
বিন্যাস-সমাবেশ বা পারমুটেশন-কম্বিনেশন। আমি ভাত খাই, তিনটা শব্দকে কতভাবে সাজানো যায়? আমি ভাত খাই, আমি খাই ভাত, খাই আমি ভাত, খাই ভাত আমি, ভাত আমি খাই, ভাত খাই আমি। ছয়ভাবে। যাঁরা গণিত জানেন, তাঁরা এটা সহজেই অঙ্ক কষে বের করে দিতে পারেন—৩ গুণন ২ গুণন ১। ৬।
কিন্তু পোশাককর্মীদের হয়রানি করা, দুঃখ–কষ্টে ফেলার আর কোন কোন পদ্ধতি বাকি থাকল!
২০২০ সালে যখন প্রথম বিধিনিষেধ দেওয়া হয়, তারপর একবার বলা হলো, গার্মেন্টস–কারখানা খোলা হবে। কর্মীরা দূরদূরান্ত থেকে হেঁটে রওনা হলেন ঢাকার উদ্দেশে। গাজীপুরের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ বাক্স-পেটরা কাঁধে হাঁটছেন। তাঁরা ঢাকায় এসে পৌঁছানোর আগেই আবার ঘোষণা করা হলো, কারখানা বন্ধই থাকবে। কেউ মাঝপথে থেমে পড়লেন। বুঝছেন না, কী করবেন। কেউ বাড়ি ফিরে গেলেন। কেউবা হেঁটে হেঁটেই ঢাকায় পৌঁছালেন। যাঁরা কারখানা এলাকায় এসে পৌঁছাতে পারলেন, তাঁরা জানলেন, কারখানা বন্ধ। এখন তাঁরা বিপদে পড়লেন। ঢাকায় থেকে তাঁরা করবেনটা কী! কাজ নেই। আয় নেই। থাকবেন কোথায়, খাবেন কী?
তখন ব্যাপক সমালোচনা হলো। ফেসবুক-টুইটার ভেসে গেল মালিকদের নিন্দা-সমালোচনায়। দিন দুই পর আবার বলা হলো, কারখানা খোলা। যাঁরা মাঝপথ থেকে বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলেন, তাঁরা বিপদে পড়লেন। বাস-ট্রেন-লঞ্চ বন্ধ। তাঁরা কর্মস্থলে যাবেন কী করে?
ইতিহাসের শিক্ষা হলো, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না এবং ইতিহাস পুনরাবৃত্তিময়। সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো ২০২১ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে এসে। ৫ আগস্ট পর্যন্ত কঠোর বিধিনিষেধ। বাস চলবে না, ট্রেন চলবে না, লঞ্চ চলবে না। এরই মধ্যে বলা হলো, ‘১ আগস্ট থেকে কারখানা খুলে দেওয়া হবে। কর্মীরা, চলে এসো কারখানায়।’
বাস-ট্রেন-লঞ্চ না চললে কর্মীরা কীভাবে আসবে?
কেন?
তারা রিকশায় উঠতে পারে।
তারা সাইকেল চালাতে পারে।
তারা জুতায় চাকা লাগিয়ে আসতে পারে।
তারা ভেলা বানিয়ে সেটা লগি দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে আসতে পারে।
তারা হেঁটে আসতে পারে।
যে হেঁটে আসতে পারবে না, সে হামাগুড়ি দিয়ে আসতে পারে।
গড়িয়ে গড়িয়ে আসার চেষ্টা করতে পারে।
কর্মীরা রওনা দিল ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জের দিকে।
একটা অনলাইন পোর্টালে খবর এবং ছবি দেখলাম, সন্তান কোলে নিয়ে ১৫০ কিলোমিটার হেঁটে মাদারীপুর থেকে ঢাকায় এসেছেন এক মা। খবরের সত্যতা যাচাই–বাছাই করিনি। এমন ঘটনা ঘটা খুবই স্বাভাবিক! মানুষ যে অবর্ণনীয় কষ্ট স্বীকার করেছে, তার বর্ণনা সব কাগজেই এসেছে। হেঁটে, রিকশায়, ট্রাকে, মোটরসাইকেলে, আবার হেঁটে কর্মস্থলের দিকে আসতে থাকেন কর্মীরা। ২০০ টাকার জায়গায় খরচ করতে হয় ২ হাজার টাকা।
তখন কর্তৃপক্ষের হুঁশ হয়। তারা কয়েক ঘণ্টার জন্য গণপরিবহন খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
এখন প্রশ্ন হলো, আগে গণপরিবহন খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করে, তারপর কারখানা খুলে দেওয়ার ঘোষণা কি দেওয়া যেত না?
বিন্যাস-সমাবেশ বা পারমুটেশন-কম্বিনেশনের কথা পেড়েছিলাম এই লেখার শুরুতে। আর কী কীভাবে পোশাককর্মীদের হয়রানি করা যেত!
১. কারখানা খুলে দেওয়া হয়েছে, ঘোষণা দিয়ে তাদের কারখানার কাছে এনে বলা যেত, কারখানা বন্ধ। তোমরা না জেনে, না বুঝে এসেছ (গত বছর এটা করা হয়েছিল বটে)
২. গণপরিবহন খুলে দিয়ে বলা যেত, এগুলো চলতে পারবে, তবে এগুলো যাবে উল্টো দিকে। মাদারীপুর থেকে ঢাকার দিকে না এসে এরা সুন্দরবনের দিকে রওনা দেবে। তাহলে হয়রানিটা করা যেত ভালোভাবে!
এই পর্যন্ত লিখে আর লিখতে ইচ্ছা করছে না। মানুষের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে রসিকতা করা যায় না। চোখে পানি চলে আসে।
কর্তাদের বলি, আপনাদের সিদ্ধান্তের সমন্বয় নেই কেন? এক মন্ত্রী ঘোষণা দেন, ১৮ বছরের বেশি বয়সী যারা দুটো টিকা নেয়নি, তারা পথে বেরোলে শাস্তি পাবে। আরেক মন্ত্রী বলেন, না, এই কথা ঠিক নয়। আসলে কোনটা ঠিক? নাকি কোনোটাই ঠিক নয়। এটা কে বলেছেন? মন্ত্রী বলেছেন। মন্ত্রী বলেছেন, তাহলে নিশ্চিত থাকো যে তিনি ঠিক বলেননি। আগামীকাল বা পরশু সংশোধনী আসছে! এ–ই কি তাহলে পরিস্থিতি!
কিন্তু কর্তৃপক্ষের এই সমন্বয়হীনতা, একবার এ কথা, আরেকবার ও কথায় মানুষ যে অমানবিক কষ্ট-ভোগান্তির শিকার হচ্ছে, যা একটু সচেতন হলে, একটু সুবিবেচক হলে এড়ানো যেত, তার দায়িত্ব কে নেবে? নাকি জাতীয় পার্টির নেতা জি এম কাদেরের কথাই ঠিক:
‘সরকার শ্রমিকদের মানুষই ভাবে না।’
সোমবার এক বিবৃতিতে জি এম কাদের এসব অভিযোগ করেন।
জাতীয় পার্টির এই নেতা বলেন, ‘অপরিকল্পিত লকডাউনের নামে শ্রমিকদের প্রতি যে উদাসীনতা দেখানো হয়েছে, তা সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না। অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে এক বছরের মাথায় আবারও শ্রমিকদের হেঁটে, কয়েক গুণ বেশি টাকা খরচ করে রাজধানীতে ফিরতে হয়েছে। যেসব শ্রমিক দেশের সমৃদ্ধির জন্য অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন, তাঁদের সঙ্গে অশোভন ও নির্মম আচরণ করা হয়েছে।’ সূত্র: প্রথম আলো
● আনিসুল হক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক