মতামত

অলিম্পিক, নোবেলের সাফল্য বা উদ্ভাবন— কোনো যোগসূত্র আছে কি

অলিম্পিকে পদক জয়ের তালিকায় শীর্ষে কোন দেশগুলো? উত্তরটা হয়তো সবার জানা। তারপরও বলছি, আমেরিকা, চীন তারপর জাপান। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, প্রথম তিনটি দেশের জনসংখ্যা ও অর্থনীতির সঙ্গে পদকপ্রাপ্তির একটা সম্পর্ক রয়েছে। আসলেই কি তাই? আসুন দেখি।

জনসংখ্যার অনুপাতে পদকপ্রাপ্তি, অর্থাৎ প্রতি ১০ হাজার লোকের জন্য পদকপ্রাপ্তির তালিকা করা হলে শীর্ষে কোন দেশগুলো? প্রথমেই সান মারিনো। চারপাশে ইতালিপরিবেষ্টিত ছোট এ দেশের জনসংখ্যা ৩৪ হাজার। অলিম্পিক পদক পেয়েছে তিনটি, অর্থাৎ ১১ হাজার মানুষপ্রতি একটি পদক। দ্বিতীয় বারমুডা। জনসংখ্যা ৬২ হাজার। পদক একটি। জনসংখ্যার অনুপাতে পদকপ্রাপ্তির এ ক্রমতালিকায় আমেরিকা ৫৯, চীন ৭৭ ও জাপান ৪২ নম্বরে।

জিডিপি বা প্রবৃদ্ধিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক ধরা হয়ে থাকে। জিডিপির ভিত্তিতে পদকের তালিকা করলেও প্রথমে সান মারিনো। সান মারিনোর জিডিপি ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। পদক তিনটি। অর্থাৎ পদকপ্রতি জিডিপি শূন্য দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। তারপর গ্রানাডা আর জ্যামাইকা। আমেরিকা আছে তালিকার ৮৭-তে; পদকপ্রতি জিডিপি ৩৫ দশমিক ২ বিলিয়ন। আর চীন ৮৫-তে। বুঝতেই পারছেন, পদকপ্রাপ্তির সঙ্গে জনসংখ্যা বা অর্থনীতির উন্নয়নের সূচকের যোগসূত্র স্থাপন করা একটু কঠিন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের ছোট দ্বীপরাষ্ট্র জ্যামাইকার জনসংখ্যা ৩০ লাখ। পেয়েছে নয়টি পদক। জ্যামাইকাতে বড় হয়ে অন্য দেশের নাগরিকত্ব নেওয়া আরও কিছু প্রতিযোগীও অলিম্পিকে পদক জিতেছেন। অধিকাংশই ১০০ থেকে ৪০০ মিটারের মতো বিভিন্ন ধরনের স্বল্প দূরত্বের দৌড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা রাজ্যের টাম্পা বা রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরের মতো আয়তন যে দেশের, সেখানকার লোকেরা দৌড়ে এত পদক জিতছেন কীভাবে?

আসলে স্বল্প দূরত্বের দৌড়ে জ্যামাইকার এই সাফল্যের পেছনে বড় কারণটা হলো প্রতিভাকে তুলে আনার পরিকাঠামো। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহ। জ্যামাইকার স্কুলগুলোয় দৌড় শেখানোর প্রশিক্ষক রয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই—প্রতিভাকে তুলে আনা আনা, লালন করা ও আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তোলা।

জ্যামাইকার জনসংখ্যার একটা বড় অংশ পশ্চিম আফ্রিকার বংশোদ্ভূত। আফ্রিকানরা দৌড়ে, বিশেষ করে বড় দূরত্বের দৌড়ে বেশ ভালো। বলতে পারেন শারীরিক গড়নের কারণেই আফ্রিকানরা হয়তো দৌড়ে ভালো। মনে রাখতে হবে, আফ্রিকার দেশগুলোর প্রতিযোগীদের সঙ্গে লড়াই করেই জ্যামাইকার প্রতিযোগীদের জিততে হয়েছে।

আসলে স্বল্প দূরত্বের দৌড়ে জ্যামাইকার এই সাফল্যের পেছনে বড় কারণটা হলো প্রতিভাকে তুলে আনার পরিকাঠামো। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহ। জ্যামাইকার স্কুলগুলোয় দৌড় শেখানোর প্রশিক্ষক রয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই—প্রতিভাকে তুলে আনা আনা, লালন করা ও আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তোলা। লন্ডনের জ্যামাইকান অভিবাসী আমার এক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। সে বলল, জ্যামাইকার স্কুলগুলো একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামে ভালো দৌড়াতে পারে—এমন ছাত্রদের আকৃষ্ট করার জন্য। প্রতিভা অঙ্কুরে বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ভালো দৌড়াতে পারে—এমন ছাত্রদের বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হয় স্কুলে আকৃষ্ট করার জন্য। স্কুলগুলোর প্রতিপত্তি আর মর্যাদা নির্ভর করে ভালো দৌড়বিদের সংখ্যা আর স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে তাদের সাফল্যের ওপর।

বহুমাত্রিক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক এ প্রণোদনা অভিভাবক ও শিশুদের ছোটকাল থেকেই দৌড়ের প্রতি উৎসাহিত করে। একজনের সাফল্য অন্যজনের মধ্যে সংক্রমিত হয়। দৌড়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করলে নিজের ও পরিবারের ভাগ্যোন্নয়ন সম্ভব—এ ধারণা জ্যামাইকার সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বাংলাদেশের একই ধরনের একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। দক্ষিণের খুব ছোট জেলা নড়াইল। টেবিল টেনিসে বয়সভিত্তিক একাধিক জাতীয় পর্যায়ে একটা বড় সময় নড়াইলের খেলোয়াড়দের আধিপত্য। কারণ হলো সংক্রমণ। একজন-দুজন প্রথমে খেলতে শুরু করে। তাদের সাফল্যে অন্যরাও উৎসাহিত হলো। স্বল্প পরিসরে, স্থানীয়ভাবে সাধারণ পরিকাঠামো তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর সম্প্রসারণ হয়নি।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ১০ লাখ আমেরিকান উদ্ভাবকের শৈশব, শিক্ষা, পরীক্ষার ফলাফল আর বেড়ে ওঠার পারিপার্শ্বিক নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেছেন। গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, যেসব এলাকায় উদ্ভাবকের সংখ্যা বেশি, সেখানকার শিশুদের বড় হয়ে উদ্ভাবক হওয়ার সম্ভাবনা অন্যদের তুলনায় বেশি।

খেলাধুলার বাইরেও এ প্রবণতা লক্ষ করা যায়। নোবেল পুরস্কারের কথা ধরুন। রসায়নে, ২০০০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ইসরায়েল থেকে চারজন নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ৯০ লাখ লোকের দেশ থেকে ২০ বছরে চারজন নোবেল লরিয়েট। কারণ কী? ধরলাম, ইসরায়েলের জনসংখ্যার একটা অংশ, ধরুন ১ শতাংশ, প্রকৃতিগতভাবেই রসায়নের বিষয়গুলো অনায়াসে আত্মস্থ করতে পারে। কঠিন সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারে। সেই হিসাবে জনসংখ্যার একইসংখ্যক অংশ পৃথিবীর যেকোনো দেশেই রসায়নে অত্যন্ত মেধাবী হওয়ার কথা। অর্থাৎ চীন আর ভারতের, রসায়নের নোবেলে একচ্ছত্র আধিপত্য। কিন্তু বাস্তবটা আসলেই অন্য রকম।

ইসরায়েলের এ সাফল্যের বড় কারণ হলো মেধার বিকাশে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা। ইসরায়েলে রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিকভাবে রসায়ন পড়াকে উৎসাহিত করা হয়। রসায়নে পড়ার সঙ্গে একধরনের সামাজিক সম্মান জড়িত। স্কুল-কলেজে যারা রসায়নে ভালো, তাদের প্রথম থেকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। অতিরিক্ত শিক্ষক তাদের সঙ্গে লেগে থাকেন; স্কুল থেকে যাতে প্রতিভা ঝরে না পড়ে। রসায়নে গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় প্রচুর রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ দেওয়া হয়। আর নোবেলজয়ীদের প্রভাব তো রয়েছেই। নোবেলজয়ীরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে গবেষণার বরাদ্দ নিয়ে আসেন। ইসরায়েলের জনসংখ্যার অনুপাতে রসায়নে মেধাবী ছাত্র অন্য দেশে থাকলেও শুধু পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তাঁরা সাফল্যের শিখরে যেতে পারেন না।

তবে বাঙালি অর্থনীতির নোবেল নিয়ে গর্ব করতেই পারে। দুই বাংলা থেকে তিন অর্থনীতিবিদ শান্তিতে একটি এবং অর্থনীতিতে দুটি নোবেল পেয়েছেন। একাধিক বাঙালি অর্থনীতিবিদ ইংল্যান্ড আর আমেরিকার বিখ্যাত সব বিশ্ববিদ্যালয়ে দাপটের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। দুই বাংলার অর্থনীতিবিদদের জগদ্বিখ্যাত হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানার আগ্রহ রইল।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ১০ লাখ আমেরিকান উদ্ভাবকের শৈশব, শিক্ষা, পরীক্ষার ফলাফল আর বেড়ে ওঠার পারিপার্শ্বিক নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেছেন। গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, যেসব এলাকায় উদ্ভাবকের সংখ্যা বেশি, সেখানকার শিশুদের বড় হয়ে উদ্ভাবক হওয়ার সম্ভাবনা অন্যদের তুলনায় বেশি। শুধু তা–ই নয়, শিশুরা আশপাশের বড়দের দেখে ভবিষ্যতের পেশাও নির্ধারণ করে। যেমন ধরুন কম্পিউটারপ্রযুক্তি উদ্ভাবনের পীঠস্থান সিলিকন ভ্যালি। দেখা গেছে, বড় হয়ে সিলিকন ভ্যালির শিশুরাও কম্পিউটার নিয়ে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছে। অন্য পেশার তুলনায় কম্পিউটারবিজ্ঞানে তাদের ঝোঁক বেশি।

যেকোনো বিষয়ে খুব ছোট পরিসরের নিয়মিত সাফল্য অন্যের মধ্যে উৎসাহ তৈরি করে। সঠিক সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতায় আস্তে আস্তে এ উৎসাহ গাণিতিক হারে বাড়ে বাড়তে থাকে। ব্যক্তি বা স্থানীয় পর্যায় থেকে ছড়িয়ে পড়ে জাতীয় পর্যায়ে। হয়ে ওঠে অর্থনীতির চালিকা শক্তি।

ড. সুব্রত বোস প্রবাসী বাংলাদেশি এবং বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট
Subratabose01@yahoo.com