
হলিউডের হইচই ভরা প্রচারের ডামাডোল থেকে অনেক দূরে গ্রিসের ছোট্ট একটি শহর মার্কোপুলো মেসোগাইয়াসে বসে হঠাৎ করেই ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন ছবি দ্য অডিসি দেখার সুযোগ হলো।
গ্রিসের পূর্ব অ্যাটিকা অঞ্চলের এই ঐতিহাসিক ছোট শহরটি বেশ মনোরম।
এখান থেকে মাত্র ১৫ মিনিটের পথেই ভ্রাভরোনার প্রাচীন প্রত্নস্থলে পঞ্চম শতকের খ্রিষ্টপূর্বাব্দের আর্টেমিসের মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। বন্য প্রকৃতি ও সন্তান জন্মদানের দেবী আর্টেমিসের উদ্দেশে এই মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল।
আমরা যে সিনেমা হলে বসে স্যার ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন ছবি দেখলাম, সেই হলটির নামও ‘আর্টেমিস’।
হলটি মার্কোপুলোর ১৯০৪ সালে নির্মিত অপূর্ব সেন্ট জন অর্থোডক্স চার্চের ঠিক পেছনে। এর চেয়ে বেশি ‘গ্রিক’ আর কী-ই বা হতে পারে!
সুন্দর একটি প্রেক্ষাগৃহে আমরা স্থানীয় প্রায় দুই ডজন গ্রিক দর্শকের সঙ্গে বসেছিলাম। হলিউডের কোটি কোটি ডলারের প্রচারণায় ছবিটিকে যে ঐতিহাসিক মহাকাব্যিক প্রদর্শনী হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, সেই আইম্যাক্সের বিশাল আয়োজন থেকে আমরা ছিলাম অনেক দূরে।
বড়সড় প্রচারণার এসব আয়োজন আমাদের একেবারেই প্রভাবিত করেনি। বরং গ্রিসের এই ছোট শহরের ছোট সিনেমা হলটি ছবির মাঝখানে পুরোনো দিনের মতো ‘বিরতি’ দিল; দর্শকেরা যাতে টয়লেটে যেতে পারেন, পপকর্ন নিতে পারেন।
সেই মুহূর্তে নোলানের আকার ও বিশালত্বের প্রতি আসক্তি যেন মানুষের স্বাভাবিক মাত্রায় নেমে এল। চোখধাঁধানো প্রদর্শনীকে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হলো।
ট্রয় নগরীর বিশাল ঘোড়ার চেয়েও বড় করে তোলার যে চেষ্টা, সেটিও যেন খানিকটা সংযত হলো।
নোলানের আইম্যাক্স ক্যামেরার আকার নিয়ে এই কিশোরসুলভ মুগ্ধতা আসলে এক ধরনের ‘ট্রোজান হর্স’ বা ‘ট্রয়ের ঘোড়া’। তাই এটিকে এতটা গুরুত্ব দেওয়ার দরকার নেই।
নিউইয়র্কে ফিরে এসে নিশ্চিত হওয়ার জন্য ছবিটি শহরের সবচেয়ে বড় আইম্যাক্স সিনেমা হলে আবার দেখলাম। নোলানের আগের সব বড় বাজেটের ছবির ক্ষেত্রেও আমি এমনটাই করেছি।
তবে গ্রিসের সেই ছোট্ট শহরের সিনেমা হলে যা দেখেছিলাম, সেটিই আমার কাছে অনেক বেশি ভালো লেগেছে। সেটি ছিল বাস্তব।
হোমার এবং তাঁর দুটি বিখ্যাত মহাকাব্য ইলিয়াড ও অডিসি—এগুলো কি সেই মানুষদের সম্পদ, যাদের সঙ্গে আমি মার্কোপুলো শহরের সাদামাটা একটি সিনেমা হলে বসে নোলানের অডিসি দেখেছি?
নাকি এগুলো এমন এক কৃত্রিম প্রাচীন সভ্যতার অংশ, যার সাংকেতিক নাম ‘পশ্চিম’, আর যেটি এক প্রজন্মের ইউরোপীয় বর্ণবাদী পণ্ডিত (যেমন অস্ট্রিয়ান ইয়াকব ফিলিপ ফালমেরায়ের) নিজেদের জন্য তৈরি করেছিলেন?
এই পরিকল্পিত মতাদর্শিক প্রকল্পের মাধ্যমে আধুনিক গ্রিকদের তাঁদের নিজেদের ভাষা, সাহিত্য ও দর্শনের ঐতিহ্য থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল।
এর সবই করা হয়েছিল গ্রিসকে ‘পশ্চিমা সভ্যতার’ কাল্পনিক ভিত্তি হিসেবে নতুন করে নির্মাণের মাধ্যমে।
একই সঙ্গে গ্রিসের এশিয়া মাইনর বা আনাতোলিয়ার সঙ্গে তার স্বাভাবিক ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল।
অথচ আনাতোলিয়াই সেই ভূখণ্ড, যেখানে গ্রিস, তুরস্ক, লেভান্ট, মিসর ও উত্তর আফ্রিকার মধ্যে বহু গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহাসিক যোগসূত্র গড়ে উঠেছিল।
এই প্রতারণামূলক মতাদর্শিক কৌশল (যার শিকড় শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের বর্ণবাদী আগ্রাসনের মধ্যেও রয়েছে) গ্রিসকে তার ঐতিহ্য থেকে বঞ্চিত করেছে।
সেই ঐতিহ্যের নিদর্শনগুলো আক্ষরিক অর্থেই পাথর ধরে ধরে ব্রিটিশ মিউজিয়াম বা প্যারিসের ল্যুভ জাদুঘরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, আধুনিক ঔপনিবেশিক ও ইউরোকেন্দ্রিক স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য। এভাবে এমন একটি বিষয়কে বানানো হয়েছে, যার বাস্তবে কখনো অস্তিত্বই ছিল না।
কুখ্যাত ফালমেরায়ের তত্ত্ব ছিল, আধুনিক গ্রিকদের সঙ্গে প্রাচীন হেলেনদের কোনো সম্পর্ক নেই।
তাঁর দাবি ছিল, স্লাভ ও আলবেনীয়দের অভিবাসনের ফলে গ্রিসের আদি জনগোষ্ঠী পুরোপুরি প্রতিস্থাপিত হয়েছিল। যেন কোনো ভূখণ্ডে মানুষের অভিবাসন ঘটাই ভুল—অথবা এমন অভিবাসন শুধু গ্রিসেই ঘটেছিল!
ইউরোপীয়রা প্রাচীন গ্রিকদের, তাঁদের শিল্প ও দর্শনকে পছন্দ করেছিল ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলো নিজেদের করে নিয়েছিল।
গ্রিকদের ঐতিহ্যকে তারা লেখা ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মাধ্যমে নিজেদের দখলে নিয়েছে, জাদুঘরে সাজিয়ে রেখেছে।
গ্রিসের সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে উপনিবেশমুক্ত করার এবং গ্রিকদের নিজেদের ঐতিহ্য তাঁদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বহুদিন ধরেই চলছে।
কিন্তু হোমারের অডিসি নিয়ে নোলানের নির্মাণ যেন ঠিক বিপরীত দিকে যাচ্ছে। এটি সেই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক আত্মসাৎ প্রক্রিয়ারই অংশ, যার শক্তিশালী ‘ট্রয়ের ঘোড়া’ হয়ে উঠেছে হলিউড।
বাস্তবতা হলো, হোমার ব্রিটিশ, আমেরিকান বা জার্মান ছিলেন না। তিনি খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতকে এশিয়া মাইনরের পশ্চিম উপকূলের আয়োনিয়া অঞ্চলে বাস করতেন। ওই এলাকা আজকের তুরস্কের অন্তর্ভুক্ত।
যেভাবেই বিষয়টি দেখা হোক না কেন, পশ্চিম ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার যেকোনো জায়গার চেয়ে হোমারকে বেশি আপন মনে হতো গ্রিসের সেই ছোট শহরের সুন্দর ছোট্ট সিনেমা হলটিকে, যেখানে আমি নোলানের অডিসি দেখেছি।
নোলানের ছবিটি যে বিপুল প্রশংসা পেয়েছে, তাতে মনে হয় এটি সেই বিশাল সাংস্কৃতিক আত্মসাৎ প্রকল্পেরই অংশ, যেখানে ইউরোপীয়রা নিজেদের সাংস্কৃতিক সত্যতা প্রমাণের জন্য একটি কৃত্রিম ‘প্রাচীন সভ্যতা’ নিজেদের মতো করে তৈরি করে নিয়েছে।
তাহলে কি এটা নিছক কাকতালীয় যে নোলানের অডিসি ছবির বিশাল তারকাবহুল অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে নিশ্চিতভাবে গ্রিক বংশোদ্ভূত অভিনেতা মাত্র একজন—মাইকেল ভ্লামিস?
তাঁর বংশে গ্রিক, সার্বীয় ও লেবানিজ—তিন ধরনের পরিচয়ই রয়েছে। আর ছবিতে তিনি খুবই ছোট একটি সহায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
অন্যরা মূলত ম্যাট ডেমন ও অ্যান হ্যাথাওয়ের মতো হলিউডের অভিনেতা-অভিনেত্রী।
বিশেষ করে ডেমনের অভিনয়ের সীমাবদ্ধতা নোলানের মতো একজন প্রতিভাবান ও খুঁতখুঁতে নির্মাতার অজানা থাকার কথা নয়। তাহলে তিনি কেন তাঁর অডিসিকে এতটা স্পষ্টভাবে অ্যাংলো-আমেরিকান চেহারা ও আবহ দিয়েছেন?
অন্যদিকে, ছবির বৈচিত্র্যময় সহায়ক চরিত্রে অভিনয়শিল্পী বাছাই নিয়েও উল্টো দিক থেকে সমালোচনা এসেছে। ইলন মাস্ক তো হেলেন চরিত্রে লুপিতা নিয়ং’ওকে নেওয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়ে নানা ধরনের অর্থহীন কথা বলেছেন।
তবে এসব সিদ্ধান্ত মূলত স্টুডিও কর্তাদের এখতিয়ারের মধ্যেই পড়ে। তাঁদের প্রধান লক্ষ্য থাকে আর্থিক লাভের কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর দর্শককে আকৃষ্ট করা।
এ কারণেই আমরা দেখি ব্রিটিশ-ভারতীয় অভিনেতা হিমেশ প্যাটেল ইউরিলোকাস চরিত্রে, জন লেগুইজামো ইউমেয়াস চরিত্রে, লুপিতা নিয়ং’ও ট্রয়ের হেলেন এবং ক্লাইটেমনেস্ট্রা—দুই চরিত্রেই এবং ট্রান্সজেন্ডার অভিনেতা এলিয়ট পেজ সিনন চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
এসবকে ‘রাজনৈতিক শুদ্ধতা’ বলে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো আসলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য আর্থিকভাবে লাভজনক সিদ্ধান্ত।
এ কারণেই নোলান, ডেমন ও টম হল্যান্ড ২০২৬ সালের ১০ জুলাই ছবিটির প্রচারণায় মুম্বাই গিয়েছিলেন। বিশাল জনসংখ্যার এই বাজারে হিমেশ প্যাটেল একজন পরিচিত মুখ।
এটা খুব একটা গোপন বিষয় নয় যে, নোলানের সিনেমা আমার ভালো লাগে না। তাঁর প্রতিটি নতুন ছবির প্রচারণা ও মুক্তিকে ঘিরে তাঁর স্টুডিও যত বেশি হইচই করে, তাঁর সিনেমা নিয়ে আমার সন্দেহও তত বাড়ে।
নোলানের দ্য অডিসি নিয়ে বিপুল ইতিবাচক প্রচারণা, এমনকি কিছু নেতিবাচক প্রচারণাও হয়েছে। কিন্তু আমি ছবিটি নিজে না দেখা পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করিনি।
ছবিটির প্রচারণা-যন্ত্র ইচ্ছাকৃতভাবেই ইলন মাস্কের বর্ণবাদী প্রতিক্রিয়াকে সামনে এনেছে।
এর উদ্দেশ্য ছিল ছবির নির্মাতা স্টুডিওগুলো শুরুতেই যে নির্দিষ্ট শ্রেণি ও জনগোষ্ঠীর দর্শককে লক্ষ্য করেছিল, তাদের কাছে ছবিটির আকর্ষণ আরও বাড়ানো।
হলিউডের স্টুডিওগুলো প্রতিটি নতুন ছবিকে ঘিরে যে প্রচারণার বন্যা বইয়ে দেয়, আমি যদি তার সবকিছু বিশ্বাস করতাম, তাহলে গণমাধ্যমকে ‘গণপ্রতারণার মাধ্যম’ হিসেবে দেখার অ্যাডোর্নো ও হর্কহাইমারের যুগান্তকারী ধারণা নিয়ে এত বছর পড়ানোরই বা কী অর্থ থাকত?
এক মুহূর্তের জন্য দ্য অডিসি কিংবা ওপেনহাইমার-কে পাশে রাখুন। নোলানের অন্য ছবিগুলোতে সময় ও স্মৃতির প্রতি তাঁর অদ্ভুত আসক্তি আছে। মেমেন্টো (২০০০), ইনসেপশন (২০১০), টেনেট (২০২০)—এই ছবিগুলোতে তা স্পষ্টতই আছে। সেটা ভাবুন। তাঁর ভক্তরা মনে করেন, জটিল ও মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া গল্পের মাধ্যমে তিনি ‘সিনেমাটিক টাইম মেশিন’ তৈরি করছেন, যা দেখায় সময় ও স্মৃতি মানুষের পরিচয় নির্ধারণ করে।
ফরাসি দার্শনিক পল রিক্যুর তাঁর পথপ্রদর্শক তিন খণ্ডের গ্রন্থ ‘টাইম অ্যান্ড ন্যারেটিভ’ (১৯৮৩-১৯৮৫)-এ এই বিষয়টি নিয়ে গভীর দার্শনিক অনুসন্ধান করেছেন। বিষয়টি নিয়ে সত্যিই আগ্রহ থাকলে সেখানে যাওয়া যেতে পারে।
কিন্তু নোলানের হাতে সময় ও স্মৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি উদ্দেশ্য ও রূপ পায়। তাঁর কাজের মধ্যে সময়কে উপনিবেশ করার এবং আমাদের সক্রিয় স্মৃতির অনুকরণমূলক প্রবাহকে বশে আনার এক অসাধারণ ঔদ্ধত্যপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা দেখা যায়।
সময়, স্মৃতি ও অস্তিত্ব—আমাদের ভঙ্গুর ও অনিশ্চিত জীবনের এই উপাদানগুলো দিয়ে আমরা গড়ে উঠি।
নোলান যেন সেগুলোও নিয়ন্ত্রণ করতে চান। তিনি সেগুলোকে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনা, নাড়াচাড়া, মসৃণ করা ও নতুন করে সাজাতে চান এমন এক চরিত্রের জীবন্ত স্মৃতির ভেতর, যার সঙ্গে কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে নিজেকে মেলানো প্রায় অসম্ভব।
‘প্রজেক্ট ফর দ্য নিউ আমেরিকান সেঞ্চুরি’ বা পিএনএসির-এর কথা মনে আছে? এটি ছিল নব্য রক্ষণশীলদের একটি কূটচাল, যেখানে পুরো একটি শতাব্দীকে ‘আমেরিকান’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এর অর্থ ছিল মূলত ইসরায়েলি আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। অর্থাৎ সময় ও স্মৃতির ওপরও নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।
স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্ব, ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ ধারণা এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’-এর উন্মাদ ধারণার মতো নোলানের সিনেমাও একই ধরনের বিকারগ্রস্ত ও অসুস্থ সাম্রাজ্যবাদী চিন্তার অংশ।
সময় ও স্মৃতিকে ঘিরে নোলানের সিনেমাটি আসলে পিএনএসি-এরই মতাদর্শগত প্রস্তুতি এবং তার পরবর্তী প্রতিফলন। তবে তারা যতই দম্ভভরে নিজেদের ক্ষমতা প্রকাশ করুক না কেন, দুটিই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ।
একটি স্পষ্ট কথা স্বীকার করি: সিনেমা নিয়ে আমার চিন্তাভাবনা গড়ে উঠেছে বিশ্ব চলচ্চিত্রের মহান পরিচালকদের হাতে।
হলিউডের সেই বিশাল বাণিজ্যিক ছবিগুলোর ঠিক বিপরীত তারা। সেই ছবিগুলোর প্রতি আমার একধরনের অ্যালার্জি আছে।
যদিও এর একটি কারণ হতে পারে, আমি অতীতে হলিউডের কয়েকজন খ্যাতনামা পরিচালকের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছি এবং তাঁরা কীভাবে কাজ করেন, সে সম্পর্কে আমার কিছুটা ধারণা আছে।
আমি সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ বোধ করি সিনেমার মহান শিল্পীদের সঙ্গে। ইয়াসুজিরো ওজু, সত্যজিৎ রায়, আব্বাস কিয়ারোস্তামি, নুরি বিলগে জেইলান, এলিয়া সুলেইমান, উসমান সেমবেনসহ আরও বহু দূরদর্শী নির্মাতার চলচ্চিত্র আমাকে আচ্ছন্ন করে।
কুয়েন্টিন ট্যারান্টিনো ও ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমা আমার বিশেষভাবে অপছন্দ। কারণ তাঁদের ছবির প্রতিটি ফ্রেম, প্রতিটি শট ও প্রতিটি দৃশ্যে—তাঁদের তৈরি প্রতিটি তারকা চরিত্রে, এমনকি তাঁদের চলচ্চিত্র নির্মাণের সামগ্রিক ভঙ্গিতেও—নিজ নিজ সাম্রাজ্যবাদের ঔদ্ধত্য ও আত্মম্ভরিতা প্রকাশ পায়।
এত বড় একটি ছবি বানানোর ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাব নিয়ে নোলান যেন গর্ব করেন এবং তা প্রকাশ্যে দেখান। যখনই আমি এত বিপুল ক্ষমতা ও ঔদ্ধত্য দেখি, আমি নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালাতে চাই।
আমার এই অনুভূতির কারণ, সের্গেই আইজেনস্টাইনের সোভিয়েত ফরমালিজম এবং রবার্তো রসেলিনি, ভিত্তোরিও দে সিকা, লুচিনো ভিসকন্তি প্রমুখের ইতালীয় নব্যবাস্তববাদী সিনেমা দেখে আমি বড় হয়েছি।
নোলান ও ট্যারান্টিনোর এই আত্মম্ভরী, চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো, অতিরিক্ত পুরুষতান্ত্রিক দৃশ্যগুলোর পুরোটা বাদ দিয়ে আমাকে যদি লা স্ত্রাদা (১৯৫৪) কিংবা বাইসাইকেল থিভস (১৯৪৮)-এর একটি মাত্র অসাধারণ দৃশ্যও দেওয়া হয়, আমি সেটিই বেছে নেব।
সত্যজিতের ‘অপু’স ট্রিলজি’ (১৯৫৫-১৯৫৯)-এর একটি মাত্র দৃশ্য দিন, তাহলেই এত লাগামহীন আত্মম্ভরিতা না দেখেও আমি আনন্দে থাকতে পারব।
টোকিও স্টোরি (১৯৫৩) কিংবা রান (১৯৮৫)-এর একটি মাত্র দৃশ্য দিন—তাহলেই নোলানের এই কৃত্রিম, জাঁকজমকপূর্ণ সাম্রাজ্যবাদী চলচ্চিত্র নির্মাণের পুরো আয়োজন আমি অনায়াসে ছেড়ে দিতে পারি।
অনেকে বলছেন, নোলানের অডিসি যুদ্ধবিরোধী। আমি তা মনে করি না। আর যদি হয়ও, তাহলে সেটি হবে পারমাণবিক শক্তিধর এক ‘শ্বেতাঙ্গ ত্রাণকর্তা’র কল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে যুদ্ধবিরোধী। সারা বিশ্বের মানুষ এ ধরনের কল্পনা পছন্দ করে না; বরং তারা এটিকে পুরোপুরি আপত্তিকর মনে করে।
নোলানের অডিসিউসের পিটিএসডি আছে। প্রথমে সে ট্রয় নগরীর কাঠের ঘোড়ার পরিকল্পনা করে, পরে সেটি তৈরি করে, এরপর তার শত্রুদের নির্বিচারে হত্যার কারণ হয়। এসব ঘটনার পর সে দুঃস্বপ্ন দেখে এবং নিজের করা কাজগুলো বারবার মনে করতে থাকে। ওপেনহাইমার ছবিতেও ঠিক একই বিষয় দেখা গেছে।
প্রথমে আপনি নিজের হাতে দুর্বল ও অসহায় মানুষের জন্য ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাকাণ্ড ঘটাবেন। তারপর সেই গণহত্যার শিকার পৃথিবীর মানুষের ওপর আপনি যে ভয়াবহতা চাপিয়ে দিয়েছেন, তা নিয়ে তাঁদের মানসিক যন্ত্রণা সম্পর্কে একটি সিনেমা বানাবেন।
ইসরায়েল এ ধরনের সিনেমা তৈরিতে ওস্তাদ। লেবানন (২০০৯), ওয়াল্টজ উইথ বাশির (২০০৮) এবং বিউফোর্ট (২০০৭)—এ ধরনের ছবির উদাহরণ।
প্রথমে বিশ্বকে ইসরায়েলের অপরাধমূলক বর্বরতা সহ্য করতে হবে, তারপর সেই অপরাধীদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে হবে, যখন তারা মানুষের ওপর কী করেছে তা মনে করে দুঃস্বপ্ন দেখে।
অডিসিউসের পিটিএসডির ওপর জোর দেওয়ার কারণে ছবিটি আসলে যুদ্ধবিরোধী নয়, বরং যুদ্ধপন্থী। এটি যুদ্ধবাজদের মানবিক করে তোলে, আর তাদের শিকার মানুষদের অমানবিক করে দেখায়।
ছবিটি নায়কের মানসিক যন্ত্রণার ওপর জোর দেয়; কিন্তু তার হত্যাকাণ্ডের ঔদ্ধত্য কীভাবে শেষ পর্যন্ত সীমাহীন অহংকারে বা ‘হিউব্রিসে’ রূপ নেয়, তা দেখায় না।
অবশ্যই, হোমারের মহাকাব্যের অন্য যেকোনো পাঠকের মতো নোলানেরও অডিসি নিজের মতো করে নির্মাণ করার অধিকার আছে।
সমস্যা হলো, নোলানের ছবিকে একটি অনন্য চলচ্চিত্র-ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যে অতিরিক্ত জাঁকজমকপূর্ণ প্রচারণা চালানো হচ্ছে। অথচ বাস্তবে ছবিটি মোটেও তেমন কিছু নয়। আমি বা অন্য কোনো সুস্থবুদ্ধির মানুষ কেন গ্রিসের প্রয়াত মহান চলচ্চিত্রকার থিও অ্যাঞ্জেলোপোলাসের অসাধারণ ছবি ইউলিসিস’ গেজ (১৯৯৫) (যা কিনা হোমারের মহাকাব্যের এক সাহসী ও অসাধারণ চলচ্চিত্রায়ন) ছেড়ে নোলানের ছবির সামনে গিয়ে মাথা নত করব?
চমৎকার পণ্ডিত ও অডিসি-র অনুবাদক এমিলি উইলসন এখানে ভুল পথে হাঁটছেন। একটি চলচ্চিত্রকে চলচ্চিত্র হিসেবেই বিচার করতে হবে, গ্রিক মূল রচনার ইংরেজি অনুবাদের সঙ্গে মিলিয়ে নয়।
সমস্যা হলো, নোলানের ছবিকে একটি অনন্য চলচ্চিত্র-ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যে অতিরিক্ত জাঁকজমকপূর্ণ প্রচারণা চালানো হচ্ছে। অথচ বাস্তবে ছবিটি মোটেও তেমন কিছু নয়।
আমি বা অন্য কোনো সুস্থবুদ্ধির মানুষ কেন গ্রিসের প্রয়াত মহান চলচ্চিত্রকার থিও অ্যাঞ্জেলোপোলাসের অসাধারণ ছবি ইউলিসিস’ গেজ (১৯৯৫) (যা কিনা হোমারের মহাকাব্যের এক সাহসী ও অসাধারণ চলচ্চিত্রায়ন) ছেড়ে নোলানের ছবির সামনে গিয়ে মাথা নত করব?
কেনই বা নোলানের প্রযোজনার জন্য তৈরি করা সেই বিশাল, একচোখা পলিফেমাসের মতো আইম্যাক্স ক্যামেরার সামনে নিজেকে সমর্পণ করব এবং সেই ভয়ংকর চোখের দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবীকে দেখার চেষ্টা করব?
আইম্যাক্স সিনেমা হলে দর্শকেরা যেন অডিসিউসের সঙ্গীদের মতো প্রবেশ করেন। একবার অন্ধকারের ভেতর আটকা পড়লে তারা সেখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন। কারণ সেখানে তারা নোলানের অতৃপ্ত অহংকারের খাদ্য হয়ে ওঠেন—একচোখা ক্যামেরা হাতে মানুষখেকো সাইক্লপসের মতো নোলান যেন তাদের গ্রাস করতে থাকেন।
নোলানের অন্য সব ছবির মতো এটিও দেখতে বসা মানে একজন ধনী ও উদ্ধত ব্রিটিশ অভিজাতের বিলাসবহুল প্রাসাদে প্রবেশ করা—যিনি তাঁর সম্পদ ও ক্ষমতা প্রদর্শন করছেন। আমার এটা ভালো লাগে না। আমি সেখানে থাকতেও চাই না।
একবার ভাবুন, আপনার হাতে কী বিপুল ক্ষমতা ও অর্থ আছে—আপনি আপনার ছবির জন্য নতুন ধরনের আইম্যাক্স ক্যামেরা তৈরি করাতে পারেন।
এমন একটি ছবি বানাতে পারেন, যা ডিজিটাল যুগ ও কম্পিউটার-নির্ভর গ্রাফিক্সের যুক্তি ও প্রচলনকে অস্বীকার করবে বলে দাবি করে এবং কৃত্রিমভাবে বাস্তবতার অনুভূতি তৈরি করবে। কিন্তু তারপর এই প্রযুক্তি ও তৈরি করা সেই ‘বাস্তবতা’ দিয়ে করবেনটা কী?
হোমারের অডিসি-র অন্যতম বর্ণবাদী, যুদ্ধপন্থী ও প্রতিক্রিয়াশীল পাঠের মাধ্যমে অডিসিউসকে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের আদিরূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবেন?
নোলান এত বিশাল পর্দা, ক্যামেরা, শব্দ ও দৃশ্যের আয়োজন করেছেন যে, দর্শক নিজেকে খুব ছোট ও অসহায় মনে করতে পারে।
ছবির চরিত্রগুলোকে প্রায় দেবতার মতো শক্তিশালী ও মহিমান্বিত করে দেখানো হচ্ছে। বিপরীতে সাধারণ দর্শক নিজেকে সেই বিশাল জগতের সামনে একজন তুচ্ছ মানুষের মতো অনুভব করে। এই অনুভূতিটিকে স্বাভাবিক বা মহৎ কোনো শিল্প-অভিজ্ঞতা নয়।
সমালোচকেরা এই বিশাল আয়োজন দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছেন যে তাঁরা প্রশ্নই করছেন না—এই জাঁকজমক দর্শকের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক তৈরি করছে।
এটি অশ্লীল। যৌন অর্থে ‘অশ্লীল’ নয়। বিপুল ক্ষমতা, অর্থ ও প্রযুক্তির প্রদর্শন করে দর্শককে নিজের তুলনায় তুচ্ছ করে দেওয়ার প্রবণতাই নান্দনিক ও মানবিক জায়গা থেকে আপত্তিকর।
এই ক্ষমতা প্রদর্শন মানবিকতার বদলে আধিপত্যের অনুভূতি তৈরি করে—আর সেটিই ‘অশ্লীল’।
জীবনের ভঙ্গুরতা এবং আমাদের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য কতটা অনিশ্চিত—মহাকবি ওমর খৈয়ামের মতো কবিরা আমাদের শিখিয়েছেন।
এসবের মুখোমুখি হয়ে আমাদের নিজেদের ধুলিকণার মতো ক্ষুদ্র মনে করাই স্বাভাবিক।
কিন্তু প্রকাশ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের একজন প্রতিনিধি, যিনি আবার আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের কাঁধে ভর করে দাঁড়িয়ে আছেন, সেই মানুষটির কাছে আমাদের মতো ভঙ্গুর মরণশীল মানুষের জন্য কী শ্রেষ্ঠ কবিতা, জ্ঞান বা দর্শন থাকতে পারে? নেই। একেবারেই কিছু নেই।
উত্তর-ঔপনিবেশিক চিন্তাবিদদের বহু প্রজন্ম অডিসি-কে ‘আদি-উপনিবেশবাদ’-এর একটি ভিত্তিমূলক রচনা হিসেবে পাঠ করেছেন। এখানে উপনিবেশকারীর দৃষ্টি গিয়ে পড়ে অপরিচিত ভূখণ্ড ও সেখানকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর; তাদের বশে আনা হয় এবং বর্বর ও নরখাদক হিসেবে দেখানো হয়।
তবে আরও মানবিকভাবে দেখলে, অডিসিউসকে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে পালিয়ে নিজের ঘরের সন্ধানে বের হওয়া একজন শরণার্থী হিসেবেও পড়া যায়।
তার সঙ্গে থাকে নির্বাসন, জোরপূর্বক অভিবাসন ও প্রবাসজীবনের বিচ্ছিন্নতার গভীর মানসিক ক্ষত। নোলানের অডিসিউস কিন্তু এই দ্বিতীয়টির চেয়ে প্রথমটিরই বেশি প্রতিফলন।
উদাহরণ হিসেবে ডেরেক ওয়ালকটের ওমেরোস (১৯৯০)-এর কথা বলা যায়। সেন্ট লুসিয়ার এই কবি ও নাট্যকার তাঁর মহাকাব্যে হোমারের গল্পকে উত্তর-ঔপনিবেশিক ক্যারিবীয় প্রেক্ষাপটে নতুন করে লিখেছেন।
সেখানে আফ্রিকান প্রবাসী জনগোষ্ঠীর ইতিহাস এবং আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে দাস বানিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভয়াবহতার মানসিক ক্ষত উঠে এসেছে। বাস্তুচ্যুত মানুষ কীভাবে ‘ঘর’ বা ‘স্বদেশ’-এর ধারণাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে বাধ্য হয়, সেটিও এতে অনুসন্ধান করা হয়েছে।
একইভাবে টনি মরিসনের উপন্যাস সুলা (১৯৭৩)-কে মহাকাব্যের নায়কের যাত্রার একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক পুনর্ব্যাখ্যা হিসেবে পড়া হয়েছে। এখানে কেন্দ্রে রয়েছে আফ্রিকান-আমেরিকান নারীদের অভিজ্ঞতা।
এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত সুজান-লরি পার্কসের ২০১৪ সালের মহাকাব্যিক নাটক ফাদার কামস হোম ফ্রম দ্য ওয়ার্স (পার্টস ১,২ অ্যান্ড ৩)।
হোমারের অডিসি অবলম্বনে লেখা এই নাটকে আফ্রিকান-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। গল্পের কেন্দ্রের চরিত্র হিরো একজন দাসত্বের শিকার টেক্সান। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় কনফেডারেসির পক্ষে যুদ্ধে তার মালিকের সঙ্গে যোগ দিলে তাকে স্বাধীন করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
হোমারের মহাকাব্যের এসব অসীমভাবে উন্নত পাঠের বিপরীতে নোলান বেছে নিয়েছেন সবচেয়ে সাদামাটা, শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী পাঠটি। তাঁর ব্যাটম্যান ট্রিলজিতেও যেমন ওয়াল স্ট্রিটের আন্দোলনকে দানবীয় হিসেবে দেখানো হয়েছে।
একইভাবে ইন্টারস্টেলার (২০১৪) হলো মার্কিন গ্রহ-উপনিবেশবাদের এক বিপজ্জনক কল্পনা।
যাঁরা কখনো থিও অ্যাঞ্জেলোপোলাসের কোনো ছবি দেখেননি, তাঁদের কাছে তাঁর একটি ছবি দেখা যেন প্লেটোর ‘গুহার উপমা’-য় আলোর উৎস দেখতে পাওয়ার মতো।
নোলানের আইম্যাক্সের প্রতি আসক্তি এবং দর্শকদের জন্য তৈরি করা গুহার মতো সিনেমা হলের কথা ভাবলে এটি সবচেয়ে উপযুক্ত রূপক।
তাঁর অসাধারণ মাস্টারপিস ইউলিসিস গেজ-এর কথাই ধরুন। হোমারের অডিসি অবলম্বনে তৈরি এই ছবিটি একটি যুদ্ধের গল্পও বটে।
খুব বেশি কিছু আগেভাগে বলে না দিয়ে শুধু এটুকু বলা যায়—একটি নিরিবিলি সন্ধ্যায় বাড়িতে বসে ছবিটি দেখা উচিত।
একজন যত্নশীল ও দক্ষ গ্রিক নির্মাতা কীভাবে গ্রিক সাহিত্যের একটি মহাকাব্যিক রচনাকে নিজের দেশ, নিজের মহাদেশ এবং তার মধ্য দিয়ে আমাদের সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাস নিয়ে গভীর এক চলচ্চিত্র-ভাবনায় রূপ দিয়েছেন, তা দেখে বিস্মিত হতে হয়। এর পরিণতি হলো বলকান অঞ্চলের গণহত্যা নিয়ে এক গভীর মননশীল চলচ্চিত্র।
নোলান যখন তাঁর অডিসিউস ছবির শুটিং করছিলেন, তখন কি পৃথিবীর কোথাও কোনো গণহত্যা চলছিল না, যার কথা তিনি ছবিতে উল্লেখ করতে পারতেন?
হোমারের অডিসি-র পটভূমি ভূমধ্যসাগর। কিন্তু আজ সেই ভূমধ্যসাগর সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বিপজ্জনক যাত্রার সাক্ষী।
আফ্রিকার অভিবাসীরা সেখানে ডুবতে বসা নৌকায় চড়ে বাঁচার মতো একটি জীবনের সন্ধানে পাড়ি দিচ্ছেন। সাহসী অধিকারকর্মীরা ফ্লোটিলায় চড়ে গাজায় পৌঁছানোর এবং ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া অনাহার থেকে সেখানকার মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন; অথচ ইসরায়েলি বাহিনী তাদের অপহরণ ও ধর্ষণ করছে।
আবার জ্যারেড কুশনার ও ইভানকা ট্রাম্পের মতো অতি ধনী মানুষ পুরো একটি দ্বীপ দখল করে নিজেদের মতো আরও উন্মত্ত ধনীদের জন্য সেটিকে ‘উন্নয়ন’ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু নোলানের পুরুষতান্ত্রিক ও কিশোরসুলভ অডিসি-তে এই বাস্তব ভূমধ্যসাগরের কোনো চিহ্নই নেই।
উন্নততর পাঠের জন্য অ্যাঞ্জেলোপোলাসই একমাত্র উদাহরণ নন। গ্রিসের নোবেলজয়ী কবি জর্জ সেফেরিস হোমারকে অতীতের কোনো ধ্বংসাবশেষ হিসেবে দেখেননি; তিনি তাঁকে আমাদের পৃথিবীর জীবন্ত কণ্ঠস্বর হিসেবে দেখেছেন।
সেফেরিসও আধুনিক গ্রিসের ইতিহাসের মানসিক ক্ষতকে বোঝাতে হোমারের পুরাণ ব্যবহার করেছেন। তাঁর লগ বুক ট্রিলজি (১৯৪০-১৯৫৫)-তে যুদ্ধ ও অস্থিরতার সময় ভূমধ্যসাগরের পটভূমিতে নির্বাসন ও পরিচয়ের সংকট অনুসন্ধান করা হয়েছে।
আরেকটি উদাহরণ নিকোস কাজানজাকিসের দ্য অডিসি: অ্যা মডার্ন সিকুয়েল (১৯৩৮)। গ্রিক এই কবি, দার্শনিক ও ঔপন্যাসিকও হোমারের মহাকাব্যকে ভিত্তি করে নিজের মহাকাব্যটি লিখেছেন। জেমস জয়েস, মার্গারেট অ্যাটউডসহ আরও অনেক লেখকের কাজেও এ ধরনের উদাহরণ রয়েছে।
নোলানের অডিসি হোমারের মূল কাহিনির সবচেয়ে ভালো বা সবচেয়ে খারাপ পুনর্নির্মাণ—কোনোটাই নয়। বরং হাজার বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন দেশের মানুষ হোমারের এই মহাকাব্যকে নিজেদের মতো করে নতুনভাবে ব্যাখ্যা ও নির্মাণ করেছেন। নোলানের ছবিকেও সেই দীর্ঘ ধারার অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।
আমি গ্রিসের একটি ছোট শহরের সাধারণ সিনেমা হল থেকে শুরু করে নিউইয়র্কের সবচেয়ে বড় আইম্যাক্স প্রেক্ষাগৃহ—দুই জায়গাতেই ছবিটি দেখেছি।
আমার কাছে নোলানের অডিসি বাস্তব পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো থেকে আমাদের মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া একটি অতিরিক্ত প্রশংসা পাওয়া বিনোদনমূলক ছবি ছাড়া আর কিছু নয়।
এই ছবিতে আমাদের পৃথিবী কতটা ভঙ্গুর ও অনিশ্চিত, সেই উপলব্ধি খুব একটা নেই। অথচ থিও অ্যাঞ্জেলোপোলাসের ইউলিসিস’ গেজ আমাদের সেই ভঙ্গুর পৃথিবীর দিকে তাকাতে, তার বাস্তবতা নিয়ে ভাবতে এবং গভীরভাবে তা অনুভব করতে সাহায্য করে।
হামিদ দাবাশি নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানীয় স্টাডিজ ও তুলনামূলক সাহিত্যের হ্যাগোপ কেভোরকিয়ান অধ্যাপক। তিনি তুলনামূলক সাহিত্য, বিশ্ব চলচ্চিত্র ও উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্ব পড়ান।
মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ।