অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান
অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

পাকিস্তান পর্ব

বাঙালি মুসলমানের ভাষা প্রশ্ন

শিরোনামের তিনটি বিষয় শুরুতে স্পষ্ট করা দরকার—‘বাঙালি মুসলমান’ কারা, ‘ভাষা’ বলতে আমরা কী বুঝব, আর ‘পাকিস্তান পর্ব’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে। এরপর এই তিনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হবে, যেগুলো কখনোই তর্কাতীত থাকেনি, বরং প্রশ্ন হয়েই থেকেছে।

রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগপর্যন্ত ‘বাঙালি’ আর ‘মুসলমান’ শব্দ দুটি আলাদা করে দেখা হয়েছে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীকান্ত (১৯১৭) উপন্যাসের শুরুতে ‘বাঙালি’ আর ‘মুসলমান’ শুধু আলাদা শব্দ নয়, সেখানে ফুটবল খেলাকেন্দ্রিক সংঘর্ষের বিবরণে লেখকের পক্ষপাতও স্পষ্ট। কিন্তু মুশকিল হলো, পাকিস্তান রাষ্ট্রের সূচনাপর্বে ‘বাঙালি মুসলমান’ একক শব্দ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও নতুন আরেক বাইনারি তৈরি হয়। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের পর ‘বাঙালি মুসলমান’ ‘অভিজাত মুসলমান’ থেকে আলাদা হয়ে যায়।

‘ভাষা’র আলোচনায় আমাদের খেয়াল রাখা দরকার, এর মৌখিক ও লিখিত রূপের বাইরেও ভাষিক ও অভাষিক এমন অনেক চিহ্ন আছে, যা সচেতন-অসচেতনভাবে আমরা কাল ও পুরুষ-পরম্পরায় বয়ে নিয়ে চলি। অর্থাৎ আমরা যা বলি বা লিখি, শুধু সেটাই ভাষা নয়—যা করি সেটাও ভাষা। ভাষার সঙ্গে সমাজ-সংস্কৃতির যোগ গভীর; এর মধ্যে ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদ নিহিত থাকে।

আর ‘পাকিস্তান পর্ব’ বলতে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত চিন্তা করলে হবে না, অন্তত ভাষার প্রশ্নে তো নয়ই। রাজনৈতিক ইতিহাসের যেমন পূর্বাপর থাকে, তেমনি ভাষারও আছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রে ভাষাবিষয়ক তর্ক ও প্রশ্নের সূচনা সাতচল্লিশের দেশভাগের আগে এবং এর জের আমরা টেনে চলেছি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী কালপর্বেও।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের সূচনাপর্বে ‘বাঙালি মুসলমান’ একক শব্দ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও নতুন আরেক বাইনারি তৈরি হয়। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের পর ‘বাঙালি মুসলমান’ ‘অভিজাত মুসলমান’ থেকে আলাদা হয়ে যায়।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ভারত-পাকিস্তান ভাগের ইতিহাস দ্বিজাতিতত্ত্বের সরল একরৈখিক বিবরণ দিয়ে মীমাংসা করার চেষ্টা করা হয়। সে কারণে সাহিত্যেও বাংলাভাগের প্রধান পরিণতি হিসেবে উদ্বাস্তুজীবন আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উপস্থাপনা দেখা যায়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩) থেকে রাজস্ব আদায়ে সরকার ও হিন্দু জমিদারদের ভূমিকা এবং এর বিপরীতে পূর্ব বাংলার সংখ্যাগুরু কৃষক প্রজার প্রতিক্রিয়াও এখানে বিবেচনায় নিতে হবে। সুতরাং পাকিস্তানের স্বাধীনতা মুসলমান রাজনীতিবিদ, অভিজাত মুসলমান শ্রেণি আর সাধারণ মুসলমান—সবার জন্যই যৌক্তিক, কাঙ্ক্ষিত ও অবশ্যম্ভাবী ছিল।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এ অঞ্চলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশপর্বও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। তাতে বোঝা যাবে, ভাষার অধিকার তাদের অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষার সঙ্গেও কীভাবে সম্পর্কিত ছিল। পাকিস্তান পর্বের সূচনা থেকে পূর্ব বাংলার কৃষকশ্রেণির অংশবিশেষ শিক্ষা ও চাকরি গ্রহণের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে রূপান্তরিত হতে থাকে। তারাই প্রথমে বুঝতে পারে, উর্দু বা ইংরেজি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজের ভাষা হলে বাংলাভাষীরা পিছিয়ে পড়বে। তা ছাড়া রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে এই প্রদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা ‘বাংলা’কে অবজ্ঞা করা হলে আবেগজনিত তীব্র প্রতিক্রিয়া তো ছিলই।

পাকিস্তান পর্বে ভাষাবিষয়ক সবচেয়ে বড় ঘটনা রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বাংলার পক্ষে দাবি তোলা এবং রক্তের মাধ্যমে এর স্বীকৃতি আদায়। পাকিস্তানের অপরাপর আঞ্চলিক ভাষাগুলো ছিল জনসংখ্যার দিক দিয়ে ছোট। ফলে বাংলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা কঠিন ছিল না। তা ছাড়া এ ভাষার বিস্তৃত সাহিত্য ও নোবেল পুরস্কার জয়ের মাধ্যমে পাওয়া আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এ দাবিকে জোরালো করে তোলে। তবে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে যখন থেকে ভাবা হচ্ছিল, তখন থেকেই এর সমান্তরালে আরও কিছু আলাপ তৈরি হয়। হাজার বছরের ঐতিহ্যযুক্ত নিজস্ব লিপিপদ্ধতি থাকা সত্ত্বেও প্রশ্ন ওঠে—উর্দু বা আরবি হরফে, এমনকি রোমান হরফে বাংলা লেখা যায় কি না। এসব অদ্ভুত ও বিতর্কিত প্রস্তাব যাঁরা দিয়েছেন, তাঁরা নিজেরাও ছিলেন দ্বিধান্বিত। তাঁদের এই সংশয় কাটতে সময় বেশি লাগেনি।

তবে বাংলা ভাষা চিরকাল রূপকথার ‘দুয়োরানি’ হয়েই থেকেছে। ১৯৫৬ সালে সংবিধানে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পেলেও এই ভাষার ‘প্রস্তুতি ও উন্নয়নে’র জন্য দুই দশক সময় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। অর্থাৎ এ সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রের কাজেকর্মে বাংলা ভাষার ব্যবহারযোগ্যতা তৈরি করতে হবে। ফলে দেখা যায়, পাকিস্তান পর্বে সত্যিকার অর্থে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে প্রযুক্ত হওয়ার সময় ও সুযোগ পায়নি। তবে এর সূত্র ধরে ১৯৬২ সালে কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলা পরিভাষা তৈরি এবং বাংলায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি প্রথমেই দারুণ সফলতা দেখায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এই প্রতিষ্ঠানকে বাংলা একাডেমির সঙ্গে একীভূত করে দেওয়া হলে ভাষাবিষয়ক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়।

পাকিস্তানের অপরাপর আঞ্চলিক ভাষাগুলো ছিল জনসংখ্যার দিক দিয়ে ছোট। ফলে বাংলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা কঠিন ছিল না। এ ভাষার বিস্তৃত সাহিত্য ও নোবেল পুরস্কার জয়ের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এ দাবিকে জোরালো করে তোলে।

১৯৫৫ সালে বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠা পাকিস্তান পর্বের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পাশাপাশি ভাষা গবেষণার জন্য এ রকম একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের দাবি ওঠে। অবশ্য ১৯৪৮ সালেই মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে’ ভাষাসংক্রান্ত একটি একাডেমির প্রয়োজনের কথা তুলে ধরেন। ওই সময়ে দৈনিক আজাদ পত্রিকা এ–বিষয়ক জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে। বাংলা একাডেমি ও কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগসমূহ ভবিষ্যৎ কাজের ভিত্তি তৈরি করে দিচ্ছিল। তবে দুঃখজনক হলো, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ভাষার প্রশ্নে আবেগটুকুই শুধু থেকেছে, প্রকৃত আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে।

রাষ্ট্রভাষা করার ক্ষেত্রে উর্দুর পক্ষে যুক্তিও একেবারে কম ছিল না। বহুভাষিক নতুন রাষ্ট্রে উর্দুর ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’ হয়ে ওঠার সব সম্ভাবনাই ছিল। এমনকি কথ্য ও লিখিত ভাষায় ব্যাপক মাত্রায় এর ব্যবহার ছিল—সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের দৈনন্দিন কথোপকথনে এর ব্যবহার হতো, কবি-লেখকেরাও উর্দুতে লিখতেন। ওই সময়ে উর্দু চলচ্চিত্র পূর্ব বাংলায়ও জনপ্রিয় হয়। কিন্তু মধ্যবিত্ত হয়ে ওঠা শিক্ষিত নতুন শ্রেণি বাংলা ভাষার পক্ষে অবস্থান নিয়ে নিজেদের ‘বাঙালি’ করে তুলল। তারা স্পষ্ট করে দিল—এই বাঙালি মুসলমান, আর সীমানার ওপারে আছে বাঙালি হিন্দু। হিন্দু-মুসলমানের বিভাজনরেখা আগে থেকেই ছিল, পাকিস্তান পর্বে এই রেখা আরও মোটা হয়। মুহম্মদ আবদুল হাই ১৯৪৬ সালে মাসিক মোহাম্মদীতে ‘ওরা ও আমরা’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে হিন্দু-মুসলমানের ভেদ নিয়ে পরিতাপ করে বলেছেন, ‘একেবারে মনের মিলন, সামাজিক আচার-আচরণে একেবারে আত্মীয়তা হলো না ওতে আমাতে এতকাল ও এবং আমি এক সঙ্গে বসবাস করা সত্ত্বেও।’

মজার ব্যাপার হলো, বাংলা বরাবরই ছিল ‘ব্রাত্যজনে’র ভাষা। মধ্যযুগে আরবি-ফারসি স্বীকৃত ছিল ‘বেহেশতি ভাষা’ হিসেবে, আর সংস্কৃত ‘দেবভাষা’ হিসেবে। আঠারো শতকের কবি সৈয়দ নাসির সিরাজসাবিল কাব্যে আলাওল ও আবদুল হাকিমের বরাত দিয়ে লিখেছেন, ‘হিংসা না করিবা দেখি শাস্ত্র হিন্দুয়ানি’, কিংবা ‘বাঙ্গালা দেখিয়া ঘিন্ন ন আন মনএ’। বাংলাকে লোকভাষা হিসেবে ঘৃণা করার প্রবণতা সতেরো-আঠারো শতক পর্যন্ত উচ্চবর্ণ হিন্দুসমাজেও ছিল। সে কারণে রামায়ণ, মহাভারত বাংলায় লেখার জন্য কৃত্তিবাস, কাশীরাম দাস নিন্দিত হয়েছেন: ‘কৃত্তিবেসে কাশীদেসে আর বামুন ঘেঁষে, এই তিন সর্বনেশে।’ সুতরাং মুসলমান বাংলাভাষী বাঙালির মতো হিন্দু বাংলাভাষী বাঙালি সমাজের নিচু কোটরেই বিন্যস্ত বা বিবেচিত হয়েছে।

বাংলা ভাষার ‘নতুন রাজধানী’ ঢাকা হওয়ার পর এর মৌখিক ভাষারূপ কেমন হবে, পাকিস্তান পর্বে তা নিয়েও কথা উঠেছে। অঞ্চলভেদে বাংলার মৌখিক রূপের নানা ভিন্নতা আছে; কিন্তু ‘আদর্শ’ বা প্রমিত কথ্য ভাষা কেমন হবে, সেটাই ছিল প্রশ্ন। আবদুল হাই নির্দেশ করেছেন, ঢাকা বা পূর্ব বাংলার কোনো অঞ্চলের কথ্য ভাষাকে আদর্শ ভাষারূপ হিসেবে গ্রহণ করা দরকার ছিল। তবে একই সঙ্গে তিনি এই শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন, ভাষার মৌখিক ও লিখিত রূপের আদর্শ হিসেবে কলকাতাভিত্তিক ‘চলিত ভাষা’ স্বীকৃতি পেয়ে এত দূর পর্যন্ত এগিয়ে গেছে যে ঢাকার ভাষারূপের আদর্শ হিসেবে নতুন কিছুকে আর গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

ওই সময়ে উর্দু চলচ্চিত্র পূর্ব বাংলায়ও জনপ্রিয় হয়। কিন্তু মধ্যবিত্ত হয়ে ওঠা শিক্ষিত নতুন শ্রেণি বাংলা ভাষার পক্ষে অবস্থান নিয়ে নিজেদের ‘বাঙালি’ করে তুলল। তারা স্পষ্ট করে দিল—এই বাঙালি মুসলমান, আর সীমানার ওপারে আছে বাঙালি হিন্দু।

পাকিস্তান পর্বে লিখিত ভাষার রূপ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাতচল্লিশের আগপর্যন্ত, যখন কলকাতা ছিল বাণিজ্য ও সাহিত্যের রাজধানী, তখন দেখা গেছে—পূর্ব বাংলার মানুষও কলকাতাকে বিত্ত আর সাহিত্য তৈরির উপায় ভেবেছে। মীর মশাররফ হোসেন ‘আদর্শ গদ্য ভাষা’র সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন কলকাতাকেন্দ্রিক পত্রিকা আর লেখকদের গদ্য পড়েই। আবু হেনা মোস্তফা কামাল লিখছেন, মশাররফ হোসেনকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বঙ্গদর্শন (১৮৭২) পত্রিকায় অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছিলেন, তবে সেটা সাহিত্যের শিল্পমূল্যের জন্য নয়, বরং ‘বিশুদ্ধ’ ভাষাদর্শের জন্য। আর কায়কোবাদ তো মুসলমান সমালোচকদের কাছেই অভিযুক্ত ছিলেন মুসলমান কবি হয়েও ‘মুসলমানি শব্দ’ কম ব্যবহারের কারণে।

আঠারো শতকে এ অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী ধারণার উন্মেষ হয়নি; তবে সে সময়ে মুসলমানদের মধ্যে জাতিগত স্বাতন্ত্র্যের ধারণা প্রবল হয়। সে কারণে মধ্যযুগের শেষ ভাগে রচিত আরবি-ফারসি মিশ্রিত দোভাষী পুঁথি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। পাকিস্তান পর্বে ‘দোভাষী পুঁথি’র আবেগ ও জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ভাষা সংস্কারেরও প্রস্তাব করা হয়। পূর্ব বাংলার সরকার ১৯৪৯ সালে মাওলানা আকরম খাঁর নেতৃত্বে ঢাকায় ‘ইস্ট বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ কমিটি’ গঠন করে। এই কমিটির বিশেষ লক্ষ্য ছিল বাংলা ভাষাকে ‘পাকিস্তানের মানুষের প্রতিভা ও কৃষ্টির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ’ করা। কমিটি প্রস্তাব করে, এখন থেকে ‘আমি তোমায় জন্ম-জন্মান্তরেও ভুলিব না’ এমন বলা যাবে না, বরং বলতে হবে ‘আমি তোমাকে কেয়ামতের দিন পর্যন্ত ভুলিব না’, কিংবা ‘মাসের পরিসমাপ্তিতে ঋণ শোধ করিব’, এই বাক্যের বদলে বলতে হবে ‘মাস কাবারিতে দেনা/কর্জ আদায় করিব’ ইত্যাদি।

অবশ্য ভাষা আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহের কারণে সরকার এই কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করতে সাহস করেনি। রিপোর্টটি ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হলে দেখা যায়, এই কমিটি লিপি ও বানান নিয়েও বিদঘুটে সংস্কার প্রস্তাব করেছে। ল্যাঙ্গুয়েজ কমিটি এর নাম দিয়েছে ‘শহজ বাংলা’। কমিটি আশা করে, প্রস্তাবিত সংস্কার সাধিত হলে আগামী ২০ বছরের মধ্যে বাংলা হরফকে রোমান বা উর্দু হরফে রূপান্তরের প্রয়োজন হবে না, তবে ২০ বছর পর হরফ পরিবর্তনের চিন্তা করা যেতে পারে। বানানের ক্ষেত্রেও তাদের প্রস্তাব বিস্ময়কর—স্বরচিহ্ন পরে বসবে, যুক্তবর্ণ ভেঙে একক বর্ণ হিসেবে পাশাপাশি বসাতে হবে এবং কোনো ফলাচিহ্নও থাকবে না; যেমন কীন্‌তু (কিন্তু), চন্‌দ্‌র (চন্দ্র), বীশ্শ (বিশ্ব) ইত্যাদি। এর প্রতিক্রিয়ায় মুনীর চৌধুরী বলেছিলেন, ‘যাঁরা ভাষাতত্ত্বে অনভিজ্ঞ, ব্যাকরণের মর্মোদ্ধারে অনভ্যস্ত, অভিধানে অনাস্থাবাদী, তাঁরাই নির্দ্বন্দ্বচিত্তে ব্যাপকতম সংস্কারের সুপারিশ করেছেন এবং গভর্নমেন্টের শরণাপন্ন হয়েছেন নিজেদের প্রস্তাব অনুযায়ী আইন জারি করার জন্য।’ হুমায়ুন আজাদ একে দেখেছেন ‘বাঙালি জাতিসত্তাকে পর্যুদস্ত করার চক্রান্ত’ হিসেবে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান পর্বে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভের জন্য যেমন লড়াই করতে হয়েছে, তেমনি লিপি-বানান ও ভাষাগত বিভ্রান্তিমূলক নানা তৎপরতার বিপরীতেও লড়াই করতে হয়েছে। এ কাজে বাংলা ভাষার শক্তি হয়ে ছিল এর বিপুল ভাষিক জনগোষ্ঠী ও সমৃদ্ধ সাহিত্যভান্ডার। এ দুই শক্তির কারণে ব্রিটিশ পর্বে ফারসি-ইংরেজি রাজভাষা ও সরকারি ভাষা থাকা সত্ত্বেও বাংলা ভাষা ঠিকই ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে—সাধারণের মুখের কথায়, পত্রিকা ও সাহিত্যের লেখায়। তবে বাংলাদেশ পর্বে আমরা আমাদের হীনম্মন্যতা আর ভুল নীতির কারণে বাংলা ভাষার ব্যবহারকে নিজেরাই সংকুচিত করে তুলছি।