মাহে রমজান কর্মচারীদের থেকে কাজের বোঝা কমিয়ে দেওয়ার মাস। খেটে খাওয়া পরিশ্রমী মানুষ ও বিভিন্ন ধরনের শ্রমিকের পক্ষে রোজা রেখে পরিপূর্ণভাবে কাজ সম্পাদন যে কত কঠিন, তা মালিকপক্ষের অনুভব করা দরকার। যেসব শ্রমিক দৈহিক পরিশ্রম করে রুজি-রোজগার বা আয়-উপার্জন করে, তাদের জন্য রোজা অবস্থায় দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের বিষয়টি উপলব্ধি করে অধীনস্থ কর্মচারী এবং চাকর-বাকরদের দায়িত্ব ও কাজকর্ম হালকা করে দেওয়া ইসলামের বিধান। রমজান মাসে তাদের ওপর কষ্টকর সাধ্যাতীত কাজের বোঝা চাপানো সম্পূর্ণ অনুুচিত, এটা অমানবিক বটে। কারণ, তারাও রোজাদার, রোজা রেখে তারা অধিক কষ্টসাধ্য কাজ করলে বেশি ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত হয়ে পড়বে। তাই মাত্রাতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপিয়ে যাতে তাদের অধিক কষ্ট দেওয়া না হয়, সেদিকটি অবশ্যই মানবিক বিবেচনায় রাখতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এ মাসে (রমজানে) যাঁরা দাস-দাসীদের প্রতি সদয় ব্যবহার করেন, অর্থাৎ তাদের কাজের বোঝা হালকা করেন, আল্লাহ তাঁদের দয়াপরবশ হয়ে ক্ষমা করে দেন এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেন।’
ইসলাম ধনী-গরিব, মনিব-চাকর, মালিক-শ্রমিকের কোনো পার্থক্য করে না। ন্যায়নীতির ধর্ম ইসলামের বিধানমতে, মালিক নিজে যা খাবে ও পরবে, অধীনস্থ কাজের লোকদের তা-ই খাওয়াবে ও পরাবে। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের ভাইদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। অতএব, যার অধীনে কোনো ভাই থাকে তাকে তা-ই খাওয়াবে যা সে নিজে খায়, তাকে তা-ই পরাবে যা সে নিজে পরে এবং তাকে সাধ্যের অধিক কাজ চাপিয়ে দেবে না। অগত্যা তাকে দিয়ে যদি কোনো কষ্টের কাজ করাতে হয়, তাহলে তাকে সাহায্য করবে।’ (বুখারি ও মুসলিম)
সাহাবায়ে কিরাম নবীজির আদেশ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করেছেন এবং অন্যকেও পালনে উদ্বুদ্ধ করেছেন। কিন্তু বাস্তবে ঘাম ঝরানো শ্রমিকের প্রতি মালিক শ্রেণীকে সামান্যতম সহানুভূতি প্রদর্শন করতে দেখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে যেন রমজান মাসে তাদের আরও রুদ্রমূর্তি হয়ে আবির্ভূত হতে দেখা যায়। রোজাদার শ্রমিকদের কাছ থেকে অন্য সময়ের মতোই কড়ায়-গন্ডায় শ্রম আদায় করার জন্য কঠোরতা দেখালে, রোজা রাখার কারণে তপ্ত দুপুরে প্রচণ্ড খরতাপে যখন সে হাঁপিয়ে ওঠে এবং দায়িত্ব পালনে ত্রুটি হয়, তখন তার প্রতি চাপ প্রয়োগ ও দুর্ব্যবহার করলে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের দিনগুলোতে মালিকপক্ষের ক্ষমা নয়, বরং কঠোর শাস্তিই নিশ্চিত হবে। অপরদিকে শ্রমিক যদি রোজা রাখা সত্ত্বেও সাধ্যমতো কর্তব্য পালনে সচেষ্ট হয়, তাহলে সে সাধারণ কেউ রোজা রেখে যে সওয়াব পাবে তার দ্বিগুণ সওয়াব পাবে। কারণ, অধীনস্থ কর্মচারী, শ্রমিক শ্রেণী ও খেটে খাওয়া লোকদের পুরস্কারের কথা রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘তিন ধরনের লোকের জন্য দ্বিগুণ সওয়াব রয়েছে। তন্মধ্যে এক ব্যক্তি হচ্ছে ওই শ্রমিক যে আল্লাহর হক ও মনিবের হক উভয় আদায় করে।’ এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যারা কাজ করে তাদের জন্য কতই না চমৎকার প্রতিদান।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৬)
গৃহভৃত্য ও পরিচারিকারাও যে আল্লাহর বান্দা, রমজান মাসে যেন লোকেরা সেসব কথা ভুলে যায়। ফলে তাদের খাটুনির মাত্রা বেড়ে যায়। অথচ নবী করিম (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘তোমরা মাহে রমজানে দাস-দাসীর কাজকর্ম শিথিল করে দাও। তারা যেন রমজান মাসের ইবাদত যথাযথভাবে করতে পারে।’ মহানবী (সা.) ক্রীতদাসদের কষ্ট নিজে ভাগ করে নিতেন। বিপদে-আপদে তাদের পাশে দাঁড়াতেন। কোনো ক্রীতদাসের অসুস্থতার খবর শুনলে নবীজি ছুটে যেতেন এবং তার সেবা-শুশ্রূষা করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনের শেষ মুহূর্তটি পর্যন্ত দাস-দাসীদের কথা স্মরণ রেখেছিলেন। হজরত আলী (রা.) বলেছেন যে নবী করিম (সা.)-এর সর্বশেষ বাণী ছিল, ‘১ নামাজ-নামাজ, আর ২. যারা তোমাদের অধীনে তাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো।’ (আদাবুল মুফরাদ)
প্রকৃত রোজাদার মুমিন ব্যক্তি সদা আল্লাহর প্রতি দায়িত্বশীল এবং মানুষের প্রতি কর্তব্যপরায়ণ থাকেন। মানুষের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট থাকাই ইমানদারের দায়িত্ব। গৃহে যেসব কাজের লোক রয়েছে, তাদের প্রতিও তার অধিকার রয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে তাদের এ ন্যায্য অধিকার আদায় করতে হবে। কোনো রোজাদার এ ব্যাপারে শৈথিল্য দেখাতে পারেন না। মালিক শ্রেণীর সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে অফিস-আদালতের মতো শ্রমিকের কর্মঘণ্টা কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পারিশ্রমিক ও বেতন-ভাতা মিলিয়ে যেন মাহে রমজানে তাদের রুটি-রুজির যথাযথ ব্যবস্থা হয়। যে রোজাদার ব্যক্তি তার অধীনস্থ কাজের লোকদের প্রতি সদ্ব্যবহার দেখাবে, আল্লাহ তার প্রতি অসীম দয়ার হাত প্রসারিত করবেন এবং তাকে বেহেশত দান করবেন। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যার মধ্যে তিনটি গুণ থাকবে, আল্লাহ তার ওপর রহমতের ডানা প্রসারিত করবেন এবং তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। ১. দুর্বলের সঙ্গে নম্র ব্যবহার, ২. পিতা-মাতার সঙ্গে মমতা জড়ানো কোমল ব্যবহার এবং ৩. দাস-দাসীর প্রতি সদাচরণ।’ (তিরমিযী)
সাধারণত কাজের লোকদের মানুষ খুব কমই ক্ষমা করে থাকে। নিজের ছেলেমেয়ের হাত দিয়ে মূল্যবান জিনিসটি খোয়া গেলে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করে না, আর ওই গৃহস্থালি শিশুশ্রমিক বা কাজের ছেলেমেয়ের হাত দিয়ে সামান্য কিছু নষ্ট হলেই শুরু হয় বেদম প্রহার বা নির্যাতন। অসুখের কারণে কাজ না করতে পারলে তাদের বকুনিও শুনতে হয়। কাজের লোক বলে তাদের কামনা-বাসনা নেই, বিশ্রামের প্রয়োজন নেই, রোগব্যাধি নেই—এমন ধারণা ইসলামসম্মত নয়। নবী করিম (সা.) এজাতীয় দুর্ব্যবহার থেকে উম্মতকে বিরত থাকার জন্য কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। অধীনস্থ লোকদের প্রতি সদ্ব্যবহার করা হচ্ছে না বলেই সমাজে মালিক-শ্রমিক ব্যাপক বৈষম্য বিদ্যমান রয়েছে, যা সভ্য সমাজের জন্য মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং সর্বাবস্থায় কঠোরতা পরিহার করে রোজাদারদের আচার-ব্যবহারে ইসলামের সদাচরণ, ক্ষমা, উদারতা ও কোমলতার মহৎ গুণাবলির বহিঃপ্রকাশ একান্ত বাঞ্ছনীয়।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: চেয়ারম্যান, ইসলামিক স্টাডিজ ও দাওয়াহ বিভাগ, ধর্মবিজ্ঞান অনুষদ, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
dr.munimkhan@yahoo.com