মতামত

প্রথম আলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে যে কারণে

নিজের আঁকা প্রথম আলোর প্রতিলিপি হাতে নুরানী ইসলাম।
ছবি: সোয়েল রানা

পৃথিবীর সব ভালো ভালো কথা কি ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম বলে গেছেন? ইদানীং ফেসবুকে ঢুকলে এমন প্রশ্ন মাথায় আসতেই পারে। দেখা যায়, অনেকেই নানা রকম উপদেশমূলক উক্তির সঙ্গে কালামের নাম ও ছবি জুড়ে দিয়ে স্ট্যাটাস দেন। এই প্রবণতা অবশ্য কালে কালে বিভিন্ন জায়গায়ও ছিল। কোনো প্রজ্ঞার কথা যদি চমৎকার উইটসহ বলা হতো, সেটাকে অনেক সময়ই চালিয়ে দেওয়া হতো উইটের রাজা মার্ক টোয়েনের নামে। তাঁর নামে প্রচারিত (যদিও পরে প্রমাণিত হয়েছে উক্তিটি তাঁর নয়) একটি উক্তি আজকের এই কলামের সঙ্গে খুবই প্রাসঙ্গিক—‘মিথ্যা যতক্ষণে অর্ধেক পৃথিবী ভ্রমণ শেষ করে, ততক্ষণে সত্য মাত্র জুতা পরা শেষ করে।’

মিথ্যা প্রচারিত হওয়ার শক্তি বোঝাতে রূপকভাবে বলা হয়েছিল কথাগুলো, কিন্তু সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এটা নিশ্চয়ই কারও কষ্ট-কল্পনায়ও আসেনি, মিথ্যা সত্যিই এত দ্রুত প্রচারিত হতে পারে। সামাজিক মাধ্যমের যুগে আজ আক্ষরিক অর্থেই মিথ্যা অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বহু আগে যেমন সংবাদ প্রচারিত হওয়ার মাধ্যমগুলো ধ্রুব থাকা সত্ত্বেও সত্য মিথ্যার অনেক পেছনে পড়ে থাকত, আজও পরিস্থিতি একই আছে, কিংবা খারাপ হয়েছে আরও।

ফ্রান্সেস হাউগেনের বয়ানে তথ্যের চরিত্রে সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব
সম্প্রতি ফেসবুকের সিভিক ইনটিগ্রিটি ডিপার্টমেন্টের সাবেক প্রোডাক্ট ম্যানেজার ফ্রান্সেস হাউগেন হইচই ফেলে দিয়েছেন বিশ্বব্যাপী।

হাউগেনের বয়ানে, ‘আমরা এমন একটি তথ্যনির্ভর পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যে আছি, যেটা ক্ষোভ, বিদ্বেষ ও মেরুকরণের কনটেন্ট দিয়ে পূর্ণ, এটা আপনার নাগরিক বিশ্বাসকে ক্ষয় করতে থাকে, একে অন্যের ওপর বিশ্বাস নষ্ট করতে থাকে, আমাদের একে অন্যের যত্ন নেওয়ার ক্ষমতা কমাতে থাকে। ফেসবুকের যে সংস্করণটি এখন আছে, সেটি আমাদের সমাজব্যবস্থাকে ছিঁড়ে ফেলছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জাতিগত সহিংসতার জন্ম দিচ্ছে।’

হাউগেন আমাদের জানিয়েছেন, কীভাবে ফেসবুকের অ্যালগরিদম মিথ্যা, ঘৃণা-বিদ্বেষসম্পন্ন পোস্টগুলোকেই বেশি ছড়িয়ে দেয়। কারণ, এতেই তার আয় অনেক বেড়ে যায়। কীভাবে এই টেক-জায়ান্টটি স্রেফ তার ব্যবসাকেই একমাত্র লক্ষ্য করে, কেন অনলাইনে ভুয়া তথ্যের প্রচারণা, মিথ্যাচার, সহিংসতা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় মনোযোগী হয় না, কীভাবে ফেসবুক তার সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করার জন্য ফেসবুককে নাগরিকদের জন্য আরও নিরাপদ, ইতিবাচক শক্তি হয়ে ওঠার পথে বাধা দেয়, কীভাবে এই উদ্দেশ্যে গঠিত সিভিক ইনটিগ্রিটি ডিপার্টমেন্টটিই বিলুপ্ত করে দিয়েছিল, সেসবও আমরা জানতে পেরেছি সবিস্তারে।

এর অনিবার্য ফল হয়েছে নানামুখী। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা শুনে নিই হাউগেনের বয়ানে, ‘আমরা এমন একটি তথ্যনির্ভর পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যে আছি, যেটা ক্ষোভ, বিদ্বেষ ও মেরুকরণের কনটেন্ট দিয়ে পূর্ণ, এটা আপনার নাগরিক বিশ্বাসকে ক্ষয় করতে থাকে, একে অন্যের ওপর বিশ্বাস নষ্ট করতে থাকে, আমাদের একে অন্যের যত্ন নেওয়ার ক্ষমতা কমাতে থাকে। ফেসবুকের যে সংস্করণটি এখন আছে, সেটি আমাদের সমাজব্যবস্থাকে ছিঁড়ে ফেলছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জাতিগত সহিংসতার জন্ম দিচ্ছে।’

যেহেতু মিথ্যা, ঘৃণা ও বিদ্বেষপূর্ণ পোস্ট মানুষের বেশি মনযোগ আকর্ষন করে , তাই যাঁরা এসব মিডিয়ার জন্য আধেয় তৈরি করেন, তাঁরাও সেরকম আধেয়ই বানান। এতে তাঁদের বেশি আয় কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন সহজ হয়। অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে এই চক্রেই বন্দী হয়ে পড়েছে আজকের সামাজিক মাধ্যম। স্বল্প এবং মধ্য মেয়াদে (দীর্ঘ মেয়াদে নয়) সাংবাদিকতা এবং মিডিয়ার জন্য এটি এক বিরাট চ্যালেঞ্জ তো বটেই।

কর্তৃত্ববাদ এবং সিএনএনও যখন ‘ফেইক নিউজ’
সদ্য নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জনাকীর্ণ এক সংবাদ সম্মেলনে সিএনএনের সাংবাদিকের প্রশ্নের মুখে পড়েন। কিন্তু ট্রাম্প কোনোভাবেই সেই সাংবাদিকের কোনো প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন না। সিএনএনসহ কিছু ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ার প্রতি ট্রাম্পের অ্যালার্জির কথা আমরা অনেকেই জানি। তো সেই নাছোড়বান্দা সাংবাদিককে নিবৃত্ত করতে না পেরে এক পর্যায়ে ট্রাম্প খেপে গিয়ে তাঁকে বলে ওঠেন, ‘ইউ আর ফেইক নিউজ’।

বর্তমান বিশ্বে সাংবাদিকতা তথা মিডিয়ার আরেক বড় শত্রু কর্তৃত্ববাদী শাসন। পুরো কর্তৃত্ববাদী দেশ বাদেও গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও কর্তৃত্ববাদের উত্থান হচ্ছে। সেসব দেশে স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সব মূলধারার মিডিয়াকে আক্রমণ করাই হয়ে ওঠে এসব রাজনৈতিক নেতাদের এক প্রধান উদ্দেশ্য। কারণ, এই মিডিয়াগুলোই তাদের চিন্তা এবং মতের প্রতিভাষ্য বা কাউন্টার-ন্যারেটিভ তৈরি করে।

আমেরিকার মতো উন্নত প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রের দেশে মূলধারার মিডিয়া যখন এ রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় সাম্প্রতিক অতীতেই, তখন আমাদের মতো দেশে এই পরিস্থিতি কেমন, সেটা বোঝা নিশ্চয়ই রকেটবিজ্ঞান নয়।

বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের চোখে
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি সাংবাদিকতা এবং মিডিয়ার জন্য কী দুর্বিষহ অবস্থা তৈরি করেছে, সেটা খুব চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের (আরএসএফ) সাম্প্রতিকতম রিপোর্টের ভূমিকায়। রিপোর্টের শুরুতে ২০২০ সালের প্যানডেমিক এবং বিধিনিষেধের সময় সাংবাদিক, সাধারণ নাগরিক, ব্লগার এবং কার্টুনিস্টদের ওপরে মারাত্মক সহিংসতা এবং নির্যাতনের কথা বলা হয়। এরপরের অংশ এ রকম—সমস্যাজনক মনে হওয়া সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ করার জন্য সরকারের কাছে আছে একেবারে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি করা একটি আইনি অস্ত্র-২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এই আইনে ‘সরকারের সমালোচনা’ একটা অপরাধ, যেটার শাস্তি হতে পারে ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।

বাংলা দৈনিক প্রথম আলো এবং ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার-এর রিপোর্টারদের সরকারি প্রেস কনফারেন্সে প্রবেশাধিকার নেই, এটাই হতে পারে অবিশ্বাসের যে নতুন পরিবেশ তৈরি হয়েছে তার এক প্রতীক। যেসব সাংবাদিক দুর্নীতি এবং স্থানীয় অপরাধী চক্র নিয়ে ইনভেস্টিগেশন করেন, তাঁদের বর্বর সহিংসতার মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি আছে, যার পরিণতি হতে পারে নির্যাতন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত।

এতে সেলফ সেন্সরশিপ এতটা অভূতপূর্ব পর্যায়ে গেছে কারণ, যৌক্তিকভাবেই সম্পাদকেরা কারাগারে যাওয়া কিংবা তাঁদের মিডিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইছেন না.... . সাংবাদিকেরা দলীয় নেতা-কর্মীদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, জবাবদিহিহীনভাবে গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং অনেক সংবাদ-ওয়েবসাইট বন্ধ করা হয়েছে।

বাংলা দৈনিক প্রথম আলো এবং ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার-এর রিপোর্টারদের সরকারি প্রেস কনফারেন্সে প্রবেশাধিকার নেই, এটাই হতে পারে অবিশ্বাসের যে নতুন পরিবেশ তৈরি হয়েছে তার এক প্রতীক। যেসব সাংবাদিক দুর্নীতি এবং স্থানীয় অপরাধী চক্র নিয়ে ইনভেস্টিগেশন করেন, তাঁদের বর্বর সহিংসতার মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি আছে, যার পরিণতি হতে পারে নির্যাতন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত।

এই রিপোর্টে এখন পর্যন্ত মিডিয়ার স্বাধীনতা হরণকারী ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কথাই বলা হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি বলছে, সামনের সময়টা আরও ভয়ংকর হতে যাচ্ছে। পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন এবং সামাজিক মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের নামে প্রস্তাবিত হয়েছে আরও দুটি আইন। বলা বাহুল্য, আইনগুলো এ ক্ষেত্রে আরও বেশি নিপীড়নকারী হয়ে উঠবে।

প্রসঙ্গত রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে ক্রমাগত অবনতি হতে হতে ২০২০ সালে বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ১৫২তম। জেনে রাখি আরও কিছু দেশের অবস্থান: আফগানিস্তান (১২২), উগান্ডা (১২৫), মিয়ানমার (১৪০), পাকিস্তান (১৪৫)। হতাশা আরও বাড়ানোর জন্য ইউরোপ-আমেরিকা দেখার দরকার নেই, দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভুটান (৬৫), মালদ্বীপ (৭২), নেপাল (১০৬)-এর দিকে তাকালেই চলবে।

বাংলাদেশের মিডিয়ায় লুটেরা পুঁজির প্রভাব

মূলধারার একটি প্রিন্ট কিংবা ইলেকট্রনিক মিডিয়া অত্যন্ত পুঁজিঘন ব্যবসা। হ্যাঁ ব্যবসা, চ্যারিটি নয়। কোনো এক অদ্ভুত কারণে আমাদের দেশের অনেক মানুষের মিডিয়াকে একধরনের চ্যারিটি হিসেবে দেখার প্রবণতা আছে। মানুষের মাথায় রাখা উচিত, মিডিয়া যেহেতু একটি ব্যবসা, তাই পৃথিবীর কোনো মিডিয়ার কাছেই শতভাগ নিখুঁত হওয়া দাবি করতে আমরা পারি না। মালিকপক্ষ, বিজ্ঞাপনদাতাদের কিছু প্রভাব মিডিয়ার ওপরে থাকতেই পারে। এই প্রবণতা বৈশ্বিক, কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতি একেবারেই আলাদা।

এই দেশে প্রচুর লুণ্ঠিত পুঁজির মালিক মিডিয়ার মালিক বনে গেছেন। ফলে সেগুলো একটি দায়িত্বশীল মিডিয়া হিসেবে ন্যূনতম যতটুকু মান বজায় রাখার কথা ছিল, সেটুকু রাখছে না। এমনকি বহু ক্ষেত্রেই সেসব মিডিয়ার মালিকই মিডিয়াটিকে ব্যবহার করেন নিজের অন্য ব্যবসার রক্ষাকবচ হিসেবে এবং ব্যবসায়িক কিংবা অন্য ক্ষেত্রের প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘায়েল করার অস্ত্র হিসেবে।

ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কিছুদিন আগে এই পরিস্থিতি বোঝাতে গিয়ে যথার্থই বলেছেন, ‘আমরা তো জানি, এখন সাংবাদিকেরা কী বিপদের মধ্যে আছেন। তাঁরা যে সংবাদ নিয়ে যান, সেটা প্রকাশ পায় না। সেটা মালিকের অধীন চলে যায়। এবং মালিক হচ্ছেন টাকার জোরে মালিক হয়েছেন। অনেক সম্পাদককে বলতেই হয়… অনেক সম্পাদকের দায়িত্ব হচ্ছে মালিকের পাবলিক রিলেশনস অফিসার হিসেবে কাজ করা।’

কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে পেশাদার প্রাতিষ্ঠানিক মিডিয়াই
নিশ্চিতভাবেই মূলধারার মিডিয়ার স্খলন আছে, তারা কখনো কখনো মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তাই মাঝেমধ্যেই মানুষ সামাজিক মাধ্যমের ‘ইকো-চেম্বার’গুলোতে যায়। সেখানে সত্য-মিথ্যার বাছবিচার না করে মনের মতো তথ্য পেয়ে শান্তি পেতে চায়। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমকে ভিত্তি করে ইকো-চেম্বার তৈরির মাধ্যমে মানুষকে তার পছন্দের ‘সত্য’ দিয়ে ভুলিয়ে রাখার পরিস্থিতি দীর্ঘ মেয়াদে থাকবে, এটা আমি বিশ্বাস করি না।

যে কারও যেকোনো কিছু বলার ক্ষমতা যখন থাকছে, তখন সামনে আসা অকল্পনীয় পরিমাণ তথ্যের সত্যতা নিয়ে মানুষ সন্দিহান হয়ে পড়তে বাধ্য। সামাজিক মাধ্যমের ইকো-চেম্বারগুলোতে যেসব ব্যক্তি বা সাইট ‘প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে কাজ করছে, তাদের দেওয়া তথ্যও একে একে যখন মিথ্যা প্রমাণিত হতে থাকবে (যেটা অনিবার্য), তখন এগুলোর ওপর মানুষ একসময় আস্থা হারাবেই। খুব সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশেই এর আলামত আমি দেখতে পাচ্ছি।

একজন বিখ্যাত তরুণ নারী রাজনীতিবিদ এবং একজন অত্যন্ত স্বনামধন্য সম্পাদকের বিরুদ্ধে নোংরা কুৎসায় পূর্ণ মিথ্যা খবর প্রকাশ করা হয়েছে যেনতেন কিছু নিউজ পোর্টালে, সঙ্গে তৈরি করা হয়েছে ভিডিও। সেগুলো সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এসব পোস্টে মানুষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে, সেটা আমাদের এই সমাজের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অন্তত প্রাথমিক ধারণা দেয়। তাই আগ্রহ নিয়ে সেসব পোস্টের মন্তব্য পড়তে গিয়েছি এবং তাতে আমি বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক মিডিয়া নিয়ে হতাশ না হয়ে বরং আশাবাদী হয়ে উঠেছি।

মন্তব্যগুলোর বেশির ভাগ লেখা হয়েছে ভুল বানানে, ভুল বাক্যে। আমি এসব মন্তব্যকারীর অনেকের ফেসবুক প্রোফাইলে প্রবেশ করেছি। বুঝতে পেরেছি, বেশির ভাগ খুব কম শিক্ষিত সাধারণ মানুষ। কিন্তু এই মানুষগুলোই একেবারেই গ্রহণ করেননি এসব ফেইক নিউজ। তাঁরা এসব সংবাদ বা ভিডিও প্রস্তুতকারীদের বিরুদ্ধে তাঁদের রাগ-ক্ষোভ-ঘৃণা প্রকাশের জন্য তীব্র আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করেছেন; অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন ভয়ংকর গালিরও।

একটি ভীষণ নারীবিদ্বেষী সমাজে একজন অসাধারণ সফল নারী কিংবা একজন অতি প্রতিষ্ঠিত পুরুষের নামে স্ক্যান্ডালের মতো অতি উপাদেয় ‘খবর-খাদ্য’ও ছুড়ে ফেলে দিয়েছে মানুষ। হ্যাঁ, ‘সত্য-উত্তর যুগে’ বাংলাদেশের মতো একেবারেই অনগ্রসর একটা সমাজেও যাচ্ছেতাই করে যাওয়া যাচ্ছে না।

বর্তমান ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশে প্রথম আলো
সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক ফেইক নিউজের চরম বাড়বাড়ন্তের বৈশ্বিক পরিস্থিতি আছে এই দেশেও, অনগ্রসর হওয়ার সমাজ হওয়ার কারণে অনেক বেশিই আছে। এই দেশে আছে লুণ্ঠনে সৃষ্ট পুঁজির দাপট। সর্বোপরি আছে একটি কর্তৃত্ববাদী সরকার। বিশ্বাসযোগ্যতার অভাবে ‘সত্য-উত্তর যুগ’ সম্পর্কিত সংকট কেটে যাবে, নিশ্চিত। কর্তৃত্বপরায়ণতার কালও অনন্ত হবে না। স্যামুয়েল হান্টিংটন বলেছেন, গণতন্ত্রের জোয়ার-ভাটা আছে। গণতন্ত্রের বর্তমান বৈশ্বিক ভাটা কেটে জোয়ার আসবেই।

কিন্তু বর্তমানে বিদ্যমান পরিস্থিতি একটি সংবাদপত্রের স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য ভীষণ প্রতিকূল। ২৩ বছরের পথচলায় প্রথম আলো এর চেয়ে কঠিন সময় সম্ভবত আর পার করেনি। তবে আমি বিশ্বাস করি, সমস্যাসংকুল সময়টা ঠিকই পাড়ি দেবে প্রথম আলো, আরও উজ্জ্বল হয়ে জ্বলবে প্রথম আলোর আলো। এই আলোয় গত ২৩ বছরের মতো আরও বহু যুগ আলোকিত হবে আমাদের মানস-মনন।

একের পর এক ভেঙে পড়া রাষ্ট্রীয় এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দেশে প্রথম আলো টিকে থাকবে এক শক্তিশালী, আস্থার প্রতিষ্ঠান হিসেবে। প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে আমি দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছি ‘সত্য-উত্তর যুগে’ তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আস্থাযোগ্য, বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব আরও বাড়বে। আর সেই প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রথম আলো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, মূল্যবান, প্রভাবশালী হয়ে উঠবে সামনের দিনগুলোতে। উঠবেই।

ডা. জাহেদ উর রহমান ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষক
zahedff@gmail.com