শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে হাত ধোয়া শেখানো হচ্ছে
শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে হাত ধোয়া শেখানো হচ্ছে

মতামত

সুপারবাগ: পরের মহামারির সস্তা প্রতিষেধক আমাদের ঘরেই আছে

বিশ্বের পরবর্তী বড় স্বাস্থ্য সংকটের প্রতিষেধক হয়তো কোনো অত্যাধুনিক গবেষণাগারে তৈরি হচ্ছে না। সেটি হয়তো নেই কোনো বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির দামি পেটেন্টে, নেই কোনো বিরল প্রযুক্তির ভেতরেও। বরং সেটি পড়ে আছে আমাদের ঘরের বাথরুমে, বেসিনের পাশে, রান্নাঘরের কোণে। নাম তার সাবান।

শুনতে অবিশ্বাস্য লাগে! কারণ, আমরা বড় সংকটের সমাধান বড় জায়গায় খুঁজতে অভ্যস্ত। হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র, জিন-সিকোয়েন্সিং ল্যাব, নতুন অ্যান্টিবায়োটিক, আধুনিক ডায়াগনস্টিক প্রযুক্তি—এসব ছাড়া আজকের স্বাস্থ্য সংকট সামলানো যাবে না, এ ধারণা ভুল নয়। কিন্তু সম্পূর্ণও নয়।

প্রতিকারের জন্য এগুলো অত্যাবশ্যকীয়, কিন্তু প্রতিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এগুলো আসে অনেক পরে। কারণ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি এখন এমন জায়গা থেকে জন্ম নিচ্ছে, যা আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সেই বিপদের নাম অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা এএমআর।

এএমআরকে সহজ করে বললে দাঁড়ায়, জীবাণু যখন ওষুধকে আর ভয় পায় না। যে অ্যান্টিবায়োটিক একসময় নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, ক্ষত কিংবা সাধারণ ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণে আনত, সেই ওষুধ একসময় কাজ করা বন্ধ করে দেয়। জীবাণু বেঁচে থাকে, আরও শক্তিশালী হয়, ছড়ায়। তখন সাধারণ সংক্রমণও জটিল হয়ে ওঠে। অস্ত্রোপচার ঝুঁকিপূর্ণ হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তিই দাঁড়িয়ে আছে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর। ক্যানসারের কেমোথেরাপির পরবর্তী জটিলতা ব্যবস্থাপনা, কিডনি রোগীদের নিয়মিত ডায়ালাইসিস এবং আইসিইউতে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা রোগীদের ইনফেকশন নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুই অ্যান্টিবায়োটিকের সফল কার্যকারিতার ওপর সরাসরি নির্ভরশীল।

এ কারণেই এএমআর ‘নীরব মহামারি’। এটি কোভিডের মতো হঠাৎ এক দিনে শহর বন্ধ করে দেয় না। লকডাউনের ঘোষণা আনে না। কিন্তু হাসপাতালের বিছানায়, শিশুদের জ্বরের মধ্যে, বয়স্ক মানুষের সংক্রমণে, অস্ত্রোপচারের পরে, ডায়রিয়ায় কাতর গ্রামীণ শিশুর শরীরে এটি ধীরে ধীরে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়। আর যখন বোঝা যায়, তখন অনেক সময় হাতে থাকা ওষুধ আর যথেষ্ট থাকে না।

আমরা যতবার অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করি, ততবার জীবাণুকে প্রশিক্ষণ দিই। তাকে বলি, এ অস্ত্রকে কীভাবে নিষ্ক্রিয় করতে হয় শেখো। প্রতিবার অসম্পূর্ণ ডোজ, অযথা প্রেসক্রিপশন, ভুল রোগে অ্যান্টিবায়োটিক, কিংবা সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে জীবাণুর বিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে।

বাংলাদেশের জন্য এ সংকট আরও বাস্তব। কারণ, এখানে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি, স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ বেশি, জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি এবং অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সংস্কৃতি অনেক ক্ষেত্রেই বেপরোয়া।

অ্যান্টিবায়োটিক এখানে অনেকের কাছে চিকিৎসকের পরামর্শনির্ভর ওষুধ নয়, বরং ফার্মেসি থেকে সহজে কেনা যায় এমন দ্রুত সমাধান। জ্বর? অ্যান্টিবায়োটিক। ডায়রিয়া? অ্যান্টিবায়োটিক। শিশুর কাশি? অ্যান্টিবায়োটিক।

অসুখটি ভাইরাসজনিত কি না, অ্যান্টিবায়োটিক আদৌ দরকার কি না, সঠিক সময় ধরে সঠিক ডোজ খাওয়া হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্ন অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়।

বাংলাদেশ ও কেনিয়ার গ্রামীণ জনগোষ্ঠী নিয়ে নেচার কমিউনিকেশনসে প্রকাশিত এক গবেষণার ফল আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। বাংলাদেশে গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের প্রায় ৯৮ শতাংশই ছয় মাস বয়স হওয়ার আগেই অন্তত একবার অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করেছে। বছরে গড়ে তারা প্রায় ১০ বার অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স নিয়েছে।

তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে একটি শিশু বছরে গড়ে দুবারের কম অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স নেয়। এ ব্যবধান শুধু চিকিৎসা-অভ্যাসের নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, দারিদ্র্য, আস্থা, বাজারব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণহীন ওষুধ বিক্রির মিলিত প্রতিচ্ছবি।

আরও উদ্বেগজনক হলো, গ্রামীণ এলাকায় শিশুদের ডায়রিয়া নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের প্রায় ৭৭ শতাংশই চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া সরাসরি ফার্মেসি থেকে কেনা হয়েছিল।

অর্থাৎ রোগ, ভয়, দ্রুত আরোগ্যের প্রত্যাশা ও বাজার—এ চারটি মিলে অ্যান্টিবায়োটিককে এমন এক দৈনন্দিন পণ্যে পরিণত করেছে, যা আসলে কখনোই সাধারণ ভোগ্যপণ্য হওয়ার কথা ছিল না।

কিন্তু এ গল্পের আরেকটি দিক আছে। আমরা যতবার অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করি, ততবার জীবাণুকে প্রশিক্ষণ দিই। তাকে বলি, এ অস্ত্রকে কীভাবে নিষ্ক্রিয় করতে হয় শেখো।

প্রতিবার অসম্পূর্ণ ডোজ, অযথা প্রেসক্রিপশন, ভুল রোগে অ্যান্টিবায়োটিক, কিংবা সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে জীবাণুর বিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে। ফলে তৈরি হয় সুপারবাগ।

তাই এএমআর মোকাবিলার প্রশ্নটি কেবল নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের প্রশ্ন নয়; বরং আরও মৌলিক প্রশ্ন হলো, আমাদের এত বেশি অ্যান্টিবায়োটিক লাগছে কেন? কেন একটি শিশুকে বছরে এতবার সংক্রমণের মুখোমুখি হতে হচ্ছে? কেন ডায়রিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, চর্মরোগ কিংবা পেটের অসুখ এত সহজে ছড়াচ্ছে? কেন সংক্রমণ প্রতিরোধের প্রাথমিক সুরক্ষাদেয়াল এত দুর্বল?

অসুস্থ শিশুকে বুকে জড়িয়ে হাসপাতালের বারান্দায় বসে আছেন অভিভাবকেরা

এ জায়গাতেই হাত ধোয়া রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অত্যন্ত কার্যকর হয়ে ওঠে।

হাত মানুষের শরীরের সবচেয়ে ব্যস্ত অঙ্গগুলোর একটি। দরজার হাতল, টাকা, মুঠোফোন, সুইচ-রিমোট, যানবাহনের হাতল, শিশুর খেলনা, বাজারের থলে, টয়লেটের দরজা, রান্নার সরঞ্জাম—হেন কিছু নেই, যার সঙ্গে হাতের সম্পর্ক নেই।

তারপর সেই হাতই যায় মুখে, চোখে, নাকে, খাবারে। জীবাণুর ভ্রমণপথটি প্রায়ই এতটাই সাধারণ যে আমরা তা চোখেই দেখি না। অথচ সংক্রমণের বড় অংশ এই অদৃশ্য পথেই ঘরে ঢোকে।

সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া এই পথের ওপর একটি সস্তা কিন্তু কার্যকর ব্যারিকেড বসায়। এটি কোনো রোমান্টিক স্বাস্থ্যবার্তা নয়; এর পেছনে শক্ত বৈজ্ঞানিক যুক্তি আছে। নিয়মিত হাত ধোয়ার ফলে ডায়রিয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণও কমে। সংক্রমণ কমলে চিকিৎসার প্রয়োজন কমে। চিকিৎসার প্রয়োজন কমলে অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর চাপ কমে। আর অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমলে এএমআর তৈরির গতি শ্লথ হয়।

এ যুক্তি এত সরল যে অনেক সময় নীতিনির্ধারণের টেবিলে তার গুরুত্ব কমে যায়। আমরা জটিল সমস্যার জন্য জটিল সমাধান পছন্দ করি। বাজেটের ভাষায়, প্রযুক্তির ভাষায়, প্রকল্পের ভাষায় বড় সমাধান বেশি আকর্ষণীয়।

কিন্তু জনস্বাস্থ্যের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, অনেক বড় সাফল্য এসেছে ছোট আচরণগত পরিবর্তন থেকে—টিকা, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, হাত ধোয়া, মশারি, ওআরএস। এগুলোর কোনোটিই নাটকীয় নয়; কিন্তু এগুলোই জীবন বাঁচিয়েছে সবচেয়ে বেশি।

বাংলাদেশ ও কেনিয়ার সেই গবেষণার ফল তাই আমাদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যেখানে পানি, স্যানিটেশন ও হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ও অভ্যাস জোরদার করা হয়েছে, বাংলাদেশে সেখানে শিশুদের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার লক্ষণীয়ভাবে কমেছে।

যেসব পরিবার এই স্বাস্থ্যবিধির আওতায় এসেছে, তাদের শিশুদের ক্ষেত্রে আগের ৯০ দিনে অন্তত একবার অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের হার ১০ থেকে ১৪ শতাংশ কম ছিল। একাধিকবার অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স নেওয়ার হার কমেছে ২৬ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার কমেছে কোনো নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নয়, কোনো ভয় দেখিয়ে নয়, কোনো ব্যয়বহুল চিকিৎসা হস্তক্ষেপ দিয়েও নয়। কমেছে সংক্রমণ কমার কারণে। অর্থাৎ মানুষ কম অসুস্থ হয়েছে, তাই ওষুধ কম লেগেছে। এএমআর মোকাবিলায় এর চেয়ে স্বাভাবিক, মানবিক ও টেকসই পথ আর কী হতে পারে?

তবে একই গবেষণায় কেনিয়ায় একই ধরনের সুফল দেখা যায়নি। এ তথ্যও সমান জরুরি। কারণ, এটি আমাদের বলে, শুধু অবকাঠামো বানালেই হয় না। একটি হাত ধোয়ার স্টেশন বসিয়ে দিলেই আচরণ বদলায় না। স্কুলে পোস্টার ঝুলালেই শিশু হাত ধোয়ার অভ্যাস করে না। কমিউনিটিতে একদিন মাইকিং করলেই স্বাস্থ্যবিধি সংস্কৃতি হয়ে ওঠে না।

আচরণ বদলাতে হলে প্রাপ্যতা, সুবিধা, সামাজিক অনুপ্রেরণা, পুনরাবৃত্তি, নজরদারি এবং স্থানীয় নেতৃত্ব—সব একসঙ্গে কাজ করতে হয়।

আমাদের এখন দরকার হাত ধোয়াকে নতুন দৃষ্টিতে দেখা। এটি আর কেবল শুধু ‘ভালো অভ্যাস’ নয়। এটি অ্যান্টিবায়োটিক রক্ষার উপায়। এটি শিশুদের অপ্রয়োজনীয় ওষুধ থেকে বাঁচানোর উপায়। এটি চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপ কমানোর উপায়। এটি সুপারবাগের বিরুদ্ধে সমাজের প্রথম সারির প্রতিরক্ষা।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমাদের দেশে প্রকল্পভিত্তিক অবকাঠামো নির্মাণের ইতিহাস দীর্ঘ, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ ও আচরণগত ধারাবাহিকতার ইতিহাস দুর্বল। অনেক স্কুলে হাত ধোয়ার জায়গা আছে, কিন্তু পানি নেই। কোথাও পানি আছে, সাবান নেই। কোথাও সাবান আছে, কিন্তু শিশুদের জন্য তা ব্যবহারযোগ্য জায়গায় নেই। কোথাও টয়লেট আছে, কিন্তু দরজা ভাঙা, আলো নেই, পরিষ্কার নয়। অবকাঠামো ও অভ্যাসের মাঝখানের এ ব্যবধানই জনস্বাস্থ্যের নীরব ফাঁক।

এএমআর মোকাবিলায় তাই বাংলাদেশকে শুধু ‘অ্যান্টিবায়োটিক কম খাও’ ধরনের প্রচারে আটকে থাকলে চলবে না। এই বার্তা দরকার, কিন্তু যথেষ্ট নয়। দরকার সংক্রমণ কমানোর জাতীয় কৌশল।

নিরাপদ পানি, কার্যকর স্যানিটেশন, সাবানসহ হাত ধোয়ার স্থায়ী ব্যবস্থা, স্কুলভিত্তিক স্বাস্থ্যবিধি শিক্ষা, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সংক্রমণ প্রতিরোধ, পাবলিক টয়লেটের মানোন্নয়ন এবং ফার্মেসি পর্যায়ে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির নিয়ন্ত্রণ—এসবকে একই নীতির অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

এখানে একটি অর্থনৈতিক যুক্তিও আছে। নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং অনিশ্চিত। অন্যদিকে অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা বাড়লে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে, হাসপাতালে থাকার সময় বাড়ে, দরিদ্র পরিবারের আর্থিক ঝুঁকি বাড়ে, কর্মক্ষমতা কমে।

অর্থাৎ এএমআর কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাথাব্যথা নয়; এটি অর্থনীতি, দারিদ্র্য, শ্রমবাজার এবং সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নও।

সেই তুলনায় হাত ধোয়া অত্যন্ত সস্তা। কিন্তু সস্তা বলেই একে অবহেলা করা সবচেয়ে বড় ভুল। সাবান-পানি সুলভ করা, স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ব্যবহারযোগ্য হাত ধোয়ার জায়গা রাখা, শিশুদের আচরণগত শিক্ষা দেওয়া, মায়েদের ওপর একক দায়িত্ব চাপিয়ে না দিয়ে পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের যৌথ অভ্যাস তৈরি করা—এসবের খরচ অল্প, কিন্তু জনস্বাস্থ্য লাভ বিপুল।

যে কোনো জীবাণুকে রুখতে হাত ধুতে হবে

আমাদের এখন দরকার হাত ধোয়াকে নতুন দৃষ্টিতে দেখা। এটি আর কেবল শুধু ‘ভালো অভ্যাস’ নয়। এটি অ্যান্টিবায়োটিক রক্ষার উপায়। এটি শিশুদের অপ্রয়োজনীয় ওষুধ থেকে বাঁচানোর উপায়। এটি চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপ কমানোর উপায়। এটি সুপারবাগের বিরুদ্ধে সমাজের প্রথম সারির প্রতিরক্ষা।

যে দেশে শিশুরা খুব অল্প বয়সেই বারবার অ্যান্টিবায়োটিকের মুখোমুখি হয়, সে দেশে হাত ধোয়া কোনো নরম বার্তা নয়; এটি জরুরি স্বাস্থ্যনীতি। যে দেশে ফার্মেসি থেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক কেনা যায়, সে দেশে সংক্রমণ প্রতিরোধকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার না করলে শুধু আইন দিয়ে সমস্যা মিটবে না।

যে দেশে ডায়রিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এখনো অসংখ্য শিশুর দৈনন্দিন বাস্তবতা, সে দেশে সাবান-পানি বিলাসিতা নয়, জীবনরক্ষাকারী অবকাঠামো।

বিশ্ব হয়তো সুপারবাগের বিরুদ্ধে নতুন ওষুধ খুঁজবে। খোঁজা উচিতও। কিন্তু তার আগেই আমাদের নিজেদের জিজ্ঞাসা করতে হবে, আমরা কি জীবাণুকে অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে লড়াইয়ের সুযোগই কমিয়ে দিতে পারি না? আমরা কি সংক্রমণকে দরজার বাইরে আটকে রাখতে পারি না? আমরা কি এমন এক সমাজ গড়তে পারি না, যেখানে অসুখ কম হবে, অ্যান্টিবায়োটিক কম লাগবে, আর ওষুধ তার শক্তি ধরে রাখবে?

এ প্রশ্নের উত্তর শুরু হতে পারে খুব সাধারণ এক দৃশ্য থেকে। একটি শিশু খাওয়ার আগে হাত ধুচ্ছে। একজন শ্রমিক কাজ শেষে সাবান ব্যবহার করছেন। একটি স্কুলে টয়লেটের পাশে পানি ও সাবান আছে। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগী দেখার আগে ও পরে স্বাস্থ্যকর্মীর হাত পরিষ্কার। একটি বাস টার্মিনালে ব্যবহারের উপযোগী পাবলিক টয়লেট। একটি পরিবার বুঝছে, অ্যান্টিবায়োটিক সব অসুখের উত্তর নয়।

পৃথিবীর পরবর্তী বড় স্বাস্থ্য সংকটের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সস্তা অস্ত্রটি সত্যিই আমাদের ঘরেই আছে। কিন্তু সাবান নিজে যুদ্ধ জেতে না। জেতে তখনই, যখন সেটি অভ্যাসে পরিণত হয়; যখন অভ্যাস সংস্কৃতিতে পরিণত হয়; আর সংস্কৃতি যখন নীতির সমর্থন পায়।

সুপারবাগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হতে হবে হাসপাতালের বিছানায় নয়, তার অনেক আগে। শুরু হবে হাতের তালুতে, সাবানের ফেনায়, পরিষ্কার পানির নিচে। এবং হয়তো সেখানেই লুকিয়ে আছে অ্যান্টিবায়োটিকের ভবিষ্যৎ বাঁচানোর সবচেয়ে সস্তা, সবচেয়ে সহজ, অথচ সবচেয়ে অবহেলিত প্রতিরক্ষা।

  • প্লাবন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াটারএইড বাংলাদেশের কমিউনিকেশনস কো–অর্ডিনেটর; মো. গোলাম রসুল ওয়াটারএইড বাংলাদেশের রিসার্চ ও নলেজ ম্যানেজমেন্ট কো–অর্ডিনেটর হিসেবে কর্মরত।

    মতামত লেখকদের নিজস্ব