
আগামী অক্টোবর মাসের শেষ দিকে রোমে জি-২০ নেতারা একটি সম্মেলনে মিলিত হতে যাচ্ছেন। সেখানে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে ভবিষ্যতে মহামারি কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু আসল ঘটনা হলো, এসব ধনী দেশের কাজকর্মই সারা দুনিয়ায় মহামারি ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে বড় প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে।
জি-২০ জোটভুক্ত অনেক দেশই করোনাভাইরাসের অতিবিস্তারকারী দেশ। উৎপত্তিস্থল চীন প্রথম দিকে মহামারির তথ্য চেপে গিয়েছিল। চীনের বাইরে সংক্রমণের চিত্রটি যদি আমরা অনুধাবন করি, তাহলে দেখতে পাব, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য ধনী দেশগুলো শুরুতেই ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছিল। তারা মূলত বিশ্বব্যাপী ভাইরাসটির বিপুল বিস্তারের জন্য দায়ী। ধনী বিশ্ব যদি তাড়াতাড়ি পদক্ষেপ নিতে পারত, তাহলে অন্তত গরিব দেশগুলোয় সংক্রমণ ধীরে হতো।
সারা বিশ্বের সব মানুষকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব টিকাকরণের প্রতিশ্রুতি দিতে ধনী দেশগুলো ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তারা বিশ্বকে বিনা লড়াইয়ে পরাজয় মেনে নেওয়ার একটা দুষ্টচক্রে ঠেলে দিয়েছে, যার ফলে ভবিষ্যতে এই ভাইরাসের আরও সংক্রমণক্ষম ও অধিক ক্ষতিকর ধরন জন্ম নেওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, গত বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত আকাশপথে মানুষের চলাচল ছিল করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক বিস্তারের মূল কারণ। ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে লন্ডন বিমানবন্দর থেকে আলফা ভেরিয়েন্ট (ইউকে ও কেন্ট ভেরিয়েন্ট নামেও প্রচলিত) বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। তা হয়েছিল বিমানবন্দর থেকে উড়োজাহাজের অবাধ চলাচলের জন্য। যুক্তরাজ্য কোভিড-১৯ ভাইরাসের অতিবিস্তারকারী দেশ।
মহামারির শুরুর দিককার তথ্য থেকে আমরা দেখতে পাই, সময়ের ব্যবধানে কীভাবে ভাইরাসটির ভিন্ন ধরনের জন্ম হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জি-২০ দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ব্যর্থতা স্পষ্টত লক্ষণীয়।
নিউইয়র্ক হচ্ছে প্রথম দিককার করোনার অতিবিস্তারকারী একটি নগর। সেখানে প্রথম কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয় ২০২০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি। তারও এক মাস আগে চীনের কিছু অংশে বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয় আমেরিকা। যদিও একই সময়ে ইতালিতে ভাইরাসটি রীতিমতো তাণ্ডবলীলা চালাচ্ছিল। এরপরও ১৩ মার্চের আগে ইউরোপের সঙ্গে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। ভাইরাস বিস্তারের তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, চীন থেকে নিউইয়র্কে করোনাভাইরাসের বিস্তার সরাসরি হয়নি। এর পরিবর্তে ইউরোপের সঙ্গে ভ্রমণ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিধা নিউইয়র্কে ভাইরাসটির একাধিক ভেরিয়েন্ট ছড়িয়ে দিয়েছিল। এর ফলে পাহাড়সম মৃত্যুর বোঝা বইতে হয়েছে শহরটিকে।
করোনাভাইরাসের বিস্তারকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও এখন আবার জি-২০ দেশগুলো সুকৌশলে যে বিষয় এড়িয়ে যাচ্ছে সেটি হলো, কাদের সবচেয়ে বেশি ভ্যাকসিন প্রয়োজন
এসব ব্যর্থতার কারণে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে জি-২০–ভুক্ত দেশগুলো মহামারি ব্যবস্থাপনায় বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে কি না। বিশ্বের অগ্রসর ও বড় অর্থনীতির দেশগুলো যদি আগেভাগেই যোগাযোগ বন্ধ করে দিতে পারত, দেশের ভেতরে চলাচল সীমিত করতে পারত, তাহলে তাদের দেশে কোভিডের ধ্বংসযজ্ঞ অনেক কম হতো।
ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়ানো সীমাবদ্ধ করা গেলে গরিব দেশগুলোয় রোগবিস্তার ধীর করে দেওয়া যেত। এমনকি কার্যকর ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের আগপর্যন্ত সেসব দেশে রোগটিকে ঠেকিয়ে রাখাও সম্ভব হতো। তা করা গেলে গরিব দেশগুলোয় বিপুল ব্যয়সাধ্য নিষেধাজ্ঞা এড়ানো যেত। জি-২০ নিজ নিজ দেশে বাইরে থেকে ভাইরাস আসা ঠেকাতে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু তাদের কাছ থেকে অন্য দেশে ভাইরাস ছড়ানো ঠেকাতে মোটেই মনোযোগ দেয়নি।
করোনাভাইরাসের বিস্তারকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও এখন আবার জি-২০ দেশগুলো সুকৌশলে যে বিষয় এড়িয়ে যাচ্ছে সেটি হলো, কাদের সবচেয়ে বেশি ভ্যাকসিন প্রয়োজন। ধনী দেশগুলো ভ্যাকসিনের মজুত করছে। শিশুদের টিকাকরণে গুরুত্ব দিচ্ছে। যদিও শিশুরা কোভিড-১৯ ভাইরাস সংক্রমণের সবচেয়ে কম ঝুঁকিতে রয়েছে। এমনকি বড় কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই ধনী দেশগুলো বুস্টার ডোজ দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। এই ফাঁকে কোভিড-১৯ ভাইরাস উন্নয়নশীল দেশগুলোয় ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। টিকা না পাওয়ায় সেখানে সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মীরা মারা যাচ্ছেন। এই মহামারি ২০২১ সালের আট মাসেই ২০২০ সালের চেয়ে বেশি মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ ডেলটা ভেরিয়েন্টের আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যেসব অঞ্চলে এখনো টিকাকরণের হার খুব কম, সেসব অঞ্চলে ভাইরাসের নতুন ভেরিয়েন্টের উদ্ভবের ব্যাপারে তাঁরা সতর্ক করেছেন।
জি-২০–ভুক্ত দেশগুলোকে অবশ্যই তাদের ব্যর্থতা সামলে নিতে হবে। যেসব দেশের মানুষ বেশি ঝুঁকিতে আছে, তাদের টিকাকরণের অঙ্গীকার করতে হবে। অতিসংযোগকারী দেশ হিসেবে তাদের জীবাণু নজরদারি ও ভ্রমণের নতুন আন্তর্জাতিক প্রটোকল তৈরি করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে, তারা যেন আবার ভাইরাসের অতি-বিস্তারকারী না হয়ে ওঠে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
● নরি উডস অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লাভাতনিক স্কুল অব গভর্মেন্টের ডিন
● আনা পেথেরিক অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লাভাতনিক স্কুল অব গভর্মেন্টের জননীতি বিষয়ের