ছবি ও গ্রাফিকস: প্রথম আলো
ছবি ও গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বার্লিন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল

অরাজনৈতিক শিল্পের চুপ থাকা ও অরুন্ধতীর চিৎকার

‘শিল্পের রাজনৈতিক হওয়া উচিত নয়’—কথাটা শুনলে মনে হতে পারে শিল্প অতি নিরীহ অরাজনৈতিক ব্যাপার। যেন শিল্প এক স্বয়ংসম্পূর্ণ নন্দনলোক, যেখানে রঙের সঙ্গে রঙের, শব্দের সঙ্গে শব্দের সম্পর্ক, ইতিহাসের সঙ্গে নয়। যেন শিল্প মানে কেবল রূপ, সুর, গঠন। যেন ক্ষমতা, সহিংসতা, রাষ্ট্র বা নৈতিকতার সঙ্গে তার কোনো লেনদেন নেই।

কিন্তু এই নেকুপুষু মার্কা ‘অরাজনৈতিক’ বক্তব্যই আজ বিরাট ‘রাজনৈতিক’ আলাপ হয়ে উঠেছে। আর যাঁকে কেন্দ্র করে এই আলাপের ঘূর্ণিপাক, তিনি বুকারজয়ী লেখক অরুন্ধতী রায়।

ইতিমধ্যে দুনিয়াজুড়ে রাষ্ট্র হয়ে যাওয়া ঘটনাটা হলো, গত ১২ ফেব্রুয়ারি বার্লিনে শুরু হয়েছে বার্লিন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল বা বেরলিনালে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মঞ্চে বসে ছিলেন জুরি সদস্যরা। তাঁদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জার্মান নির্মাতা ভিম ভেন্ডার্স। সামনে সাংবাদিকেরা।

এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, গাজায় যা চলছে, সে বিষয়ে এই উৎসবের আয়োজকদের অবস্থান কী? সিনেমা কি রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারে?

ভেন্ডার্স বিরক্ত হলেন। বললেন, ‘সিনেমা দুনিয়া বদলাতে পারে; কিন্তু রাজনৈতিকভাবে নয়। শিল্পের রাজনৈতিক হওয়া উচিত নয়।’ তারপর যোগ করলেন, ‘চলচ্চিত্রকারদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে হবে।’

ভেন্ডার্সের কথাগুলো হলঘরে থাকেনি। ছড়িয়ে পড়েছে সংবাদমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আর তা জেনেছেন অরুন্ধতীও।

জুরিদের ‘শিল্প রাজনৈতিক হওয়া উচিত নয়’ মন্তব্য শুনে তাঁর মেজাজ খারাপ হয়েছে। তিনি বিবৃতি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, এই উৎসবে তিনি যাচ্ছেন না। তাঁর মতে, ‘শিল্প রাজনৈতিক নয়’ কথাটিই ঘোরতরভাবে রাজনৈতিক। এই কথার মানে চোখের সামনে ঘটে চলা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ নিয়ে আলোচনা থামিয়ে দেওয়া।

অন্যান্যবারের মতো এবারও বেরলিনালেতে অরুন্ধতীর যাওয়ার কথা ছিল। তবে এইবারটা একটু আলাদা ছিল। কারণ, তাঁর বহু পুরোনো, ১৯৮৯ সালে লেখা চিত্রনাট্যের সিনেমা ইন হুইচ অ্যানি গিভস ইট দোজ ওয়ানস এবার উৎসবের ‘ক্ল্যাসিকস’ বিভাগে দেখানো হবে। তিনি নিজেই বলেছিলেন, খবরটা শুনে তাঁর ভীষণ ভালো লেগেছিল। আটত্রিশ বছর আগে নিজের সৃষ্টি করা এক তরুণী চরিত্রের সঙ্গে আবার দেখা হওয়ার আনন্দ তিনি অনুভব করছিলেন। একটু নস্টালজিয়া, একটু মায়া তাঁকে ঘিরে রেখেছিল।

জার্মান নির্মাতা ভিম ভেন্ডার্স (১৪ আগস্ট ১৯৪৫)

কিন্তু জুরিদের ‘শিল্প রাজনৈতিক হওয়া উচিত নয়’ মন্তব্য শুনে তাঁর মেজাজ খারাপ হয়েছে। তিনি দ্য ওয়ার পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, এই উৎসবে তিনি যাচ্ছেন না। তাঁর মতে, ‘“শিল্প রাজনৈতিক নয়” কথাটিই ঘোরতরভাবে রাজনৈতিক। কারণ, যে মুহূর্তে আমরা বলি শিল্প রাজনীতির বাইরে, সেই মুহূর্তেই আমরা একটি নির্দিষ্ট অবস্থান গ্রহণ করি—আমরা শিল্পকে এমন এক নিরপেক্ষতার ভান দিই, যা বাস্তবে কখনোই নিরপেক্ষ নয়।’

এই কথা বলা মানে আমাদের চোখের সামনে ঘটে চলা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ নিয়ে আলোচনা থামিয়ে দেওয়া।

জুরি বোর্ডে ভেন্ডার্স ছাড়াও ছিলেন মার্কিন পরিচালক-প্রযোজক রেইনাল্ডো মার্কাস গ্রিন, জাপানি নির্মাতা হিকারি, নেপালি পরিচালক মিন বাহাদুর ভাম, দক্ষিণ কোরিয়ার অভিনেত্রী বে দুনা, ভারতীয় নির্মাতা শিবেন্দ্র সিং দুঙ্গারপুর ও প্রযোজক এভা পুশচিনস্কা।

প্রশ্নটি যে সাংবাদিক তুলেছিলেন, তাঁকে উদ্দেশ্য করে পুশচিনস্কা বলেছিলেন, কে ইসরায়েলকে সমর্থন করবে আর কে ফিলিস্তিনকে, তার দায় তাঁদের নয়। তিনি আরও বলেন, ‘পৃথিবীতে আরও অনেক যুদ্ধ চলছে, সেগুলো নিয়েও তো আমরা কথা বলি না।’

বার্লিনের মঞ্চে উচ্চারিত এসব বাক্য আর দিল্লির এক লেখকের প্রত্যাখ্যান—এই দুইয়ের মাঝখানেই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে যে প্রশ্নগুলো, তা হলো—শিল্প কি রাজনৈতিক নয়? সৌন্দর্য কি সত্য থেকে আলাদা? নন্দন কি নৈতিকতার বাইরে?

যে শিল্পী আলো নির্বাচন করেন, তিনি একই সঙ্গে ছায়াকেও নির্বাচন করেন। যে চলচ্চিত্রকার ক্যামেরা স্থাপন করেন, তিনি নির্ধারণ করেন কোন মুখ দৃশ্যমান হবে, কোন মুখ অদৃশ্য থাকবে। এই নির্বাচনই তো রাজনীতি—দৃশ্যমানতার রাজনীতি, প্রতিনিধিত্বের রাজনীতি, নীরবতার রাজনীতি।

শিল্পকে ‘অরাজনৈতিক’ ভাবার ধারণাটি আধুনিক নন্দনতত্ত্বে নতুন নয়। শিল্পকে কখনো বলা হয়েছে ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’, কখনো ‘অটোনোমাস’, কখনো ‘শুধু রূপের খেলা’। কিন্তু প্রশ্ন হলো—রূপ কি কখনো শূন্যে জন্মায়?

যে শিল্পী আলো নির্বাচন করেন, তিনি একই সঙ্গে ছায়াকেও নির্বাচন করেন। যে চলচ্চিত্রকার ক্যামেরা স্থাপন করেন, তিনি নির্ধারণ করেন কোন মুখ দৃশ্যমান হবে, কোন মুখ অদৃশ্য থাকবে। এই নির্বাচনই তো রাজনীতি—দৃশ্যমানতার রাজনীতি, প্রতিনিধিত্বের রাজনীতি, নীরবতার রাজনীতি।

শিল্প যদি মানুষের অভিজ্ঞতার রূপায়ণ হয়, তবে মানুষের অভিজ্ঞতা কি ক্ষমতা, রাষ্ট্র, সহিংসতা, বঞ্চনা থেকে আলাদা? ইতিহাসের প্রতিটি যুগে শিল্প সময়ের অন্তর্লিখন বহন করেছে। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, বিপ্লব, প্রেম—সবই শিল্পের ভাষায় প্রবেশ করেছে। শিল্প কখনোই নির্জন দ্বীপ ছিল না; বরং তা ছিল সময়ের মানচিত্র।

অরুন্ধতী রায় (২৪ নভেম্বর ১৯৬১)

অতএব ‘শিল্প অরাজনৈতিক’—এই দাবি আসলে একধরনের নান্দনিক নিরপেক্ষতার কল্পনা, যা নিজেকে অরাজনৈতিক বলে ঘোষণা করার মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক হয়ে ওঠে।

ভেন্ডার্স যখন বলেন, ‘শিল্প রাজনৈতিক হওয়া উচিত নয়’, তখন সেই উচ্চারণের ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক নন্দনতাত্ত্বিক নিরপেক্ষতার ধারণা। অরুন্ধতী সেই নিরপেক্ষতার দাবিকেই প্রশ্ন করেছেন। তাঁর ভাষায়, শিল্প যদি বাস্তবতার সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তে নীরব থাকে, তাহলে সেই নীরবতা নিরপেক্ষতা নয়; বরং সেটি এক নৈতিক অবস্থান। অর্থাৎ নীরবতা নিজেই এক ভাষা।

ভেন্ডার্স যখন বলেন, ‘শিল্প রাজনৈতিক হওয়া উচিত নয়’, তখন সেই উচ্চারণের ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক নন্দনতাত্ত্বিক নিরপেক্ষতার ধারণা। অরুন্ধতী সেই নিরপেক্ষতার দাবিকেই প্রশ্ন করেছেন। তাঁর ভাষায়, শিল্প যদি বাস্তবতার সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তে নীরব থাকে, তাহলে সেই নীরবতা নিরপেক্ষতা নয়; নৈতিক অবস্থান।

গাজায় যা ঘটছে, তা গণহত্যা। তা নিয়ে শিল্পীর ভূমিকা কী থাকা উচিত? কেউ বলতে পারেন, শিল্পীর কাজ শিল্প করা, রাজনীতি রাজনীতিবিদদের জন্য। কিন্তু এই বিভাজন কি সত্যিই সম্ভব? যখন অন্যায় প্রকাশ্য, তখন নীরব থাকা কি সত্যিই নিরপেক্ষ থাকা?

শিল্প যদি কেবল বিনোদন হয়, তবে তা ক্ষমতার অলংকার হতে পারে; কিন্তু শিল্প যদি সাক্ষ্য হয়, তবে তা ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।

অরুন্ধতী রায়ের প্রত্যাহার তাই কেবল একটি উৎসব বর্জন নয়, এটিও প্রচ্ছন্ন এক শিল্প। এখানে শিল্প কেবল পর্দায় নয়, শিল্পীর সিদ্ধান্তেও প্রকাশিত। অরুন্ধতীর সিদ্ধান্ত আমাদের জানিয়ে দেয়—শিল্প কখনোই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিতে দাঁড়ায় না। তা হয় ক্ষমতার পাশে, নয় তার বিপরীতে। যখন পৃথিবী জ্বলছে, তখন শিল্পের কাজ কেবল আলো-ছায়ার খেলা নয়; সেই আগুনের সাক্ষ্য বহন করা।

দ্য ওয়ার–এ প্রকাশিত অরুন্ধতী রায়ের সম্পূর্ণ বিবৃতি

অরুন্ধতী রায়

‘ইন হুইচ অ্যানি গিভস ইট দোজ ওয়ানস’—আটত্রিশ বছর আগে লেখা আমার এক কৌতুকরসে ভেজা চিত্রনাট্য—বার্লিন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল-এর ২০২৬ সালের ‘ক্ল্যাসিকস’ বিভাগে প্রদর্শনের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল। খবরটি যখন প্রথম পেলাম, মনে হয়েছিল বহু পুরোনো এক তরুণীর সঙ্গে হঠাৎ আবার দেখা হয়ে গেল—যে তরুণী আমারই সৃষ্টি, অথচ আজও নিজস্ব এক প্রাণশক্তি নিয়ে বেঁচে আছে। এটি ছিল গভীরভাবে ব্যক্তিগত, মৃদু আলোয় ভেজা এক আনন্দের মুহূর্ত; এটি ছিল সময়ের কাছ থেকে ফিরে পাওয়া এক পুরোনো চিঠির মতো।

ফিলিস্তিন প্রশ্নে জার্মান সরকারের অবস্থান ও জার্মানির কিছু সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আমাকে দীর্ঘদিন ধরেই বিচলিত করেছে—এ কথা আমি লুকোইনি। তবু জার্মানির নাগরিকদের ভেতরে, শিল্পমনা মানুষদের মধ্যে আমি বারবার রাজনৈতিক সংহতি দেখেছি। গাজায় যা ঘটছে, তা নিয়ে কথা বলার জন্য আমি যেমন কণ্ঠ তুলেছি, তেমনি বহু কণ্ঠ আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাই আমাকে ভাবতে শিখিয়েছিল—‘অ্যানি’র প্রদর্শনীতে উপস্থিত থাকা হয়তো অর্থহীন হবে না; হয়তো সেখানে দাঁড়িয়ে আরও একবার সত্য উচ্চারণ করা যাবে।

আমরা যাঁরা শিল্পী, লেখক, চলচ্চিত্রকার, তাঁরা কি কেবল সৌন্দর্যের রক্ষক? আমাদের কাজ কি শুধু রূপের উপাসনা? নাকি আমাদের ভাষা, আমাদের ক্যামেরা, আমাদের কলম—এ সবই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য?
অরুন্ধতী রায়

কিন্তু আজ সকালে, যখন উৎসবের জুরি সদস্যদের কাছে গাজায় চলমান গণহত্যা সম্পর্কে মতামত জানতে চাওয়া হয়েছিল, তখন পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের মতো আমিও জুরি সদস্যদের কিছু বক্তব্য শুনলাম। শিল্প নাকি রাজনৈতিক হওয়া উচিত নয়—তাঁদের এই কথা আমাকে হতবাক করেছে। এই বাক্যটি যেন এক নির্মিত প্রাচীর, যার আড়ালে মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের আলোচনা স্তব্ধ করে দেওয়া যায়। অথচ সেই অপরাধ আমাদের চোখের সামনেই, বাস্তব সময়েই ঘটছে—রক্তের উষ্ণতা এখনো শুকোয়নি।

আমরা যাঁরা শিল্পী, লেখক, চলচ্চিত্রকার, তাঁরা কি কেবল সৌন্দর্যের রক্ষক? আমাদের কাজ কি শুধু রূপের উপাসনা? নাকি আমাদের ভাষা, আমাদের ক্যামেরা, আমাদের কলম—এ সবই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য? আমি বিশ্বাস করি, এই মুহূর্তে আমাদের নীরব থাকার কথা নয়; বরং আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে অন্যায় থামানোর পক্ষে দাঁড়ানোর কথা।

আমি স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, গাজায় যা ঘটেছে এবং যা এখনো ঘটছে, তা ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ইসরায়েল রাষ্ট্রের সংঘটিত এক গণহত্যা। এই অপরাধকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমর্থন ও অর্থায়ন করছে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির সরকার এবং ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ। ফলে তারাও এই অপরাধের অংশীদার।

আমাদের সময়ের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকার ও শিল্পীরা যদি আজও এই সত্য উচ্চারণ না করেন, যদি তাঁরা নিরপেক্ষতার আবরণে নিজেদের ঢেকে রাখেন, তবে ইতিহাস তাঁদের ক্ষমা করবে না। ইতিহাস নিরপেক্ষ নয়; ইতিহাস সাক্ষ্য খোঁজে।

আমি গভীরভাবে মর্মাহত, ক্ষুব্ধ এবং বিতৃষ্ণ। ব্যক্তিগত আনন্দের মুহূর্তকে তাই আমি সরিয়ে রাখছি। গভীর অনুতাপের সঙ্গে জানাচ্ছি—আমি বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে উপস্থিত থাকছি না।