
দিল্লির কবি ও লেখকেরা ফারসি, হিন্দি ও উর্দু ভাষা এবং এসব ভাষার সংমিশ্রণে বানানো উপভাষার বিকাশে অপরিসীম অবদান রেখেছেন। এঁদের অনেকেই ঐতিহাসিক প্রসিদ্ধি পেয়েছেন, আবার অনেকেই হয়তো অজানা রয়ে গেছেন। মোগল সাম্রাজ্যের পতনের যুগের এক শক্তিমান কবি জাফর জাতাল্লি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা সত্ত্বেও, মুষ্টিমেয় ভাষাবিদ এবং ইতিহাসবিদ বাদে বাকিরা তাঁকে প্রধানত উপেক্ষাই করেছে। কয়েকটি কারণে জাতাল্লির লেখা শুধু যে বিপ্লবী চরিত্রের তা নয়, সেই সঙ্গে পীড়াদায়ক বা মানসিক আঘাত দেওয়ার মতোও বটে।
উর্দু (যদিও তখনো ভাষাটি ‘উর্দু’ নামে পরিচিত ছিল না) কবিতার এই ব্যঙ্গাত্মক বা ক্রোধব্যঞ্জক চরিত্রটি সৃষ্টি হয়েছিল এ ভাষায় রচিত কাব্যের ‘শের-আশোবর’ (দুর্ভাগ্যের কবিতা) নামে প্রধান একটি ধারা থেকে। প্রকৃতপক্ষে মোগল বংশের শেষ পরাক্রমশালী সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীরের মৃত্যুর পর তাঁর দুর্বল উত্তরাধিকারীদের আমলে দিল্লি বারবার বহিরাগত নাদির শাহ, আহমদ শাহ আবদালি প্রমুখের হানাদার লুটেরা বাহিনীর ভয়াবহতম ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে। দিল্লির দুর্ভাগ্য আসলে তখন নতুন বা দুর্লভ কিছু ছিল না। সম্ভবত এই প্রপঞ্চ থেকেই ‘শের-আশোবর’ ধারার কবিতা লেখার সূত্রপাত হয়।
এ ধারারই সূচনাকারী হিসেবে গণ্য করা হয় আওরঙ্গজেব আলমগীরের সমসাময়িক কবি জাফর জাতাল্লিকে (১৬৫৮-১৭১৩)। জাতাল্লি জন্ম নেন দিল্লির কাছে নার্নাউল নামের একটা গ্রামে (বর্তমানে ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত) এক সৈয়দ পরিবারে। তাঁর আসল নাম মির মুহাম্মদ জাফর এবং জাতাল্লি হলো তাঁর কলমি নাম বা তখল্লুস। ‘জাতাল্লি’ শব্দটার আক্ষরিক অর্থ হলো, ‘যে আবোলতাবোল বকে’ বা ‘যে আজেবাজে কথা বলে’। নিজের এই নামকরণ থেকেই বোঝা যায়, তিনি তাঁর কাব্যকৃতির স্বরূপ সম্পর্কে কতটা সচেতন ছিলেন।
ফারসি ও হিন্দি ভাষা ও ‘রেখতা’ শৈলীর কাব্যে সুশিক্ষিত জাতাল্লি তাঁর কবিতায় মোগলশাহির ক্রমক্ষয়িষ্ণু চরিত্রের সুতীব্র সমালোচনা করেছেন। নির্ভীক, ক্রুদ্ধ, প্রতিবাদমুখরভাবে তিনি লিখে গেছেন, যার উচিত মূল্যও তাঁকে চুকাতে হয়েছে। আওরঙ্গজেবের উত্তরাধিকারী হিসেবে অভিষেকের সময় বাদশাহ ফররুখসিয়ার যে নতুন সিক্কা টাকা চালু করেন, তাতে খোদিত কবিতাটির প্রচণ্ড বিরূপ সমালোচনা করার জন্য জাতাল্লিকে তিনি মৃত্যুদণ্ড দেন। মুদ্রায় উৎকীর্ণ এ ধরনের কবিতা সাধারণত সম্রাটের প্রশংসামূলক হওয়াটাই প্রচলিত রীতি। কিন্তু জাতাল্লি সেটাকে তীব্রভাবে ব্যঙ্গ করেন তাঁর নিজের লেখা আরেকটি কবিতায়।
ফররুখসিয়ার বাদশাহ পদে অভিষিক্ত হওয়ার সময় চালু করা সিক্কা টাকায় খোদিত তাঁর প্রশস্তিটি ছিল:
সিক্কা জাদ আজ ফজল-ই হক বার সিম ও জার
পাদশাহ-ই বাহার-ও-বার ফররুখসিয়ার।
বাংলায়:
সত্য খোদার আশিসে বানালেন মুদ্রা সোনা ও রুপার
জমিন ও সাগরের বাদশাহ ফররুখসিয়ার।
—(অনুবাদ: লেখক)
জাতাল্লি এটার প্যারোডি করে লিখেছিলেন:
সিক্কায়ে জাদ বার্গান্দুম ওয়া মথ ওয়া মাতার
বাদশাহ হ্যায় তসমা কাশ ফররুখসিয়ার
বাংলায়:
চালু করা মুদ্রাগুলো ডাল আর মটরদানার,
কারণ জুতোর ফিতে দিয়ে মানুষ মারেন বাদশাহ ফররুখসিয়ার।
—(অনুবাদ: লেখক)
জাতাল্লির এই ব্যঙ্গাত্মক পঙ্ক্তি পড়ে ফররুখসিয়ার আদেশ দেন, এই দুর্মুখ কবির গলায় সত্যি সত্যিই জুতার ফিতে জড়িয়ে তাঁকে হত্যা করা হোক।
জাতাল্লির কবিতা সঠিকভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে হলে তাঁর সময়কার পরিবেশ-পরিস্থিতিটাকে ভালোভাবে বুঝতে হবে। আওরঙ্গজেবের সঙ্গে জাতাল্লির ছিল যুগপৎ প্রেম ও ঘৃণার সম্পর্ক। যদিও তিনি তাঁর কবিতায় কঠোরভাবে আওরঙ্গজেবের সমালোচনা করেছেন, কিন্তু এর পাশাপাশি তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতার প্রশংসাও করেছেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর শুরু হলো একের পর এক বিপর্যয় ও পতনের কাল। কবিতার জন্য জাতাল্লির খোরাকের তখন কোনো অভাব ছিল না। আলমগীর-পরবর্তী মোগল সম্রাটদের সমস্ত ব্যর্থতা, পরাভব আর অকৃতকার্যতাকে তিনি চাবুকপেটা করেছেন নির্দ্বিধায়।
নিজের কবিতায় তীব্র ব্যঙ্গবিদ্রূপ, কঠোর সমালোচনার উপস্থিতির পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে জাতাল্লি বলেছেন: ‘জব গুস্সা হদ্ পার কর জায়ে তো আদমি গালিয়াঁ হি বকতা হ্যায়।’ বাংলায়: রাগ যখন সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন লোকে তো শুধু গালাগালিই দেয়। —(অনুবাদ: লেখক)
উদীয়মান উর্দু তখন এক রূপান্তরের সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। কথ্য ও লিখিত উভয় ক্ষেত্রে তখন নতুন নতুন শব্দ জায়গা করে নিচ্ছিল। সমাজের শিক্ষিত অভিজাতরা তখনো ফারসি ভাষাই ব্যবহার করে যাচ্ছিল, আর মুষ্টিমেয় কবি ও লেখক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছিলেন খসরুর অনুসরণে হিন্দি ও ফারসির এক মিশ্রিত ভাষা নিয়ে। এ ভাষাকে বলা হতো রেখ্তা। একটি অভিজাত ভাষা হিসেবে উর্দু কথাটার তখনো তেমন প্রচলন হয়নি বা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। জাতাল্লি তাঁর জীবন্ত ভাষায় এ পরিস্থিতির নিপুণ বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন:
‘অগরসে হুমা কুদাও কর্করতস্ত
বা হিন্দি-দাশিন্দি জুবান
ওয়া লেকিন কিসি নে ভলি ইয়েহ্ কহি
জিসে পিছু চাহে, সুহাগন ওয়হি।’
বাংলায়:
যদিও এটাকে মনে হয় যেন আবর্জনা
এই হিন্দি ছোটলোকের ভাষা
তবু কেউ কেউ বলে থাকে
যাকে তুমি ভালোবাসো
সে-ই তোমার বধূ হবে।
—(অনুবাদ: লেখক)
নিজের কবিতায় তীব্র ব্যঙ্গবিদ্রূপ, কঠোর সমালোচনার উপস্থিতির পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে জাতাল্লি বলেছেন:
‘জব গুস্সা হদ্ পার কর জায়ে
তো আদমি গালিয়াঁ হি বকতা হ্যায়।’
বাংলায়:
রাগ যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়
তখন লোকে তো শুধু গালাগালিই দেয়।
—(অনুবাদ: লেখক)
নিজের জীবদ্দশায় আওরঙ্গজেবের যে কজন উত্তরাধিকারীকে পেয়েছেন, তাঁদের কাউকে জাতাল্লি রেয়াত করেননি। আওরঙ্গজেবের পর সিংহাসনে আসীন প্রথম বাহাদুর শাহ সম্পর্কে জাতাল্লি তাঁর কবিতার বই ‘গাণ্ডুনামা’য় লিখেছেন:
‘বাদশাহি হ্যায় বাহাদুর শাহ কি
বনবনাকর গাঁড় মারাওয়া খেলিয়ে।
পির সে, বাপ সে, উস্তাদ সে
চুপ চুপ আকর গাঁড় মারাওয়া খেলিয়ে।’
বাংলায়:
বাহাদুর শাহের রাজত্ব এসেছে
বনবন করে পাছামারানি খেলা খেলো।
চুপিচুপি এসে পিরের সঙ্গে, বাপের সঙ্গে,
শিক্ষকের সঙ্গে পাছামারানি খেলা খেলো।
—(অনুবাদ: লেখক)
অযোগ্য ক্ষমতাধারীদের তীব্রতম ভাষায় আক্রমণ করতে গিয়ে জাতাল্লি অনেক সময়েই শ্লীলতা ও শালীনতার সীমা অতিক্রম করে গেছেন। তবে তাঁর মানসিক যন্ত্রণার গভীরতার দিকটা বিবেচনা করলে সেটাকে আর অপ্রত্যাশিত বা অবাঞ্ছিত মনে হয় না।
হত্যা করে জাতাল্লির কণ্ঠ রোধ করা হলেও তাঁর কাব্যধারা প্রতিধ্বনিত হয়েছে তাঁর উত্তরসূরি হাতিম, মির্জা রফি সওদা, মির তকি মির প্রমুখের কবিতায়। এ ধারার শেষতম ও উজ্জ্বলতম শেষ দুই প্রতিভূ ছিলেন স্বয়ং শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর এবং তাঁর শাহি দরবারের সেরা রত্ন বা উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক মির্জা আসাদুল্লাহ্ খান গালিব। দিল্লির ক্রমক্ষয়িষ্ণুতা, দুর্ভাগ্য ও দুর্দশা এঁদের সবার কবিতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
জাতাল্লির রচনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ভাষার অগ্রণী ব্যবহার। উর্দু ভারতে জন্ম নিয়েছিল ওয়ালি ডেকানির গজলের মাধ্যমে, এ দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে জাতাল্লির লেখা। কাব্যজগতে ডেকানির আগমন ঘটে ১৭০০ সাল নাগাদ। কিন্তু এর অনেক আগে থেকেই জাতাল্লির রচনায় প্রমাণ মিলে গেছে উর্দুতে তাঁর দক্ষতার। জাতাল্লি ফারসি ও উর্দুকে একটি উজ্জ্বল ও অনন্য পদ্ধতিতে মিশ্রিত করেছিলেন। অনেক সময় একই দ্বিপদীতে তিনি ফারসি ও উর্দু পাশাপাশি ব্যবহার করেছেন। তাঁর গদ্য ও কবিতা উভয়ই উর্দু লেখার চমৎকার উদাহরণ, যদিও এ ভাষা ‘উর্দু’ নামটি পেয়েছে আরও পরে। ভাষার ওপর তাঁর দক্ষতা ছিল অসাধারণ মেধার ঔজ্জ্বল্যে ভরপুর। তাঁর অদ্ভুত অযৌক্তিক ভাষাশৈলী সত্ত্বেও তাঁর লেখাকে অগ্রাহ্য করা কঠিন ছিল। উর্দু ভাষার ক্রমবিকাশে জাতাল্লির অবদান ছিল প্রতিভাবান অগ্রদূতের।
দিল্লির শাহি রাজপরিবারকে সতর্ক আচরণ করতে হতো জাতাল্লির সঙ্গে। আওরঙ্গজেবের সঙ্গে তিনি খানিকটা শ্রদ্ধা-ভক্তি ভাগাভাগি করে নিয়েছিলেন। এমনিতে জাতাল্লি যথেষ্ট বুদ্ধিমান ছিলেন। তাঁকে বা তাঁর বক্তব্যকে কেউ হেয় বা অগ্রাহ্য করলে তবেই তিনি তার বিরুদ্ধে লিখতে প্ররোচিত হতেন, যেটাকে সম্ভবত বাদশাহরা ভয় পেতেন।
যদিও ফারসি ভাষায় আগে থেকেই ব্যঙ্গাত্মক লেখার পাশাপাশি কামোত্তেজক লেখারও ঐতিহ্য ছিল, কিন্তু উর্দু তখনো সে স্বীকৃতি পায়নি বা ততটা জোরদার হয়ে উঠতে পারেনি। জাতাল্লি যখন লেখালেখি শুরু করেন, তখনো উর্দু ব্যবহৃত হতো আকস্মিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে। জাতাল্লিই এ ভাষাকে তাঁর সার্বক্ষণিক ব্যবহার্য করে তোলেন।
জাতাল্লি নির্ভীকভাবে লিখেছিলেন। সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সমানে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকা নিপীড়নের তীব্রতা তুলে ধরার জন্য তিনি তাঁর লেখায় কঠোর থেকে কঠোরতর, কঠোরতম শব্দ ব্যবহার করেছেন। নিরপেক্ষ সত্য বিচারে বলতে হবে, জাতাল্লির কাজ রাজনৈতিক ছিল এবং অবশ্যই অশ্লীল বা কামোত্তেজক ছিল না। আর তাঁর ভাষা, যা রাস্তাঘাটের ভাষার অভদ্রতা দিয়ে তৈরি বলে মনে হয়, তার অন্তর্নিহিত মর্মার্থ পরিচিত গালির অর্থের চেয়ে অনেক বেশি ব্যাপক। জাতাল্লি ছিলেন স্পষ্টবাদী ও অভদ্র, কিন্তু তা করতেন হালকা চালে এবং রসবোধের সঙ্গে।
ফারসি ভাষায় যাঁরা লিখতেন, তাঁদের রচনা মূলত অভিজাত শ্রেণির পাঠকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু জাতাল্লি যেহেতু তাঁর লেখায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের ভাষা ব্যবহার করতেন, তাই তাঁর কবিতা সাধারণ্যে জনপ্রিয় ছিল। তিনি তাঁর লেখাকে শুধু রইসদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর চিন্তাভাবনায় ও লেখায় নিপীড়িত জনসাধারণের অনুভূতির প্রতিধ্বনি ছিল, আর তাই সবাই সহজেই তাঁর লেখার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতে পারত।
অন্যদিকে দিল্লির শাহি রাজপরিবারকে সতর্ক আচরণ করতে হতো জাতাল্লির সঙ্গে। আওরঙ্গজেবের সঙ্গে তিনি খানিকটা শ্রদ্ধা-ভক্তি ভাগাভাগি করে নিয়েছিলেন। এমনিতে জাতাল্লি যথেষ্ট বুদ্ধিমান ছিলেন। তাঁকে বা তাঁর বক্তব্যকে কেউ হেয় বা অগ্রাহ্য করলে তবেই তিনি তার বিরুদ্ধে লিখতে প্ররোচিত হতেন, যেটাকে সম্ভবত বাদশাহরা ভয় পেতেন। তাঁরা জানতেন, রেগে গেলে জাতাল্লি খারাপের চেয়েও খারাপ হয়ে যেতে পারেন। এসব থেকে মনে হয়, শাহি দরবার আর নাগরিক সমাজ ডরেভয়ে হলেও জাতাল্লিকে কিছুটা সম্মান-মর্যাদা দিত। তবে শেষ পর্যন্ত তারা তাঁকে পাগলা কবি বলেই মনে করত। রাজধানীর সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে একজন কবি বা লেখক হিসেবে তিনি কখনোই তাঁর সত্যিকারের প্রাপ্য সম্মান বা স্বীকৃতিটা পাননি এবং শেষ পর্যন্ত এই লেখার কারণেই তাঁকে মৃত্যুদণ্ডিত হতে হয়েছিল। ফলে বোঝাই যায়, সমকালীন ক্ষমতাসীনেরা কখনোই জাতাল্লির লেখাকে পুরোপুরি ভালো চোখে দেখেনি।
জাতাল্লি খুব সজাগ সচেতন একজন কবি ছিলেন। তাঁর চারপাশের জগতে যা যা ঘটছে, সেসবের প্রতিক্রিয়ায় তিনি কলম ধরেছেন, যেগুলোকে প্রতিবাদী বা রাজনৈতিক লেখা বলা যায়। তবে প্রতিবাদ বা রাজনীতির বাইরেও তাঁর অনেক কবিতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, তিনি বিয়ে এবং বিয়ের আসরে বৈবাহিকদের তরজা নিয়েও বেশ কিছু দ্বিভাষী কবিতা রচনা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর রচনাবলির সিংহভাগ স্পষ্টতই রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যঙ্গাত্মক। অনুমান করা হয়, জাতাল্লি নিজেকে একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই ভাবতেন। তিনি তাঁর নিজস্ব পন্থায় চিৎকার-চেঁচামেচি করেছেন, তাঁর সময়কার শাসকদের অন্যায়-অবিচারগুলোকে তুলে ধরেছেন, শাসকদের ক্ষমতা আর তার অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং অবশেষে একজন প্রতিবাদকারী হিসেবেই চরমতম শাস্তিকে বরণ করে নিয়েছেন।
নিচে উদ্ধৃত পঙ্ক্তিগুলো থেকে নিজের সময়ের প্রতি জাতাল্লির রাগ আর হতাশাকে উপলব্ধি করা যায়। এখানে তিনি সমাজের বৃহত্তর চিত্রটিকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন এবং দেখিয়ে দিয়েছেন নিপীড়ক রাষ্ট্রশক্তি কীভাবে তাদের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে।
দুর্ভাগ্যবশত, জাতাল্লির ‘গাণ্ডুনামা’ বা অন্যান্য লেখার কোনো অনুবাদ নেই। এমনকি নাগরী হরফে হিন্দিতেও এগুলো অনূদিত হয়নি। এ ছাড়া তাঁর লেখার পাণ্ডুলিপির সংখ্যাও কম। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও পাঠাগারে এবং দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতাল্লির লেখার কিছু মাইক্রোফিল্ম সংরক্ষিত আছে বলে জানা যায়।
গয়া ইখলাস আলম সে
আজব ইয়েহ্ দৌর আয়া হ্যায়
ডরে হ্যায় খালাক জালিম সে
আজব ইয়েহ্ দৌর আয়া হ্যায়
না ইয়ারোঁ মে রহি ইয়ারি
না ভাইয়োঁ মে ওয়াফাদারি
মহব্বত উঠ গয়ে সারি
আজব ইয়েহ্ দৌর আয়া হ্যায়
সিপাহি হক নহিঁ পাওয়েঁ
নি উঠ-উঠ চৌকিয়াঁ যাওয়েঁ
কর্জ বানিয়োঁ সে লে খাওয়েঁ
আজব ইয়েহ্ দৌর আয়া হ্যায়
বাংলায়:
দুনিয়া থেকে আনুগত্য হারিয়ে গেছে,
আজব এক সময় এসেছে
সবাই অত্যাচারীকে ভয় পাচ্ছে,
আজব এক সময় এসেছে
বন্ধুদের মধ্যে বন্ধুত্ব নেই
ভাইদের মধ্যে নেই বিশ্বস্ততা
সমস্ত ভালোবাসা হারিয়ে গেছে
আজব এক সময় এসেছে
সৈনিকেরা তাদের প্রাপ্য পাচ্ছে না
আর অস্থিরভাবে ছোটাছুটি করছে
মহাজনের কাছ থেকে কর্জ নিয়ে খাচ্ছে
আজব এক সময় এসেছে
—(অনুবাদ: লেখক)
দুর্ভাগ্যবশত, জাতাল্লির ‘গাণ্ডুনামা’ বা অন্যান্য লেখার কোনো অনুবাদ নেই। এমনকি নাগরী হরফে হিন্দিতেও এগুলো অনূদিত হয়নি। এ ছাড়া তাঁর লেখার পাণ্ডুলিপির সংখ্যাও কম। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও পাঠাগারে এবং দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতাল্লির লেখার কিছু মাইক্রোফিল্ম সংরক্ষিত আছে বলে জানা যায়। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতেও কিছু পাণ্ডুলিপি ছিল, কিন্তু কয়েক বছর আগে সেগুলো হারিয়ে গেছে। জানা যায়, এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়েও জাতাল্লির লেখার কিছু পাণ্ডুলিপি আছে।