
১৯৯৩ সালের ১৫ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনের রাস্তায় ট্রাকচাপায় নিহত হয় আমাদের সহপাঠী রুমানা পারভীন। তখন সে ১৯ বছরের মেধাবী তরুণী। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী, সদ্যই ক্যাম্পাসে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রিয় মুখ হয়ে উঠতে শুরু করেছে, চমৎকার উপস্থাপনা আর মিষ্টি বাচনভঙ্গি তাকে ক্রমশ জনপ্রিয় করে তুলছে। এখনো মনে পড়ে সেদিন সকালবেলা লেকচার গ্যালারিতে সংবাদটা পৌঁছানো মাত্র আমরা সবাই একযোগে বেরিয়ে এসেছিলাম, ছুটতে ছুটতে পৌঁছেছিলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে, যেখানে নিথর–নিস্তব্ধ বসেছিলেন রুমানার হতভাগ্য মা-বাবা। আদুরে ছোট মেয়েকে মা একটু আগেই নাশতা খাইয়ে কলেজের উদ্দেশে বিদায় দিয়েছিলেন।
আমাদের রুমানার লাশ দেখতে দেওয়া হয়নি কারণ, বড় ট্রাকটি তার অপূর্ব সুন্দর মিষ্টি মুখটার ওপর দিয়েই নাকি চলে গিয়েছিল। বন্ধুর এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া আমাদের পক্ষে কঠিন ছিল, তাই আমরা নেমে পড়েছিলাম রাস্তায়। আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও। আমরা বিক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ, আহত হয়েছিলাম। দুর্ঘটনাস্থলে আমরা গড়ে তুলেছিলাম রুমানার স্মরণে একটি বেদি। তারপর ২৮ বছর পেরিয়ে গেছে।
২৮ বছরে আমরা অনেকেই ব্যক্তিগত জীবন ও ক্যারিয়ারে সফল হয়েছি, কেউ কেউ আবার হইনি, অনেকেরই সংসার পরিবার নিয়ে সুখী আনন্দময় এক জীবন, কারোর হয়তো কিছু খামতি আছে; কিন্তু রুমানার পরিবারে আছে কেবল দীর্ঘশ্বাস। কেবলই নিঃসীম এক অপেক্ষা। ২৮ বছরে আমাদের বয়স বেড়েছে, কিন্তু ওর বাড়েনি। আমরা এখনো ১৫ নভেম্বর এলে নিজেদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ওর ১৯ বছরের ছবিটাই শেয়ার করি। সেই ছবিতে এখনো উজ্জ্বল, তারুণ্যে দীপ্ত, সরল আর মিষ্টি এক মেয়ে হয়ে রয়ে গেছে সে।
২৮ বছরে আমরা অনেকেই ব্যক্তিগত জীবন ও ক্যারিয়ারে সফল হয়েছি, কেউ কেউ আবার হইনি, অনেকেরই সংসার পরিবার নিয়ে সুখী আনন্দময় এক জীবন, কারোর হয়তো কিছু খামতি আছে; কিন্তু রুমানার পরিবারে আছে কেবল দীর্ঘশ্বাস। কেবলই নিঃসীম এক অপেক্ষা।
২৮ বছর পর নিজের ১৮ বছরের সন্তান যখন সহপাঠীর মৃত্যুতে বন্ধুদের সঙ্গে মিছিলে নেমে খুদে বার্তা পাঠায়, ‘আমার দেরি হবে মা’। তখন তার জন্য অস্থির পায়ে অপেক্ষা করতে করতে নিজের হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর কথা মনে পড়ে। নিজেকে অপরাধী লাগে, কেমন আছে ওর মা-বাবা কে জানে, জানি না কোন আকাশের ওপার হতে মেয়েটা আমাদের দেখে মনে মনে ভাবে—‘আমারও তো একটা জীবন হতে পারত এ রকম, তোমাদের মতো।’ ভাবি এই ২৮ বছরে আমাদের এ শহরটা আরও বসবাসের অযোগ্য হয়েছে, আরও অনিরাপদ হয়েছে, হয়েছে আরও নিষ্ঠুর। ২৮ বছর পরও আমাদের ছেলেমেয়েদের বন্ধুর লাশ দেখে ক্ষুব্ধ আহত হয়ে পথে নামতে হয় সামান্য একটা দাবি নিয়ে, তেমন বড় কোনো দাবি নয়—কেবল চলাচলের জন্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার জন্য একটা নিরাপদ সড়ক চায় তারা। সুস্থ ও অক্ষত দেহে বাড়ি ফেরার নিশ্চয়তা চায়।
এ ২৮ বছরে চারদিকে উন্নয়নের তুফান বয়ে গেছে, আমাদের শহরে গজিয়েছে উঁচু উঁচু উড়ালসড়ক, হাতছানি দিচ্ছে মেট্রোরেল আর এক্সপ্রেস হাইওয়ে, রাস্তাগুলো আলো ঝলমল হয়েছে কত, কত কত বহুতল ভবন, রেস্তোরাঁ, দৃষ্টিনন্দন শপিং মল রাস্তার দুধারজুড়ে, পথে কত কত দামি গাড়ি! আমরা নাকি নিজেদের অজান্তেই কত ধনী হয়ে গেছি বলে শুনি। কিন্তু এখনো একটা নিরাপদ সড়ক আর ট্রাক-বাসের তলায় অপঘাতে বেঘোরে প্রাণ না হারানোর দাবিতে ছেলেমেয়েদের পথে নামতে হয়!
২০১৮ সালের ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে দ্রুতগতির দুটি বাসের সংঘর্ষে রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী রাজীব ও দিয়ার ঘটনাস্থলে মৃত্যু ঘটে, আহত হয় আরও ১০ জন শিক্ষার্থী। তারপর শহরজুড়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নেমে আসে রাস্তায়, কেবল তাই নয়, তারা শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে গাড়ির কাগজপত্র পরীক্ষা করতে শুরু করে, আর আমরা আশ্চর্য হয়ে দেখি যে মন্ত্রী, পুলিশ, বিচারক, সাংসদের গাড়িতেও লাইসেন্স ও অন্যান্য সনদ নেই। তারা ট্রাফিক আইন ভঙ্গের দায়ে বড় বড় হোমরাচোমরাদের গাড়ি আটক করে। গাড়ি-রিকশাকে লেন মানতে বাধ্য করে, পথচারীদের সুশৃঙ্খলভাবে ফুটপাতে ওঠায়, জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করতে শেখায়। ক্রমশ এ আন্দোলন স্কুল–কলেজের ছাত্রদের থেকে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজগুলোতে, ঢাকার বাইরে আরও ৪২টি জেলায়। ২ আগস্ট সরকার সব স্কুল–কলেজ বন্ধ ঘোষণা করে কিন্তু শিক্ষার্থীরা পথ ছাড়ে না। বহুদিন পর একটা স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে, সাধারণ মানুষ একাত্মতা প্রকাশ করে কারণ, বিষয়টা রাজনৈতিক নয়, বিষয়টা একেবারেই বাঁচা–মরার, সাধারণ মানুষের সন্তানদের জান-জীবনের প্রশ্ন।
নগরবাসীর চাওয়া কমতে কমতে এখন তলানিতে নেমেছে। আমাদের কোনো নাগরিক অধিকারই আর অবশিষ্ট নেই যখন, তখনো আমরা মাঝেমধ্যে চাই কেবল আমাদের সন্তানদের বেঁচে থাকার একটুখানি অধিকার, যেন স্কুল–কলেজ থেকে তারা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারে।
কিন্তু শেষ অবধি যা হয়, সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন পথে নেমে পড়ে তাদের বিরুদ্ধে, আন্দোলনকে রাজনৈতিক রং দেওয়া হয়, ধরপাকড় ও সংঘর্ষ হতে থাকে, একসময় পরিবহন শ্রমিকেরাও রাস্তায় নামে, সব মিলিয়ে জগাখিচুড়ি। একটা একেবারেই মৌলিক দাবি, একদমই সাধারণ নাগরিক অধিকারের চাওয়াকে গলা টিপে হত্যা করা হয়। কী আশ্চর্য, আমাদের এই আজব শহরে প্রতিদিন রাজপথে নেমে বেঁচে ফেরার নিশ্চয়তাটুকু চাইতেও যেন দোষ। যেন শ্বাপদসংকুল জঙ্গলের মতো এখানেও প্রাণ হাতে নিয়েই বের হতে হবে শিশুদের—এটাই নিয়ম এ রাজ্যের।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী প্রতিবছর হাজারো তাজা প্রাণ সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়ে যাওয়ার পেছনের ৫৩ শতাংশ ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে; ৩৭ শতাংশ চালকের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে এবং বাকি ১০ শতাংশ গাড়ির ত্রুটি ও পরিবেশের কারণে। আমাদের এ মেগাসিটির সড়ক পরিবহনব্যবস্থা চরমভাবে বিশৃঙ্খল, দুর্ঘটনাপ্রবণ, বৈষম্যপূর্ণ, নারী ও শিশুবান্ধবহীন। গাড়িচালক বা পথচারী কারোরই ট্রাফিক আইন মানার বালাই নেই, পরিবহন শ্রমিকেরা উদ্ধত ও বেপরোয়া, ভিআইপিরা স্বঘোষিতভাবেই আইনের ঊর্ধ্বে, পুলিশ ট্রাফিক ক্ষেত্রবিশেষে অতি সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয়।
নগরবাসীর চাওয়া কমতে কমতে এখন তলানিতে নেমেছে। আমাদের কোনো নাগরিক অধিকারই আর অবশিষ্ট নেই যখন, তখনো আমরা মাঝেমধ্যে চাই কেবল আমাদের সন্তানদের বেঁচে থাকার একটুখানি অধিকার, যেন স্কুল–কলেজ থেকে তারা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারে, যেন দুই বাসের চাপায় রাজীবের মতো হাতখানি হারাতে না হয়, যেন নাঈমের বাবার মতো আহাজারিতে প্রকম্পিত না হয় ভারী বাতাস। দুধারে রাস্তা আটকে সাঁই সাঁই করে চলা গাড়িগুলোতে বসে যারা কালো কাচের মধ্য দিয়ে শহরটাকে দেখেন, তারা কি দেখতে পান এই শহরের রাজপথ শিশু–কিশোরদের নিষ্পাপ রক্তে কেমন রঞ্জিত হয়ে আছে, তারা কি বলতে পারবেন আরবের কোন সুগন্ধি কি এই রক্তের গন্ধ দূর করতে পারবে?
তানজিনা হোসেন কথাসাহিত্যিক ও চিকিৎসক