‘আল–আকসা’ মসজিদ মুক্তির লক্ষে্য সমগ্র মুসলিম উম্মাহ প্রতিবছর রমজান মাসের শেষ শুক্রবার ‘আল–কুদস’ দিবস পালন করে
‘আল–আকসা’ মসজিদ মুক্তির লক্ষে্য সমগ্র মুসলিম উম্মাহ প্রতিবছর রমজান মাসের শেষ শুক্রবার ‘আল–কুদস’ দিবস পালন করে

মাহে রমজান

আজ আল–আকসা রক্ষার প্রত্যয় ঘোষণার দিন 

রমজান মাসের শেষ শুক্রবার বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা ‘আল কুদস দিবস’ পালন করেন। দিনটি মূলত ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও জেরুজালেমের পবিত্র মসজিদুল আকসা রক্ষার আহ্বানের প্রতীক। মুসলিম বিশ্বের কাছে এটি কেবল একটি রাজনৈতিক দিবস নয়, বরং ধর্মীয় অনুভূতি, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং ন্যায়বিচারের দাবির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

আল কুদস তথা ‘মসজিদুল আকসা’ ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে পবিত্র ভূমিতে অবস্থিত মসজিদ, যা ‘বায়তুল মুকাদ্দাস’ নামে সুপরিচিত। ‘কুদস’ অর্থ পবিত্র। বায়তুল মুকাদ্দাস তথা মসজিদুল আকসা মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত। প্রিয় নবীজি (সা.) মিরাজের রাতে প্রথমে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা তথা বায়তুল মুকাদ্দাস সফর করেন, যা ‘ইসরা’ নামে অভিহিত। (সুরা-১৭ ইসরা, আয়াত: ১)

হজরত ইব্রাহিম (আ.) কর্তৃক পবিত্র কাবাঘর নির্মাণের ৪০ বছর পর, তাঁর দ্বিতীয় পুত্র হজরত ইসহাক (আ.)–এর সন্তান হজরত ইয়াকুব (আ.) ফিলিস্তিনের জেরুজালেম নামক স্থানে ‘আল–আকসা’ মসজিদটি নির্মাণ করেন। এরপর তাঁর পুত্র হজরত ইউসুফ (আ.)–এর বংশধর হজরত দাউদ (আ.)–এর সন্তান হজরত সুলাইমান (আ.) তা পুনর্নির্মাণ করেন। তিনি রমজান মাসের শেষ শুক্রবার জেরুজালেম নগর উদ্বোধন করেন। মানবজাতির প্রথমে কিবলা ‘কাবা’ শরিফ হলেও মসজিদুল আকসা বা বায়তুল মুকাদ্দাস নির্মাণের পর এটি কিবলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। 

ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে মসজিদুল আকসা মুসলমানদের কিবলা ছিল। মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরতের প্রায় দেড় বছর পর্যন্ত মুসলমানরা এই দিকেই মুখ করে নামাজ আদায় করতেন। পরে কিবলা পরিবর্তন হয়ে আবার কাবার দিকে নির্ধারিত হয়। এই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে মদিনায় মসজিদে কিবলাতাইন আজও বিদ্যমান।

হজরত ওমর (রা.)–এর খিলাফতকালে ৬৪৮ সালে বায়তুল মুকাদ্দাস, জেরুজালেমসহ পুরো ফিলিস্তিন সম্পূর্ণভাবে মুসলমানদের অধিকারে আসে। ১০৯৬ সালে খ্রিষ্টান ক্রুসেডাররা সিরিয়া ও ফিলিস্তিন জবরদখল করেন। ১১৮৭ সালে মুসলিম বীর সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি (রহ.) পুনরায় জেরুজালেম মুসলমানদের অধিকারে নিয়ে আসেন। এর পর থেকে উগ্র খ্রিষ্টান ও ইহুদি চক্র ফিলিস্তিনে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র করতে থাকে। 

এ অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য ইহুদিরা তৎকালীন তুর্কি সালতানাতের শাসক আবদুল হামিদ (রহ.)–এর কাছে ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপনের অনুমতি চায়; দূরদর্শী সুলতান তাদের এ দুরভিসন্ধিমূলক প্রস্তাবে রাজি হননি। 

১৯১৭ সালে ইংরেজরা ফিলিস্তিনে অনুপ্রবেশ করে এবং ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে; অল্প সময়ের মধ্যে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে। ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে ইহুদির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানদের সঙ্গে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দাঙ্গা ঘটতে থাকে। ১৯৪৮ সালের ১৫ মে বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে জায়নবাদী অবৈধ ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষিত হয়। তখন থেকে মুসলমানদের প্রতি ইহুদিদের জুলুম, নির্যাতন ও অত্যাচারের মাত্রা বাড়তে থাকে, যা আজও চলছে। ১৯৬৭ সালে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরায়েল মসজিদুল আকসা জবরদখল করে। এর পর থেকে মুসলিম জনগণ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ সূচনা করে। 

১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ ও ১৯৭৩ সালের রমজানের যুদ্ধের পর অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। ১৯৭৮ সালে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে অধিকৃত ফিলিস্তিন ও নিপীড়িত ও বাস্তুচ্যুত মুসলিম জনগণের অবস্থা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। 

ফিলিস্তিনের এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ১৯৭৯ সাল থেকে প্রতিবছর রমজান মাসের শেষ শুক্রবার আল কুদস দিবস পালনের প্রথা চালু হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই দিনে সমাবেশ, আলোচনা ও সংহতি কর্মসূচির মাধ্যমে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার দাবিকে স্মরণ করা হয়। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো মসজিদুল আকসার মর্যাদা রক্ষা, ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া। 

রমজানের শেষ শুক্রবার পালিত আল কুদস দিবস তাই বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের কাছে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি প্রকাশের একটি প্রতীকী দিন হিসেবে বিবেচিত হয়, যে দিনটি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় জেরুজালেমের পবিত্র ভূমি ও তার ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা।

অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী 

সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম

smusmangonee@gmail.com