ঢাকা তুমি কার? এটা যদি কবিতার ‘মামলা’ হতো, তাহলে বলতাম এটা কবি শামসুর রাহমানের ‘স্মৃতির শহর’। কিন্তু এটা জীবনের মামলা। সেই মামলায় ঢাকাকে ভালোবাসার দাবিদার বোধ হয় এই সময়ের কিশোর-তরুণেরা। পরপর দুটি সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলন দিয়ে জানিয়েছে, তারা এই শহরকে ভালোবাসে।
এই শহরে যাদের বেড়ে ওঠা; এই শহরের রাস্তা-ফুটপাত, যানবাহনে যাদের শৈশব ও তারুণ্যের একটা সময় কাটে, এই যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যম ছাড়া যাদের স্কুল-কলেজে বা বন্ধুর বাড়িতে বা আত্মীয়ের দাওয়াতে যাওয়ার উপায় নেই; যাদের ভালোবাসার আরেকটি বিকল্প শহর আসলেই নেই, তারা কী করবে? তারা যতটাই ভালোবাসবে ততটাই প্রতিরোধ করবে। ভালোবাসে বলেই এর সড়কের স্বৈরাচার মানতে চায় না। ভালোবাসে বলেই এখানে তারা স্বস্তি ও নিরাপত্তা চায়।
এই শহরের রাস্তা জীবন তো খেয়ে নেয়ই, আয়ুও শুষে নেয়। একবার হিসাব করে দেখেছিলাম, যানজটে নষ্ট হওয়া সময় যোগ করলে গড় আয়ু থেকে সাত-সাতটা বছর খোয়া যায়। সড়কে বাসে-লেগুনায় চলাচলে মন ও স্বাস্থ্যের ওপর, নারী ও শিশুর ওপর, প্রসূতি ও বৃদ্ধদের ওপর যে ধকল যায়, তা যেন সশ্রম কারাদণ্ডের সমান।
ছাত্রছাত্রীদের সড়কে নিরাপত্তা আন্দোলন তাই ন্যায্য, যৌক্তিক ও জরুরি। কিন্তু খেয়াল করা গেল একটা বিষয়। ইদানীং যাঁরা গাড়িচাপা দিয়ে যাত্রী ও পথচারী হত্যার সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন, আন্দোলনকারীরা তাঁদের ফাঁসি দাবি করছে। অবশ্যই এ ব্যাপারে তারাই প্রথম নয়; শাহবাগ আন্দোলনেও শিশুদের মুখ দিয়ে ফাঁসির স্লোগান দেওয়ানো হয়েছিল।
ক্ষমা একটি নীতি, কিন্তু সব ক্ষেত্রে ক্ষমা করলে জীবন চলে না। শাস্তি অবশ্যই দরকার। কিন্তু প্রতিহিংসা আর শাস্তির মধ্যে তফাতটাও ভুললে চলে না। আমার কেউ কারও হাতে নিহত হলে আমিও তার মৃত্যু দাবি করতেই পারি। একে বলে প্রতিহিংসা।
প্রতিহিংসার আগে ‘প্রতি’ কথা দিয়ে বোঝানো হয় যে হিংসা করে মৃত্যু দাবি করা হচ্ছে না, হিংসার জবাবে হিংসা চলে এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে চাইবে, আদালতের কাজ হচ্ছে তার মধ্য থেকে মনের হিংসা সরিয়ে বিচারিক শাস্তি নিশ্চিত করা। সেই শাস্তি সর্বোচ্চও হতে পারে, সর্বনিম্নও হতে পারে। কিন্তু ঘৃণায় অন্ধ হয়ে মৃত্যু কামনা অসুস্থতা।
সড়কে বাসে-লেগুনায় চলাচলে মন ও স্বাস্থ্যের ওপর, নারী ও শিশুর ওপর, প্রসূতি ও বৃদ্ধদের ওপর যে ধকল যায়, তা যেন সশ্রম কারাদণ্ডের সমান।
প্রতিহিংসা আর বিচারিক শাস্তি তাই এক নয়। সর্বোচ্চ শাস্তি মানেই যে মৃত্যুদণ্ড হতে হবে, তাও নয়। অনেক দেশেই মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ। তাতে তাদের দেশে অপরাধ না বেড়ে বরং কমেছে। খুব করে খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, শাস্তি দিয়ে অপরাধ কমানো যায় না। শাস্তি হচ্ছে একটা সেফটি ভাল্ভ, যার ভেতর দিয়ে কিছু সমস্যা নিষ্কাশন করা হয়, ভুক্তভোগীদের মনে সান্ত্বনা আনা হয় এবং সম্ভাব্য অপরাধীদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি জানানো হয়। তাহলেও সর্বোচ্চ শাস্তি অপরাধ কমায় না। অপরাধ কিংবা অন্যায়-অনিয়ম কমায় রাষ্ট্রের সজাগ-সতর্ক প্রহরা। এমন আইন, প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও সমাজ তৈরি করতে হয়, যেখানে অপরাধ ঘটানোই কঠিন হয়ে যাবে।
যদি দুর্নীতি কমানো যায়, তাহলে রক্তপাতও কমে। কীভাবে? যদি ঢাকা শহরের পরিবহনব্যবস্থাকে মাফিয়ামুক্ত করা যায়, যদি তাদের মুনাফার সীমা ঠিক করে দেওয়া যায়, যদি পুলিশ ও ট্র্যাফিক-ব্যবস্থা কঠোর হয়, যদি গাড়ি, চালক ও পরিবহনব্যবস্থাকে আধুনিক, মানবিক ও বৈজ্ঞানিক করা হয়, তাহলে চালকের স্বেচ্ছাচারী, যাত্রীদের হুড়োহুড়ি, রাস্তার দুর্গতি—সব কমে আসবে। এসব কাজ না করে চালকের ফাঁসি দিলে মনে সান্ত্বনা আসবে বটে, কিন্তু সড়কে থাকার দুঃসহ ঘণ্টাগুলো মোটেই স্বস্তিকর হবে না।
কিন্তু কিশোর-তরুণেরা দেখেছে, হত্যার শাস্তি হিসেবে পাল্টা–হত্যার সংস্কৃতি, ফাঁসিবাদী সংস্কৃতি। ‘বিজ্ঞ ও মহান’ মানুষের কণ্ঠেই তারা শুনেছে ফাঁসিবাদী প্রতিহিংসা। দেখেছে চোখের বদলে চোখ নেওয়ার অন্ধকরণ কর্মসূচি। তাই তারাও সমস্যার উত্তেজনায় ফাঁসি ছাড়া আর কিছু চাইতে পারছে না। আমাদের সবচেয়ে নিষ্কলুষ, সবচেয়ে প্রাণবাদী, ঢাকাকে ভালোবাসার যোগ্য উত্তরাধিকারীদের আমরা এই-ই শিখিয়েছি। কিশোর বিদ্রোহের দর্পণে আমরা যারা অভিভাবক, শিক্ষক, সিনিয়র সিটিজেন; নিজেদের দেখতে পাচ্ছি?
সমাজ বিষয়ে দুটি মডেলের কথা ভাবা যাক। একটা হলো উদ্যানের সংস্কৃতি, আরেকটা শিকারির সংস্কৃতি। শিকারির লক্ষ্য শিকারকে বধ করা। তার নিশানা কেবল শিকারের বুকের দিকে, কীভাবে তাকে আটকে ফেলা যাবে বা হত্যা করা যাবে। বাগানের মালির চিন্তা হলো কীভাবে বাগানে বহু রকম উদ্ভিদকে বাড়িয়ে তুলে ফুল-ফল ফলানো যাবে। প্রতিযোগিতা ও প্রতিহিংসার যে সমাজ আমরা হতে দিয়েছি, সেখানে শিকারির নীতিই শাসন করছে। প্রতিপক্ষকে শিকার করা, ফাঁদে ফেলে হত্যা করা, তাকে বিনাশ করা ছাড়া আমরা সন্তুষ্ট হতে পারি না। ক্রসফায়ার, ফাঁসি, খুনোখুনি করেও কি রক্তের হোলিখেলা থামল? থামে না, থামবেও না।
যে রাষ্ট্রে মানুষের জীবনের কোনো দাম আছে বলে মনে হয় না, সেখানে উত্তেজিত জনতার সামনে কয়েকটা ফাঁসির লাশ ছুড়ে দেওয়া কঠিন নয়। তাতে অপঘাতে মৃত্যু থামবে না। তাই কারও মৃত্যু চাওয়া নয়, টেকসইভাবে জীবন জিয়ানোর সংস্কৃতি চাই। তার মানে হলো নিজে বাঁচো এবং বাঁচতে দাও।
বিএনপির শীর্ষ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ারও উপযুক্ত চিকিৎসার সুযোগ না দেওয়ার মধ্যেও শিকারির নীতি কাজ করছে, বিনাশবাদী নীতি কাজ করছে। এটা হয়। সময়ে-সময়ে একটা পক্ষের মনে এমন ক্রোধ ও অসন্তোষ জন্মে যে তাদের মনে হয় বিনাশেই বুঝি জয় হবে। একাত্তর সালে বিদ্রোহী বাঙালির কাছে পাকিস্তান পরাজিত হয়েছে এ জন্যই। তারা বিনাশ চেয়েছে, বিজয়ের রূপ কী, তা বোঝেনি। ভগবান কৃষ্ণের বরাতে মহাভারতের বীর হলেন অর্জুন। তাঁর প্রতিপক্ষ নীচ কুলে বেড়ে ওঠা কর্ণ।
কর্ণের সঙ্গে কোনো পরাশক্তি দেবতা নেই, তিনি একা। তবু কর্ণকে হারানো যাচ্ছে না, কৌরবদের থামানো যাচ্ছে না। তখন কৃষ্ণের উসকানিতে বীরপুরুষ অর্জুনের মনের হিংসা তাঁর বিচারবোধকে দখল করে ফেলল। কাদায় যখন কর্ণের যুদ্ধরথ আটকে গেছে, কর্ণ যখন অপ্রস্তুত, সে সময় দুর্বল জায়গায় তির মেরে তাঁকে হত্যা করেন অর্জুন। এমন বিজয়ের সুযোগ কর্ণেরও এসেছিল, তিনি বীরধর্মের তেজে সেই সুযোগ নেননি। নিজের কু-রিপুর কাছে বশ মানেননি। কিন্তু ভাগ্যগুণে পাওয়া জয়ের তেমন সুযোগ অর্জুন ছাড়েননি। কর্ণ বলেছিলেন, ‘জয় নয়, অভীষ্ট চাহিয়াছি’। অর্থাৎ তোমাকে ধ্বংস করা আমার লক্ষ্য হতে পারে না, আমার লক্ষ্য হলো ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। ন্যায়ের স্বার্থেই আমি তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধও হিংসাতাড়িত ছিল না। ছিল আত্মরক্ষার যুদ্ধ; সেই আত্মরক্ষা মানে স্বার্থপর প্রাণী হিসেবে রক্ষা পাওয়া নয়। এ জন্যই মুক্তিযুদ্ধের মহান মর্ম প্রকাশকারী গানটা আজও এত জনপ্রিয়, ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি’।
আজকের সামাজিক আন্দোলনে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় শিকারির মনোভাব নয়, উদ্যানের মালির মনোভাবই জরুরি।
যে রাষ্ট্রে মানুষের জীবনের কোনো দাম আছে বলে মনে হয় না, সেখানে উত্তেজিত জনতার সামনে কয়েকটা ফাঁসির লাশ ছুড়ে দেওয়া কঠিন নয়। তাতে অপঘাতে মৃত্যু থামবে না। তাই কারও মৃত্যু চাওয়া নয়, টেকসইভাবে জীবন জিয়ানোর সংস্কৃতি চাই। তার মানে হলো নিজে বাঁচো এবং বাঁচতে দাও।
ফারুক ওয়াসিফ লেখক ও সাংবাদিক
faruk.wasif@prothomalo.com