
শতবর্ষ পূর্ণ করল বাংলা ভাষা-ইতিহাসের এক অনন্য গ্রন্থ ওডিবিএল। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের এই গবেষণা শুধু ভাষার উৎপত্তি নয়, বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গভীর শিকড়ও উন্মোচন করে। শতবর্ষ পরে আজও এর প্রাসঙ্গিকতা অটুট।
বাংলা ভাষাতত্ত্বের তাত্ত্বিক চর্চার সূচনা মূলত বিদেশি-বিভাষীদের দ্বারাই। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলা গদ্যের বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। ইংরেজ ও পর্তুগিজদের আগমনের আগে এ দেশের মানুষ দৈনন্দিন বৈষয়িক ও জীবনাচরণমূলক কাজেও প্রধানত পদ্যভাষার ওপরই নির্ভরশীল ছিলেন। অথচ বাস্তব জীবন ও প্রয়োজনের স্বাভাবিক বাহন হিসেবে গদ্যের অপরিহার্য ব্যবহার ও ক্রমোন্নতি বিদেশিদের সক্রিয় হস্তক্ষেপের পরেই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ধর্ম প্রচার ও বৈষয়িক স্বার্থসাধনের উদ্দেশ্যে ইংরেজ-পর্তুগিজরা এ দেশে এলেও নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণে তাদের বাংলা ভাষা শেখা এবং ভাষাটির চর্চা ও উন্নয়নে মনোনিবেশ করতে হয়। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে বাংলা ভাষাতত্ত্বের সমৃদ্ধ চর্চা গড়ে ওঠে। এর পেছনে কার্যকর ছিল প্রাচীন ভারতীয় ভাষাতাত্ত্বিক ঐতিহ্য এবং আধুনিক ইউরোপীয় ভাষাবিজ্ঞানের সম্মিলিত প্রভাব। এ দুই ধারার পারস্পরিক টানাপোড়েন বাংলা ভাষাতত্ত্বের বিকাশকে কখনো কখনো বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তও করেছে।
বাংলা শব্দ প্রয়োগ ও ব্যাকরণচর্চার ক্ষেত্রে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। উমেশচন্দ্র বটব্যাল, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, ব্যোমকেশ মুস্তাফী, যোগেশচন্দ্র রায় প্রমুখ মনীষীর গবেষণায় এ পরিসর সমৃদ্ধ হয়। এই বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশেই রবীন্দ্রনাথের ভাষাচিন্তার বিকাশ ঘটে। শৈশব থেকেই ভাষার অন্তর্নিহিত রহস্য তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। ব্যুৎপত্তিগত ইতিহাসের চেয়ে ভাষার ব্যবহারিক রূপ, প্রয়োগ ও ভাব প্রকাশের বৈশিষ্ট্য তাঁর কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ‘বাংলা বহুবচন’, ‘সম্বন্ধে-কার’ ও ‘বাংলা উচ্চারণ’ প্রবন্ধে তাঁর এই সূক্ষ্ম ও আধুনিক ভাষাদৃষ্টির পরিচয় স্পষ্ট। বাংলা ধ্বনির উচ্চারণের রহস্য প্রথম পর্যায়ের ভাষাতত্ত্বচর্চাকারীদের আকৃষ্ট করে। উচ্চারণ এক আর বানান অন্য—এ রহস্য সম্পর্কে তাঁরা জানতে প্রয়াসী হন। রবীন্দ্রনাথকেই প্রথম এ বিষয়ে আগ্রহী হতে দেখা যায়। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক পবিত্র সরকার বলেন, ‘বাংলা ধ্বনির উচ্চারণের রহস্যই সর্বপ্রথম রবীন্দ্রনাথকে ভাষার ভিতরকার ব্যাপার-স্যাপার সম্বন্ধে আগ্রহী করে তোলে।’
প্রায় এক শতাব্দী আগে স্যার উইলিয়াম জোনস সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে ইউরোপীয় ভাষাগুলোর সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়ে যে নবচিন্তার সূচনা করেছিলেন, সুনীতিকুমার তারই এক দীপ্ত উত্তরাধিকার। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাতত্ত্বের গবেষণায় তাঁর অবদান অসামান্য।
আনুমানিক ১৮৭৮-৮০, অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন ১৭-১৮ বছর, তখন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময়েই একজনকে বাংলা শেখানোর দায়িত্ব নেন তিনি। তখন খেয়াল করে দেখেন, বাংলা ভাষায় লেখার সময় উচ্চারণের প্রচুর তফাত হয়। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বাংলা উচ্চারণ’ প্রবন্ধে বলেন, ‘বাংলা ভাষার এইরূপ উচ্চারণের বিশৃঙ্খলা যখন নজরে পড়িল, তখন আমার জানিতে কৌতূহল হইল, এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটা নিয়ম আছে কিনা। আমার কাছে তখন খান-দুই বাংলা অভিধান ছিল। মনোযোগ দিয়া তাহা হইতে উদাহরণ সংগ্রহ করিতে লাগিলাম। যখন আমার খাতায় অনেকগুলি উদাহরণ সঞ্চিত হইল, তখন তাহা হইতে একটা নিয়ম বাহির করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলাম।’ ইংল্যান্ডে একজনকে বাংলা শেখানোর আন্তরিক তাগিদ থেকে রবীন্দ্রনাথ ভাষাবিজ্ঞানচর্চায় ব্রতী হন অজ্ঞাতসারেই। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথের ভাষাচর্চার ব্যাপ্তি দেখে বিস্মিত হয়ে তাঁকে বাংলা ভাষাতত্ত্বের একজন ‘অগ্রণী পথিকৃৎ’ হিসেবে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথের পরে জ্ঞান ও সাধনার মাধ্যমে ভাষাবিজ্ঞানের দুনিয়ায় স্থায়ী ছাপ রেখেছেন অধ্যাপক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৮৯০–১৯৭৭)। তিনি বাংলা ভাষাবিজ্ঞানের উজ্জ্বলতম দিকপাল। উনিশ শতকের শেষভাগে তাঁর আবির্ভাবের সময় ভাষাতত্ত্বের নানা নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছিল। সেই বৌদ্ধিক পরিবেশ তাঁকে ভাষাবিজ্ঞানচর্চায় গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। প্রায় এক শতাব্দী আগে স্যার উইলিয়াম জোনস সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে ইউরোপীয় ভাষাগুলোর সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়ে যে নবচিন্তার সূচনা করেছিলেন, সুনীতিকুমার তারই এক দীপ্ত উত্তরাধিকার। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাতত্ত্বের গবেষণায় তাঁর অবদান অসামান্য। ১৮৯০ সালের ২৬ নভেম্বর তাঁর জন্ম। মতি শীলের অবৈতনিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবনের সূচনা। পরবর্তীকালে তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজ ও প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যয়ন করেন এবং ১৯১১ সালে স্নাতক ও ১৯১৩ সালে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিশেষ বিষয় হিসেবে জার্মান ভাষাতত্ত্ব এবং প্রাচীন ও মধ্য ইংরেজি ভাষা নির্বাচন তাঁর জ্ঞানজগতের নতুন দ্বার উন্মোচন করে। প্রাচীন ও মধ্য ইংরেজির সঙ্গে গথিক, প্রাচীন উচ্চ জার্মান, নিম্ন জার্মানসহ জার্মানিক ভাষাগুলোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাঁকে এসব ভাষার গভীর অধ্যয়নে উদ্বুদ্ধ করে। ভাষার ইতিহাস, বিবর্তন ও পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতি ক্রমে তাঁর আগ্রহ তীব্রতর হয়। এভাবেই তরুণ সুনীতিকুমারের মনে ভাষাতত্ত্বের প্রতি গভীর অনুরাগ জন্ম নেয়।
ওডিবিএল-এর রচনায় ফরাসি ভাষাবিদ জুল ব্লখের ফরমেশন অব মারাঠি গ্রন্থের প্রভাব লক্ষ করা যায়। ১৯২০ সালে প্রকাশিত ব্লখের এ গ্রন্থ তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত। সুনীতিকুমার অনেকটা এটির আদলেই বাংলা ভাষার একটি বিস্তৃত ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক রূপ নির্মাণ করেন। মারাঠি, গুজরাটি, রাজস্থানি, পাঞ্জাবি, হিন্দি, অসমিয়া, ওডিশি, বিহারি, সিন্ধি, লহন্দি, নেপালি ও সিংহলির সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক ও স্বাতন্ত্র্য নির্ণয়ে ওডিবিএল-এর দ্বারস্থ না হয়ে উপায় নেই।
বিদেশ থেকে ফিরে ১৯২২ সালের নভেম্বরে সুনীতিকুমার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘খয়রা অধ্যাপক’ পদে যোগ দেন। খয়রার রাজা কুমার গুরুপ্রসাদ সিংয়ের আর্থিক সহায়তায় পদটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে সুনীতিকুমারের ডি–লিট অভিসন্দর্ভটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশের ব্যবস্থা হয়। ১৯২৪ সালে মুদ্রণ শুরু হয়ে দীর্ঘ ১২ বছরের সাধনার ফসল দ্য অরিজিন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অব দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ (ওডিবিএল) ১৯২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটির প্রুফ তিনি নিজেই অত্যন্ত যত্নসহকারে সংশোধন করতেন এবং নিয়মিত অধ্যাপনার পাশাপাশি তাঁর অবসর সময়ের প্রায় পুরোটাই এ কাজে ব্যয় করতেন। ১ হাজার ১৭৯ পৃষ্ঠার গ্রন্থটি প্রথমে দুই খণ্ডে, ৫০০ কপি মুদ্রিত হয়। মূল্য ছিল মাত্র ২০ টাকা। পরবর্তীকালে ১৯৭১ সালে লন্ডনের অ্যালেন অ্যান্ড আনউইন সংযোজক খণ্ডসহ তিন খণ্ডে এর একটি অফসেট পুনর্মুদ্রণ প্রকাশ করে। গ্রন্থটি প্রকাশের পর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সুনীতিকুমারের ঘনিষ্ঠতা আরও গভীর হয়। ১৯২৭ সালে মালয়, বালি, জাভা ও শ্যামদেশ ভ্রমণে তিনি রবীন্দ্রনাথের অন্যতম সঙ্গী ছিলেন।
ওডিবিএল বাংলা ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সংযোজন। গ্রন্থটিতে সরাসরি ‘ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাতত্ত্ব’ নামে কোনো পৃথক আলোচনা নেই। তবে বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বিভিন্ন প্রসঙ্গে এ ভাষাতত্ত্বের গভীর প্রয়োগ করেছেন। গ্রন্থের ভূমিকা অংশে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা ও উপভাষা, বিশেষত কেন্তুম-শতম বিভাজন নিয়ে আলোচনা রয়েছে। সমগ্র গ্রন্থেই ইন্দো-ইউরোপীয় ধ্বনিতত্ত্ব ও রূপতত্ত্বের নানা দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে আছে। এমনকি গ্রন্থের পরিশিষ্টে কয়েকটি আধুনিক বাংলা বাক্যের ইন্দো-ইউরোপীয় রূপও উপস্থাপিত হয়েছে।
ওডিবিএল-এর রচনায় ফরাসি ভাষাবিদ জুল ব্লখের ফরমেশন অব মারাঠি গ্রন্থের প্রভাব লক্ষ করা যায়। ১৯২০ সালে প্রকাশিত ব্লখের এ গ্রন্থ তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত। সুনীতিকুমার অনেকটা এটির আদলেই বাংলা ভাষার একটি বিস্তৃত ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক রূপ নির্মাণ করেন। মারাঠি, গুজরাটি, রাজস্থানি, পাঞ্জাবি, হিন্দি, অসমিয়া, ওডিশি, বিহারি, সিন্ধি, লহন্দি, নেপালি ও সিংহলির সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক ও স্বাতন্ত্র্য নির্ণয়ে ওডিবিএল-এর দ্বারস্থ না হয়ে উপায় নেই। পরবর্তীকালে ভারতীয় বিভিন্ন ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে রচিত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থে ওডিবিএল-এর আদর্শ ও পদ্ধতির প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ করা যায়। এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ বাবুরাম সাকসেনার দ্য ইভল্যুশন অব আওধি (এলাহাবাদ, ১৯৮৩), কাত্রের দ্য ফরমেশন অব কোঙ্কনি (মুম্বাই, ১৯৪২), উদয় নারায়ণ তেওয়ারীর দ্য অরিজিন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অব দ্য ভোজপুরি ল্যাঙ্গুয়েজ (কলকাতা, ১৯৬০), সুভদ্রকুমার ঝার দ্য ফরমেশন অব দ্য মৈথিলি ল্যাঙ্গুয়েজ (লন্ডন, ১৯৫৪) এবং বাণীকণ্ঠ কাকতীর আসামিজ: ইটস ফরমেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (গুয়াহাটি, ১৯৪১)। এ ছাড়া গুজরাটি, রাজস্থানি ও পাঞ্জাবি ভাষা নিয়ে রচিত বহু ছোট-বড় গবেষণাগ্রন্থেও ওডিবিএল-এর চিন্তাধারা, বিশ্লেষণপদ্ধতি ও গবেষণাদৃষ্টির অনুসরণ পরিলক্ষিত হয়।
ওডিবিএল প্রকাশের শতবর্ষ চলছে। এক শতাব্দী পার হয়ে এসে এর গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করার সময় এসেছে। বাংলা ভাষার ইতিহাস, বিস্তার ও ভূগোল অনুধাবনের ক্ষেত্রে এটি আজও গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য ভিত্তি। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের উপভাষার বৈশিষ্ট্যকে বর্তমান সময়ের আলোকে বিচার করতে গেলে এটিই অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এক সেতুবন্ধ হয়ে ওঠে।
সুনীতিকুমার নিজস্ব ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে ওডিবিএল-এর বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করেছেন। বাংলা ভাষার প্রতিটি বৈশিষ্ট্যকে তিনি ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে দেখিয়েছেন, কীভাবে সংস্কৃত, বিশেষত বৈদিক ও লৌকিক সংস্কৃতের ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য মধ্যভারতীয় আর্য ভাষায় বিকশিত হয়ে অপভ্রংশের মাধ্যমে উত্তর ভারতের বিভিন্ন ভাষায়, পশ্চিমের মারাঠি থেকে পূর্বের বাংলা-অসমিয়ায় বিস্তার লাভ করেছে। প্রায় দেড় হাজার বছরব্যাপী মধ্যভারতীয় আর্য ভাষার দীর্ঘ বিবর্তনপর্বে অশোকের অনুশাসনের ভাষা এবং মহারাষ্ট্রী, শৌরসেনী, মাগধী, অর্ধমাগধী, পৈশাচী প্রভৃতি প্রাকৃতের নানা স্তর অতিক্রম করতে হয়েছে। জটিল এই পরিক্রমাকে সুনীতিকুমার বিভিন্ন ভাষার বিশেষ চিহ্ন ও প্রতীক ব্যবহার করে সহজবোধ্য করে তুলেছেন এ গ্রন্থে।
ভাষার ধ্বনিগত বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে উচ্চারণতত্ত্বের গুরুত্ব সুনীতিকুমার গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। বাংলা ধ্বনির উচ্চারণ বিশ্লেষণে এর সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। বাংলা ‘অ’-কার ও ‘অ্যা’-কারের উচ্চারণকে তিনি ঐতিহাসিকভাবে বিচার করে দেখিয়েছেন, কখন ও কীভাবে এগুলোর পরিবর্তন ঘটেছে। মধ্যভারতীয় আর্য ভাষা থেকে অপভ্রংশ এবং প্রত্ন-নব্য ভারতীয় আর্যভাষার পর্যায়ে ধ্বনির ক্রমবিবর্তন ব্যাখ্যায় এ গ্রন্থের তুল্য অন্য গ্রন্থ নেই।
ওডিবিএল প্রকাশের শতবর্ষ চলছে। এক শতাব্দী পার হয়ে এসে এর গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করার সময় এসেছে। বাংলা ভাষার ইতিহাস, বিস্তার ও ভূগোল অনুধাবনের ক্ষেত্রে এটি আজও গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য ভিত্তি। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের উপভাষার বৈশিষ্ট্যকে বর্তমান সময়ের আলোকে বিচার করতে গেলে এটিই অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এক সেতুবন্ধ হয়ে ওঠে। ভাষার বিবর্তন, আঞ্চলিক বৈচিত্র্য এবং মানুষের ভাষাব্যবহারের পরিবর্তনকে বুঝতে এ গ্রন্থ আমাদের সামনে এক নির্ভরযোগ্য ‘রেফারেন্স পয়েন্ট’ হিসেবে উপস্থিত হয়। এর ভিত্তিতেই উপভাষাতত্ত্বের নতুন প্রশ্ন, ভাষার সামাজিক ব্যবহার এবং বাংলা সমাজভাষাতত্ত্বের নানা সম্ভাবনা নিয়ে আরও গভীর গবেষণার পথ উন্মুক্ত হতে পারে। তাই শতবর্ষে ওডিবিএল-এর মূল্যায়ন বাংলা ভাষাচর্চার বর্তমান, ভবিষ্যৎ ও নতুন জিজ্ঞাসার সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস হতে পারে।
সুহৃদ সাদিক: প্রভাষক, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।