অরণ্যে রোদন

কী বলতে চায় বদরুল?

অসম্ভব প্রাণশক্তির জোরে সুস্থ হয়ে মায়ের কাছে ফিরতে পেরেছেন খাদিজা
অসম্ভব প্রাণশক্তির জোরে সুস্থ হয়ে মায়ের কাছে ফিরতে পেরেছেন খাদিজা

মাননীয় বিচারক রায়ে বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, আসামির ওপর সর্বোচ্চ শাস্তি আরোপের মাধ্যমে প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হাজার হাজার বদরুল ভবিষ্যতে এমন কাণ্ড থেকে বিরত থাকবে এবং আমাদের নারীসমাজ সুরক্ষিত হবে।’

আর বদরুল আদালতের সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় চিত্কার করে বলে, ‘এখানেই শেষ নয়। আমার কিছুই হবে না।’ একসময় সে বলে, ‘আমি শিক্ষক। আমি বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। জন্ম বাংলায়, মরবও বাংলায়। জয় বাংলা।’

কী বলতে চায় বদরুল? বদরুলদের জানিয়ে দিতে হবে, ‘জয় বাংলা’ বললে, বঙ্গবন্ধুর নাম নিলেই অপরাধী তার অপরাধের জন্য প্রাপ্য শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না। বরং অপরাধ আড়াল করার জন্য কৌশলগত কারণে যে বঙ্গবন্ধুর নাম নেবে, ‘জয় বাংলা’ বলবে, তার সাজা নিশ্চিত করা গেলে সেটা হয়ে উঠবে আরও দৃষ্টান্তমূলক।

গতকালের কাগজেই তো আরও দুটো খবর আছে। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ এইচ বি এম ইকবালের স্ত্রী, ছেলেমেয়েসহ চারজনকে কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছেন আদালত। অন্য খবরটি হলো, কার্যালয় সরাতে তিন বছর সময় চেয়ে আবেদন প্রস্তুত করেছে বিজিএমইএ। আগের খবর হলো, হাতিরঝিলের জলাভূমি ভরাট করে তৈরি করা বিজিএমইএর ১৬ তলা ভবনটি ভাঙার আদেশ বহাল রেখেছেন সর্বোচ্চ আদালত।

বিজিএমইএ আমাদের সবচেয়ে প্রভাবশালী, সবচেয়ে ধনাঢ্য, সবচেয়ে বেশি রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের সংগঠন। তাঁরা তাঁদের কার্যালয়, যা কিনা প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করেছেন, তাও রাখতে পারছেন না। আমার মনে আছে, এই ভবন ভাঙার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বেলার পক্ষে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছিলেন, এই বেআইনি ভবন ভাঙা হলে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে, আইন লঙ্ঘন করে কেউই পার পান না, তিনি যত শক্তিশালী বা ধনাঢ্য হন না কেন। সেই কারণেই এই ভবন ভেঙে ফেলার আদেশ দিতে হবে।

একই দিনে সংবাদপত্রের পাতায় তিনটা সংবাদ। তিনটাতেই আমরা দেখছি, আদালত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দ্বিধাহীন। আসামিরা সরকারি দল করে, নাকি ক্ষমতাবান, তা আদালত আমলেই নেননি। আমরা এই দৃষ্টান্তগুলো সামনে তুলে ধরতে চাই। আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা মাঝেমধ্যেই বলে থাকেন, অপরাধী ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগ করলেও আওয়ামী লীগ আমলেই তাদের বিচার হয়, বিচারে অপরাধীদের সাজা হয়, ‘সুশীল সমাজ’ তা দেখেও না দেখার ভান করে থাকে। আমার মনে হয়, সুশীল সমাজ তা দেখল কি দেখল না, এটা বড় কথা নয়, বড় কথা এই বার্তা প্রচার করে দেওয়া যে অপরাধীর কোনো দল নেই, তিনি যেই দল, যেই মতেরই হোন না কেন বা বড়লোক বা গরিব যা-ই হোন না কেন, অপরাধের বিচার হতে হবে এবং আইনানুগ শাস্তি পেতেই হবে। আমরা অনেক জায়গাতেই দেখেছি, সরকারি দল বা ছাত্রসংগঠনের কর্মীদেরও সাজা হয়েছে, হচ্ছে এবং সেই সাজা দৃষ্টান্তমূলক।

আর বদরুলদের জানিয়ে দিতে হবে যে জয় বাংলা আমাদের মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। একটা জনশ্রুতি আছে। ১৯৭১ সাল। ৩ মার্চ। মালিবাগ আবুজর গিফারী কলেজের ছাত্র সংসদ নেতা ফারুক ইকবাল মিছিল নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর মুখে স্লোগান জয় বাংলা। তাঁদের মুখে মুখে স্লোগান, বাঁশের লাঠি তৈরি করো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো, শেখ মুজিবের পথ ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো। মিছিল রামপুরার দিকে যেতেই মিলিটারিরা গুলি করল। রাজপথে লুটিয়ে পড়ল ফারুক ইকবালের গুলিবিদ্ধ দেহ। তিনি বললেন, পানি পানি। পানি আনার জন্য মানুষ ছুটছে। এসে দেখল, ফারুক ইকবাল নিজের বুকের রক্ত দিয়ে আঙুলে রাজপথে লিখছেন—‘জয় বাংলা’। তিনি আসলেই জয় বাংলা রাজপথে লিখেছিলেন কি লেখেননি, এত দিন পরে তা প্রমাণ করা যাবে না, কিন্তু শহীদেরা যে তাঁদের বুকের রক্ত দিয়ে ইতিহাসে চির অক্ষয়ভাবে ‘জয় বাংলা’ লিখে রেখে গেছেন, তাতে তো আমাদের কারও সন্দেহ নেই। কত কত মুক্তিযোদ্ধা জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন মরণপণ যুদ্ধে, আর পাকিস্তানি সৈন্যরা জয় বাংলা রণধ্বনি শোনার সঙ্গে সঙ্গে কাঁপাকাঁপি শুরু করে দিয়েছে। ১৯৭১ সালে যাঁরা শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিলেন ভারতে, তাঁদের বলা হতো ‘জয় বাংলার মানুষ’।

কাজেই বদরুলদের জানিয়ে দিতে হবে, অপরাধী তার অপরাধ ঢাকার জন্য, শাস্তি থেকে মাফ পাওয়ার জন্য ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ব্যবহার করে পার পাবে না। ‘জয় বাংলা’ আমাদের মুক্তির স্লোগান, স্বাধীনতার স্লোগান, দেশপ্রেমের স্লোগান, অপরাধীদের বর্ম নয়।

আর বদরুল যখন দাবি করে যে সে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক, তখন কেমন লাগে, বলুন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিবিসির জরিপে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হয়েছিলেন, তা তো এমনি এমনি নয়। হাজার বছরের বাঙালি জাতিকে ইতিহাসে প্রথম একটা স্বাধীন রাষ্ট্র দিয়ে গেছেন শেখ মুজিব। আজকে আমরা যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভালো করছি, তার সবকিছুর পেছনে আছে স্বাধীনতা, আর তার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বঙ্গবন্ধুর। যে নিজেকে দাবি করবে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক, তাকে বঙ্গবন্ধুর জীবন-ইতিহাস পড়তে হবে। অন্তত তাঁর লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটা পড়লেও জানা যাবে, তিনি কেমন মানুষ ছিলেন।

তিনি এক অপরূপ মানুষ ছিলেন। তিনি তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করতেন না, তাদের খোঁজখবর নিতেন, তাদের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহার করতেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেই আমরা পাব, তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে দেখা করেছেন। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, তিনিও জানতেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁকে শ্রদ্ধা করি। তিনি সেখানেই বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ বিরোধী পার্টি। তাকে কাজ করতে দেওয়া উচিত। বিরোধী দল না থাকলে গণতন্ত্র চলতে পারে না। আপনি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তা আমি জানি।’ এই একটা উক্তির মধ্যেই কত কথা নিহিত আছে। বিরোধী দল না থাকলে গণতন্ত্র চলে না, বিরোধী দলকে কাজ করতে দেওয়া উচিত। শুধু তা-ই নয়, তিনি বলছেন, আপনি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, আমি জানি।

আর নারীর প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল অপরিসীম শ্রদ্ধা। অসমাপ্ত আত্মজীবনীর একেবারে শুরুতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বলল, “বসেই তো আছ, লেখো তোমার জীবনের কাহিনি।”’ অর্থাৎ স্ত্রীর কথায় তাঁরই দেওয়া খাতায় বঙ্গবন্ধু জীবনী লিখেছেন। আর বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ওরফে রেণু কেমন ছিলেন। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়া, অনেকগুলো সন্তান নিয়ে সংসার সামলাতে ব্যস্ত এক চিরায়ত বাঙালি নারী, তাঁর স্বামী প্রায়ই থাকেন জেলখানায়, স্বামী আগের দিন হয়তো ছিলেন মন্ত্রী, পরের দিন গেছেন কারাগারে, তখন অনেকগুলো বাচ্চাকাচ্চাসহ বেগম মুজিব বাসা খুঁজে ফিরছেন, তাঁদের কেউই বাসা ভাড়া দিতে সাহস পাচ্ছে না। সেই নারী ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দী, দেশের মানুষ তাঁর মুক্তির দাবিতে গণ-অভ্যুত্থান করে ফেলছে রাজপথে, গোলটেবিল বৈঠকে পাকিস্তান যেতে তখন আইয়ুব খান তাঁকে প্যারোলে মুক্তি দিতে চান, বেগম মুজিব তখন চিঠি লিখে পাঠালেন বঙ্গবন্ধুকে, ‘খবরদার, তুমি প্যারোলে মুক্তি নিবা না।’

বঙ্গবন্ধু প্যারোলে মুক্তি নিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। বিকেলবেলা। বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে যাবেন। একদিকে দেশের মানুষ মুক্তিপাগল, স্বাধীন দেশের পতাকা তৈরি হয়েছে, জাতীয় সংগীত নির্বাচিত হয়েছে, চারদিকে এক ডাক, স্বাধীনতা, স্বাধীনতা। অন্যদিকে ইয়াহিয়া খান ফোন করেছেন, পাকিস্তানি সৈন্যরা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি কী করবেন। বেগম মুজিব বললেন, ‘তুমি একটু ঘুমিয়ে নাও। তুমি নিজের হৃদয়ের দিকে তাকাও। সারাটা জীবন তুমি বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছ। তোমার মনের কথা তুমি বলবে। আর কারও কথা তোমার শোনার দরকার নাই।’

১৯৭১ সালের মার্চের শেষের দিকে। তখনো ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আলোচনা চলছে। একদিন ভাত খাওয়ার টেবিলে বেগম মুজিব বললেন, শোনা যাচ্ছে সমঝোতা হয়ে গেছে, তুমি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছো। শোনো, তুমি যদি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হও, তাহলে তোমার পেছন থেকে বাংলার মানুষের সমর্থন চলে যাবে। তখন ইয়াহিয়া খান তোমাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেবে। আর যদি তুমি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে থাকো, তাহলে বাংলার মানুষ তোমার সঙ্গে থাকবে, তখন কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। বঙ্গবন্ধু হয়তো একটু উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন, কেন বেগম মুজিব গুজবে কান দিচ্ছেন। তিনি তো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন না। ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, আমি বাংলার মানুষের মুক্তি চাই।’ তখন বেগম মুজিব তাঁর নিজের ভাতের থালায় পানি ঢেলে দিয়ে উঠে চলে গিয়েছিলেন।

এই হলেন বেগম মুজিব। এই হলেন বঙ্গবন্ধু। ৭ মার্চের ভাষণে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের যেন বদনাম না হয়।’ আমরা এমন কিছু করব না যাতে আমাদের বদনাম হয়। বদরুলরা শুধু নিজেদের বদনাম করেই ক্ষান্ত হয় না, সে সবারই মুখে কালি লেপন করতে চায়। তারা জয় বাংলা এবং বঙ্গবন্ধুর নাম নেওয়ার উপযুক্ত নয়। এই সব বলে তারা পার পায়নি। পাবেও না।

গতকালের সংবাদপত্রের খবরগুলো আমাদের আবারও আশ্বস্ত করেছে। অপরাধীর কোনো দল নেই। তাদের একটাই পরিচয়, তারা অপরাধী। এই নীতিতে অটল থাকতে হবে। তাহলে অপরাধ কমে আসতে বাধ্য।

আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।