
১৯১৩ সাল। বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে গেছে দুই বছর হলো। মৌলভীবাজার সরকারি হাইস্কুলে ক্লাস থ্রিতে পড়ে এক বালক। জন্মসূত্রে ও পারিবারিকভাবে সে মুসলমান। সরস্বতীপূজার সময় এসেছে। স্কুল সাজানো হচ্ছে লতাপাতা ও নানা রকম রঙিন কাগজ দিয়ে। তদারক করছেন ড্রিল ও ড্রয়িং মাস্টার। হিন্দুধর্মের ছাত্রছাত্রীরা আমোদ–আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেছে পূজা উপলক্ষে। হইহুল্লোড় আর মহা ধুমধামের সঙ্গে উদ্যাপিত হচ্ছে সরস্বতীপূজা। অপর দিকে মনমরা হয়ে ক্লাসে বসে জানালা দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ওই বালক সহপাঠীদের হইচই দেখছে আর চিকচিক করে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে চোখের পানি।
এটি কোনো কাল্পনিক দৃশ্য নয়। সৈয়দ মুজতবা আলীর বড় ভাই, বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও গবেষক সৈয়দ মুর্তাজা আলী তাঁর আত্মজীবনীতে এই বিবরণ উল্লেখ করেছেন। (আলী: ১৩৭৫ বাংলা, ৬০) এই বিবরণ থেকে স্পষ্ট হয়, সে সময়ে বাংলার মুসলমান সমাজে সাংস্কৃতিক শূন্যতা বিরাজ করছিল। এই দৃশ্যে যেমনটি দেখা গেছে, হিন্দুধর্মের ছাত্রছাত্রীরা যেভাবে সরস্বতীপূজা উপলক্ষে সাংস্কৃতিক চর্চা করতে পারছে, মুসলমান ছাত্রছাত্রীরা তা পারছে না। এটি কেবল স্কুলের চিত্র ছিল না; বরং তৎকালীন মুসলমান সমাজের সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির একটি প্রতিনিধিত্বশীল চিত্র। আমাদের আলোচনার মূল লক্ষ্য—বাংলার মুসলমান সমাজ এই সাংস্কৃতিক শূন্যতা পূরণে মিলাদুন্নবী পালনে কীভাবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।
১.
সৈয়দ মুর্তাজা আলী নিজেই এই সাংস্কৃতিক শূন্যতা পূরণের সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমরা যখন সিলেট গবর্নমেন্ট হাইস্কুলে পড়তাম, তখন স্কুলে খুব আড়ম্বরের সংগে মিলাদ উৎসব হত। এই উপলক্ষে আমরা স্কুল বাটিকাকে সুন্দররূপে সাজাতাম। সভা করে বাংলা ও ইংরেজী ভাষায় পয়গম্বরের ভাবধারা ও জীবনী সম্বন্ধে আলোচনা করতাম।’ অর্থাৎ তিনি মৌলভীবাজার সরকারি হাইস্কুলে যে সাংস্কৃতিক শূন্যতা অনুভব করেছেন, তা পূরণ হয়েছে সিলেট গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে এসে মিলাদুন্নবী পালনের মাধ্যমে, যাকে বলা হয়েছে ‘মিলাদ উৎসব’।
মিলাদুন্নবী পালনের একই চিত্র দেখা যায় তৎকালে বেড়ে ওঠা অনেক লেখক ও গবেষকের স্মৃতিকথায়। পূর্ববাংলার মধ্যবিত্ত সমাজের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাষ্যকার কামরুদ্দীন আহমদ লিখেছেন, ‘আমাদের স্কুলে খুব ধুমধাম করে সরস্বতীপূজা হতো। ড্রয়িং টিচার ও ড্রিল মাস্টার সাজানো–গোছানো ও শৃঙ্খলা রক্ষা করার দায়িত্ব নিতেন। আমাদের স্কুলে ফাতেহায়ে দোয়াজ দাহম–এ মিলাদ হতো, তবে মুসলমান ছাত্রের সংখ্যা এত কম ছিল যে মৌলবী সাহেবের সব তালবে আলেম নিমন্ত্রণ করে এনেও একটি ঘর ভর্তি করা যেত না। মিলাদ পড়াবার জন্য আমরা খাজা নাজিমুদ্দীনের ছোট ভাই খাজা শাহাবুদ্দীনকেই ডাকতাম। তিনি তখন রাজনীতি করতেন না। তিনি ছিলেন মৌলভী সাহেব...। তার গলার স্বর সুমিষ্ট ছিল। কেতাব ও ছাতা তালবে আলেমদের হাতে থাকত। কোন মৌলভী সাহেব আমাদের স্কুলে মিলাদ পড়ালে তাকে দেয়া হতো পাঁচ টাকা; কিন্তু খাজা সাহেব আসলে কলিন্স সাহেব তাঁকে ১০ টাকা দিতে বলতেন।” (আহমদ: ২০১১, ৪৯) এখানেও সরস্বতী পূজার বিপরীতে মুসলমান ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য মিলাদুন্নবী পালনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। একই বিষয়ে কবি আবুল হোসেনের সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ: ‘কৃষ্ণনগরে কলেজিয়েট স্কুলে ছাত্র শিক্ষকদের কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান করতে দেখিনি। স্কুলে প্রধান অনুষ্ঠান ছিল দুটি, ডিসেম্বর মাসে বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী সভা এবং বছরের মাঝামাঝি বার্ষিক স্পোর্টস। স্কুলে ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রথম পাই কুষ্টিয়া হাই স্কুলে। সরাসরি স্কুলের অনুষ্ঠান নয়, হিন্দু ছাত্রদের উদ্যোগে তাদের হস্টেলে সরস্বতী পূজা। কয়েক মাস পরে মুসলমান ছাত্ররা ফাতেহায়ে দোয়াজ দাহম উপলক্ষে স্কুলেই হজরত মুহম্মদের জন্মোৎসব পালন করে। মুসলমান ছাত্রদের কোন হস্টেল ছিল না, স্কুলের একটা বড় পড়ার ঘরে তাদের অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়। সরস্বতী পূজায় শরিক না হলেও, আমরা কয়েকজন তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিই। কিন্তু ফাতেহায়ে দোয়াজ দাহম অনুষ্ঠানে হিন্দু ছাত্রদের দেখিনি; কিন্তু প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে আরও কয়েকজন হিন্দু শিক্ষক অনুষ্ঠানে ছিলেন। শহরের গণ্যমান্য নাগরিকদেরও আমন্ত্রণ করা হয়েছিল। প্রধান অতিথি ছিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়। তিনি তখন কুষ্টিয়ার মহকুমা হাকিম। কিন্তু ফাতেহায়ে দোয়াজ দাহমের যে অনুষ্ঠানটি কুষ্টিয়ায় সাড়া জাগিয়েছিল, সেটি হয় পরের বছর।’ (হোসেন: ২০০৩, ৪৪)
ওপরের উদ্ধৃতিগুলো থেকে এটা স্পষ্ট যে বঙ্গভঙ্গ রদের পর থেকে স্কুল ও কলেজে ধারাবাহিকভাবে বার্ষিক মিলাদুন্নবী পালনের মাধ্যমে মুসলমান ছাত্রছাত্রীরা সাংস্কৃতিকভাবে নিজেদের তৈরি করেছিলেন। যে সময়ের কথা বলছি, তখনো নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা স্কুলে যাওয়া শুরু করেনি। মধ্যবিত্ত সমাজই মূলত তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানো শুরু করেছে তখন। ফলে স্কুলে মিলাদুন্নবীর এই সাংস্কৃতিক চর্চা ছাত্রছাত্রীদের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত সমাজে ছড়িয়ে যেতে লাগল। যার নিদর্শন হিসেবে তৎকালীন সাহিত্যে মিলাদুন্নবীর উপস্থিতিকে চিহ্নিত করা যায়। কবি কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে গদ্যকার এস ওয়াজেদ আলী পর্যন্ত বাঘা বাঘা লেখক মিলাদুন্নবী পালনের বিষয়ে লিখেছেন তখন। আলবত তার প্রভাব সমাজে পড়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—জাতীয় সংস্কৃতির নির্মাণে মধ্যবিত্ত সমাজের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। মিলাদুন্নবী যে জাতীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে, সে ক্ষেত্রে স্কুল–কলেজের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মধ্যবিত্ত সমাজে মিলাদুন্নবীর সাংস্কৃতিক চর্চা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।
২.
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মিলাদুন্নবী পালনের একটি অংশ ছিল গদ্যে, পদ্যে নবীজির জীবনী লেখার প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অনেক ছাত্রছাত্রীর লেখার হাতেখড়ি হয়েছিল। প্রমাণ হিসেবে তিনজন বিখ্যাত লেখকের স্মৃতিচারণা উল্লেখ করা যায়।
বিখ্যাত লেখক ও সাহিত্যিক সানাউল হক লিখেছেন: ‘আমার গদ্য লেখার প্রথম প্রকাশ্য পরিচয় ঘটে হযরত মোহাম্মদকে নিয়ে লিখিত আমার একটি রচনায়। ফাতেহা দোয়াজ দাহম উপলক্ষে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে রচনাটি আমি পাঠ করি।’ (ঘোষ: ২০০২, ৪৮১) সরদার ফজলুল করিম বলেছেন: ‘মিলাদ হতো স্কুলে। সে উপলক্ষে হযরতের জীবনের উপর রচনা প্রতিযোগিতা হতো। আর তাতে একবার “মানুষ হযরত মোহাম্মদ” শিরোনামের আমার লেখাটিকে প্রথম পুরস্কার দেওয়া হয়েছিলো।’ (করিম: ২০১৬, ১২০) কবি ও সাহিত্যিক মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ্ লিখেছেন: ‘সে সময়ে আমাদের তালশহর হাই স্কুলে বার্ষিক মিলাদ মাহফিল হতো; আর সে উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হতো মহানবীর (সা.) জীবন ও আদর্শ সম্পর্কে রচনা প্রতিযোগিতা। বার্ষিক মিলাদ উপলক্ষে ও নবী দিবসে স্থানীয় মওলবী-মাওলানারা ছাড়াও বাইরে থেকে আমন্ত্রিত অতিথিরাও আসতেন।’ (মাহফুজউল্লাহ্: ১৯৯৯, ৩৩) অর্থাৎ মিলাদুন্নবী পালনের মাধ্যমে মুসলমান ছাত্রছাত্রীরা সাংস্কৃতিকভাবে নিজেদের তৈরি করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশেরও সুযোগ লাভ করে।
স্কুল ও কলেজে মিলাদুন্নবী পালনের মাধ্যমে মুসলমান সমাজের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধ যখন তৈরি হচ্ছিল, তখন সাহিত্যেও তার প্রভাব পড়ে। কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলার মুসলমান সমাজের সাংস্কৃতিক অগ্রদূত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ১৯২০ সালে মোসলেম ভারত পত্রিকায় ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে লেখেন ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্ [আবির্ভাব]’ শীর্ষক কবিতা। কবি গোলাম মোস্তফা, যিনি কাজী নজরুল ইসলামের সমসাময়িক ও তৎকালীন বাংলার মুসলমান সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল কবি, তিনিও মিলাদুন্নবী উপলক্ষে একাধিক কবিতা রচনা করেছেন। যেমন: ফাতেহায়ে দোআজ দাহম (আবির্ভাবে), হযরত মোহাম্মদ, বিশ্বনবী ইত্যাদি। মুসলিম রেনেসাঁর কবি হিসেবে খ্যাত কবি ফররুখ আহমদ লিখেছেন ‘সিরাজাম মুনীরা’। মিলাদুন্নবী উপলক্ষে গদ্যও লিখেছেন তৎকালীন সাহিত্যিকেরা। ১৯২৪ সালে কাজী আবদুল ওদুদ লিখেছেন ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজদাহাম’ গদ্য; মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ লিখেছেন ‘রবিঅল আউয়ল’, যা সবুজ বাঙলা পত্রিকার আষাঢ় ১৩৪২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়; এস ওয়াজেদ আলীর ‘নবী দিবস’ শীর্ষক রচনা প্রকাশিত হয় গুলিস্তাঁ পত্রিকার শ্রাবণ ১৩৫১ সংখ্যায়। অর্থাৎ তৎকালীন বাংলার মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বশীল কবি, সাহিত্যিক ও গবেষকদের কাছে ঈদে মিলাদুন্নবী একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। এটি স্বীকৃত যে সাংস্কৃতিক উৎসব উদ্যাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশমাধ্যম সাহিত্য। বাংলার মুসলমান সমাজ যখন ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের মাধ্যমে সাংস্কৃতিকভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন সাহিত্যিকেরাও নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই চেষ্টায় শামিল হয়েছেন।
ঈদে মিলাদুন্নবী পালনকে নিজেদের সাংগঠনিক প্রচার প্রসারের লক্ষ্যেও ব্যবহার করা হয়েছে। পূর্ববাংলার খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ ও পাকিস্তান গণপরিষদের স্পিকার মৌলভি তমিজউদ্দিন খান আঞ্জুমান-ই-ইসলামিয়ার ফরিদপুর শাখায় যোগদান করেছিলেন ১৯১৫ সালে। যোগদান করেই তিনি সংগঠনের পক্ষ থেকে ফরিদপুর জেলায় অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করেন। উল্লেখ্য যে আঞ্জুমান-ই-ইসলামিয়ার প্রধান ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ খান। (খান: ১৯৯৩, ৬৮)
পাকিস্তান আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরিতেও মিলাদুন্নবী পালন একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল। অ্যাডভোকেট সা’দ আহমদ এ বিষয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন: ‘১৯৪২ সালের কোন এক সময় কুষ্টিয়া মহকুমা মুসলিম ছাত্রলীগের সভাপতি ও সম্পাদক ভেড়ামারা হাইস্কুলে এসে মুসলিম ছাত্রলীগের সংগঠন গড়েন এবং স্থানীয় সভাপতির দায়িত্ব আমার উপর অর্পণ করেন। ...। হাইস্কুলে পূর্বের চাইতে মুসলিম ছাত্রসংখ্যা বেশ কিছু বৃদ্ধি পেল। ভেড়ামারা বাজারে মুসলিম বসতি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং মুসলিম সরকারি কর্মচারী বৃদ্ধি পাওয়ায় তাঁদের সন্তানদের নিয়ে মুসলিম ছাত্রলীগের দল ভারী হতে লাগল। বড়দের সাহায্য নিয়ে কলকাতা থেকে কবি, সাহিত্যক ও গায়ক এনে আমরাও একমাত্র হাইস্কুলের ময়দানে জমকালোভাবে নবী (সা.) দিবস উদ্যাপন করতে শুরু করে দিলাম।’ (আহমদ: ২০০২, ২০) দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যখন মুসলমান ছাত্রছাত্রীরা সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠছিল, তখন তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা ও প্রচার-প্রসারে মিলাদুন্নবীর পালন একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
বাংলার মুসলমানদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ঈদে মিলাদুন্নবীকে কীভাবে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তার একটি নিদর্শন উল্লেখ করা যেতে পারে। পাবনার সাঁথিয়ায় হিন্দু জমিদারের সঙ্গে মুসলমান জনগোষ্ঠীর বাদানুবাদ হয়। বাদানুবাদ শেষ পর্যন্ত মামলায় গড়ায়। মুসলমানদের পক্ষ থেকে মামলা লড়েন শেরেবাংলা এ কে এম ফজলুল হক এবং তাঁর বাকপটুতা ও অনন্য নৈপুণ্যের গুণে মামলায় মুসলমানরা জয়লাভ করে, পরাজিত হয় জমিদার। জমিদারকে পরাজিত করা ছিল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য স্বপ্নের মতো ব্যাপার। এই বিজয় উদ্যাপনের জন্য তারা বেছে নেয় ঈদে মিলাদুন্নবীকে। এলাকায় ছিল একটি মাদ্রাসা; তালিমনগর মাদ্রাসা। এটি ছিল স্থানীয় মুসলমানদের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। জমিদারের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন উদ্যাপনের লক্ষ্যে তালিমনগর মাদ্রাসায় মিলাদুন্নবী উদ্যাপনের বর্ণাঢ্য আয়োজন করা হয়; ১৮টি গরু জবাইয়ের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয় মিলাদুন্নবীর সেই ঐতিহাসিক উদ্যাপন।’ (গফুর: ২০০০, ৩৭)
ওপরের আলোচনায় নিশ্চয়ই একটি সাংস্কৃতিক রূপান্তর লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্কুলে মুসলমান ছাত্রছাত্রীদের জন্য কোনো সাংস্কৃতিক উৎসব উদ্যাপনের বিষয় না থাকার হতাশাগ্রস্ত অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে উত্তরণ ঘটেছে। প্রথমে স্কুল–কলেজে মিলাদুন্নবী উদ্যাপনের মাধ্যমে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধ নির্মাণের মাধ্যম হিসেবে; মিলাদুন্নবীতে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে মুসলমান ছাত্রছাত্রীদের সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশের উপায় হিসেবে; সাহিত্যের বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করে সংস্কৃতির সাহিত্যিক ভিত্তি রচনার মাধ্যমে এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় ও প্রচার প্রসারের মাধ্যম হিসেবে, অর্থাৎ বাংলার মুসলমান সমাজ নিজেদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধ নির্মাণে মিলাদুন্নবীর বহুমাত্রিক ব্যবহার করেছে। জমিদারবিরোধী কার্যক্রমে মিলাদুন্নবীর রাজনৈতিক ব্যবহারও লক্ষণীয়। এটিকে কেবল ধর্মীয় বিষয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতিগত উৎসবে পরিণত করা হয়েছে।
এখানে স্মরণ করা যায় এম আর আখতার মুকুলের বাবা বিশিষ্ট লেখক সা’দত আলী আখন্দের একটি বক্তব্যকে। তিনি আক্ষেপ করে ১৯২৯ সালে লিখেছেন: ‘বাঙালী মুসলিম সমাজের ভিতরকার খবর নিতে গেলে প্রথমেই সমাজের একটা বিরাট নিরানন্দতা চোখে পড়ে যায়। বর্তমানে আমাদের সামাজিক-জীবনে এই উৎসব আনন্দের অভাব এতই বিসদৃশভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে যে তরুণ মুসলিম তাঁদের বৈচিত্র্যবিহীন জীবন নিয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। বস্তুত জাগরণশীল সমাজে কোনো দিনই আনন্দ উৎসবের অপ্রতুলতা দেখা যায় না।’ বাংলার মুসলমান সমাজের মধ্যে যে নিরানন্দতা, উৎসবের অভাব লক্ষ্য করে তিনি আফসোস করেছেন, তা কেটে গেছে পরের দশকেই। ৩০ ও ৪০ দশকে জাগরণশীল সমাজ হিসেবে বাংলার মুসলমান পালন করেছে মিলাদুন্নবী। এই পালনের ফলে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধ নির্মাণ তো হয়েছেই, রাজনৈতিক শক্তিমত্তাও বেড়েছে বৈ কি!
বর্তমান সময়ে মিলাদুন্নবী পালন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। সরকারি ছুটি, রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন, মিলাদুন্নবী উপলক্ষে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ প্রায় সব জেলায় মিছিল, মাহফিল, ফ্রি চিকিৎসা ক্যাম্প ইত্যাদির মাধ্যমে পালনের পরিসর দিন দিন বেড়েই চলেছে। চলমান বাস্তবতায় মিলাদুন্নবীর জাতীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হবার ভিত্তিপ্রস্তর নির্মিত হয়েছে বঙ্গভঙ্গ রদ থেকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে। এই ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক কালপর্বকে (১৯১১-১৯৪৭) স্মরণ করা মিলাদুন্নবী পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
১. আমাদের কালের কথা : সৈয়দ মুর্তাজা আলী, চট্টগ্রাম, ১৩৭৫ বঙ্গাব্দ
২. বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশ : কামরুদ্দীন আহমদ, ধ্রুপদ সাহিত্যাঙ্গন, ২০১১
৩. জীবন ক্রমশ ঠিকানা পশ্চিম এখন বর্তমান : আবু রুশদ, অ্যাডর্ন পাবশিকেশন, ১৯৯৮
৪. সানাউল হক রচনাবলী দ্বিতীয় খণ্ড : বাংলা একাডেমি, ২০০২
৫. আমার দেখা সমাজ ও রাজনীতির তিনকাল : সা'দ আহমদ, রিজিয়া সা'দ ইসলামিক সেন্টার প্রকাশনী, ২০০২
৬. সা’দত আলী আখন্দ রচনাবলী: মুস্তাফা নূরউল ইসলাম সম্পাদিত, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০০৯
৭. আমার এই ছোট ভুবন: আবুল হোসেন, অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ঢাকা, ২০০৩
৮. কালের পরীক্ষা ও আমার জীবনের দিনগুলি: তমিজউদ্দিন খান, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৩
৯. কৈশোরকালের কথা ও সাহিত্য-জীবনের সূচনা-পর্ব: মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ্, বুক ক্লাব, ঢাকা, ১৯৯৯
১০. আমি সরদার বলছি: সরদার ফজলুল করিম, অন্বেষা প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১৬
১১. আমার কালের কথা: আবদুল গফুর, বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লিমিটেড, ঢাকা, ২০০০
মোহাম্মদ আবু সাঈদ
এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর
মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ