কখনো কখনো কোনো কোনো উচ্চারিত শব্দ শ্রোতার কানের ভেতর দিয়ে মরমে গিয়ে পশে। পশা দুই রকম: অন্তরে মধু মেখে দেয় অথবা বিষাক্ত তিরের মতো আঘাত হানে। কোনো কোনো শব্দ মধুও মাখায় না, আঘাতও হানে না—শুনলেই কান গরম হয়ে ওঠে। আর যদি শব্দটি হয় স্ল্যাং—তাহলে তো কথাই নেই। ইংরেজি স্ল্যাংয়ের বাংলা প্রতিশব্দ ছিল না, অভিধান প্রণয়নকারীরা করেছেন অশ্লীল শব্দ বা অপশব্দ।
ভাষা এক অদ্ভুত জিনিস। এক দেশের মানুষের যা বোল, আরেক দেশের মানুষের তা গাল। এক ভাষায় যা সুশ্রাব্য, আরেক ভাষায় তা অশ্লীল। অনেক বছর আগের কথা। দিল্লিতে পিটিআইয়ের এক বন্ধুর সঙ্গে এক ঘরোয়া কীর্তনের আসরে যাই। গৃহকর্তা জনাব গওহর রিজভী, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর বৈদেশিকবিষয়ক উপদেষ্টা। অতি চমৎকার ভক্তিমূলক সংগীত। রাতের খাবারের তালিকায় লুচি, নিরামিষ প্রভৃতি। শ্রোতাদের একজন দিল্লির কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বা চারুকলার ছাত্রী। ঢাকা থেকে সফরে গেছেন একজন। ওই তরুণীকে তিনি কমপ্লিমেন্ট জানাতে গিয়ে বললেন: আপকা বাল বহুত বিউটিফুল। আমি বিব্রত বোধ করি। প্রথমবার বলার পরে তরুণী সৌজন্যের সলজ্জ হাসি হাসলেন। চুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ মানুষটি আবার বললেন একই হিন্দি বাক্য। তখন বিপন্ন তরুণী বিরক্তির সঙ্গে বললেন, আমি বাঙালি। বাংলাদেশের মেয়ে। বাংলা বুঝি। তিনি সুস্পষ্টভাবে বোঝাতে চাইলেন, তাঁর কেশরাশি যতই অন্ধকার বিদিশার নিশা হোক, তার বাংলাতে প্রশংসা করাই ভালো। চুলটুলের ব্যাপার শুধু হিন্দিভাষীর সঙ্গেই হিন্দিতে বলা শোভন। বাঙালি নারীর সঙ্গে বাংলা ভাষাই মানানসই। বাংলা ‘চুল’-এর হিন্দি প্রতিশব্দটি বাংলাদেশে প্রতিদিন বাড়িঘরে, রাস্তাঘাটে, মাঠে-ময়দানে, দোকানপাটে, অফিস-আদালতে যতবার উচ্চারিত হয় বঙ্গসন্তানের মুখে, চুল শব্দটি তার দশ ভাগের এক ভাগও হয় না। রেগে গেলে শুধু বাঙালি নয়, পৃথিবীর অনেক ভাষার মানুষই অপশব্দ বা স্ল্যাং বলে থাকে। স্ল্যাং শুধু ইতরজনের ভাষা নয়, স্ল্যাং হলো আক্রমণাত্মক শব্দ—অফেনসিভ ল্যাঙ্গুয়েজ। এরিক পার্ট্রিজ-এর অ্যা ডিকশনারি অব স্ল্যাং অ্যান্ড আনকনভেনশনাল ইংলিশ একটি চমৎকার কাজ। বাংলা ভাষায় অপশব্দের একটি অভিধান হতে হতেও হতে পারল না। একদিন আমাদের পিতৃতুল্য শিক্ষক শওকত ওসমান এসে বললেন, ‘ঢাকাই স্ল্যাংয়ের একটি অভিধানের পরিকল্পনা করেছি। চলো বাংলা একাডেমীতে। ডিজির সঙ্গে কথা বলি। আবু হেনা মোস্তফা কামালের ঘরে গেলাম। প্রস্তাব শুনে তাঁর মোটামুটি পছন্দ হলো। স্যার তাঁর ব্রাউন খামের ভেতর থেকে পাণ্ডুলিপি বের করে কিছু শব্দ পড়তে শুরু করলে হেনা সাহেব বললেন, থাক থাক আর দরকার নেই। ওই প্রকল্প ওখানেই শেষ। আবু হেনা মোস্তফা কামালের কোয়ার্টারে প্রায়ই শুক্রবার সকালে আড্ডা দিতাম। অতি মজলিশি হাস্যরসপ্রিয় মানুষ। বললেন, ভালো প্রস্তাব নিয়ে শওকত ভাই এসেছিলেন। ওই সব শব্দ কম্পোজিটর কম্পোজ করতে রাজি হতেন না। ইউরোপের স্ল্যাং-বিষয়ক গবেষকদের মতে, স্ল্যাং হলো সেই অপভাষা যা প্রধানত ব্যবহূত হয় ইতরজনের বস্তিতে, পথেঘাটে, হাট-বাজারে, সেলুনে, ঘোড়ার আস্তাবলে, ছোট কারখানায়, নাট্যমঞ্চে, সৈনিকদের ছাউনিতে, খেলার মাঠে, পশুচারণ ক্ষেত্রে। কিন্তু বহু দেশে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান পার্লামেন্টের সদস্যরাও যে অবলীলায় দেদার অপশব্দ বা স্ল্যাং ব্যবহার করেন তা তাঁরা উল্লেখ করেননি। ওসব দেশে জনস্বার্থে উচ্চ স্বরে সংসদে বিতর্ক হয়, কিন্তু অশ্লীল বা অপশব্দ প্রয়োগ নয়।
এমন এক শব্দ উচ্চারিত হলো লুই কানের নকশা করা শেরেবাংলা নগরের ধূসর ভবনটি থেকে, যার অর্থ ও ভাবার্থ উদ্ধার করতে দুই বাংলার প্রয়াত ও জীবিত ভাষাবিজ্ঞানীদের মাথার ঘাম পা পর্যন্ত গড়িয়েছে। তলব করা হয়েছে দুই মহান ভাষাবিজ্ঞানী মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ও সুনীতি চাটুজ্যেকে চিরকাল আনন্দবাজার পত্রিকা আওয়ামী লীগের পক্ষে লেখে, বিএনপির বিরোধিতা করে। এই প্রথম একটি শব্দের প্রশ্নে আনন্দবাজার দাঁড়াল বিএনপির পাশে। বেঁচে গেলেন বিএনপির সাংসদ।
বিএনপির মাননীয়া রেহানা আক্তার সংসদ অধিবেশনে নির্দলীয় সরকারের দাবি তুলে ধরে তাঁর আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়া কোনো চুদুর বুদুর চইলত ন।’ তাঁর ‘চুদুর বুদুর’ শব্দটি নিয়ে সরকারি দলের সাংসদদের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। চিফ হুইপ ওই শব্দের কারণে তাঁর বক্তব্যই কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান। তাঁর মতে, শব্দটি ‘অশোভন’। যদিও চিপ হুইফ নিজে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন তাও অশোভন। কথায় কথায় নিষিদ্ধ পল্লিকে টানা মনুষ্যত্ববিরোধী।
আনন্দবাজার রায় দিয়েছে: ‘চুদুর বুদুর’ গালাগালি নয়।...কলকাতার ভাষাবিদ পবিত্র সরকার ও ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক নির্মল দাস—দুজনেরই অভিমত, চুদুর বুদুর গ্রাম্য শব্দ, অশ্লীল কিছুতেই নয়।’ আনন্দবাজার আরও লিখেছে: ‘বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধানে দিব্যি জায়গা করে নিয়েছে চুদুর বুদুর। ওই অভিধানের প্রধান সম্পাদক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। ওই অভিধানে চুদুর বুদুরের তিনটি অর্থ দেওয়া হয়েছে। এক. বাড়াবাড়ি করা। সিলেট, পাবনা অঞ্চলে এই অর্থে ব্যবহার দেখা যায়। দুই. গড়িমসি। এই অর্থে ব্যবহার বেশি ময়মনসিংহে, ঢাকায়। তিন. এক ধরনের খেলা, যার নাম চুদুর বুদুর।’ পবিত্রবাবুর মন্তব্য, ‘এটা নিশ্চিতভাবেই অনার্য শব্দ।’ অশ্লীল না হওয়ায় সরকারি দলের সাংসদদেরও এখন আর এটি ব্যবহারে কোনো বাধা রইল না।
চুদুর বুদুর একধরনের খেলা। শিশুদের খেলা। রাজনীতিও একধরনের খেলা। তা জনগণকে নিয়ে রাজনীতিকেরা খেলেন। শিশুদের চুদুর বুদুর খেলাটি এখন বিলুপ্তির পথে; কিন্তু বাংলার মাটিতে আরও বহুদিন রাজনীতির চুদুর বুদুর চলবে।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।