মতামত

মহামারি মোকাবিলায় কাদা–ছোড়াছুড়ি বন্ধ করতেই হবে

দেড় বছর ধরে এক দুঃসহ মহামারি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। এই দেড় বছরে বহু মৃত্যু আমাদের দেখতে হয়েছে। এখনো হচ্ছে। মহামারি এখনো শেষ হয়ে যায়নি এবং সে কারণেই এটি মোকাবিলা থেকে নিজেদের সরিয়ে আনার সময়ও হয়নি।

গোড়াতে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়েছিল, চীনের উহান শহরের একটি সামুদ্রিক মাছ ও প্রাণীর বাজার থেকে করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে। ধারণা করা হয়েছিল, সেখানকার বাজারে বিক্রি হওয়া বাদুড়ের দেহ থেকে ভাইরাসটি প্রথম মানুষের দেহে প্রবেশ করে। কিন্তু পরে বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করতে শুরু করেন, উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি নামের একটি গবেষণাগার থেকে এই ভাইরাস দুর্ঘটনাক্রমে ছড়িয়ে পড়ে। দুর্ঘটনাজনিত কারণে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে—এমনটা সন্দেহ করার অনেকগুলো কারণ আছে। যেমন যেখানে প্রথম মানবদেহে এই ভাইরাস ধরা পড়ে তার খুব কাছেই এই ল্যাবরেটরির অবস্থান; প্রথম সংক্রমণের শিকার হওয়া এলাকাটিতে বাদুড়ের উপস্থিতি ব্যাপক; আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানীদের ওই অঞ্চলে চীন সরকারের ঢুকতে না দেওয়া—ইত্যাদি। মার্কিন প্রশাসন প্রথম থেকেই এসব কারণ ভালোভাবে খতিয়ে দেখার কথা বলে এসেছে। তবে সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কোভিড-১৯–এর উৎপত্তিস্থল খুঁজে বের করতে মার্কিন গোয়েন্দাদের তৎপরতাকে আরও বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। যদি শেষ পর্যন্ত ল্যাব থেকে এই ভাইরাস ছড়ানোর ভাষ্য সর্বমহলে প্রতিষ্ঠা পায়, তাহলে তা বিশ্বদরবারে চীনের ভাবমূর্তির ব্যাপক ক্ষতি করবে এবং চীনের অভ্যন্তরে দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব মারাত্মক সমস্যার মুখে পড়বে।

এই মহামারিকে সামাল দেওয়ার বিষয়ে একেকটি দেশের সাফল্য–ব্যর্থতাকে ওই সংশ্লিষ্ট দেশের রাজনৈতিক সাফল্য-ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়েছে। রাশিয়া, ব্রাজিল, মেক্সিকো এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রশাসন তুলনামূলকভাবে কোভিড মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছেন।
সে তুলনায় তাইওয়ান, নিউজিল্যান্ড, ভিয়েতনাম এবং জো বাইডেনের যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে ভালো করেছে।

এর মধ্য দিয়ে মোটা দাগে বলা যায়, জনতুষ্টিবাদী নেতারা কোভিড মোকাবিলা ভালোভাবে করতে পারেননি। এর কারণ, অনুগত জনগণের সমর্থন যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য তারা বিরোধীদের জনস্বাস্থ্য ইস্যুকে এড়িয়ে গেছেন। তাঁদের বিভাজনমূলক ও বর্ণবাদী আচরণের কারণে কোভিড-১৯ মোকাবিলা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপের অনেক দেশকে প্রথম দিকে করোনা নিয়ন্ত্রণে সফল মনে হয়েছিল, কিন্তু এখন তারা বেকায়দায় পড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং কন্টাক্ট ট্রেসিং খুব জরুরি। কিন্তু এগুলো অপর্যাপ্ত ব্যবস্থা।

এই মহামারি দেখিয়ে দিয়েছে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ইস্যু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই বিষয়টি চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি অনুধাবন করতে পেরেছে। বলা হচ্ছে, আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় যত মানুষ মারা গেছে বলে জানানো হচ্ছে, আদতে কোভিডে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা তার চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি। অনেক দেশ, বিশেষ করে চীন প্রকৃত সংখ্যা সবচেয়ে বেশি গোপন করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। সবচেয়ে আক্ষেপের বিষয় হলো, করোনাজনিত এই মহামারি এখন যতটা না স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এই ইস্যুতে যেন মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। বাইডেন করোনাভাইরাসের উৎপত্তিস্থল দ্রুত খুঁজে বের করতে মার্কিন গোয়েন্দাদের নির্দেশ দেওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই চীন যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতার বিষয়ে সন্দিগ্ধ হয়ে পড়েছে। এটি দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। এ ছাড়া টিকা নিয়েও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্ক বিষিয়ে উঠছে। কোন দেশ কাকে টিকা দেবে না দেবে, সেটি নিয়ে চলছে রাজনীতি ও কূটনীতি। কিন্তু সেটি দিন শেষে সাধারণ মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

এই অবস্থা থেকে বিশেষ করে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে বেরিয়ে আসতে হবে। না হলে এশিয়া ও আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলো তাদের বিরোধের শিকার হবে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

l রিচার্ড এন হাস কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের প্রেসিডেন্ট