‘ঐতিহ্যের শহর কুমিল্লা’, ‘পথিকৃৎ শহর কুমিল্লা’—এ কথাগুলো শুনেই আমরা বড় হয়েছি। কথাগুলো অতিরঞ্জিত তা-ও কিন্তু নয়। বরং ঐতিহাসিক সত্য। হাজার বছর আগে কুমিল্লা সমতট আর খড়্গ বংশের রাজধানী ছিল। এখানে রয়েছে বৌদ্ধসভ্যতার নিদর্শন। কুমিল্লার শীল ভদ্র জগৎময় নমস্য, টাইগার গণি বাঙালি সৈনিকদের নিজস্ব পরিচয় তৈরি করেছেন। কুমিল্লার জিলা স্কুল, ফয়জুন্নেসা স্কুল, ভিক্টোরিয়া কলেজ—গোটা বাংলাদেশের বাতিঘর।
তারও আগে এখানে গিরিধারী স্কুল নামে একটি স্কুল ছিল। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়ই দেবীদ্বারে রাজবিহার ও আশ্রমবিহার নামের দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল। কুমিল্লার বার্ড দেশের বাইরেও পাঠ্যবিষয়। কুমিল্লা টাউন হল শত বছর আগেই বাংলাদেশের নান্দনিক মিলনায়তনগুলোর একটি। রামমালা গ্রন্থাগার আর টাউন হল গ্রন্থাগার সেই আমলের সবচেয়ে জ্ঞানগর্ভসমৃদ্ধ পাঠাগারের অন্যতম। ফয়জুন্নেসার সুনাম ব্রিটিশ রানির দরবার পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
এ শহর কাজী নজরুল ইসলামকে বারবার টেনে এনেছে। নজরুল-জীবনের বড় অংশজুড়ে আছে কুমিল্লা। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, শচীন কর্তা, হিমাংশু দত্ত, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, ওস্তাদ জানে আলম চৌধুরীর স্মৃতির শহর কুমিল্লা। বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠাকারী মোহিনী মোহন বর্ধন, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, অজিত কুমার গুহ, অতীন্দ্রমোহন রায় আর রফিকুল ইসলামের শহর কুমিল্লা। আখতার হামিদ খান, আসহাব উদ্দিন আহমেদ, সেলিনা বানু, ডা. যোবায়দা হান্নান কবে যে কুমিল্লার একজন হয়ে গেছেন, তাঁরা নিজেরাও তা জানেন না। বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের বাবা পণ্ডিত দ্বিজদাস দত্ত আর ব্রাহ্মধর্মের অন্যতম প্রবক্তা গুরুদয়াল সিংহের স্মৃতির শহর কুমিল্লা।
ব্যাংকিং সেক্টরের জনক নরেন্দ্রনাথ দত্ত, যিনি ইউনাইটেড ব্যাংক অব ইন্ডিয়ারও অন্যতম উদ্যোক্তা, তাঁর কথা এই শহরের মানুষেরাই জানে না। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক করপোরেশনের শতবর্ষী ভবনটিকে (বর্তমানে পূবালী ব্যাংক ভবন) ভেঙে ফেলার উদ্যোগ কয়েক দফা ব্যর্থ হলেও কত দিন এটাকে রক্ষা করা যাবে, তা ভবিতব্য জানে। অসংখ্য কীর্তিমান ব্যক্তির স্মৃতিধন্য কুমিল্লা টাউন হল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র থিয়োসফিক্যাল লজকে নিয়েও আছে নানা কানাঘুষা। ১ হাজার ৩০০ বছর আগের চণ্ডীমুড়া, ৭০০ বছর আগের সতেরো রত্নমন্দির, ৫৬৪ বছর আগের ধর্মসাগর, নানুয়া দীঘি এখনো সগৌরবে বয়ে যাচ্ছে।
সংস্কৃতিজন আর শিক্ষিত মানুষের শহরে এখন সত্যিকার অর্থে কোনো নাগরিক সমাজ নেই। এই শহরে রাসমোহন চক্রবর্তীর মতো কোনো পণ্ডিত আর কবে জন্ম নেবে, বিধাতা জানে! যানজট বেড়েই চলেছে, শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়েই যাচ্ছে, কিন্তু কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। এই শহরে ১০০ জন হকার ১০ লাখ মানুষের চেয়ে শক্তিশালী। আশার কথা, যানজট নিরসনে জেলা প্রশাসক উদ্যোগ নিয়েছেন। আশঙ্কার কথা, এটি কত দিন স্থায়ী হয়!
সেই কুমিল্লার এখনকার অবস্থা দেখলে উপরের কথাগুলোকে নিছক গালগল্প বলেই মনে হবে। বিমানবন্দর তৈরির সময় অনেক পুরোনো স্থাপত্যকীর্তি বিনষ্ট করা হয়েছে। পাঁচথুবীর পঞ্চস্তূপ খুঁজে পাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই। আনন্দ চন্দ্র রায়ের আনন্দ সাগর পাকিস্তান আমলের শুরুতেই ভরাট হয়ে গেছে। শাসনগাছা ডাকবাংলোর দীঘি ভরাট করে সেখানে এখন বাস টার্মিনাল। চোখের সামনে ভরাট হয়ে গেল মোগলটুলীর লালা পুষ্করিণী, ঠাকুরপাড়ার জোড়পুকুর, তালপুকুর এলাকার দুটি পুকুর, রায়বাড়ির পুকুর, ব্যাঙ সাগর, সারদা পাল মাঠের পুকুরসহ অসংখ্য জলাশয়।
আজ থেকে এক শ–দেড় শ বছর আগে শহরে প্রায় বাসাতেই ছোট–বড় পুকুর ছিল। মানুষ ছিল কম, জায়গা ছিল বেশি। এক ইউসুফ স্কুল রোডেই আমার বাসার সামনে আমি ছয়টি পুকুর দেখেছি। মানুষ বেড়েছে, বাসস্থান ও অন্যান্য চাপ বেড়েছে, সেই বাস্তবতাও মানতে হবে, এটাও সত্য। কিন্তু এখন তো শহরের দিঘিগুলোও ঝুঁকির মুখে। তিন শ বছরের পুরোনো উজির দিঘির ভরাট প্রক্রিয়া সচেতন কুমিল্লাবাসীর প্রতিবাদের মুখে আপাতত রক্ষা পেলেও তার স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। সাড়ে তিন শ বছরের পুরোনো আমির দিঘির প্রতিও নাকি লোভাতুর চোখে তাকাচ্ছেন অনেকে। সেখানে বিনোদন সুবিধার আড়ালে কী হচ্ছে, তা জানার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে দিঘির শান্ত নিরিবিলি প্রাকৃতিক রূপটি আর থাকছে না, এটি নিশ্চিত।
ঘিলাতলীর জমিদার সুফি আমির মোহাম্মদ চৌধুরী কর্তৃক নির্মিত চকবাজারে শহরের অন্যতম প্রাচীন মসজিদটিও আধুনিকায়নের নামে ভেঙে ফেলা হয়েছে তিন মাস আগে। যেকোনো বিবেচনায় এটি পুরাকীর্তি। মসজিদটির পুরোনো আদলটি রেখেও তো আধুনিকায়ন, বর্ধিতকরণ সম্ভব ছিল। আমরা শুধু নির্বাক হয়ে অবলোকন করেছি। বছর দুই-তিন আগে জগন্নাথপুরে শাহজালালের মসজিদটিরও একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছে।
কুমিল্লাকে আপন করে যিনি আমাদের মহিমান্বিত করেছেন, সেই চিরবিদ্রোহী নজরুলের স্মৃতিচিহ্নগুলো বিলীন হওয়ার পথে। গান্ধীজির স্মৃতি স্মারক অভয়াশ্রম নিয়েও শোনা যায় নানা রকম কানাঘুষা। দানবীর মহেশ বাবুর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান নেতাজি সুভাষ বসুর স্মৃতিধন্য ঈশ্বর পাঠশালাও এর বাইরে নয়। রামমালা গ্রন্থাগারটি উপমহাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধ পাঠাগার। এখানে ভূর্জপত্র, কলাপাতা, তালপাতা, তুলটপত্র ও কাঠে খোদাই করা আট হাজার দুর্লভ পুঁথির অমূল্য ভান্ডার রয়েছে, যার অধিকাংশেরই এখনো পাঠোদ্ধার করা যায়নি।
ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর কান্দিরপাড়ের বাসাটি তাঁর বংশধরেরাই বিক্রি করে দিয়েছেন। ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছর পরও শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাসভবন সংরক্ষণ করার জন্য আমাদের দাবি জানাতে হয়, এটা বড় লজ্জার বিষয় বটে। এ জন্য তাঁর বংশধরদের অনীহা যেমন আছে, তেমনিভাবে সরকারের উদ্যোগেরও অভাব আছে। কবিগুরুর স্নেহধন্য সুধীর সেনের পরিবারকে তাঁদের পৈতৃক ভিটা ছাড়তে হয়েছিল সুধা সেনের জীবদ্দশাতেই।
সংস্কৃতিজন আর শিক্ষিত মানুষের শহরে এখন সত্যিকার অর্থে কোনো নাগরিক সমাজ নেই। এই শহরে রাসমোহন চক্রবর্তীর মতো কোনো পণ্ডিত আর কবে জন্ম নেবে, বিধাতা জানে! যানজট বেড়েই চলেছে, শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়েই যাচ্ছে, কিন্তু কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। এই শহরে ১০০ জন হকার ১০ লাখ মানুষের চেয়ে শক্তিশালী। আশার কথা, যানজট নিরসনে জেলা প্রশাসক উদ্যোগ নিয়েছেন। আশঙ্কার কথা, এটি কত দিন স্থায়ী হয়!
● আহসানুল কবীর সংস্কৃতিকর্মী ও লেখক
ahkabir71@gmail.com