
বর্তমান বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ভোটাধিকারকে মানবাধিকারের অংশ বলে গৃহীত। শুধু ভোটাধিকার নয়, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনও একই সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত। এমনকি জাতিসংঘের ‘ইউএন কনভেনশন’ ধারা ৬ যেখানে সদস্যদেশে দুর্নীতি রোধের কথা বলা হয়েছে, ওই ধারার সংজ্ঞায় নির্বাচনে যেকোনো ধরনের কারচুপিকেও দুর্নীতির সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এ কারণেই জাতিসংঘ সদস্যদেশগুলোতে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করতে সব ধরনের সহযোগিতা করে থাকে। নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যে গণতন্ত্রের িভত, সে বিষয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। অস্বচ্ছ ও পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন ভোটারদের গণতন্ত্রের ও নির্বাচন–প্রক্রিয়া থেকে বিমুখ করে ফেলে। এর ভূরি ভূরি উদাহরণ রয়েছে ইতিহাসে।
নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন তখনই সম্ভব, যখন নির্বাচনে সরকারি অথবা রাজনৈতিক অথবা অন্য কোনো সংস্থার হস্তক্ষেপের আশঙ্কা থাকে না। সরকারের তথা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নির্বাচন করার উদ্দেশ্যেই গঠিত হয় একটি স্বাধীন সত্তা—নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা সংস্থা, যা আমাদের কাছে নির্বাচন কমিশন বলে পরিচিত। বাংলাদেশে একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে নির্বাচন কমিশন গঠনে আমাদের সংবিধানের পার্ট-৭ আর্টিক্যাল ১১৮ থেকে ১২৫ একটি বড় সংযোজন। অনেক দেশে এ ধরনের সাংবিধানিক সংস্থা এখনো গঠিত হয়নি।
সংবিধানে নির্বাচন কমিশনের সংযোজন মানে হলো নির্বাচনকে সরকারের আওতা থেকে বের করে একটি নিরপেক্ষ স্বাধীন সত্তার তত্ত্বাবধানে দেওয়া, যার মাধ্যমে জনগণ ভোটাধিকার রক্ষা ও প্রয়োগ করতে পারেন। এটি নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতার সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে সংবিধানের আর্টিক্যাল ১১৯ ও ১২৬-এ ধারায়। এতে বলা হয়েছে, নির্বাচন তত্ত্বাবধান, নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণের (Superintendence, direction and control) দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। ভারতীয় সংবিধানের অনুরূপ ধারায়ও ৩২৪-এ একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানেও উদ্ধৃত ‘তত্ত্বাবধান, নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ’ ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বের মধ্যে বর্তায়। এর মানে হচ্ছে যে আমাদের দেশেও ভারতীয় ধারার ক্ষমতার মতোই প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে অন্য কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। এ ধরনের হস্তক্ষেপ হবে সংবিধানের পরিপন্থী। বস্তুতপক্ষে ভারতের মতোই আমাদের সংবিধানের ধারা ১১৮, যার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন গঠিত এবং ধারা ১১৯, যেখানে কমিশনের ক্ষমতা ও দায়িত্ব উল্লিখিত এবং অন্যান্য ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা সংবিধানের মূল কাঠামোর অংশ। সংসদ সার্বভৌম ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রাখলেও এই মূল কাঠামোর পরিপন্থী আইন প্রণয়ন করতে পারে না।
ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ে এ প্রসঙ্গে কিছু পর্যবেক্ষণ ছিল। সুপ্রিম কোর্টের রায় ২০০২-এর নং ১ (এআইআর ২০০৩ এসসি ৮৭) বিশেষ পর্যবেক্ষণের দ্রষ্টব্যে বলা হয়েছে যে, সংসদ যে নির্বাচন সম্বন্ধে যাবতীয় আইন পাস করতে পারে, তবে নির্বাচনের একক দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের এবং তার ক্ষমতা কোনোভাবেই খর্ব করা বা বাতিল করার মতো আইন সংসদ পাস করতে পারবে না। আগের আরেক রায়ে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট (এআইআর ১৯৭৮ এসসি ৮৫১) ধারা ৩২৪-এর অধিক ব্যাখ্যায় বলেছেন যে ‘তত্ত্বাবধান, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ’ সংবিধানে মোটা দাগে উদ্ধৃত। এর প্রেক্ষাপটে কোর্ট মতামত দিয়েছিলেন যে এই ধারার (৩২৪) অধিকতর ব্যাখ্যায় ‘যেখানে কোনো আইন দ্বারা সীমিত নয়, যেখানে আলোচিত ধারা কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে আরও অধিকতর ক্ষমতা প্রদান করে।’
ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের এসব নির্দেশনা বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার উদ্ধৃত করে সংবিধানের ধারা ১১৯-এর অধিকতর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কাজেই নির্বাচন কমিশনকে আমাদের সংবিধান, পার্লামেন্ট আইন দ্বারা (আরপিও-১৯৭২) এমন ক্ষমতা প্রদান করেছে, যেখানে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ অথবা নির্বাচনকে প্রভাবিত করা সংবিধান ও আইনের পরিপন্থী বলে বিবেচিত হবে। আমাদের সংবিধানের ধারা ১২৬ নির্বাচন কমিশনকে তার দায়িত্ব পালনে সর্বপ্রকার সহযোগিতা করার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করেছে। ধারা ১২৬-এ বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে।’ এখানে ধারা ১২৬-ও ধর্তব্যের মধ্য নিলে এককথায় নির্বাচনী সময়ে দেশে ‘সরকার নয়’ নির্বাচন কমিশন নির্বাচনসংক্রান্ত সব বিষয়ে শেষ কথা হবে।
এ আলোচনা কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা প্রবীণ আমলা এইচ টি ইমামের এমন একটি বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে, যা আমার মতে সংবিধানপরিপন্থী এবং নির্বাচন কমিশনকে অকার্যকর করার শামিল। অবশ্য তাঁর এই বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক মহলে এমনকি সরকারি দলের মধ্যেও বেশ বিতর্ক দেখা দিয়েছে। খবরে প্রকাশ খোদ প্রধানমন্ত্রীও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। এইচ টি ইমাম প্রায় তিন দিন পর এক প্রেস কনফারেন্সে দাবি করেন যে তাঁর বক্তব্য খণ্ডায়িতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তবে তিনি নির্বাচনের সময়ে নির্বাচনে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন তার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিলেও সে ক্ষেত্রেও নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার লঙ্ঘিত হয়েছে বলে মনে করার সংগত কারণ রয়েছে।
এমনিতেই জানুয়ারি ৫, ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে যে বিরূপ মনোভাব রয়েছে, তা সর্বজনবিদিত। ওই নির্বাচনে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনও দারুণ বিতর্কের মধ্যে পড়ায় তার ভাবমূর্তি যেভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে, তা দেশের এই উচ্চ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ এবং টেকসই গণতন্ত্রের জন্য সুখকর নয়। শুধু জানুয়ারি ৫, ২০১৪ সালের নির্বাচনই নয়, তার এক মাস পরে অনুষ্ঠিত চতুর্থ উপজেলা নির্বাচন নিয়ে যা হয়েছে তাতে এ কথা বলা অন্যায় হবে না যে নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেনি। নির্বাচনের সময়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের বিদেশে অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অতীতেও রাজনৈতিক সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় এবং উপনির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে ডিঙিয়ে সরকারি দলের হস্তক্ষেপ করার একাধিক উদাহরণ রয়েছে। এমনকি ১৯৯৪ সালে মাগুরার উপনির্বাচনে প্রশাসনের খোলাখুলি হস্তক্ষেপ এবং নির্বাচন কমিশনের অসহায়ত্বের কারণে পরবর্তী পর্যায়ে যে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছিল, তা এখনো আলোচিত। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। প্রায় একই স্টাইলে ১৯৯৯ সালে টাঙ্গাইলের একটি উপনির্বাচনে একজন নির্বাচন কমিশনারের উপস্থিতি সত্ত্বেও নির্বাচনে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তা এমনকি ম্যাজিস্ট্রেটদের কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও পরিস্থিতির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ হয়েছিল। একজন কমিশনার অকুস্থলে উপস্থিত হয়ে প্রায় ছয়টি কেন্দ্রে নির্বাচন স্থগিত এবং কয়েকজন ম্যাজিস্ট্রেটকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার পরেও পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকে। নির্বাচনের পরে ফলাফল প্রকাশ নিয়েও ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়। অস্বাভাবিক দেরি করে প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশিত হয়, যা সন্দেহজনক হওয়ায় তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু হেনার কমিশন প্রায় ছয় মাস ফলাফলের গেজেট প্রকাশ স্থগিত রাখে। পরে ২০০০ সালে আবু হেনা তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করার পর গেজেট প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানেও তৎকালীন সরকারের প্রশাসনের হস্তক্ষেপ হয়েছিল।
এই দুটি ঘটনা ছাড়াও অতীতে সব দলীয় সরকারই স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও বেশ প্রভাব বিস্তার করেছে। কোথাও কোথাও সরাসরি হস্তক্ষেপও হয়েছে। তবে এসব হস্তক্ষেপের বিষয় ইতিপূর্বে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এমনভাবে আলোচনায় আনেননি, যেমনভাবে এবার হয়েছে।
আলোচিত উপদেষ্টার জনসমক্ষে বক্তব্য প্রমাণ করেছে কীভাবে ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনকে নিজের পক্ষে নিতে প্রয়াস নিয়েছিল। যদিও ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে, উপদেষ্টার বক্তব্যে অনুযায়ী, সরাসরি প্রভাব বিস্তারের আদৌ প্রয়োজন ছিল কি না, তাও ভেবে দেখার বিষয়। ওই সময়ে পর পর দুটি নির্বাচনেই এ ধরনের হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তারের কথা এখন আর অনুমানভিত্তিক নয়। ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো যে কেমন হবে, তার নমুনা ছিল বিগত দুটি বড় নির্বাচন।
উপদেষ্টা মহোদয় এমন সময় নিজেকে সম্পৃক্ত করে সত্যের সন্ধান দিলেন, তাতে বর্তমান সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর আওতায় ভবিষ্যৎ নির্বাচন যখনই হোক না কেন, এই সরকারের অধীনেই হবে, কেমন হবে তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। তিনি তাঁর এই বক্তব্যের মাধ্যমে বিরোধীদের দাবির যৌক্তিকতা এবং নির্বাচন কমিশনকে ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করার প্রমাণ দিলেন।
নির্বাচন কমিশন তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি। তবে তারা যে এখনো সাংবিধানিক শক্তির প্রেক্ষাপটেও একটি শক্ত ভিতে দাঁড়াতে পারেনি, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। অথচ নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার কথা সব দলের মুখে বারবার উচ্চারিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন সংবিধানে প্রদত্ত ক্ষমতা ব্যবহারে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা না করতে পারবে এবং তত দিন দেশের গণতন্ত্রের শক্ত শিকড় গ্রথিত হবে না।
নির্বাচন কমিশন তার দায়িত্বের আওতায় নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যদি না করতে পারে, সে অপারগতাও হবে সংবিধানের পরিপন্থী। দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার দায়িত্ব যাদের, তারাই এমন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে পদে পদে দুর্বল করছে। এ পরিস্থিতি গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।
আমি আলোচনা শেষ করতে চাই ভারতের সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কোরেশির বই অ্যান আন ডকুমেনটেড ওয়ান্ডার: দ্য মেকিং অব দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান ইলেকশন বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে। তিনি লিখেছেন, তিনটি জিনিসের জন্য ভারত বিশ্বে অধিক পরিচিত। তাঁর মতে, সে তিনটি হলো তাজমহল, মহাত্মা গান্ধী এবং ভারতের নির্বাচনী গণতন্ত্র (electoral democracy)।
আমরা কবে এমনভাবে বলতে পারব যে নির্বাচনী গণতন্ত্রের জন্য বাংলাদেশ বিশ্বে পরিচিত।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com