মতামত

ব্লগারকাণ্ড: দেশের সমস্যাকে বাইরে নিয়ে এসেছে বেলারুশ

কিছুতেই দমাতে না পেরে ব্লগার ও সাংবাদিক রোমান প্রোতাসেভিচকে শেষ পর্যন্ত ধরে আনার পথই বেছে নিলেন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট
কিছুতেই দমাতে না পেরে ব্লগার ও সাংবাদিক রোমান প্রোতাসেভিচকে শেষ পর্যন্ত ধরে আনার পথই বেছে নিলেন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট

ইউরোপের শেষ স্বৈরাচারী বলে পরিচিত আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো ক্ষমতায় আছেন ২৭ বছর। গত বছরের সাজানো নির্বাচনে ষষ্ঠবারের মতো বেলারুশের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন তিনি। এরপর থেকেই সরকারবিরোধীদের কঠোর হাতে দমন শুরু করেছেন।

৬৬ বছর বয়সী লুকাশেঙ্কোর কাণ্ডকীর্তি সম্পর্কে দুনিয়াবাসীর কমবেশি ধারণা আছে, তারপরও তার আদেশে সংগঠিত সাম্প্রতিক এক ঘটনায় তাজ্জব বনে গেছে মানুষ। আন্তর্জাতিক নিয়মনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রীতিমতো জঙ্গি বিমান পাঠিয়ে আকাশ থেকে বিরুদ্ধ মতাবলম্বী এক ব্লগারকে গ্রেপ্তার করিয়ে এনেছেন। রোমান প্রোতাসেভিচ নামের এই ব্লগার ছিলেন বেলারুশের নেক্সটা মিডিয়া নেটওয়ার্কের সহসম্পাদক। ২০১৯ সাল থেকে প্রাণভয়ে বেলারুশ ছেড়ে কখনো পোল্যান্ড, কখনো লিথুনিয়ায় থাকতেন। নির্বাসনে থেকেই লুকাশেঙ্কোর বিরুদ্ধে কলম শাণাতেন। ২৬ বছর বয়সী এই ব্লগার ও সাংবাদিককে কিছুতেই দমানো যাচ্ছিল না, তাই বুঝি এই পথ বেছে নিলেন স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট। প্রোতাসেভিচ গ্রেপ্তারের ঘটনায় নিজেদের আকাশপথ দিয়ে বেলারুশের বিমান চলাচল নিষিদ্ধ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। দেশটির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে তারা।

২৩ মে লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াসে যাওয়ার উদ্দেশে গ্রিসের রাজধানী এথেন্স থেকে বিমানে উঠেছিলেন রোমান প্রোতাসেভিচ। রাইন এয়ারলাইনসের বিমানটি বেলারুশের আকাশসীমায় পৌঁছালে পাইলটদের জানানো হয়, বিমানে বোমা আছে। পাশাপাশি বেলারুশ বিমানবাহিনীর একটি জঙ্গি বিমান যাত্রীবাহী বিমানটিকে মিনস্কে অবতরণে বাধ্য করে।

বেলারুশের রাজধানীতে অবতরণ করার পর বিমানটিতে কোনো বোমা বা বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। বিমানের ১৭১ যাত্রীর মধ্যে থেকে রোমান প্রোতাসেভিচ ও তাঁর বান্ধবী সোফিয়া সাপেগাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। ঘটনার পর বেলারুশের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে মুখে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে রোমান প্রোতাসেভিচকে বলতে দেখা যায়, নির্বাচনের পর বেলারুশ জুড়ে যে গণবিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল, তা সংগঠিত করতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।

পোল্যান্ডে দেশান্তরী প্রোতাসেভিচের মা-বাবা উভয়ই ২৫ মে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘টেলিভিশনে আমাদের সন্তানের বিবৃতিটি আমরা দেখেছি। চাপের মুখে অসত্য একটি বিবৃতি তার কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে। আমরা আতঙ্কিত বেলারুশ কর্তৃপক্ষ এখন আমাদের সন্তানকে জেলে কোনো জীবনঘাতী ওষুধ, স্নায়ু গ্যাস প্রয়োগে হত্যা বা অসুস্থ করবে।’

আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কোর সরকার বিগত মাসগুলোয় সরকারবিরোধী হাজারো নেতা-কর্মী ও সাংবাদিককে কারাদণ্ড দিয়েছে। তবে আকাশ থেকে জোর করে বিমান নামিয়ে এনে একজন সরকারবিরোধীকে গ্রেপ্তারের ঘটনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।

বিভিন্ন দেশে সরকারবিরোধী বা যুদ্ধাপরাধীদের অপহরণের ঘটনা আগেও ঘটেছে। আত্মগোপনে থাকা হিটলারের সহযোগী অ্যাডলফ আইখম্যানকে ইসরায়েলি এজেন্টরা ১৯৬০ সালে আর্জেন্টিনা থেকে অপহরণ করে। ইসরায়েল নিয়ে গিয়ে তাঁর বিচার করে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে কুর্দি মুক্তি আন্দোলনের দেশান্তরিত নেতা আবদুল্লাহ ওজকানকে সিআইএর সহযোগিতায় নাইরোবি থেকে অপহরণ করে তুরস্কে নিয়ে আসে দেশটির গোয়েন্দা বাহিনী। দেশদ্রোহের অভিযোগে প্রথমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও পরে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

নিকট অতীতে বার্লিনেও এ ধরণের দুটো ঘটনা ঘটেছে। ২০১৭ সালে শহরের কেন্দ্র টিয়ার গার্টেন থেকে ভিয়েতনামী ব্যবসায়ী থ্রিনহ জুয়ান থানকে অপহরণ করে গাড়িতে প্রাগে নিয়ে যায় ভিয়েতনামের এজেন্টরা। সেখান থেকে বিশেষ বিমানে করে তাঁকে হ্যানয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ২০১৯ সালে রাশিয়ান গোয়েন্দারা জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়া জর্জিয়ার নাগরিক সেলিম খানকে বার্লিনের টিয়ার গার্টেন এলাকায় হত্যা করে। জার্মান সরকার এই দুই ঘটনায় সঙ্গে জড়িত স্থানীয় এজেন্টদের বিচার করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো এখন প্রোতাসেভিচের ঘটনার সমালোচনা করলেও্র আগে কিন্তু নিজেদের স্বার্থে এ ধরনের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা তারাও ঘটিয়েছে। ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে মস্কো থেকে দেশে ফেরার পথে বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসের বিশেষ বিমানটিকে ভিয়েনায় নামতে বাধ্য করে অস্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ। কারণ, তাদের বিশ্বাস ছিল, ওই বিমানে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক তথ্য ফাঁশকারী এডওয়ার্ড স্নোডেন আছেন। তারা তাঁকে সেখানেই গ্রেপ্তার করতে চেয়েছিল।

তবে সরকারবিরোধীদের দমন-পীড়নে আগেকার সব ঘটনা ম্লান করে দিয়েছে বেলারুশের স্বৈরাচারী সরকার। প্রথমে রায়ান এয়ারের বিমানটিতে বোমা থাকবার কথা বললেও এখন অন্য কথা বলছেন লুকাশেঙ্কো। বলছেন, তাদের পারমাণবিক চুল্লির ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার কারণেই নিরাপত্তার স্বার্থে যাত্রীবাহী বিমানটিকে নিচে নামিয়েছিল বেলারুশ। যাত্রীবাহী বিমানের নিরাপত্তা-সম্পর্কিত ফ্রি সিভিল এভিয়েশন বা শিকাগো কনভেনশন নামে যে আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে, বেলারুশ স্পষ্টতই তা লঙ্ঘন করছে। যুদ্ধবিমান দিয়ে যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে লুকাশেঙ্কো তাঁর দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে বাইরের বিশ্বে নিয়ে এসেছেন।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক রাব ও ২৭ দেশভুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ ঘটনার কঠোর নিন্দা জানিয়েছে। অন্যদিকে, এ ঘটনার পর লুকাশেঙ্কো তাঁর অন্যতম মিত্র রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সব ধরনের সহযোগিতা ও বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক ঋণের আশ্বাস পেয়েছেন।

পৃথিবীর সর্বত্রই ইদানীং সাংবাদিক ও ব্লগারদের স্বাধীনতা কমবেশি খর্ব হচ্ছে। গত এপ্রিল মাসে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস, প্রেস ফ্রিডমের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্য বেলারুশ সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশ বলে জানিয়েছে।

সরাফ আহমেদ প্রথম আলোর জার্মান প্রতিনিধি
Sharaf.ahmed@gmx.net