
জীবনের শেষ প্রান্তে উপনীত হয়ে ‘ঐকতান’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন—
‘কৃষাণের জীবনের শরিক যে জন
কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন,
যে আছে মাটির কাছাকাছি,
সে কবির বাণী-লাগি কান পেতে আছি।’
কৃষাণের জীবনের শরিক হয়ে তাঁদের সত্য আত্মীয়তা অর্জন করেছিলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। অথচ তাঁর জন্ম নগরে, ফসলের খেত আর ফসল ফলানো কৃষক থেকে বহু দূরে তাঁর সামাজিক অবস্থান। কৃষকের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও লড়াইকে চেতনায় ধারণ করে তিনি উপহার দিয়েছেন অসামান্য সব কবিতা। ইট-পাথরের হৃদয়হীন শহরে বাস করেও গ্রামের মাটির ‘ফসলের ডাক’ শুনে তাঁর জোরালো প্রত্যয়:
‘কাস্তে দাও আমার এ হাতে—
সোনালি সমুদ্র সামনে, ঝাঁপ দেব তাতে।’
শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকের লড়াকু চেতনা অসাধারণ অভিব্যক্তি পেয়েছে ‘দুর্মর’ কবিতায়। ১৯৪৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস। সুকান্ত তখন রোগশয্যায়, ফসলের দুই-তৃতীয়াংশের দাবিতে গড়ে ওঠা তেভাগা আন্দোলনের খবরে শিহরিত হলেন তিনি। গভীর আবেগে লিখলেন:
‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ
কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে বাংলাদেশ ।
সে কোলাহলের রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ
জলে ও মাটিতে ভাঙনের বেগ আসে।’
সুকান্ত উপলব্ধি করেছেন, কৃষক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘জন্ম নিয়েছে সচেতনতার ধান/গত আকালের মৃত্যুকে মুছে/আবার এসেছে বাংলা দেশের প্রাণ।’
তেভাগা আন্দোলনের লড়াকু চেতনা প্রতিধ্বনিত হয় কবিতার রক্তিম পঙ্ক্তিতে:
‘“হয় ধান নয় প্রাণ”—এ শব্দে
সারা দেশ দিশাহারা,
একবার মরে ভুলে গেছে আজ
মৃত্যুর ভয় তারা’
কৃষকদের বলিষ্ঠ উত্থান অভূতপূর্ব আশাবাদের প্রতীকে উপস্থাপন করে বাংলাদেশকে যা স্থান ও কালের সীমা অতিক্রম করে যায়:
‘সাবাস বাংলা দেশ, এ পৃথিবী
অবাক তাকিয়ে রয়:
জ্বলে-পুড়ে মরে ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়।’
শুধু কৃষক নয়, শ্রমিক, মজুর, ডাকহরকরা, ক্ষুধার্ত মানুষ, শোষিত-বঞ্চিতজনের আর্তি ও সংকল্প মর্মস্পর্শী ভাষা পেয়েছে সুকান্তের কবিতায়। সাধারণ বস্তুকেও রূপকের আড়ালে মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছেন তিনি। ইতিহাস সচেতন ও শ্রেণিসচেতন সুকান্তের কবিতায় এক বিশেষ কালপর্বে (১৯৩৯-১৯৪৭) পরাধীন ভারতবর্ষের ঘটনাবহুল ইতিহাসের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই, শ্রমিক ধর্মঘট, ১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাপ, কালোবাজারি-মজুতদারির দৌরাত্ম্য, আজাদ হিন্দ ফৌজের লড়াই, নৌবিদ্রোহ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাবে সুকান্তের সৃজনবিশ্ব উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে।
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ও চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের চাঞ্চল্যকর ঘটনারও প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর সাহিত্যে। চল্লিশের দশকের ঘটনাবহুল যুগবৈশিষ্ট্যের পরিপ্রেক্ষিতে সুকান্তের রাজনৈতিক চেতনা ও কবিতার সমান্তরাল বিকাশ ঘটেছিল।
বাঙালি সাহিত্যিকদের সাহিত্যচর্চার সূত্রপাত সাধারণত কবিতার মাধ্যমে ঘটে। সুকান্তের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ব্যতিক্রম তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু। কৈশোরে ও তারুণ্যে প্রেমের কবিতা লেখাই বাঙালি কবির বিধিলিপি। অথচ এ বয়সে সুকান্ত প্রেম নয়, কবিতার বিষয় হিসেবে বেছে নেয়েছেন সমাজদেহের নানা ব্যাধিকে। তিনি শুধু রোগ নির্ণয় করে দায়িত্ব শেষ করেননি, রোগ নিরাময়ের উপায়ও নির্দেশ করেছেন। স্নায়ুছেঁড়া বাস্তবতায় কঠিন সত্যের মুখোমুখি হয়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন প্রেম-সৌন্দর্যের স্বপ্নময় ভাবলোকের মাধুর্য নয়, জীবনসংগ্রামের রূঢ় বাস্তবতাকে মূর্ত করে তুলতে হবে নিজের কবিতায়।
মার্ক্সবাদী সমাজদৃষ্টিতে ধনতন্ত্র একদিন নিজেই নিজের কবর খুঁড়বে। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার মূলে যে অন্যায়, শোষণ ও লোভ তার গর্ভেই রয়েছে পুজিঁবাদের অনিবার্য ধ্বংসের বীজ। এই বিশ্বাস অসাধারণ রূপ পেয়েছে ‘চারাগাছ’ কবিতায়। এ কবিতায় প্রাচীন এক প্রাসাদের গায়ে অশ্বত্থগাছের চারা দেখা যায়।
সাম্যবাদের স্বপ্নে উদ্দীপিত সুকান্তের কবিতায় এ স্বপ্নের অনুরণন স্পষ্ট। তাঁর বহুল আলোচিত কবিতাগুলোর শিরোনাম স্মরণ করা যাক: ‘বিবৃতি,’ ‘অনুভব: ১৯৪০’, ‘অনুভব: ১৯৪৬’, ‘খবর’, ‘বোধন’, ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’, ‘লেনিন’, ‘মহাত্মাজীর প্রতি’, ‘ঠিকানা,’ ‘পঁচিশে বৈশাখের উদ্দেশ্যে, ‘সূচনা’, ‘ছাড়পত্র’, ‘দিনবদলের পালা,‘আগ্নেয়গিরি’, ‘রানার,’ দুর্বার, ‘যুদ্ধের গান’, ‘হে মহাজীবন,’ ‘দেশলাই কাঠি’, ‘সিঁড়ি’,‘ কলম’, ‘সিগারেট’, ‘একটি মোরগের কাহিনী,’ ‘হে মহাজীবন’, ‘উদ্যোগ’, ‘আঠারো বছর বয়স’, ‘প্রেম:১৯৪৩’ এবং ‘প্রিয়তমাসু’। এ কবিতাগুলো ব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যাবে, ক্ষুধা, শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও সাম্যের স্বপ্ন সুকান্তের সাহিত্যচর্চার মূল প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
লেনিন, রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধী—সমকালীন এই তিন মনীষী সুকান্তকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির কাজে তিনি জীবন উত্সর্গ করেছিলেন। ঢাকায় বিখ্যাত গল্পকার সোমেন চন্দ নিহত হওয়ার পর ফ্যাসিস্টবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘে যুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর কবিসত্তায় জাগ্রত ছিল বিপ্লবী রাজনৈতিক আদর্শ। অক্লান্ত পরিশ্রম ও ধারাবাহিক অসুস্থতা তাঁর অকালমৃত্যুর ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল। ১৯৪৫ সালে মেজো বউদিকে পাঠানো একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন:
‘...আমি কবি বলে নির্জনতাপ্রিয় হব, আমি কি সেই ধরনের কবি? আমি যে জনতার কবি হতে চাই, জনতা বাদ দিলে আমার চলবে কি করে? তা ছাড়া কবির চেয়ে বড় কথা আমি কমিউনিস্ট, কমিউনিস্টদের কাজ–কারবার সব জনতা নিয়েই।’
ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণে বিপর্যস্ত স্বদেশবাসীর যন্ত্রণা উত্সারিত হয় তাঁর কণ্ঠে—‘এ দেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম।’ ‘জনতার কবি’ সুকান্ত ‘ছন্দের লালিত্য ঝঙ্কার’ময় ‘স্নিগ্ধ কবিতা’ রচনার তাগিদ অনুভব করেননি। জনগণের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন ‘গদ্যের কড়া হাতুড়ি’কে, ছুটি দিয়েছেন কবিতাকে। ছাড়পত্র কাব্যের ‘হে মহাজীবন’ কবিতাকে সুকান্তের সাহিত্যচর্চার মূল দর্শন হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়:
‘প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা—
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়;
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’
মানবতাবাদী সুকান্তের কবিতায় জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বারবার মূর্ত হয়ে উঠেছে। সাম্যের পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছেন অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় তিনি অমানবিকতা ও বৈষম্যের জঞ্জাল সরিয়ে নতুন প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকার করেছেন। এ দৃপ্ত ঘোষণা তাঁর কাব্যসাধনা ও জীবনসাধনার অভিন্ন লক্ষ্য:
‘চলে যাব, তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি—
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’
মার্ক্সবাদী সমাজদৃষ্টিতে ধনতন্ত্র একদিন নিজেই নিজের কবর খুঁড়বে। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার মূলে যে অন্যায়, শোষণ ও লোভ তার গর্ভেই রয়েছে পুজিঁবাদের অনিবার্য ধ্বংসের বীজ। এই বিশ্বাস অসাধারণ রূপ পেয়েছে ‘চারাগাছ’ কবিতায়। এ কবিতায় প্রাচীন এক প্রাসাদের গায়ে অশ্বত্থগাছের চারা দেখা যায়। সুকান্তের ভাষায়: ‘এ শিশুর মধ্যে আমি দেখি এক বৃদ্ধ মহীরূহ/শিকড়ে শিকড়ে আনে অবাধ্য ফাটল/উদ্ধত প্রাচীন সেই বনিয়াদী প্রাসাদের দেহে।’
অত্যাচারী ও শোষক জমিদারের বিরুদ্ধে সুকান্ত তীব্র বিদ্রূপের চাবুক মেরেছেন ‘ভাল খাবার’ ছড়ায়। প্রবল প্রতাপশালী জমিদার এমন আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে উদরপূর্তি করেন যে একসময় তার খাদ্যে অরুচি হয়। ডাক্তার–কবিরাজ তার রোগ সারাতে ব্যর্থ। ভয়ার্ত নায়েব তখন জমিদার ধনপতি পালের কাছে জানতে চান সবচেয়ে ভালো খাবার কোনটি।
এই চারাগাছ একদিন অনেক বড় হয়ে তার শিকড়ের শক্তিতে প্রাসাদ ধসিয়ে দেবে, গর্বোদ্ধত প্রাসাদরূপী পুজিঁবাদী সভ্যতার পতন ঘটবে। সুকান্ত শক্তিমান কবি বলেই রাজনৈতিক বিশ্বাসকে শিল্পরূপ দিতে পেরেছেন।
শৈল্পিক ও প্রতীকী ব্যঞ্জনায় সুকান্ত নানা কবিতায় অত্যাচারীর বিরুদ্ধে অত্যাচারিতের ক্ষোভকে ভাষা দিয়েছেন। ‘রানার’ কবিতায় রানার বা ডাকহরকরা সমাজের দায়িত্ব কাঁধে বয়ে চলা শোষিত ও শ্রমজীবী মানুষের প্রতীক। দারিদ্র্য ও হতাশায় ক্লিষ্ট রানারের জীবনকে পরম মমতায় তুলে ধরেছেন সুকান্ত:
‘...জীবনের বহু বছরকে পিছু ফেলে,
পৃথিবীর বোঝা ক্ষুধিত রানার পৌঁছে দিয়েছে মেলে।
ক্লান্তশ্বাস ছুঁয়েছে আকাশ, মাটি ভিজে গেছে ঘামে,
জীবনের সব রাত্রিকে ওরা কিনেছে অল্প দামে।’
নৈরাশ্যের রাত্রিকে চূড়ান্ত বলে মেনে নেননি সুকান্ত। ‘বিবৃতি’ কবিতায় আহ্বান জানিয়েছেন—‘রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল।’
সুকান্তের কবিতায় দুর্ভিক্ষ দুঃস্বপ্নের মতো ফিরে ফিরে এসেছে। ‘ঐতিহাসিক’ কবিতায় তিনি মনে করিয়ে দেন, দুর্ভিক্ষ জাতি-ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় চেনে না। সবাই আক্রান্ত হয় এর করাল গ্রাসে। দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন জনগণের ঐক্যবদ্ধ লাইন, যে ঐক্য তারা দেখিয়েছে খাদ্য সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে। তিনি ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’ কবিতায় নিজেকে ‘দুর্ভিক্ষের কবি’ বলে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি তাঁর অন্যতম স্মরণীয় কবিতা ‘বোধন’–এ উন্মোচন করেছেন দুর্ভিক্ষ সৃষ্টিকারী মজুতদার-কালোবাজারিদের বর্বর ভূমিকা। তিনি শুধু তাদেরকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাননি, তাদের নির্মূল করার জন্য প্রতিশোধের সংকল্প ব্যক্ত করেছেন:
‘আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই
স্বজনহারানো শ্মশানে তোদের
চিতা আমি তুলবই।’
সুকান্ত বিশ্বনাগরিক ছিলেন। তিনি স্বদেশের পরিপ্রেক্ষিতে যেভাবে শ্রমজীবী মানুষের জয়গান গেয়েছেন, আন্তর্জাতিক স্তরেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। সোভিয়েত ইউনিয়নের শক্তিশালী ভূমিকার কারণে সাম্রাজ্যবাদী ও ফ্যাসিবাদী অপশক্তির পতনে তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশিত হয়েছে ‘রোম: ১৯৪৩’ কবিতায়। জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতার অনবদ্য সমন্বয় ঘটেছে ‘প্রিয়তমাসু’ কবিতায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পটভূমিতে রচিত এ কবিতায় সুকান্ত নিজেকে উপস্থাপন করেছেন সৈনিকের অবয়বে। সেই সৈনিক দেশপ্রেমী, কিন্তু উগ্র জাতীয়তাবাদী নয়। সেই সৈনিক প্রেমী, একই সঙ্গে দেশ ও পৃথিবীর প্রতি দায়বদ্ধ। যুদ্ধ শেষে তাঁর অভিব্যক্তি:
‘পরের জন্যে যুদ্ধ করেছি অনেক,
এবার যুদ্ধ তোমার আর আমার জন্যে।
প্রশ্ন করো যদি এত যুদ্ধ ক’রে পেলাম কী? উত্তর তার—
তিউনিসিয়ায় পেয়েছি জয়
ইতালীতে জনগণের বন্ধুত্ব,
ফ্রান্সে পেয়েছি মুক্তির মন্ত্র;
আর নিষ্কণ্টক বার্মায় পেলাম ঘরে ফেরার তাগাদা।’
অত্যাচারী ও শোষক জমিদারের বিরুদ্ধে সুকান্ত তীব্র বিদ্রূপের চাবুক মেরেছেন ‘ভাল খাবার’ ছড়ায়। প্রবল প্রতাপশালী জমিদার এমন আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে উদরপূর্তি করেন যে একসময় তার খাদ্যে অরুচি হয়। ডাক্তার–কবিরাজ তার রোগ সারাতে ব্যর্থ। ভয়ার্ত নায়েব তখন জমিদার ধনপতি পালের কাছে জানতে চান সবচেয়ে ভালো খাবার কোনটি। তারপর—
‘নায়েবের অনুরোধে ধনপতি চারিদিক
দেখে নিয়ে বার কয় হাসলেন ফিক-ফিক।
তারপর বললেন: বলা ভারি শক্ত
সবচেয়ে ভালো খেতে গরীবের রক্ত।’
নব্বইয়ের দশকে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পতনের পর সুকান্তচর্চায় ভাটা পড়তে শুরু করে। সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির উত্থান-পতন দিয়ে সুকান্তের সাহিত্য মূল্যায়ন যথার্থ নয়। প্রকৃত সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপলব্ধি করা সম্ভব, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী আজও গদ্যময়। শতবর্ষে পা রাখা সুকান্তের উচ্চারণ তাই পুরোনো হয় না।
বিভিন্ন পত্র–পত্রিকায় সুকান্তের পাঁচটি গল্পের সন্ধান পাওয়া যায়। ১৯৪৩ সাল; অর্থাৎ ১৩৫০ বঙ্গাব্দ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দাবানলে পুড়ছে। অবিভক্ত বাংলা স্মরণকালের সবচেয়ে বড় মন্বন্তরের সম্মুখীন হয় যা ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ নামে ইতিহাসে কলঙ্কিত হয়ে আছে। খাদ্যের অভাব, ম্যালেরিয়া ও কলেরার প্রভাব এবং অপুষ্টি ও চিকিত্সাব্যবস্থার মর্মান্তিক দুরবস্থার ফলে ৩০ লাখ মানুষের শোচনীয় মৃত্যু ঘটে কয়েক বছরের মধ্যে। ক্ষুধা ও বঞ্চনার জীবন্ত দলিল হয়ে উঠেছে সুকান্তের গল্প। গল্পগুলো হচ্ছে ‘ক্ষুধা’, ‘দরদী কিশোর’, ‘দুর্বোধ্য’, ‘কিশোরের স্বপ্ন’ ও ‘ভদ্রলোক’।
সুকান্ত পঞ্চাশের মন্বন্তরের মর্মান্তিক স্মৃতি নিয়ে সম্পাদনা করেছিলেন আকাল নামে এক অমূল্য কবিতা সংকলন। শুধু দুর্ভিক্ষ নিয়ে যে একটি কবিতা সংকলন হতে পারে, তা একমাত্র সুকান্ত ভট্টাচার্যই চিন্তা করেছিলেন। এই সংকলনে নিজের কবিতার পাশাপাশি অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, অরুণ মিত্র, অমিয় চক্রবর্তী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, দীনেশ দাসের মতো কবি–সাহিত্যিকদের কবিতা। তাঁদের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। সম্পাদক হিসেবে ‘কথামুখ’–এ তাঁর বক্তব্য সুকান্তের অসাধারণ ইতিহাসচেতনার সাক্ষ্য বহন করে। তিনি লিখেছেন:
‘তেরোশো পঞ্চাশ সম্বন্ধে কোনো বাঙালীকে কিছু বলতে যাওয়া অপচেষ্টা ছাড়া আর কি হতে পারে? কেননা তেরোশো পঞ্চাশ কেবল ইতিহাসের একটা সাল নয়, নিজেই একটা স্বতন্ত্র ইতিহাস। সে ইতিহাস একটা দেশ শ্মশান হয়ে যাওয়ার ইতিহাস; ঘর ভাঙা, গ্রাম ছাড়ার ইতিহাস, দোরে দোরে কান্না আর পথে পথে মৃত্যুর ইতিহাস, আমাদের অক্ষমতার ইতিহাস।’
‘জনতার কবি’ হতে চেয়েছিলেন সুকান্ত, তিনি তা হয়েও ছিলেন। রাজনীতি তাঁর কবিতাকে যেমন জনপ্রিয় করেছে, তেমনি রাজনীতির মোড়কে তাঁকে সীমাবদ্ধ রাখার প্রবণতা তাঁর কবিপ্রতিভার প্রতি অবিচার করেছে। তাঁর জন্ম, বিকাশ ও পরিণতির কালে—এমনকি পরবর্তী কয়েকটি দশকেও বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির শক্তিশালী প্রভাব ছিল। সুকান্ত মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তখন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণই মুখ্য ছিল, সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ নয়। নব্বইয়ের দশকে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পতনের পর সুকান্তচর্চায় ভাটা পড়তে শুরু করে। সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির উত্থান-পতন দিয়ে সুকান্তের সাহিত্য মূল্যায়ন যথার্থ নয়। প্রকৃত সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপলব্ধি করা সম্ভব, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী আজও গদ্যময়। শতবর্ষে পা রাখা সুকান্তের উচ্চারণ তাই পুরোনো হয় না। যত দিন পৃথিবীতে অসাম্য, শোষণ ও ক্ষুধা থাকবে, তত দিন সুকান্তের সাহিত্য বঞ্চিত ও ক্ষুধার্ত মানুষের বলিষ্ঠ প্রতিনিধি হিসেবে বেঁচে থাকবে।