মতামত

রাশিয়া-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে

ইগর মরগুলভ
ইগর মরগুলভ

২০২২ সালের ২৫ জানুয়ারি রুশ ফেডারেশন ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি দিবস উদ্‌যাপন করতে চলেছে। আজ থেকে ৫০ বছর আগে এই দিনে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর এক বছরের কম সময়ের মধ্যে আমাদের দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক সংলাপের সূচনা ঘটে। ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান মস্কো সফরে যান; সেখানে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক লিওনিদ ব্রেজনেভ, সুপ্রিম সোভিয়েতের প্রেসিডিয়ামের সভাপতি নিকোলাই পদগোর্নি, মন্ত্রিপরিষদের সভাপতি আলেক্সেই কোসিগিন ও অন্য সরকারি নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই সফরকালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বাংলাদেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি এখনো কার্যকর রয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে সোভিয়েত নৌবাহিনীর দ্বাদশ বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিযাত্রী দল বঙ্গোপসাগরে এসে পৌঁছায়। তাদের দায়িত্ব ছিল ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে স্বাধীনতাযুদ্ধের অবসানের পর চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে যেসব মাইন ও ডুবে যাওয়া জাহাজ পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়ে গিয়েছিল, সেগুলো অপসারণ করা। বিশেষ রকমের ঝুঁকিপূর্ণ কারিগরি জটিলতা সত্ত্বেও কাজটি সম্পন্ন হয়েছিল এবং তার ফলে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে খাদ্য ও অন্যান্য জরুরি ভোগ্যপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা দ্রুত ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল।

১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রদান করে। এর একটি অংশ হিসেবে সোভিয়েত বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে নির্মিত হয় ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, যেটি আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর অন্যতম।

১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রুশ ফেডারেশনকে সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার মধ্য দিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন বেগ সঞ্চারিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিষ্ঠিত পথে দুই দেশের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে চলেছেন।

২০১০ সালে ইন্টারন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন ফোরামের ফাঁকে শেখ হাসিনা ও ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভ্লাদিমির পুতিন তখন রুশ ফেডারেশনের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান আনুষ্ঠানিক সফরে মস্কোতে যান। ২০১৬ সালে উলানবাটোরে অনুষ্ঠিত এশিয়া-ইউরোপ ফোরামের (এএসএএম) শীর্ষ সম্মেলন চলাকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রুশ ফেডারেশনের প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভের মধ্যে বৈঠকের আয়োজন করা হয়। এসব যোগাযোগের ফলে আমাদের দুই দেশের সহযোগিতার মূল ক্ষেত্র নির্ধারিত হয়।

দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থার নেতাদের মধ্যে একাধিক সাক্ষাৎ ও বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে ২০২১ সালের জুলাই মাসে তাসখন্দে অনুষ্ঠিত ‘মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া: আঞ্চলিক সংযোগ, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ফাঁকে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের মধ্যে আলাপ-আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নানা সমস্যা এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার ইস্যুতেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়েছে। এবং জাতিসংঘ সনদে বিধৃত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মৌলিক নীতিগুলো অনুসরণের মধ্য দিয়ে দুই দেশ মিলিতভাবে কাজ করছে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন ‘রোসাটম’। রোসাটমের অংশগ্রহণে পাবনা জেলায় নির্মিত বৃহত্তম যৌথ প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় ঋণের আওতায় এ প্রকল্পের অর্থায়ন নিশ্চিত করা হচ্ছে। এখানে মোট দুটি ইউনিট সম্পাদনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হবে।

রাশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক প্রাদুর্ভাবের নেতিবাচক প্রভাব সত্ত্বেও ২০২০ সালে রুশ-বাংলাদেশ বাণিজ্য রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়। ২০১৭ সালে রাশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে অর্থ-বাণিজ্য ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সহযোগিতাবিষয়ক আন্তসরকার কমিশন গঠন করা হয়।

বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সমরসজ্জায় রাশিয়ার তৈরি সামরিক প্রযুক্তি-সরঞ্জাম রয়েছে। আমাদের অংশীদারেরা ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ এবং যুদ্ধবিমান, এমআই-১৭ ও এমআই-১৭১ হেলিকপ্টার, বিটিআর-৮০ আর্মড পারসোনাল ক্যারিয়ার, মিগ-২৯ জঙ্গি বিমান ও অন্যান্য বিশেষ সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করেছে।

ছয় হাজারের বেশি বাংলাদেশি নাগরিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও রাশিয়ার বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। তাঁরা এখন স্বদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের সর্বক্ষেত্রে কাজ করছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতা আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক; বিশেষত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সুদক্ষ লোকবল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাশিয়ার সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ সালে ৭০ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর জন্য ফেডারেল বাজেট থেকে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।

বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ঐতিহ্যবাহী সহযোগী রাশিয়ার গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় বা পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি অব রাশিয়া। ২০২১ সালের মার্চ মাসে রাশিয়ার গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট এবং রাশিয়ার তিউমেন রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও উচ্চতর পর্যায়ের শিক্ষাপ্রক্রিয়ায় রুশ ভাষা শিক্ষার প্রচলন বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

আন্তধর্মীয় সংলাপ ও ধর্মীয় উগ্রপন্থা মোকাবিলার ক্ষেত্রে রাশিয়া ও বাংলাদেশের অবস্থান যথেষ্ট কাছাকাছি; ‘রাশিয়া-মুসলিম বিশ্ব’ নামক কৌশলগত রূপরেখার আওতায় পরিচালিত পারস্পরিক কর্মকাণ্ডে এর প্রতিফলন রয়েছে।

উভয় জাতির মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও ঘনিষ্ঠতার উন্নয়নের জন্য সংস্কৃতি আদান-প্রদানের গুরুত্ব অপরিসীম। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে গত দুই বছর এ ক্ষেত্রে কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সবকিছু একদম থেমে যায়নি, বরং চলছে। ২০২১ সালের ৪ নভেম্বর রাশিয়ার জাতীয় সংহতি দিবস এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপন উপলক্ষে ঢাকায় রুশ দূতাবাসে মস্কোর কসাক শিল্পীদলের একটি কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় রাশিয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। আমাদের সম্পর্ক সুদৃঢ়, এ সম্পর্কের সম্ভাবনা চিত্তাকর্ষক। এটি আরও উন্নয়নের সব সুযোগই বিদ্যমান।

ইগর মরগুলভ রুশ ফেডারেশনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী