পাঠকের ভাবনা

নয়-ছয় সুদহার, টাকা পাচার ও কতিপয় অসৎ ব্যাংকার

বৈশ্বিক গোলযোগের কারণে আমদানি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছেড়ে গেছে এবং বেঁধে দেওয়া নয়-ছয় সুদের হার নিয়ে বিজ্ঞজনেরা বারবার প্রশ্ন তুলছেন। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ায় বিষয়টি অনেকটা হইচইয়ের পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন হলো, কম সুদের কারণে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যাচ্ছে এবং মুদ্রাস্ফীতির রেশ টানা যাচ্ছে না। স্বল্প সুদের কারণে ব্যবসায়ীরা বেশি ঋণ নিচ্ছেন, অনেকে ঋণের টাকা পাচার করছেন, অযথা ঋণ নিয়ে খেলাপি হচ্ছেন ইত্যাদি।

প্রথমত, ৯ শতাংশ সুদ কোনোভাবেই কম সুদহার নয়। ব্যবসায়ী ভিন্ন যে বিজ্ঞজনেরা বাড়ি-ফ্ল্যাটের জন্য ৬ শতাংশ হারে ঋণ নিয়েছেন, তাঁরা শুধু জানেন বিগত পাঁচ বছরে কত টাকা সুদে-আসলে পরিশোধ করেছেন এবং আরও কত টাকা দিলে পরে ওই সুদের অক্টোপাস থেকে মুক্তি মিলবে। নামে ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ হলেও বিভিন্ন মাশুল হিসাবে নিলে তা ১১ শতাংশ ছুঁই ছুট করে। বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক আদেশ-নির্দেশ দিয়েও তা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে পারেনি। তাই তো এ স্বল্প সুদে ঋণ দিয়েও অধিকাংশ ব্যাংকের মুনাফা আগের মতোই বিদ্যমান। এরপরও রয়েছে স্ফীত ঋণের ওপর ২ শতাংশ জরিমানা সুদ, যা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো সৎ ও অপারগ গ্রাহকের ওপর ছাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

অনেক সচেতন নাগরিক মনে করেন, অনেক ব্যবসায়ী ঋণখেলাপি হওয়ার জন্য ঋণ নেন এবং টাকা পাচার করেন। আবার এটিও সত্য, ব্যাংকারদের কেউ কেউ অসৎ না হলে কোনো খারাপ গ্রাহক ঋণ নিতে পারেন না। ঘুষখোর ব্যাংকার (কিংবা মালিকপক্ষ বা রাজনৈতিক চাপে) সব সময় মন্দ গ্রাহক খুঁজে ফেরেন। দেশে আলোচিত হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটকারী নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সেই সময়ের এমডি, চেয়ারম্যান জড়িত বলে বিভিন্ন সময়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাই বলছি, ব্যাংকার অসৎ না হলে খেলাপি ঋণ ৫ থেকে ৬ শতাংশের ওপরে উঠত না।

ব্যাংকাররা জানেন কীভাবে জামানতের মূল্য বেশি দেখাতে হয় এবং কীভাবে সাজালে জাল দলিলে ঋণ পাওয়া যায়। জামানত ব্যতীত তৎকালীন গ্রামীণ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৩ থেকে ৪ শতাংশে কিংবা চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু সাহেবের আগে তৎকালীন বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের কথা ভাবুন, যেখানে মন্দ ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ শতাংশের নিচে। জানা মতে, করোনাকালে ৪ শতাংশ সুদেও অনেক ভালো গ্রাহক ঋণ নেননি। ভালো গ্রাহক জানেন, অপ্রয়োজনে ঋণ নিয়ে সুদ গোনা কোনো কাজের কাজ নয়। তাই বলছিলাম খেলাপি ঋণের জন্য মূলত দায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মন্দ ব্যবস্থাপক, এমডি ও চেয়ারম্যান। এ তিন জাগায় নিয়োগ ঠিক করতে পারলে খেলাপি ঋণের বদনাম ব্যবসায়ীদের ঘাড় থেকে অনেকাংশে নেমে যাবে। সুদের হার বাড়িয়ে ঋণপ্রবাহ কমানোর চেষ্টা করলে বিনিয়োগ-কর্মস্থান কীভাবে হবে, তা-ও তো ভাবনায় রাখতে হবে।

অনেকে মূল্যস্ফীতির রেশ টানতে মুদ্রা সরবরাহ কমাতে সুদের হার বৃদ্ধির পক্ষে মত দিচ্ছেন। তবে আমাদের মূল্যস্ফীতি তো আমদানি করা, বাজারে তেল-গম না থাকলে টাকার সরবরাহ কমালে কি ওই সমস্ত পণ্যের দাম কমবে? বরং উৎপাদন-কর্মসংস্থান কমে মানুষ আরও কষ্টে দিন যাপন করবে। সরকার দ্রুত পণ্যের মূল্য হ্রাস করতে জ্বালানির দাম কমাতে পারে, যা হবে প্রকৃতই কার্যকর। তাই বলছিলাম, বর্তমান অবস্থার জন্য সুদহার নয়, মূল্যস্ফীতি ও ঋণখেলাপির প্রকৃত কারণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন।

নুরুল আমিন
শিল্পোদ্যোক্তা
ঢাকা