বেকারত্ব

উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে

দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বিপুল। এ বিষয়ে সহকর্মী মশিউল আলম বেশ কটি নিবন্ধ লিখেছেন। তাঁর লেখায় এই বেকার যুবক-যুবতীদের হাহাকার শোনা গেছে। কিন্তু আমাদের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশে এত উচ্চশিক্ষিত মানুষ বেকার কেন? সেই ঔপনিবেশিক যুগে দেশে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের কাল থেকেই পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাত্রছাত্রীর মনে এই ধারণা ঢুকিয়ে দিয়ে আসছে যে পড়াশোনা করে জজ-ব্যারিস্টার হতে হবে। এখনকার পরিবার সন্তানদের আর জজ-ব্যারিস্টার হওয়ার কথা বলে না। কিন্তু পড়াশোনা করে ভালো চাকরি করতে হবে—এ কথাটা আমাদের সবার কানেই মন্ত্রের মতো ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এই মনোভাবে পরিবর্তন আসেনি। চাকরি ছাড়া অন্য কিছু করার কথা মধ্যবিত্ত ভাবতেও পারে না। 

বাস্তব দৃষ্টান্ত দিয়েই ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করা যায়। লেখকের এক বাল্যবন্ধু পড়াশোনা শেষ করার পর পণ করলেন, চাকরি করবেন না, তিনি উদ্যোক্তা হবেন। প্রথমে কিছুকাল চাকরি করার পর মধ্যবিত্ত পরিবারের বন্ধুটি টুকটাক ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করলেন। কিন্তু দেখা গেল, প্রতি পদে নানা ঝামেলার সম্মুখীন হয়ে কোনো ব্যবসাতেই তিনি স্থির হতে পারেন না। বাস্তবতা হলো, এখন পর্যন্ত তিনি কোনো ব্যবসায় থিতু হতে পারেননি। ফলে সংসারে এ নিয়ে নানা ঝক্কিঝামেলা লেগেই থাকে। অন্যদিকে তাঁর বন্ধুদের মধ্যে যাঁরা চাকরি করেন, তাঁদের অনেকেই ইতিমধ্যে ভালো অবস্থানে চলে গেছেন।

অর্থাৎ আমাদের বাস্তবতাই এমন, যেখানে একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের পক্ষে উদ্যোক্তা হওয়া কঠিন। সবাই যে চাকরির পেছনে ছোটেন, এটা তার প্রধান কারণ। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির তরুণদের চাকরি না খুঁজে উদ্যোক্তা হতে বলেছেন। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে মানুষ উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী হবে না।

বড় ব্যবসায়ীরা অনেক দিন ধরেই বলে আসছেন, দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ ভালো নয়। ফলে কাঙ্ক্ষিত হারে বিনিয়োগ বাড়ছে না। ব্যাংকে প্রচুর পরিমাণে টাকা অলস পড়ে আছে। এ নিয়ে প্রায়ই সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। কিন্তু কাজের কাজ তেমন একটা হয় না। বিনিয়োগ না হওয়ায় দেশে কর্মসংস্থানও বাড়ছে না। তবে গত কয়েক বছরে সরকারি চাকরিতে অনেক নিয়োগ হয়েছে। সরকার আর কত মানুষকে নিয়োগ দেবে। তার পক্ষে তো আর সবার কর্মসংস্থান করা সম্ভব নয়। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি ও পদ্মা সেতুসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প চলমান থাকায় প্রবৃদ্ধির চাকা একভাবে সচল আছে। কিন্তু বিনিয়োগ না বাড়লে এটা টেকসই হবে না। 

দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতেই সবচেয়ে বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাই ক্ষুদ্র উদ্যোগের ওপরই আমাদের সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়া উচিত। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যদি বড় হন, তাহলে তাঁরা আরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান করতে পারবেন। এ লক্ষ্যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজানো দরকার। ঘরে ঘরে স্নাতক তৈরি না করে আমাদের উদ্যোক্তা তৈরিতে নজর দেওয়া উচিত। শিক্ষাব্যবস্থাকে সেভাবেই ঢেলে সাজানো উচিত। একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি চাকরি করে রাষ্ট্রকে হয়তো বছরে ২০ হাজার টাকা রাজস্ব দেবেন, কিন্তু তিনি যদি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হন, তাহলে অন্তত ১০ জন মানুষকে নিয়োগ দিতে পারবেন। এতে যেমন তাঁর জীবনের নিরাপত্তাহীনতা দূর হবে, তেমনি ওই ১০ জনও চাকরি পাবেন। প্রযুক্তি খাতে উদ্যোক্তা তৈরির অনেক সুযোগ আছে। বিশ্বায়নের বদৌলতে এখন ভারতসহ আমাদের মতো দেশগুলো আউটসোর্সিংয়ের বড় বাজার হয়ে উঠেছে। ভারত ইতিমধ্যে এ খাতে বড় অগ্রগতি অর্জন করেছে। আমরাও এই পথে হাঁটতে শুরু করেছি। ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে এটা এখনো অল্প কিছু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এটাকে আরও ছড়িয়ে দেওয়া গেলে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান করা সম্ভব। একই সঙ্গে ইন্টারনেটভিত্তিক ই-কমার্স সেবাও দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অনেক তরুণ এতে আগ্রহী হচ্ছেন।

এই পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের উচিত হবে, নীতি সহযোগিতা দিয়ে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো। প্রথমত, কোন কোন খাতে উদ্যোক্তা তৈরি করা সম্ভব, তার একটি বাস্তবসম্মত জরিপ করতে হবে। এর ভিত্তিতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে উদ্যোক্তা তৈরির কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। সারা দেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এরপর উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে হবে। আশার কথা, সরকার ইতিমধ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। আইটি ও কৃষি খাতের কিছু প্রতিষ্ঠানকে সুদবিহীন ঋণও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই টাকা নির্ধারিত সময়ের পর ফেরত আসেনি। অথচ অনেক প্রকৃত উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় তহবিলের অভাবে ব্যবসা এগিয়ে নিতে পারছেন না। কিছুদিন আগে লেখকের এক নিবন্ধের প্রতিক্রিয়ায় একজন উদ্যোক্তা মেইল করেছিলেন, সেটি এখানে তুলে ধরা হলো: ‘সালাম, স্যার আজকে প্রথম আলোতে আপনার কলামটি পড়ে খুব ভালো লাগল। মনে হলো, এর পরিপ্রেক্ষিতে আপনার সদয় দৃষ্টির জন্য কিছু লিখি। স্যার আমি একজন উদ্যোক্তা এবং একজন ইঞ্জিনিয়ার। আমি এই পর্যন্ত অনেক গঠনমূলক উদ্যোগ নিয়েছিলাম। প্রতিটি উদ্যোগের পেছনে ছিল সফল হওয়ার অনেক পরিকল্পনা। কিন্তু উপযুক্ত আর্থিক জোগান না থাকার কারণে বর্তমান চলতি ব্যবসাও ঠিকভাবে করতে পারছি না। ব্যাংকগুলোর কাছে ঋণের জন্য গেলে ওরা অনেক ডকুমেন্ট চায়, যা আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব না। এমতাবস্থায় আমাদের মতো এ রকম অনেক নতুন উদ্যোক্তা অকালে হারিয়ে যাচ্ছে। একটি দেশে যত বেশি উদ্যোক্তা থাকে, ওই দেশ তত উন্নত হয়। স্যার, সবকিছু মিলে মাঝে মাঝে অনেক হতাশ হয়ে যাই। তারপরও আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রেখে এগিয়ে যাচ্ছি। দোয়া করবেন।’ 

বাস্তবতা হলো, দেশের বিপুলসংখ্যক স্নাতক ডিগ্রিধারী মানুষ পড়াশোনা শেষ করে স্রেফ সরকারি চাকরির আশায় বছরের পর বছর বসে থাকেন। প্রথম আলোর চিঠিপত্র বিভাগে এমন অনেক চাকরিপ্রার্থী চিঠি পাঠান। জানা যায়, বিসিএস পরীক্ষায় যাঁরা নন-ক্যাডার চাকরির জন্য মনোনীত হয়েছেন, তাঁরা কয়েক বছর ধরে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে পিএসসিতে চিঠি আসে না। তাঁদের অপেক্ষার পালাও আর শেষ হয় না! আবার বেসরকারি নিয়োগদাতাদের অভিযোগ, তাঁরা দক্ষ কর্মী পাচ্ছেন না। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কী উৎপাদন করছে—এ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত হওয়ার সময় এসেছে।   

ইতিমধ্যে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া শুরু হয়েছে। সময় এসেছে, সরকারকে ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজতর করতে হবে। পাশাপাশি আমাদের মনোভাবেও পরিবর্তন আনতে হবে। চাকরিজীবী থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে পরিবর্তন আসবে না। পরিবর্তনের জন্য ধাক্কা একটা দিতেই হবে।

প্রতীক বর্ধন: সাংবাদিক  অনুবাদক

bardhanprotik@gmail.com