শ্রদ্ধাঞ্জলি

তাঁদেরই একজন শরীফ ইমাম

শরীফ ইমাম
শরীফ ইমাম

১৯৭১ সালে আমরা অর্জন করি একটি মানচিত্র, একটি পতাকা, বাংলাদেশ নামের স্বাধীন ভূখণ্ড। দীর্ঘ নয় মাস এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সঙ্গে এমন কিছু মানুষ নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন, যাঁরা পর্দার অন্তরালে থেকেই অসামান্য ভূমিকা পালন করে গেছেন। তাঁদেরই একজন শরীফ ইমাম।
৩০ অক্টোবর, ১৯২৭ সালে জন্ম নেওয়া এই ক্ষণজন্মা মানুষটি ছিলেন স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে এ দেশের প্রকৌশল জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৯৪৮ সালে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, শিবপুর, কলকাতা থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং (সিভিল) পাস করে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ সরকারের ‘কমিউনিকেশন অ্যান্ড বিল্ডিং’ পরিদপ্তরের ডিজাইন বিভাগে যোগ দেন। আধুনিক স্থাপত্য নকশার ক্ষেত্রে তিনি তাঁর বিভাগে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কর্মকর্তা হিসেবে গণ্য হন। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৮ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে ‘দি ইঞ্জিনিয়ারস লিমিটেড’-এ যোগ দেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ‘দ্য ইস্ট পাকিস্তান কনসালট্যান্টস’-এ কর্মরত ছিলেন।

পেশাগত জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনেও শরীফ ইমাম ছিলেন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। স্বামী শরীফ ইমামের অনুপ্রেরণার কারণেই স্ত্রী জাহানারা ইমাম শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে সমাজের সর্বত্র নিজেকে বিকশিত করতে পেরেছিলেন। বাবা হিসেবেও ছিলেন অত্যন্ত বন্ধুবৎসল। দুই ছেলেকে নিজে পড়াতেন। তাঁর সুযোগ্য পরিচালনায় গড়ে ওঠে তরুণ রুমীর ব্যক্তিত্ব, মেধা ও দেশপ্রেম।

একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধ দারুণভাবে নাড়া দিয়েছিল এই বিবেকবান এবং দেশপ্রেমিক মানুষটিকে। তাই তো তিনি তাঁর পেশাগত জীবনের জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগান সে সময়। শরীফ ইমাম এবং তাঁর বন্ধু ও সহকর্মী বাঁকা সাহেব মিলে অক্লান্ত পরিশ্রম করে সারা দেশের ব্রিজ ও কালভার্টের তালিকা এবং ড্রয়িং করে পাঠিয়েছিলেন সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের কাছে। এর ফলে খালেদ মোশাররফ রেকি না করিয়েই শুধু ম্যাপ দেখে অপারেশনে পাঠাতেন তাঁর যোদ্ধাদের। এই তালিকা জোগান দেওয়ার ক্ষেত্রে শরীফ ইমাম বিচক্ষণতার পরিচয় দেন। পাশাপাশি তাঁর বাসভবন ‘কণিকা’ ছিল গেরিলা যোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ১৯৭১ সালের ২৫ আগস্ট ধানমন্ডিতে সফল অপারেশন সেরে আসা রুমী ও তাঁর সহযোদ্ধাদের অস্ত্রশস্ত্র নিজ বাসভবনে লুকিয়ে রাখার ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন শরীফ ইমাম। ১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট মধ্যরাতে দুই পুত্র রুমী, জামী এবং অন্য পুরুষ সদস্যদের সঙ্গে শরীফ ইমামকেও ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি বাহিনী। অমানুষিক নির্যাতনের পর ৩১ আগস্ট রুমী ছাড়া অন্যদের ছেড়ে দেয় পাকিস্তানি বাহিনী। রুমীকে উদ্ধার করার জন্য বন্ধু বাঁকা ও ফকির মার্সি পিটিশনের কথা বললেও দৃঢ়চেতা ও প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শরীফ ইমাম তাতে রাজি হননি। পরিণতি জানা থাকা সত্ত্বেও ছেলের জীবনের চেয়ে ছেলের আদর্শ এবং আত্মসম্মানকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার জন্য পুত্র বিসর্জন এবং পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন, অপমান সহ্য করে স্তব্ধ হয়ে যান তিনি, কিন্তু তার পরও সরে আসেননি তাঁর কর্তব্যবোধ থেকে।

বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসেও চূড়ান্ত বিজয় দেখে যেতে পারলেন না শরীফ ইমাম। ১৩ ডিসেম্বর হূদেরাগে আক্রান্ত হয়ে পাড়ি জমান না-ফেরার দেশে। প্রয়াণ দিবসে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

মইন উল আলম: সহযোগী তত্ত্বাবধায়ক, শহীদজননী জাহানারা ইমাম স্মৃতি জাদুঘর।