শিশুধর্ষণ ও হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ
শিশুধর্ষণ ও হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ

মতামত

শিশুধর্ষণ ও হত্যা: জনতুষ্টিবাদী বিচার ও আইনের বিপদ

পত্রিকা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই অপরাধপ্রবণতার নানা খবর, বিশেষভাবে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার সংবাদ ধারাবাহিকভাবেই আমাদের চোখে পড়ে। সেটি অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতির কারণে হওয়া হামের প্রাদুর্ভাবে ৫০০ শিশুর পদ্ধতিগত হত্যাকাণ্ডই হোক অথবা যৌন নিপীড়নের মতো নৃশংসতম অপরাধই হোক না কেন। কয়েক দিন ধরে পল্লবীর কন্যাশিশু হত্যাকাণ্ড এবং বনশ্রীর মাদ্রাসাশিক্ষার্থীর আত্মহত্যা নিয়ে জোর প্রতিবাদ হচ্ছে সমাজের সব স্তর থেকে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, দুটি ঘটনাতেই শিশু দুটি ধর্ষণের শিকার হয়েছিল বলে প্রমাণ মিলেছে।

এ ধরনের নৃশংস ঘটনায় সাধারণ জনগণের ক্ষোভ থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। কেননা শিশুদের ব্যাপারে আমরা সবাই সংবেদনশীল ও আবেগপ্রবণ। কিন্তু আমাদের সেই আবেগ যেন রাষ্ট্রক্ষমতা ও বিচারব্যবস্থাকে এমনভাবে প্রভাবিত না করে, যা নতুন কোনো অবিচার বা অন্যায়ের জন্ম দেয়। কিন্তু গত কয়েক দিনে সরকার ও বুদ্ধিজীবী মহলের নানা বক্তব্যে সে আশঙ্কাই বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

বাংলাদেশ সংবিধানের অন্যতম মৌলিক অধিকারের একটি হলো, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী (অনুচ্ছেদ ২৭)।’ এ প্রসঙ্গে সংবিধানে আরও বলা আছে, ‘যথাযথ আইন ব্যতীত এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না, যা কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির ক্ষতিসাধন করে (অনুচ্ছেদ ৩১)।’ এ ছাড়া আইনের মৌলিক একটি নীতি হচ্ছে, অভিযোগ প্রমাণের আগপর্যন্ত সব ব্যক্তিকে ‘নির্দোষ’ বলে ভাবতে হবে। এই নীতি সাধারণ নাগরিক হিসেবে আপনি-আমি যতই অপছন্দ করি না কেন (বিশেষ করে শিশুধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে) আইনকে তার নিয়মে চলতে দেওয়াই বাঞ্ছনীয়।

অথচ আমরা দেখেছি, জনপ্রতিবাদের মুখে নানা সময়ে আইনের পরিবর্তন এসেছে বাংলাদেশে। বিশেষ করে ধর্ষণের ক্ষেত্রে কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়েছে অনেক সময়েই। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, বিচারের চেয়ে ‘ফাঁসি’ই বেশি কাম্য হয়ে ওঠে এই সব দাবিদাওয়ায়।

এর পেছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, সাধারণ মানুষ মনে করেন, এ ধরনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে অন্যান্য সম্ভাব্য ধর্ষকদের ভয় দেখানো সম্ভব, যা মূলত ধর্ষণের মতো অপরাধ কমাতে সাহায্য করবে। দ্বিতীয়ত, বিচারহীনতার এই দেশে মানুষ ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডকেই কেবল উপযুক্ত শাস্তি বলে মনে করে। এটি আদতে এখনো আমাদের সেই আদিম যুগের ‘চোখের বদলে চোখ বা দাঁতের বদলে দাঁত’ নেওয়ার প্রবৃত্তিরই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরকার কি জনতুষ্টিমূলক সিদ্ধান্ত নেবে, নাকি সব জনগণের জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এবং শিশুধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধ প্রতিরোধে সচেষ্ট হবে?

সাধারণভাবে মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে অপরাধ দমন করা যায় বলে মনে হলেও বাংলাদেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য গবেষণা ও জরিপের খোঁজ পাওয়া যায় না, যা এ ধারণাকে সমর্থন করে। কিন্তু চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডগুলো নিয়ে প্রতিবারই আমরা সরকারসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একধরনের জনতুষ্টিবাদী প্রচারণা দেখতে পাই। যেমন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মাগুরায় একটি শিশুধর্ষণ ও হত্যার পর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫ অনুমোদন দেওয়া হয়। এই অধ্যাদেশে ধারা ২০-এ নতুন উপধারা ৯ সংযোজিত করে বলা হয়েছে, এ আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, কেবল ধর্ষণের মামলার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল উপযুক্ত মনে করলে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে বিচারকাজ সম্পন্ন করতে পারবেন। 

এ ছাড়া নতুন ৩২(ক) ধারায় বলা হয়েছে, তদন্তকারী কর্মকর্তা চাইলে অভিযুক্ত ব্যক্তির ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা না করার সিদ্ধান্তও নিতে পারেন। তবে শর্ত আছে যে তিনি লিখিতভাবে ট্রাইব্যুনাল বা ক্ষেত্রমতে ম্যাজিস্ট্রেটকে ডিএনএ পরীক্ষা না করার কারণ অবহিত করবেন। এ সংযোজন দুটি অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। কেননা, ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল সাধারণত ধর্ষণের মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর বাইরেও ২০২৫-এর এই অধ্যাদেশের বিভিন্ন ধারায় মৃত্যুদণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটানো হয়েছে, যদিও মৃত্যুদণ্ড এই আইনে আগে থেকেই ছিল। উল্লেখ্য, অধ্যাদেশটি বর্তমান জাতীয় সংসদে পাস হওয়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০২৬ এর মাধ্যমে রহিত হলেও উক্ত ৩২(ক) এর ধারাটি এখনো বলবৎ আছে।

অপরাধীদের সমাজ ও মিডিয়া ট্রায়ালের মধ্যে ফেলে দিয়ে চুপচাপ তা দেখে যাওয়াটাও সরকারের জন্য সমীচীন নয়। আপাতদৃষ্টিতে দেখতে সুস্থ স্বাভাবিক একজন মানুষ কেন এ ধরনের নৃশংস অপরাধে সক্ষম, সেটি তার শৈশব জীবন, বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সমস্যা আছে কি না, মাদকে আসক্ত কি না, এগুলো না জানলে আমরা কীভাবে এ ধরনের অপরাধ কমিয়ে আনতে পারব?

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিভিন্ন সময়ে নানা জনতুষ্টিবাদী আইনি উদ্যোগ নেওয়ার পরও কি আমরা ধর্ষণ বা শিশুধর্ষণের মতো অপরাধের পরিসংখ্যানে কোনো নিম্নগামিতা লক্ষ করেছি? সেটা হয়নি, তার কারণ হলো, মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতের বাইরে আমাদের অনেক বেশি প্রয়োজন ছিল ধর্ষণের মতো একটি অপরাধের পেছনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নিয়ামকগুলো বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর মাত্রা সমাজে কমিয়ে আনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া।

যেমন আমরা কি কখনো সরকারিভাবে এমন কোনো গবেষণায় পৃষ্ঠপোষকতা করতে দেখেছি, যেখানে উঠে এসেছে যে কেন শিশুধর্ষণের পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে আমাদের সমাজে? এর পেছনের কাঠামোগত ও মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো যদি চিহ্নিত করা না যায়, তাহলে শুধু একজন ধর্ষককে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে আপনার-আমার সন্তানকে রক্ষা করব কীভাবে?

অপরাধবিজ্ঞানের প্রাসঙ্গিক একটি তত্ত্ব দিয়ে এ ধরনের অপরাধের কারণ বিশ্লেষণের আলোচনাটি শুরুই করা যায়। মার্কিন অপরাধবিজ্ঞানী লরেন্স ই কোহেনের ‘রুটিন অ্যাকটিভিটি’ তত্ত্বের মতে, এ ধরনের অপরাধ সংঘটনে তিনটি উপাদান লাগে। সেগুলো হলো অপরাধ করার ইচ্ছা বা আগ্রহসম্পন্ন ব্যক্তি, সেই ব্যক্তির জন্য সহজ বা উপযুক্ত লক্ষ্যবস্তু (শিকার) এবং কার্যকর সুরক্ষা বা অভিভাবকত্বের অভাব।

এই তিনটি উপাদান একসঙ্গে মিললেই অপরাধ সংঘটনের আশঙ্কা তৈরি হয়। খেয়াল করে দেখুন, ছোট শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির চেয়ে অনেক দুর্বল ও সরলমনা হয়ে থাকে। তাদেরকে একটি চকলেট বা সামান্য উপহারের কথা দিয়ে ভুলিয়ে কোনো নির্জন জায়গায় নিয়ে যাওয়া বেশ সহজ।

আবার একটি শিশু আসন্ন বিপদ বুঝতে পারলেও তা প্রতিরোধ করার ক্ষমতাও রাখে না, এমনকি ভয় দেখিয়ে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া সহিংসতার কথাও চেপে যেতে বলা হয়। এসব কারণে একটি শিশু সব সময়েই যৌন অপরাধীদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত শিকার হয়ে থাকে। কিন্তু শিশুদের রক্ষা করতে হলে আমাদের খেয়াল করতে হবে কোহেনের সর্বশেষ উপাদানটির দিকে, যা মূলত মা–বাবা ও বড় পরিসরে রাষ্ট্রের দায়িত্বের ওপরই বর্তায়।

এ ক্ষেত্রে মা-বাবার দায়িত্ব হলো নিজে যেমন সচেতন থাকা যে সন্তান কোথায় যাচ্ছে বা কার সঙ্গে মিশছে, ঠিক তেমনি সন্তানদের গুড টাচ-ব্যাড টাচ (ভালো ও খারাপ স্পর্শ) সম্পর্কে অবহিত করা। তবে সরকারের ভূমিকা আরও বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। একদিকে যেমন স্কুলগুলোয় বাধ্যতামূলকভাবে ভালো ও খারাপ স্পর্শ পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, ঠিক তেমনি অপরাধ সংঘটনের পর ভিকটিম ও সাক্ষীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যদিকে অপরাধীদের সমাজ ও মিডিয়া ট্রায়ালের মধ্যে ফেলে দিয়ে চুপচাপ তা দেখে যাওয়াটাও সরকারের জন্য সমীচীন নয়। আপাতদৃষ্টিতে দেখতে সুস্থ স্বাভাবিক একজন মানুষ কেন এ ধরনের নৃশংস অপরাধে সক্ষম, সেটি তার শৈশব জীবন, বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সমস্যা আছে কি না, মাদকে আসক্ত কি না, এগুলো না জানলে আমরা কীভাবে এ ধরনের অপরাধ কমিয়ে আনতে পারব?

এ বিষয়গুলো অনুধাবন না করে আমরা যদি অভিযুক্ত ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ডকেই একমাত্র ইনসাফ বলে মনে করি, সেই সমাজের জন্য কোনো স্বস্তিকর বার্তা দেয় না। কেননা, দিন শেষে এটিও একধরনের পাল্টা উগ্র আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ। আর জনগণের এমন আচরণ যখন সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে সমাজের শিক্ষিত পেশাজীবীদের বক্তব্যেও প্রতিফলিত হবে, তখন সমাজে স্থিতি ও শান্তি বজায় রাখতে আমাদের ফিরে যেতে হবে অজনপ্রিয় কিন্তু কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের আলোচনায়। কেননা চটকদার ও জনপ্রিয় বক্তব্য সাময়িকভাবে জনগণের আবেগপ্রবণ মন উদ্বেলিত করবে বটে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগই কেবল পারবে সমাজ থেকে ধীরে ধীরে শিশুধর্ষণের মতো নৃশংস অপরাধের মাত্রা কমাতে।

  • উম্মে ওয়ারা সহযোগী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

    মতামত লেখকের নিজস্ব