প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

বাংলা একাডেমির ৬০ বছর

.

বাংলা একাডেমির ৬০ বছর পূর্তি হচ্ছে আজ ৩ ডিসেম্বর। ১৯৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও চেতনাজাত জাতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ছয় দশক পূর্তি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের হীরকজয়ন্তী নয়, বরং জাতি হিসেবে আমাদের অগ্রগমনেরও স্মারক। পৃথিবীর নানা দেশে ভাষা ও সাহিত্য গবেষণাকেন্দ্রিক বহু সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান আছে কিন্তু বলতে গেলে এদের কোনোটিরই ভাষা আন্দোলনের মতো কোনো ঐতিহাসিক-সংগ্রামী প্রেক্ষাপট নেই। ১৯৫৪-এর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পর তাদের ২১ দফার অন্যতম দফার বাস্তবায়ন হিসেবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণা-বিকাশের লক্ষ্যে ১৯৫৫-এর ৩ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমি যাত্রা শুরু করে। একাডেমি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তাই যুগপৎ তৎকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির আকাঙ্ক্ষা ও বাংলার মানুষের গণতান্ত্রিক সমর্থনের সংযোগ ঘটেছিল।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাকালীন অঙ্গীকার। তবে এই অঙ্গীকার মোটেও একমাত্রিক নয়, তাই বিশ্বের ধ্রুপদি ও সমকালীন চিন্তাপ্রবাহের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের কাজটি বাংলা একাডেমি শুরু থেকেই করে আসছে। ড. আহমদ শরীফের সম্পাদনায় লাইলী মজনু বই প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রকাশনা-ক্ষেত্রে একাডেমির যে যাত্রারম্ভ তা ক্রমশ ব্যাপ্ত হয়েছে সৈয়দ আলী আহসানের চর্যাগীতিকা, আনিসুজ্জামানের পুরোনো বাংলা গদ্য থেকে হোমার, অ্যারিস্টটল, রুশো, দেকার্ত, হেনরি মর্গানের বইপত্রের অনুবাদ পর্যন্ত। মনিরউদ্দীন ইউসুফের অনুবাদে মূল ফারসি থেকে ছয় খণ্ডে ফেরদৌসির শাহনামার বঙ্গানুবাদও দেশে-বিদেশে সমাদৃত হয়েছে। বাংলা একাডেমির প্রকাশনার ইতিহাস পর্যালোচনায় আমরা দেখি মোতাহের হোসেন চৌধুরীর মতো সংস্কৃতিতাত্ত্বিক একাডেমির জন্য অনুবাদ করেছেন বাট্রা৴ন্ড রাসেলের সুখ কিংবা ক্লাইভ বেলের সভ্যতা বই। পরবর্তীকালে বাংলা একাডেমির প্রকাশনার মাধ্যমে সরদার ফজলুল করিম প্লেটো, এঙ্গেলস প্রমুখ বিশ্বমনীষার সঙ্গে যেমন আমাদের পরিচয় ঘটিয়েছেন; তেমনি প্রাচীন-মধ্য-আধুনিক যুগের ইতিহাস গ্রন্থাবলি, বিশ্বখ্যাত আত্মজীবনী, বিজ্ঞান, দর্শন ইত্যাদি বিচিত্র বিষয়ে একাডেমি অসাধারণ সব বই প্রকাশ করেছে। সৃজনশীল সাহিত্যের বিকাশেও এ প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে ছিল না। বিশেষত নাটক যখন দৃশ্য ও শ্রুতিমাধ্যম-প্রধান তখন একাডেমি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র তরঙ্গভঙ্গ, মুনীর চৌধুরীর রক্তাক্ত প্রান্তর, আনিস চৌধুরীর অ্যালবাম থেকে শুরু করে ইবসেন, স্ট্রিন্ডবার্গ, জ্যাঁ আনুঈ প্রমুখের নাটকের বই প্রকাশ করেছে।
এই প্রতিষ্ঠানের আরেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ বিশিষ্ট বাঙালি লেখকদের রচনাসমগ্র প্রকাশ। মীর মশাররফ হোসেন, বেগম রোকেয়া, নজরুলের প্রামাণ্য ও পূর্ণাঙ্গ রচনাবলি প্রকাশ বাংলা একাডেমির জন্য গর্বের বিষয়। জীবনী গ্রন্থমালা সিরিজে একাডেমি বঙ্গীয় মনীষার বহু বিশিষ্টজনের জীবন ও কর্মের পরিচয় যেমন পাঠকের কাছে তুলে ধরেছে, তেমনি প্রান্তীয় পর্যায়ের অনেক গুণী মানুষের জীবনী প্রকাশ করে তাদের নিয়ে এসেছে পাদপ্রদীপের আলোয়। কয়েক বছর আগে ভাষা আন্দোলনের সব শহীদ, ভাষাসংগ্রামী এবং মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী প্রকাশ এই সিরিজে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। বাংলা একাডেমি অভিধান প্রণয়ন ও প্রকাশকে এক নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছে। এটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যে বাংলা একাডেমির অভিধান প্রণয়নের সঙ্গে নানা সময় যুক্ত ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ড. মুহম্মদ এনামুল হক, ড. জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর মতো পণ্ডিত ব্যক্তিরা। তাঁদের এবং আরও অনেকের যুক্ততায় একাডেমি আঞ্চলিক ভাষার অভিধানের পাশাপাশি সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান, ইংরেজি-আরবি-ফারসি-তুর্কি অভিধানের মতো বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অভিধান প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ড. গোলাম মুরশিদের সম্পাদনায় প্রকাশিত তিন খণ্ডের বাংলা ভাষার বিবর্তনমূলক অভিধান দুই বাংলাতেই যথেষ্ট স্বীকৃতি পেয়েছে।
বাংলা একাডেমির ঐতিহাসিক অভিযাত্রায় তিন দশক আগে যুক্ত হয় আরেক নতুন ইতিহাস—‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদদের স্মৃতিতে আয়োজিত এই মেলা এখন বই প্রকাশ ও বিপণনের পরিসর ছাপিয়ে বাঙালির মাসব্যাপী সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপ নিয়েছে। একই সঙ্গে তা বিশ্বের দীর্ঘকাল ব্যাপ্ত বইমেলার গৌরববাহকও বটে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলা একাডেমির ছিল গৌরবজনক ভূমিকা। একাডেমির প্রাক্তন পরিচালক প্রয়াত কবীর চৌধুরী, একাডেমিতে মুক্তিযুদ্ধকালে কর্মরত লেখক আবু জাফর শামসুদ্দীন, আবদুল হক, সরদার ফজলুল করিম, ফজলে রাব্বি প্রমুখের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, একাডেমির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একাত্তরের মার্চে গণ-আন্দোলনের শহীদদের পরিবারের সাহায্যার্থে খোলা আওয়ামী লীগের তহবিলে নিজেদের এক দিনের বেতন তুলে দেন। একাডেমির প্রেসে গোপনে প্রকাশিত হয় মুক্তিযুদ্ধের বুলেটিন জয়বাংলা। একাডেমি প্রাঙ্গণে মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলার কবি-লেখক-বুদ্ধিজীবীরা শপথ নিয়েছেন স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার। তাই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ২৫ মার্চ কালরাতে ঐতিহাসিক বর্ধমান হাউসকে লক্ষ্য করে শেল নিক্ষেপ করে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক সূতিকাগারকে ধ্বংস করা। কিন্তু বাংলা একাডেমি বাংলাদেশের মতোই ধ্বংসের কালরাত পেরিয়ে স্বাধীনতার আভায় নতুন করে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। একাত্তরের শহীদ বাংলার শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে বাংলা একাডেমির ছিল আত্মার সম্পর্ক। তাই স্বাধীনতার পর এই বুদ্ধিজীবীদের চিরস্মরণীয় করে রাখতে একাডেমি তাঁদের রচনাবলি প্রকাশ করেছে, স্মৃতি: ১৯৭১ (সম্পাদক রশীদ হায়দার)-এর মতো কয়েক খণ্ডের বইয়ে ধরে রেখেছে একাত্তরের অবিনাশী স্মৃতি।
ঐতিহ্যের পথ ধরে একাডেমি নতুন শতকে অবকাঠামোগত দিক থেকে বিপুলভাবে পরিবর্ধিত হয়েছে। রবীন্দ্র, নজরুলের স্মৃতিধন্য বর্ধমান হাউসের সীমা ছাড়িয়ে একাডেমি এখন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ভবন, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তন, ড. মুহাম্মদ এনামুল হক ভবন, কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ সভাকক্ষে বিস্তার লাভ করেছে। তবে ঐতিহ্যের অঙ্গীকার যে একাডেমি অবিচলভাবে বহন করে চলেছে নতুন এই স্থাপনাসমূহের নামকরণই তা প্রমাণ করে।
নানান চড়াই উৎরাই পেরিয়ে বাংলা একাডেমি আজ তার ষাট বছর পূর্ণ করছে। শুভ জন্মদিন।
পিয়াস মজিদ: কবি।