতে চায়: বন্ড, জেমস বন্ড হিসেবে।