অলংকরণ : এস এম রাকিবুর রহমান। গ্রাফিকস: প্রথম আলো
অলংকরণ : এস এম রাকিবুর রহমান। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

নিবন্ধ

পুরুষ পরিচালকেরা যেভাবে দেবতা হয়ে ওঠেন

কয়েক দিন আগে ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে এক তরুণ বাংলাদেশি অভিনেত্রীর একটি সাক্ষাৎকারে চোখ পড়ল। তাঁর অভিনীত সাম্প্রতিক চলচ্চিত্রটি বেশ প্রশংসা কুড়াচ্ছে। পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি তাঁর পরিচালককে জীবনে একধরনের ঐশী উপস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি তাঁর সঙ্গে কাজ করা পুরুষ পরিচালককে বর্ণনা করতে গিয়ে যেসব শব্দ ব্যবহার করেন, তা হলো ‘প্রভু’ ও ‘সৃষ্টিকর্তা’। তিনি ব্যক্ত করেন ভক্তি, আত্মসমর্পণ ও নিঃশর্ত বিশ্বাসের কথা।

অনেক দর্শকের কাছেই হয়তো তাঁর কথাগুলো সুন্দর লেগেছে। কিন্তু আমার কাছে এসব গভীর উদ্বেগজনক বলে মনে হলো। এ কারণে মনে হলো না যে আমি তাঁর আন্তরিকতাকে সন্দেহ করছি। কারণ, আমি এমন মনে করি না যে পরিচালকেরা গুরুত্বপূর্ণ নন। কিংবা আমি এটাও অস্বীকার করি না যে চলচ্চিত্র বিশ্বাস ও সহযোগিতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি শিল্পমাধ্যম। আমাদের চলচ্চিত্রশিল্পে—বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে—ক্ষমতার কাঠামোটি এখনো কীভাবে কাজ করে চলেছে, এসব শব্দ তা যেভাবে উন্মোচিত করেছে, সেটাই আমার উদ্বেগের কারণ।

যখন একজন অভিনেত্রী পুরুষ পরিচালককে তাঁর প্রভু, তাঁর স্রষ্টা কিংবা তাঁর কাছে আত্মনিবেদন করার মতো এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বর্ণনা করেন, তখন আমরা আর নিছক শিল্পীসুলভ সহযোগিতা নিয়ে কথা বলছি না, আমরা কথা বলছি ক্ষমতাকাঠামো নিয়ে। আমরা কথা বলছি এমন এক ঐতিহাসিক কাঠামো নিয়ে, যেখানে নারীদের গড়ে তোলার মতো একটি সত্তা হিসেবে দেখা হয়, আর পুরুষদের দেখা হয় তাঁদের গড়ে তোলার মতো ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে।

চলচ্চিত্রে নারীর অবস্থান ঐতিহাসিকভাবে সব সময়ই জটিল ছিল। চলচ্চিত্রমাধ্যম নারীর শরীর, সৌন্দর্য, যৌনতা এবং আবেগগত শ্রমের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। দর্শক টানার জন্য চলচ্চিত্র বরাবরই নারীদের ব্যবহার করেছে। অথচ একই সঙ্গে চলচ্চিত্র নিজেদের প্রতিনিধিত্বের ওপর কর্তৃত্ব থেকেও নারীদের বঞ্চিত করেছে।

এআই-সহায়তায় নির্মিত প্রতীকী ভিজ্যুয়াল
নারী অভিনয়শিল্পী এখনো তাকিয়ে দেখার ভার বহন করেন। তাঁর শরীর এখনো চলচ্চিত্র-অর্থনীতির কেন্দ্রে অবস্থান করে। তাঁর ছবি বাজারজাত হয়, ছড়িয়ে পড়ে, ভোগের সামগ্রী হয়ে ওঠে এবং আলোচনা করা হয়। অথচ চলচ্চিত্রের অর্থ ও পরিচয় নির্ধারণের ক্ষমতা ঐতিহাসিকভাবে থেকে যায় পুরুষদেরই হাতে।

নারীদের প্রায়ই রাখা হয়েছে ক্যামেরার সামনে, পেছনে নয়। তাঁদের বলা হয়েছে অভিনয় করতে, সিদ্ধান্ত নিতে নয়। তাঁদের বলা হয়েছে শরীর ও চরিত্র ধারণ করতে, স্রষ্টা হতে নয়। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস এদিক থেকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ইতিহাস বলে, এ অঞ্চলের প্রথম যুগের চলচ্চিত্রে অভিনেত্রী আনা হতো পতিতালয় থেকে, কারণ তথাকথিত ভদ্রঘরের নারীরা পর্দায় অভিনয় করতে পারতেন না। চলচ্চিত্রকে এমন এক গণপ্রদর্শিত পেশা হিসেবে দেখা হতো, যা ‘ভালো পরিবারের’ নারীদের উপযোগী নয়। ফলে শুরু থেকেই অভিনেত্রীর অবস্থান ছিল দ্ব্যর্থক—তিনি চলচ্চিত্রের জন্য অপরিহার্য, কিন্তু সামাজিক মর্যাদার বিচারে সন্দেহবিদ্ধ।

নারী অভিনয়শিল্পী এখনো তাকিয়ে দেখার ভার বহন করেন। তাঁর শরীর এখনো চলচ্চিত্র-অর্থনীতির কেন্দ্রে অবস্থান করে। তাঁর ছবি বাজারজাত হয়, ছড়িয়ে পড়ে, ভোগের সামগ্রী হয়ে ওঠে এবং আলোচনা করা হয়। অথচ চলচ্চিত্রের অর্থ ও পরিচয় নির্ধারণের ক্ষমতা ঐতিহাসিকভাবে থেকে যায় পুরুষদেরই হাতে।

চলচ্চিত্র-তাত্ত্বিক লরা মালভি তাঁর বিখ্যাত ‘মেইল গেজ’-এর ধারণা নিয়ে বিশদ করে লিখেছেন। তাঁর মতে, চলচ্চিত্র প্রায়ই নারীদের দৃশ্যগত ভোগের বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করে, আর পুরুষদের প্রতিষ্ঠা করে সক্রিয় দর্শক, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ও কর্তা হিসেবে। এটি বাংলাদেশেরই একক বাস্তবতা নয়। এটি হলিউডে আছে, বলিউডে আছে, ইউরোপীয় আর্ট সিনেমায় আছে—বস্তুত পৃথিবীর প্রায় সব বড় চলচ্চিত্রশিল্পেই আছে।

আর ঠিক এ কারণেই ভক্তির ভাষা আমার মধ্যে এতটা অস্বস্তি তৈরি করে। যখন একজন নারী অভিনয়শিল্পী বলেন, একজন পুরুষ পরিচালক তাঁর ‘প্রভু’ বা ‘সৃষ্টিকর্তা’, তখন তিনি নিজের অজান্তেই এমন একটি কাঠামোকে শক্তি জোগাচ্ছেন, যা এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিদ্যমান। এটি এমন একটি কাঠামো, যেখানে তাঁর নিজের শিল্পীসত্তা পরিচালকের শিল্প-কর্তৃত্বের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।

এআই-সহায়তায় নির্মিত প্রতীকী ভিজ্যুয়াল
একটি চলচ্চিত্রের সেট অসংখ্য প্রতিভাবান মানুষের সমাবেশ—সিনেমাটোগ্রাফার, অভিনয়শিল্পী, কস্টিউম ডিজাইনার, এডিটর, প্রোডাকশন ডিজাইনার, সাউন্ড রেকর্ডিস্ট, সহকারী পরিচালক, প্রোডাকশন অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং আরও অনেকে। তাঁরা প্রত্যেকে তাঁদের নিজস্ব দক্ষতা নিয়ে একটি যৌথ সৃষ্টির অংশ হতে আসেন। পরিচালকের কাজ তাঁদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করা নয়। পরিচালকের কাজ তাঁদের অবদানকে সম্মান করা।

অভিনয়শিল্পীরাও শিল্পী। বড় অভিনয়শিল্পী পুতুলমাত্র নন। একজন বড় অভিনয়শিল্পী ব্যাখ্যা করেন, প্রশ্ন তোলেন, উদ্ভাবন করেন, অবদান রাখেন। অন্ধ আনুগত্যের মধ্য দিয়ে অসাধারণ অভিনয়ের উদ্ভাস ঘটে না, সেটা হয় বরং তখন, যখন অভিনয়শিল্পী তাঁর প্রজ্ঞা, আবেগ, কল্পনাশক্তি এবং জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর কাজের মধ্যে আত্মস্থ করেন। একজন অভিনয়শিল্প একটি প্রকল্পে যুক্ত হন, কারণ তিনি তাঁর অন্তর্দৃষ্টিকে বিশ্বাস করেন। এরপর তিনি সেই অন্তর্দৃষ্টিকে আরও সমৃদ্ধ, আরও জটিল এবং আরও গভীর করে তোলেন। তিনি কেবল ওপর থেকে আসা নির্দেশ পালন করেন না। তিনিও সৃষ্টি করেন।

তাহলে আমরা এখনো কেন আত্মসমর্পণের ভাষাকে উদ্‌যাপন করি?

এর একটি উত্তর লুকিয়ে আছে আমরা পরিচালকদের কীভাবে কল্পনা করি তার মধ্যে। চলচ্চিত্রশিল্প দীর্ঘদিন ধরে পরিচালককে প্রতিভাবান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার এক মিথ তৈরি করেছে। পরিচালক যেন সর্বজ্ঞ। পরিচালক যেন সর্বদ্রষ্টা। পরিচালক যেন শিল্পের দেবতা। ন্যায্যতার খাতিরে বলতে হয়, পরিচালনা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত কঠিন একটি পেশা। একজন পরিচালককে বিপুল দায়িত্ব বহন করতে হয়। শত শত মানুষকে একটি একক সৃজনশীল অন্তর্দৃষ্টি বাস্তবায়নের জন্য তিনি কাজ করেন। প্রতিমুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, নেতৃত্ব দিতে হয়, কিন্তু নেতৃত্ব দেবত্ব নয়। ক্ষমতা প্রজ্ঞা নয়। বরং আমি বলব উল্টোটা। কোনো পরিচালকের হাতে যত বেশি ক্ষমতা থাকে, তাঁর তত বেশি বিনয়ী হওয়া উচিত।

একটি চলচ্চিত্রের সেট অসংখ্য প্রতিভাবান মানুষের সমাবেশ—সিনেমাটোগ্রাফার, অভিনয়শিল্পী, কস্টিউম ডিজাইনার, এডিটর, প্রোডাকশন ডিজাইনার, সাউন্ড রেকর্ডিস্ট, সহকারী পরিচালক, প্রোডাকশন অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং আরও অনেকে। তাঁরা প্রত্যেকে তাঁদের নিজস্ব দক্ষতা নিয়ে একটি যৌথ সৃষ্টির অংশ হতে আসেন। পরিচালকের কাজ তাঁদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করা নয়। পরিচালকের কাজ তাঁদের অবদানকে সম্মান করা।

এআই-সহায়তায় নির্মিত প্রতীকী ভিজ্যুয়াল
যখন তরুণ অভিনেত্রীরা প্রকাশ্যে পুরুষ পরিচালকদের ‘প্রভু’ বা ‘স্রষ্টা’ বলে বর্ণনা করেন, তখন তাঁরা কেবল প্রশংসা প্রকাশ করেন না। তাঁরা পরবর্তী প্রজন্মকেও শেখান, চলচ্চিত্রশিল্পে ক্ষমতা কীভাবে কাজ করে। আমি চাই, আমরা ভিন্ন কিছু শেখাই। আমি চাই, আমাদের তরুণ অভিনেত্রীরা বুঝুক যে তাঁরাও শিল্পী। আমি চাই, তরুণ পরিচালকেরা উপলব্ধি করুক, নেতৃত্বের জন্য পূজিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

বাংলাদেশে আমি প্রায়ই ভিন্ন এক সংস্কৃতি লক্ষ করেছি। আমি দেখেছি, পুরুষ পরিচালকের রাগকে উদ্‌যাপন করা হয়। আমি দেখেছি, নিষ্ঠুরতাকে শক্তি বলে ভুল করা হয়। আমি দেখেছি, চিৎকারকে কর্তৃত্ব হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। আমি দেখেছি, অপমানজনক আচরণকে ‘আর্টিস্টিক টেম্পারামেন্ট’ বলে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। কোনো পরিচালক অধস্তন সদস্য বা অভিনেতাকে অপদস্থ করলে সবাই তাঁকে শক্তিমান বলে। কোনো পরিচালক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করলে সবাই তাঁকে প্রতিভাবান বলে। প্রায়ই নারী অভিনশিল্পীদের বিশ্বাস করানো হয়, ভক্তি একটি পেশাগত গুণ। আমি এই সংস্কৃতিকে গভীরভাবে অসুস্থ বলে মনে করি। এটি শুধু নারীদের জন্যই ক্ষতিকর নয়, এটি পুরুষদের জন্যও ক্ষতিকর এবং সিনেমার জন্যও ক্ষতিকর।

ভক্তির ভাষা শোষণের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। কারণ, ভক্তি প্রশ্ন করার ক্ষমতাকে নির্বাপিত করে। কেউ দেবতা হলে তাঁকে চ্যালেঞ্জ করা যাবে কীভাবে? কেউ স্রষ্টা হলে তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা যাবে কীভাবে? কেউ পবিত্র আসনে বসে থাকলে তাঁর সামনে সীমারেখা টানা যাবে কীভাবে? সবচেয়ে সুস্থ শিল্পীসুলভ সহযোগিতা গড়ে ওঠে পারস্পরিক সম্মানের ওপর, ভক্তির ওপর নয়।

অভিনয়শিল্পী পরিচালককে সম্মান করেন। পরিচালক অভিনয়শিল্পীকে সম্মান করেন। সিনেমাটোগ্রাফার প্রোডাকশন ডিজাইনারকে সম্মান করেন। প্রোডাকশন ডিজাইনার এডিটরকে সম্মান করেন। প্রত্যেকে অন্যের শ্রমের মূল্য স্বীকার করেন। এখানে কারও দেবতা হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

একজন নারী পরিচালক হিসেবে আমি এই প্রশ্নগুলোর প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। কারণ, আমি জানি, চলচ্চিত্রে নারীনেতৃত্ব এখনো কতটা বিরল। বিশ্বজুড়ে নারীরা এখনো পরিচালক, সিনেমাটোগ্রাফার, এডিটর, প্রযোজক এবং স্টুডিও এক্সিকিউটিভ হিসেবে সংখ্যায় কম প্রতিনিধিত্ব পান। বাংলাদেশে এই বাস্তবতা আরও প্রকট। এখনো খুব কম নারী নিয়মিতভাবে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। আর সে কারণেই ভাষা খুব গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পীসত্তার ক্ষমতা সম্পর্কে আমরা যে গল্পগুলো বলি, সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

যখন তরুণ অভিনেত্রীরা প্রকাশ্যে পুরুষ পরিচালকদের ‘প্রভু’ বা ‘স্রষ্টা’ বলে বর্ণনা করেন, তখন তাঁরা কেবল প্রশংসা প্রকাশ করেন না। তাঁরা পরবর্তী প্রজন্মকেও শেখান, চলচ্চিত্রশিল্পে ক্ষমতা কীভাবে কাজ করে।

আমি চাই, আমরা ভিন্ন কিছু শেখাই। আমি চাই, আমাদের তরুণ অভিনেত্রীরা বুঝুক যে তাঁরাও শিল্পী। আমি চাই, তরুণ পরিচালকেরা উপলব্ধি করুক, নেতৃত্বের জন্য পূজিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি চাই চলচ্চিত্রের এমন একটি সেট, যেখানে ক্ষমতার জায়গায় থাকবে সহযোগিতা, ভয়ের জায়গায় থাকবে সম্মান, যেখানে নারীদের শুধু ক্যামেরার সামনে নয়, ক্যামেরার পেছনেও কী ঘটবে, তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা থাকবে। চলচ্চিত্রের আরও দেবতার প্রয়োজন নেই। চলচ্চিত্রের প্রয়োজন আরও বেশি শিল্পীর, যাঁরা একে অন্যের মানবিকতাকে স্বীকৃতি দিতে জানেন

রুবাইয়াত হোসেন: চলচ্চিত্র পরিচালক