সরল গরল

'না-পাকিস্তান' 'না-বাংলাদেশ'

একাত্তরে জামায়াত নিষিদ্ধের মার্কিন তারবার্তা
একাত্তরে জামায়াত নিষিদ্ধের মার্কিন তারবার্তা

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য আমি অপেক্ষা করব দুটি বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য। হাইকোর্টে শুনানিকালে এই দুটি বিষয় আদৌ আলোচিত হয়েছিল কি না, জানা নেই। তবে জামায়াত যখন আপিল করেছে, তখন আশা করা যায় আমরা আপিল বিভাগে এর ওপর আরও আলোচনার সুযোগ পাব। এর একটি হলো, মুজিবনগর সরকারে জামায়াত নিষিদ্ধ হয়েছিল। অন্যটি হলো, জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদীর দর্শন। সেটি হলো, জনগণের সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করা। মওদুদী বাংলাদেশ সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ মানেন না। এর অর্থ হলো, মুখে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের কথা বলে প্রকারান্তরে মওদুদীর সংজ্ঞায়িত রাষ্ট্রব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া। মওদুদীর ভাষ্য অনুযায়ী পার্লামেন্টের সব সদস্য হবেন মুসলিম। সেখানে অমুসলিমদের জায়গা নেই।
বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাস এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা জামায়াতের সঙ্গে মাঝেমধ্যে আলোচনা করেন। মার্কিনদের প্রশ্ন করলে তাঁরা বলেন, রাজনীতি করা প্রত্যেকের গণতান্ত্রিক অধিকার। আইনজীবী আবদুর রাজ্জাকও বলেছেন, হাইকোর্টের রায় মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। এবার সংখ্যাগরিষ্ঠের রায় এসেছে, তা নিয়ে মাথা গরম না করে ধীরেসুস্থে একটা জাতীয় বিতর্কের প্রস্তুতি আমাদের নিতে হবে।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে বাংলাদেশের বিজয় দিবসের মাত্র পাঁচ দিন আগে জামায়াতে ইসলামীকে মুজিবনগর সরকার নির্দিষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছিল। শুধু জামায়াত নয়, একসঙ্গে চারটি রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়েছিল। অন্য তিনটি হলো, পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম। কলকাতার মার্কিন কনসাল জেনারেল হার্ব গর্ডন ১৪ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনে পাঠানো বার্তায় বলেছিলেন, হিন্দুদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং ‘কোলাবরেশনিস্ট অ্যাকটিভিটিজ’ বা দালালি তৎপরতার দায়ে এসব সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্ম তারিখ ২৬ মার্চ। সেই সময় থেকে যত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সংবিধানমতে তা বৈধ। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ কার্যকর হলে ধর্মের নামে সব সংগঠন আপনাআপনি নিষিদ্ধ হয়ে যায়। ১৬ ডিসেম্বরের পর তাই সম্ভবত জামায়াতকে নির্দিষ্টভাবে নিষিদ্ধ করার দরকার পড়েনি। জিয়ার আমলে প্রথমে তারা আইডিএল নামে রাজনীতি করত। পরে স্বনামে আত্মপ্রকাশ করে। তবে তখন এবং পরে কখনো এটা জানা যায়নি যে মুজিবনগর সরকারের ওই সিদ্ধান্ত নির্দিষ্টভাবে বাতিল করা হয়েছিল কি না। এরপর পঞ্চম সংশোধনীর রায়ে বাহাত্তরের ৩৮ অনুচ্ছেদ পুনরুজ্জীবিত ও পঞ্চদশ সংশোধনীতে তা পুনরায় বাতিল করা হলে জামায়াতের আইনি অস্তিত্ব টিকে যায়। জামায়াতকে কখনো নির্দিষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তা এত দিন জানা ছিল না। গত মার্চে এই কলামে তাই লিখেছিলাম, স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতকে কখনো নির্দিষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা যায়নি। কিন্তু এখন আমরা দেখছি যে জামায়াত নিষিদ্ধ হয়েছিল। তাই কখনো যদি মুজিবনগর সরকারের সিদ্ধান্ত বাতিল না হয়ে থাকে, তাহলে তা জামায়াত নিবন্ধন মামলায় তার প্রভাব কী বা কতটুকু পড়েছে বা পড়বে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। নির্বাচন কমিশনও মুজিবনগর সরকারের সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখতে পারে। কারণ, আমাদের এটা জানা নেই যে জামায়াত কখনো জামায়াত নিষিদ্ধে মুজিবনগর সরকারের ওই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছিল কি না।
জামায়াত পাকিস্তান ও ভারতে নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু তারা পুনরায় রাজনীতিতে ফিরেও এসেছে। বাংলাদেশে এবারের নিবন্ধন বাতিলের রায় জামায়াতের নেতাদের দায়িত্ব বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাঁদের ‘রাজনীতি’ পরিষ্কার করতে হবে। বাংলাদেশের জনগণের কাছে যেমন তেমনি জামায়াতের নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁদের রাজনীতি পরিষ্কার করতে হবে। জামায়াত বা তাদের মিত্রদের কারও উচিত নয়, জামায়াতকে মদদ দিতে গিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চরিত্র স্পষ্ট করার প্রক্রিয়া অহেতুক বাধাগ্রস্ত করা। জামায়াত দৃশ্যত বাংলাদেশের সংবিধান মানে। পতাকা মানে। তাদের মন্ত্রীরা পতাকা উড়িয়েছেন। অসুবিধায় পড়ে তড়িঘড়ি দলের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে ইসিতে জমা দেয়। এসবই হলো মানুষ ভোলানো রাজনীতি। এটা আমরা সতর্কতার সঙ্গে দাবি করতে পারি, তার কারণ ‘জামায়াত-ই-ইসলামী পূর্ব পাকিস্তান’ থেকে ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ এবং অধুনা ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ নাম ধারণ করলেও আমরা কখনো এটা জানতে পারি না যে তারা মওদুদীবাদে কোনো সংশোধনী এনেছে। মওদুদী তাদের আধ্যাত্মিক নেতা। তাঁর মন্ত্রই তাদের মন্ত্র। বাদবাকি কৌশলগত হিসেবে অন্তত আমরা সন্দেহ করতে পারি। তাঁরা যদি বলেন, মওদুদীবাদের সবটুকু আমরা মানি না। এটা বুঝিয়ে বললে না বোঝার কারণ নেই।
ভারতের জামায়াত মওদুদীবাদে একেবারে বুঁদ থাকেনি। থাকলেও ভারতের মাটিতে তারা মূল স্রোতোধারাকে কলুষিত হওয়ার মতো হুমকি হতে পারে না। পাকিস্তানের জামায়াত মওদুদীবাদে স্থির। বাংলাদেশের জামায়াতও তা-ই। সে কারণেই আমরা এখন থেকেই আপিল বিভাগের আসন্ন শুনানির ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছি। এখানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগের সুযোগ থাকবে।
জামায়াতকে এখন অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। তাদের রাষ্ট্রভাবনা, সংবিধান, আইনসভা গঠনভাবনা পরিষ্কার করে বলতে হবে। পরিষ্কার করা মানে মওদুদীর দর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে উপযুক্ত ব্যাখ্যা দিতে হবে। প্রশ্নটি কেবলই স্বাধীনতা বিরোধিতার জায়গা থেকেই নয়। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিকদের প্রতিবেদনগুলোতে, আমি ২৫-৩০টি পড়ার ভিত্তিতে বলছি, কখনো জামায়াতকে গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে সমীহ করেননি তাঁরা। বরং ধারাবাহিকভাবে ইসলামি মৌলবাদী হিসেবেই দেখেছেন। সব দেশেই তো মৌলবাদী দল আছে। বাংলাদেশে ক্ষতি কী? তারা কলঙ্কিত ‘জামায়াত’ নাম বদলে নিক। বাংলাদেশের সংবিধানসম্মত দলীয় সংবিধান তৈরি করে নির্বাচন কমিশনে জমা দিক। ১৯৭২ সালের পরে পাকিস্তানি জামায়াতের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশ বিরোধিতারও একটা ব্যাখ্যা তাদের দিতে হবে। সেটা জামায়াতের নতুন প্রজন্ম আগে চাইলে সবচেয়ে ভালো।
১৯৫৬ সালের ১৭ জুলাই পাকিস্তানের মার্কিন দূতাবাস লিখেছে, মিসরের ব্রাদারহুডের (দেশ চালাতে না পেরে মুরসি মূর্ছা খেয়েছেন, তাঁর সমর্থকেরা এখন মার খাচ্ছেন) মতোই জামায়াত ‘স্পিরিচুয়াল ব্রাদারহুড।’ ১৯৩৩ সালে হায়দরাবাদে নিজামের পৃষ্ঠপোষকতায় মওদুদী জামায়াত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৪২ সালের মাঝামাঝি কাশ্মীরের কাছাকাছি পাঠানকোটে তিনি সদর দপ্তর সরিয়ে আনেন। বহু বছর জামায়াত নামের সংগঠন মওদুদী শুধু একাই করেছেন। ১৯৪২ সালেই প্রথম তিনি দলের নির্বাচিত আমির হন। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব ও পাকিস্তান আন্দোলনের বিরোধিতা করেন কিন্তু সেটা কংগ্রেসের বিরোধিতার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা কারণে। জামায়াতের সার্বভৌমত্বে কোনো সীমান্ত নেই। মুসলমানরা জার্মান, ফরাসি ও ইংরেজদের মতো কোনো জাতি নয়।
মওদুদী তাঁর মুসলিমস অ্যান্ড দ্য প্রেজেন্ট পলিটিক্যাল স্ট্রাগল বইয়ে লেখেন, মুসলিমরা কেবল জাতি নয়, তাদের জাতি হলো আদর্শগত, অনুসরণকারীদের সমষ্টি হলো জাতি। তোমাদের পাকিস্তান যদি জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সেটা হবে ‘না-পাকিস্তান’। মুসলিম জাতীয়তাবাদ আল্লাহর চোখে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মতোই অভিশপ্ত।
কূটনীতিক লিখেছেন অথচ দেশভাগের পর মওদুদী ‘জামায়াত-ই-ইসলামী’ নামে দল শুরু করেন। আইনসভার সদস্য হতে মওদুদী যোগ্যতা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তাঁর মতে, মুসলিম আইনসভায় কেবল মুসলিমরাই ভোট দিতে পারবেন। একজন সংসদ সদস্য হতে মওদুদী চারটি যোগ্যতা ঠিক করে দিয়েছেন। মুসলিম হবেন। পুরুষ হবেন। মানসিকভাবে সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক হবেন। এ ছাড়া ইসলামি আইনে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাই কেবল সাংসদ হবেন। রাষ্ট্রপ্রধানও হবেন মুসলিম এবং তাঁকেও পুরুষ হতে হবে। মওদুদীর পুরো দর্শন সংখ্যালঘু ও নারীবিদ্বেষী, শাহ আহমদ শফীর সঙ্গে তাঁর অনেক মিল। গোলাম আযম ভাষাসৈনিক হিসেবে কৃতিত্ব চান। কিন্তু বাঙালি বা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে মওদুদীর বিশ্বাসহীনতা নিয়ে তাঁকে কখনো আক্ষেপ করতে শুনিনি। আমরা মনে রাখব, জিয়া সংবিধানে যা করেছিলেন এবং তাঁর প্রবর্তিত যেটুকু মুছে দেওয়া হয়েছে বলে বিএনপি বিরোধিতা করছে, সেটা কিন্তু মওদুদীর দর্শন।
আদালতের শুনানিতে নির্বাচন কমিশন মওদুদীর আইনসভা নিয়ে কোনো বক্তব্য দেয়নি। নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে এটা জানতে চাওয়া যে মওদুদীর এই দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে বাংলাদেশ জামায়াতের অভিমত কী। তবে সরকারপক্ষের আইনজীবীদের আচরণ বড়ই উদ্বেগজনক। গতকাল রায়ের পরে তাঁরা আওয়ামী লীগের নেতাদের সুরে সুর মিলিয়ে অসত্য ব্যাখ্যাদানের প্রবণতা দেখিয়েছেন। জনমনে ধারণা দিয়েছেন যে এই রায়ের ভিত্তিতে বুঝি জামায়াতকে নির্বাচনে অযোগ্য করা যাবে। অথচ তা নয়। বিভক্ত রায় সম্ভবত ইঙ্গিতবহ নির্দেশক যে সমাজও জামায়াত প্রশ্নে বিভক্ত। এই রায়দানকারী বিচারকেরা এ আমলেই নিয়োগপ্রাপ্ত এবং ভিন্নমত পোষণকারীর নাম প্রকাশ না করা বিচারিক রেওয়াজের বিচ্যুতি। ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট জামায়াত নিষিদ্ধের বিপক্ষে যে রায় দিয়েছিলেন, সেটা যে ৪৯ বছর পরেও সহজে ওল্টানোর বস্তু নয়, সেটা বোঝা গেল। কারণ, তিন বিচারক একমত যে এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন জড়িত। তাই তাঁরা ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সর্বসম্মতভাবে সার্টিফিকেট ইস্যু করেছেন। জামায়াত এবারে তাই আদালতের অনুকম্পা নয়, সাংবিধানিক ‘অধিকার’বলে আপিল করেছে। সে কারণে আপিল বিভাগই ভরসা। তাঁরাই শেষ কথা বলবেন।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com