
মাত্র মাস ছয়েকের ব্যাপার। হাতিরঝিল প্রকল্প নিয়ে অনেকটা আশাভঙ্গের পরিস্থিতিই যেন তৈরি হতে চলেছে। এর সড়কগুলো ধরে যাঁরা নিয়মিত যাতায়াত করেন, তাঁরা বুঝতে পারছেন, দিনে দিনে অবস্থা খারাপের দিকেই যাচ্ছে। আগাম বর্ষার কারণে সেখানে লাগানো গাছগুলো কিছুটা সবুজ ও চাঙা হয়ে উঠেছে, এটাই একমাত্র স্বস্তি। ওভারপাস ও এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে বাধাহীনভাবে গাড়ি চলবে—এমনই তো প্রতিশ্রুতি, কিন্তু বাস্তবে এখন নিয়মকানুনের কোনো বালাই নেই। যে যাঁর মতো গাড়ি চালাচ্ছেন, চলছে উল্টো পথে গাড়ি, দেখার কেউই নেই। দুর্ঘটনা, বিশৃঙ্খলা—সবই সেখানকার নিয়মিত ঘটনা। জলাশয়গুলোর পানি এখনো আগের মতোই নোংরা। লেকের পাশ ঘেঁষে সুয়ারেজের যে পাইপ ও বক্স রয়েছে, সেগুলোর বেশ কয়েকটি দিয়ে নোংরা পানি লেকে পড়ছে। নানা স্থানে খোঁড়াখুঁড়ি ও নির্মাণকাজ চলছে। হাতিরঝিল প্রকল্পের এখনকার এই বিবর্ণ দশা নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখিও শুরু হয়েছে।
তবে আমরা সবাই এটা জানি যে এই প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি। এর আগে হাতিরঝিল নিয়ে এতটা হতাশ হওয়ার সুযোগ আছে কি? আগামী ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন জানা যাচ্ছে, আগামী জুন পর্যন্ত এর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। তার মানে কাজ শেষ হতে আরও পুরো এক বছর সময় লাগবে। কাজ শেষ হওয়ার পর সবকিছুতে একটা শৃঙ্খলা আসবে, নিয়মকানুন কার্যকর হবে—এমন প্রত্যাশাই হচ্ছে আশার দিক। কিন্তু কোনো কিছুতে শুরু থেকেই যদি বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, তবে সেখানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সত্যিই কঠিন কাজ। পশ্চিমে সোনারগাঁও হোটেল ও কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, উত্তরে তেজগাঁও শিল্প এলাকা ও গুলশান, দক্ষিণে ইস্কাটন, মগবাজার, মধুবাগ ও উলন এবং পূর্ব দিকে প্রগতি সরণি ও বিটিভি ভবন পর্যন্ত বিশাল এলাকাজুড়ে এই প্রকল্পের বিস্তার।
মগবাজার-তেজগাঁও সড়ক, যা টঙ্গী ডাইভারশন রোড নামে পরিচিত, তা এই প্রকল্পটিকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। সোনারগাঁও হোটেল থেকে টঙ্গী ডাইভারশন রোড পর্যন্ত জলাশয়টি পরিচিত বেগুনবাড়ী খাল হিসেবে আর টঙ্গী ডাইভারশন রোডের পূর্ব দিকে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত বিস্তৃত জলাশয় পরিচিত হাতিরঝিল হিসেবে। আমরা দেখেছি যে বেগুনবাড়ী খালের উত্তর পাশ ঘেঁষে ওয়াকওয়ে ও দক্ষিণ পাশে তৈরি হয়েছে সার্ভিস রোড। অন্যদিকে টঙ্গী ডাইভারশন রোড থেকে রামপুরা পর্যন্ত একটি আধুনিক সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এখানে শুধু এক দিকে চলাচলের জন্য এক্সপ্রেসওয়ে এবং পাশাপাশি টুওয়ে সার্ভিস সড়ক তৈরি করা হয়েছে। এই সড়ক নেটওয়ার্ক মগবাজার, মধুবাগ, উলন, মহানগর প্রজেক্ট, দাসপাড়া, রামপুরা, মেরুল, বাড্ডা, গুলশান ও তেজগাঁও এলাকার লোকজনের যাতায়াতকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। এর সুফল ইতিমধ্যেই এসব এলাকার লোকজন পাওয়া শুরু করেছে। শুধু যানজট দূর নয়, পরিবেশ ও নগরের সৌন্দর্যের দিক দিয়ে দেখলেও এই প্রকল্প ঢাকা শহরের এক অনন্য স্থান হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করেছে। ঢাকা শহরের কেন্দ্রে এত বড় খোলা ও মুক্ত জায়গা আর কোথায়ই বা আছে!
শেষ পর্যন্ত হাতিরঝিল কী অবস্থায় দাঁড়াচ্ছে, তা দেখতে আমাদের আরও বছর খানেক অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু ছয় মাস আগে গত জানুয়ারিতে এটা জনগণের জন্য খুলে দেওয়ার পর যে অভিজ্ঞতা হলো, সেটা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। লেখার শুরুতেই প্রকল্পের বর্তমান বিশৃঙ্খল অবস্থার কিছু উল্লেখ আছে। আরও বিস্তারিতভাবেই বিষয়গুলো বলা দরকার, কারণ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর এলাকাটির ঠিকঠাক ব্যবস্থাপনার জন্য তা খুবই জরুরি। এই এলাকায় ঢোকা ও বের হওয়ার রাস্তাগুলো নির্দিষ্ট। যে পথে প্রবেশ, সেখান দিয়ে বের হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এখন এই নিয়মের কোনো মানামানি নেই। সোনারগাঁও হোটেল পার হয়ে কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ের সঙ্গে যুক্ত রাস্তাটি শুধুই প্রবেশের জন্য। ওই রাস্তার মাথায় একটু দাঁড়ালেই আপনি দেখবেন, অহরহ গাড়ি বের হয়ে আসছে সেই পথ ধরে। উল্টো পথে গাড়ি চালানো যে কোনো অপরাধ, তা ঢাকা শহরের এখন কেউ আর মানেন বলে মনে হয় না। ট্রাফিক পুলিশও যেন তা মেনে নিয়েছে। আমাদের চোখেও তা সয়ে গেছে। আমাদের ভয়, হাতিরঝিলও না শেষ পর্যন্ত একই পরিণতি পায়! উল্টো পথে গাড়ি চলার যে অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে, তা বদলানো যাবে তো? আর পার্কিং? বিয়াম স্কুলের বাচ্চাদের আনা-নেওয়ার গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান এখন বেগুনবাড়ী খালের দক্ষিণ দিকের সার্ভিস রোড। প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগামী এক বছর যদি এভাবেই চলতে থাকে, তবে পরে এই পার্কিং সরানো যাবে তো?
হাতিরঝিল প্রকল্পের রাস্তায় রিকশা চলার নিয়ম নেই। এখন রিকশা চলছে হরদম। ফুটপাতে চা-ফুচকার দোকান। ছুটির দিনগুলোতে ও বিকেলবেলা লোকজন ভিড় জমান হাতিরঝিলে। তাতে সমস্যা নেই, কিন্তু রাস্তা ও ব্রিজে জটলা করে যেভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন, অনেকে তাতে যানবাহন চলাচলই কঠিন হয়ে পড়ে মাঝেমধ্যে। সৌন্দর্যের জন্য নানা গাছ লাগানো হয়েছে প্রকল্প এলাকায়, কিন্তু হাঁটার পথ ছেড়ে গাছ মাড়িয়ে চলছেন অনেকে। আর যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলার সেই পুরোনো অভ্যাস তো আমাদের রয়েছেই। নির্দিষ্ট সংযোগ সড়ক ছাড়া পুরো প্রকল্প দেয়াল দিয়ে ঘেরা থাকার কথা। কোনো বাসা বা ভবনের গেট হাতিরঝিলের সড়কে হওয়ার কথা নয়। অনেক বাড়ি থেকেই গেট করা হয়েছে, দেয়াল ফুটো করে ভেতরে দোকানে যাওয়ার পথ করা হয়েছে। এখানেও ভয়, ঢাকার অন্যান্য এলাকার মতো হাতিরঝিলে রাস্তার দুই পাশ না আবার দোকানে ভরে ওঠে, ফুটপাতগুলো দখল হয়ে যায়, রাস্তা হয়ে যায় পার্কিংয়ের জায়গা!
কী উদ্দেশ্য নিয়ে হয়েছে হাতিরঝিল প্রকল্প? প্রথমত, প্রকল্পের আশপাশের এলাকার বৃষ্টির পানি ধারণ ও বন্যা প্রতিরোধে বেগুনবাড়ী খাল ও হাতিরঝিল এলাকার নিচু অঞ্চল খনন, উন্নয়ন ও রক্ষা করা। দ্বিতীয়ত, প্রকল্প এলাকার বর্জ্য-পানি পরিকল্পিত সুয়ারেজ লাইন দিয়ে প্রবাহিত করে সমগ্র এলাকার পরিবেশ উন্নয়ন ও ঝিলের পাড় অবৈধ দখল থেকে রক্ষা ও আশপাশের এলাকার যানজট দূর করা। তৃতীয়ত, জলাশয় রক্ষা ও প্রকল্প এলাকার আশপাশের যানজট দূর করতে হাতিরঝিল এলাকার চারদিকে সড়কসেতু ও ওয়াকওয়ে তৈরি করা। উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকার কথা নয়, আর মূল কাজও শেষ হয়ে এসেছে। তবে হাতিরঝিলের পানি পরিষ্কার রাখা ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে যে সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেটা বড় উদ্বেগের বিষয়। এ ব্যবস্থায় এরই মধ্যে বড় ধরনের সমস্যা ধরা পড়েছে। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বিবেচনায় নিলে এই ত্রুটি সারাতেই হবে। এই ত্রুটি দূর করেই আগামী জুনের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে, সেটাই আমাদের আশা। এ অবস্থায় এখন সবচেয়ে বড় বিবেচনার বিষয় হচ্ছে ভবিষ্যতে প্রকল্প এলাকার ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ।
স্থপতি ইকবাল হাবিব এই প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা দেখভালের জন্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বা পরিষদের প্রস্তাব করেছিলেন সরকারের কাছে। আমরা জেনেছি যে সেই প্রস্তাবটি গৃহীত হয়েছে। একটি পর্যবেক্ষণ ও একটি ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে প্রকল্প এলাকার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ পরিচালিত হবে। এ কার্যক্রম পরিচালনা ও এ জন্য যে লোকবলের প্রয়োজন হবে, তার একটি আর্থিক দিক রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনার একটি আর্থিক হিসাবও করেছেন ইকবাল হাবিব। তিনি জানালেন, প্রাথমিকভাবে আগামী পাঁচ বছর এ জন্য প্রয়োজন পড়বে প্রায় ৪৮ কোটি ১২ লাখ টাকা। প্রথম বছরের খরচ আট কোটি ৮৬ লাখ টাকা। প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে বা কোথা থেকে আসবে এই অর্থ। প্রকল্পকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও ‘আয় থেকে ব্যয়’—এমন ভাবনাই কাজ করছে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে। প্রকল্প এলাকার মধ্য দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের কাছ থেকে টোল আদায়, নিয়মিত যাঁদের বাহন এই পথ দিয়ে যাবে, তাঁদের কাছে মেয়াদি স্টিকার বিক্রির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ, ওয়াটার ট্যাক্সি, পার্কিংয়ের টোল, সার্কুলার বাস, বাইক ভাড়া, ভাসমান রেস্তোরাঁ, শিশুদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা, বোট ক্লাব, রোপওয়ে—এসব কিছুর মাধ্যমে আয়ের চিন্তাভাবনা চলছে।
প্রকল্পের বর্তমান দশা যে দুর্ভাবনার পরিস্থিতি তৈরি করেছে তা ‘সমন্বিত ব্যবস্থা কমিটি’ বা পরিষদের মাধ্যমে দূর হবে, সেটাই আমাদের আশা। তবে আয়ের পথ হিসেবে যা করার কথা ভাবা হচ্ছে, সেগুলো বাস্তবায়নের আগে আরও চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন বলেই মনে হয়। কারণ, প্রকল্পের ভেতরে এত আয়োজন যদি যানবাহনের অবাধ চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করে, যানজট সৃষ্টি করে, তবে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com